৪ঠা মার্চ, ২০২১ ইং , ১৯শে ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২০শে রজব, ১৪৪২ হিজরী

অটিস্টিক বিষয়ে আপনার শিশুর পরিচর্যা

সচেতনতা। বনশ্রী ডলি

অটিস্টিক বিষয়ে আপনার শিশুর পরিচর্যা

মিতা তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে নতুন ক্লাসে ক্লাসে পড়া বলতে পারছে না, লিখতে চায় না; সহপাঠীদের বিরক্ত করে। তাই শিক্ষকেরাও মিতাকে বকাঝকা করেন। স্কুল থেকে বাড়ি ফিরে কান্না জুড়ে মিতা সে আর স্কুলে যাবে না। কিছুদিন পর স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয় মিতা, কিন্তু বাসায়ও লেখাপড়া করে না, আচরণও বদলে যাচ্ছে। কিছু বললে চিৎকার করে। তার অস্বভাবিকতাগুলো দিন দিন বাড়ছেই। জেলা শহরে গৃহিনী মা রিতা, হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক রবি বাবুর প্রথম সন্তান মিতা। মা-বাবা ও পরিবার ভেবেছে যে, বড় হলে ঠিক হয়ে যাবে। বেশ কিছুদিন পর ঢাকায় দেখানোর পর বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জানালেন, মিতা অটিস্টিক শিশু। চিকিৎসা চালাতে হবে দীর্ঘদিন। তবে ওর লেখাপড়া বন্ধ করাটা ঠিক হয়নি।

চিকিৎসকের কথা শুনে মিতার মা-বাবা নিজেদের অবহেলা আর অজ্ঞতার কথা ভেবে কষ্ট পান। কিছুদিন  চিকিৎসার পর বাড়ি ফিরে যায় মিতা। মিতা এখন ১৪ বছরের মেয়ে। প্রতিদিন সে পত্রিকা পড়ে, ঘর গোছায়, এক মনে গান গাইতেই থাকে; তার সুরেলা কণ্ঠের নির্ভুল গান শুনে মনেই হয় না অটিস্টিক শিশু মিতা। অবহেলা একদম সহ্য করতে পারে না সে, তবে ভালোবেসে বুঝিয়ে বললে অনেকটা স্বাভাবিক আচরণ করে মিতা।

শুভ আড়াই-তিন বছর বয়সে দুষ্টুমি করে, খায়, ঘুমায় সময়মতো এবং খেলনা দেখিয়ে দেয়। কিছু শব্দ বলে, তবে খুব স্পষ্ট নয়। শুভ’র মা সিমলা আহমেদ, বাবা ফরহাদ আহমেদ ব্যাংকার; প্রতিদিনই অফিস থেকে ফিরে ছেলের সঙ্গে সময় কাটান। এভাবে চার বছর পার হওয়ার পরও মা-বাবা খেয়াল করেন, সমবয়সী অন্য শিশুর মতো কথা বলছে না সে। শুভকে চিকিৎসকের নিয়ে যান তারা। চিকিৎসক জানালেন, শুভ অটিজমে আক্রান্ত। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী স্বাভাবিক স্কুলেই ভর্তি করা হলো শুভকে, কিন্তু ক্লাসে শুভ তাল মেলাতে পারে না। অন্যরাও বিরক্ত হয়। ফলে শুভকে ভর্তি করা হয় বিশেষ স্কুলে। শুভর বয়স যখন সাত বছর, তখন চিকিৎসক জানালেন, শুভ চোখে কম দেখে এবং কানেও কম শোনে, যা শুভ’র মা-বাবা বুঝতেই পারেননি। তখন থেকেই শুভ চশমা পরে। শুভ’র মূল চিকিৎসা কিছুটা দেরিতে শুরু হয়। অটিজমের চিকিৎসা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। যেখানে অটিস্টিক শিশুটির জন্য সবাইকে পাশে থাকতে হয়। শুভর অটিজম পুরোপুরি ভাল হবে, এমনটা নয় তবে চিকিৎসা ও সকলের সহযোগিতায় কিছুটা পরিবর্তন আসবে-বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। শুভ এখন নিয়মিত স্কুলে যাচ্ছে। এখন তার বয়স ১৩।

চিকিৎসকদের মতে সন্তান স্বাভাবিক আচরণ করছে কি-না, তা মা-বাবার খেয়াল রাখা জরুরি। আত্মীয় স্বজন, পড়শীদের কাছেও কোনো শিশুর অস্বাভাবিকতা শিশুটির মা-বাবাকে নিঃসংকোচে জানানো উচিত। গত কয়েক বছরে আমাদের দেশে অটিজম, প্রতিবন্ধী, বিশেষ শিশুদের জন্য অনেক ভাল উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মানুষের সচেতনতা আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। এ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানও গড়ে উঠেছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের অটিজম এবং অটিস্টিক শিশুদের শেখানো ও ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন, প্রয়োজন আরো মনিটরিং। এখনো আমাদের সমাজ অটিস্টিক শিশুদের সহজভাবে নেয় না। অটিস্টিক শিশুদের নিয়ে বাইরে গেলে মানুষের কৌতুহলী চাওয়া ও ব্যবহার দেখলে মনে হয় যেনো এ শিশুদের মা-বাবারা যেন অপরাধ করেছে। যদিও আগের মতো অটিস্টিক শিশুদের লুকিয়ে না রেখে সবার সামনে আনা এবং চিকিৎসা করানোর প্রবণতা বেড়েছে সমাজে।  কিন্তু তারপরও সরকারের নেয়া সচেতনতামূলক উদ্যোগগুলোর আরও প্রচার করা প্রয়োজন।

প্রতিবন্ধীদের জন্য বাংলাদেশ সরকারের নেয়া উদ্যোগগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রতিবন্ধীদের জন্য প্রণীত আইন,‘ নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন ২০১৩ (Neuro Developmental Disability Protection Trust Act, ২০১৩)। এতে প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা, শারীরিক উন্নতি, জাতীয় পরিচয়পত্র, ভোটাধিকার, নিয়মিত বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সুযোগ, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় কর্মকা- ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, পরিবহন, প্রতিষ্ঠান ও জনপরিসরে প্রবেশাধিকারের অধিকারসহ ২১টি অধিকার এর কথা বলা হয়েছে। এছাড়াও রয়েছে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩’। প্রতিবন্ধীদের কাজ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে ‘জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’ এর চাকুরি বিধিমালা- ২০১৬ করা হয়েছে।  অন্যদিকে সারাদেশে প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ধরনের বিদ্যালয় ও পুনর্বাসন  কেন্দ্র।

মন্ত্রণালয় থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত বেসরকারি প্রতিবন্ধী স্কুলের সংখাও কম নয় দেশে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রালয়ের ওয়েবসাইটের তথ্য বলছে, রাজধানীসহ সারাদেশে সুইড বাংলাদেশ পরিচালিত ৪৮টি বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী ফাউন্ডেশনের সাতটি ইনকু¬সিভ বিদ্যালয় রয়েছে এবং ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় প্রয়াস পরিচালিত ‘অটিস্টিক স্কুল’ ছাড়াও সাভার ও চট্টগ্রামে প্রয়াসের আরো বিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। এছাড়াও রয়েছে আরো বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান, যারা বিশেষ শিশুদের বিকাশে কাজ করছে।

শিক্ষার মূলধারায় প্রতিবন্ধী শিশুদের যুক্ত করতে সারাদেশে বিশেষ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মূলধারার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে লেখাপড়ার সুযোগ সৃষ্টি, দক্ষতা অর্জন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, প্রশিক্ষণসহ স্বনির্ভর ও স্বাধীন জীবন যাপনের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য সম্প্রতি প্রতিবন্ধিতা সম্পর্কিত সমন্বিত বিশেষ শিক্ষানীতি ২০১৯ অনুমোদন দিয়েছে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়ের স্বীকৃতি ও বেতন ভাতা পাওয়ার জন্য অন্তত ১০০ জন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী থাকতে হবে। দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ৭৫ জন শিক্ষার্থী থাকা চাই। প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ও বেতন-ভাতা প্রদানকারী কমিটির সভাপতি থাকবেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্তি সচিব (প্রতিষ্ঠান ও প্রতিবন্ধিতা)। বিদ্যালয় পরিচালনায় থাকবেন তিন বছর মেয়াদে ১৩ সদস্যের ব্যবস্থাপনা কমিটি। জেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক বা তার প্রতিনিধি সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন।

বিশেষ শিশুদের জন্য প্রতি জেলায় বিশেষ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা করেছে সরকার। সরকারের এই ঘোষণার পর মোট দুই হাজার ৬৯৭টি স্কুলের আবেদন পাওয়ার গেছে। প্রাথমিকভাবে এক হাজার ৫২৫টি বাছাই করা হয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা, যোগ্য শিক্ষক, যোগ্যতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেবে সরকার। দেশের প্রতিবন্ধী ও অটিজম আক্রান্তদের ওয়ানস্টপ সার্ভিস দিতে সরকার ৬৪টি জেলা ও ৩৯টি উপজেলায় ১০৩টি প্রতিবন্ধী সেবা ও সাহায্যকেন্দ্র চালু করেছে, যেখানে প্রতিবন্ধীদের ওয়ানস্টপ সার্ভিস প্রদান করা হয়। এছাড়াও প্রত্যন্ত এলাকার প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় থেরাপিউটিক সেবা পৌঁছে দিতে ২০১৫ সাল থেকে ৩২টি ভ্রাম্যমাণ মোবাইল রিহ্যাবিলিটেশন থেরাপি-ভ্যানের কার্যক্রম চলছে। এ সবই প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টা। এর আগে ২৮তম আন্তর্জাতিক ও ২১তম জাতীয় প্রতিবন্ধী দিবস-২০১৯ পালন উপলক্ষে ৫ ডিসেম্বর ২০১৯ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় প্রতিবন্ধী কমপ্লেক্স ‘সুবর্ণ ভবন’ উদ্বোধন করেন। রাজধানীর জাতীয় প্রতিবন্ধী উন্নয়ন ফাউন্ডেশন চত্বরে ১৫ তলা বিশিষ্ট এই কমপ্লেক্সে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রশিক্ষণ, পুনর্বাসন ও আবাসিক সুবিধা দিতেই সরকারের এমন উদ্যোগ।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, অটিজম বা প্রতিবন্ধিতা কোনো রোগ বা অসুস্থতা নয়। তিনি বলেন, ‘অটিজম বা প্রতিবন্ধিতায় যাঁরা ভুগছেন তাঁরা যেন সমাজের মূল ধারায় বসবাস করতে পারেন, সরকার এমন পদক্ষেপই নিচ্ছে। আমরা জানি যে এ ধরনের প্রতিবন্ধিতায় যেসব শিশু ভুগছে, তাদের পিতা-মাতার জন্য এটি খুবই বেদনাদায়ক। আমরা তাদের এই দুর্দশা নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছি।’

জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসটি ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর বিশ্বব্যাপী পালন করা হয়। এবারে (২০১৯) সালে দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘অভিগম্য আগামীর পথে’। প্রতিবছর ৩ ডিসেম্বর সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জেলা পর্যায়ে পালিত হলেও ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো উপজেলাগুলোতেও দিবসটি পালিত হয়েছে।  দিবসটি পালন উপলক্ষে জাতীয় উন্নয়নে প্রতিবন্ধী মানুষদের অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকাারি উদ্যোক্তা এবং গণমাধ্যম কর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন সরকার।

প্রতিবন্ধী ব্যক্তির পাশে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র সহায়তার হাত বাড়ালে সে সমাজের অন্য দশজনের মতো মর্যাদাপূর্ণ ও উন্নত জীবন পেতে পারে, বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখতে পারে এর উদাহরণ কুষ্টিয়ার সুজন রহমান। বাংলাদেশ বেতার ও টেলিভিশনের নিয়মিত শিল্পী সুজন এ পর্যন্ত ৩৫টি জাতীয় পর্যায়ে পুরস্কার পেয়েছেন। সিনেমায় গান গেয়েছেন, এছাড়া গান লেখেন এবং সুরও করেন সুজন। ছোটবেলায় ডায়রিয়া হয়, এতে তার চোখের জ্যোতি কমে যায়। এক পর্যায়ে সুজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। কিন্তু মা তাসলিমার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুজনের দৃঢ় মনোবল আর চেষ্টায় কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে লেখাপড়া ও গান শিখেছেন তিনি। কুষ্টিয়া ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়েছেন সুজন, সেসঙ্গে গানের চর্চা চালিয়েছেন নিয়মিত। এখন তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, কুষ্টিয়া জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন। সুজন তার এই অজর্নের পেছনে মায়ের লড়াইকে সম্মান জানিয়ে বলেছেন, আমি আজ যা কিছু অর্জন করেছি, তা সবই করেছি মায়ের চেষ্টায়।

২০০১ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধী কল্যাণ আইন ২০০১ আইন প্রণয়ন করে। ২০১৪ সালে সেই আইনটি বাতিল করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন ২০১৩ প্রবর্তন করে বর্তমান সরকার। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫, ১৭, ২৯ অনুচ্ছেদে অন্য নাগরিকদের সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সমান সুযোগ ও অধিকারের কথা বলা আছে। সংবিধানের ১৫(ঘ) অনুচ্ছেদ দায়-দায়িত্বের অংশ হিসেবে ২০০৫-০৬ অর্থ বছর হতে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীদের ভাতা কর্মসূচি চালু করে সরকার। শুরুতে অসচ্ছল প্রতিবন্ধীকে  ২০০ টাকা করে দেওয়া হলেও ক্রমেই তা বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থ বছরে ১৮ লাখ প্রতিবন্ধীকে প্রতি মাসে ৭৫০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হচ্ছে। আর তা তদারকি করছে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। প্রতিবন্ধী ভাতা প্রাপ্তদের নিজ নামে ১০ টাকায় ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছে সরকার।

সামজিক সুরক্ষামূলক ভিজিডি VGD: Vulnerable Development Programme প্রোগ্রামের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের প্রতিবন্ধী নারী ও শিশুদের উন্নয়নে কাজ করছে সরকার।

এখনো অটিস্টিক শিশু সম্পর্কে অনেকের ঠিক ধারণা নেই। মা-বাবা কাছ থেকে দেখেও বুঝতে পারেন না শিশুটি অটিজমে আক্রান্ত কি-না। অটিজম শিশুদের আচরণ ও ভাষা প্রকাশে সমস্যা সৃষ্টি করে। অন্যদের সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদানেও সমস্যা তৈরি করে। সাধারণত তিন বছর বয়সে অটিজম লক্ষণ দেখা যায়। পরেও তা ধরা পড়ে বা দেখা দিতে পারে। স্বাভাবিক শিশুরা হাত-পা নাড়ে এক বছর বয়সেই এবং আঙুল নাড়াচাড়া, আঙুল মুখে দেয়  নানারকম অঙ্গভঙ্গিও করে। চোখে চোখ রেখে হাসে। মা-বাবা ও পরিচিত জনকে খেয়াল করে। দেড়-দুই বছরের মধ্যে বিভিন্ন শব্দ করে, কিছু কথা বলে। হাঁটে, হাত বাড়িয়ে দেয় কোলে ওঠার জন্য, না নিলে কান্না করে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের বেলায় এই আচরণগুলো দিন দিন হারিয়ে যায় বা কমতে থাকে। সমবয়সী স্বাভাবিক শিশুরা যেভাবে কথা বলে, বা বাক্য ব্যবহার করে, ভাব প্রকাশে অঙ্গভঙ্গী করে, খেলায় মেতে ওঠে, অটিস্টিক শিশুরা তা পারে না। অটিজমে আক্রান্ত শিশুরা দেরিতে কথা বলতে শিখে। কথা বললেও ঠিক ভাষাটা ব্যবহার করে গুছিয়ে বলতে পারে না। যদিওবা কয়েকটা কথা শেখে, পরক্ষণেই তা ভুলে যায়। কোনো নির্দেশ অনুসরণ করতে অসুবিধা হয়। নাম ধরে ডাকলে সাড়া দেয় না। মনে হয় কানে কম শুনছে। ভাব বিনিময়ের জন্য চোখে চোখ রাখে অল্প সময়। এছাড়াও অটিস্টিক শিশুদের বিশেষ কোনো খেলনা বা অভ্যাসের প্রতি অস্বাভাবিক ঝোঁক বা আসক্তি, সৃজনশীল খেলা খেলতে না পারা, জিনিসপত্র এক লাইনে সাজিয়ে রাখা, বারবার একই কাজ করা ও একই শব্দ করা, শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বারবার নাড়াচাড়া করা, চলাফেরায় অস্বাভাবিকতা, মনোযোগের অভাব, নিয়ম বা রুটিনের পরিবর্তন হলে বিরোধিতা করা, বদমেজাজি ও জেদি হওয়া এবং ধ্বংসাত্মক, আক্রমণাত্মক বা আত্মঘাতী আচরণ লক্ষ্য করা যায়।

অটিজম কেন হয়, এর নির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। এ নিয়ে গবেষণা চলছেই। বিশেষজ্ঞদের মতে মস্তিষ্কের কিছু অস্বাভাবিক আচরণ অটিজমের জন্য দায়ী। বেশ কিছু খাবারও এর জন্য দায়ী বলে মনে করা হয়, যদিও এর বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। শিশুর প্রতি অভিবাবকদের অবহেলা বা আদর-স্নেহের অভাবে অটিজম হয় না-গবেষকরা এমনটাই মনে করেন। আবার অটিজমের ওপর পারিবারের আর্থিক অবস্থা এবং জীবনধারণের ধরণ প্রভাব ফেলে না।

অটিজম থেকে দ্রুত সেরে ওঠার মতো চিকিৎসা এখনো নেই। কেননা যত তাড়াতাড়ি এই রোগ নির্ণয় করে শিশুর উপযোগী প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তত দ্রুত অবস্থার উন্নতি হতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের জন্য দরকার উপযোগী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং অনুকূল ও বন্ধুসুলভ পরিবেশ। তাহলে তারা তাদের দক্ষতা ও সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে স্বাভাবিক হতে সক্ষম। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মূলস্রোতধারায় যুক্ত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম। এটা সবাইকে জানতে ও বুঝতে হবে, ওরা বিশেষ ক্ষেত্রে পারদর্শী হয়। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ পেলে অনেকটাই স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশে সরকারিভাবে অটিস্টিক শিশু ও অটিজম বিষয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে নেয়া হয়েছে বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ। বাংলাদেশের এই বিশেষ জনগোষ্ঠীর কল্যাণে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশ-বিদেশে কাজ করছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল, যা আন্তার্জাতিক অঙ্গনেও ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে। তবে সরকারের নেয়া এসব উদ্যোগগুলোর পাশাপশি বেসরকারিভাবেও এক্ষত্রে এগিয়ে আসতে হবে। অটিজম সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সক্রিয় ভুমিকা প্রয়োজন। অটিজমের আচরণ কোনো শিশুর মধ্যে দেখতে পেলে অবহেলা না করে দ্রুত বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে। মিতা ও শুভ’র পরিবারের মতো দেরি করা ঠিক হবে না!  বিশেষ শিশুরাও যেনো অন্য সাধারণ শিশুদের সঙ্গে মিলেমিশে বিকশিত হতে পারে; এ জন্য দরকার সবার একটু বিশেষ যত্ন ও ভালোবাসা । পিআইডি

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com