৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

অনুদান নিয়ে এত বিতর্ক কাম্য নয়

অনুদান নিয়ে এত বিতর্ক কাম্য নয়

মাওলানা আমিনুল ইসলাম :: কওমী মাদ্রাসার অনুদান পাওয়া নিয়ে আবার শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক। ফেসবুকে একেক সময় একেক ধরনের বিতর্ক জন্ম নেয়। আর সেটার উপর শুরু হয় ঝড়- ঝঞ্জা। একটানা বেশ কয়েকদিন চলে। সেটা শেষ হলে আবার শুরু হয় নতুন আরেক বিষয়।

এক সময় এই ফেসবুকে কওমী সনদের স্বীকৃতি নিয়ে বহু লেখালেখি হয়েছে। সে সময় তো এর থেকে আরো বেশী ঝড় উঠেছিল। সমালোচনার ঝড়। বাতাসের বেগটাও ছিল অনেক তীব্র। স্বীকৃতির পক্ষে- বিপক্ষে সব সময় গরম থাকত অনলাইন।

কেউ ছিলেন স্বীকৃতির পক্ষে, আর কেউ ছিলেন বিপক্ষে। যারা স্বীকৃতির বিপক্ষে ছিলেন, সে সময়ে উসুলে হাশ্তেগানার বহু দোহাই দিয়ে ছিলেন। উসুলে আকাবিরের খেলাফ, স্বকীয়তা হারিয়ে যাবে, কওমী মাদ্রাসাগুলো বিলীন হয়ে যাবে, আরো অনেক কিছু।

তবে অনলাইনে দুপক্ষেরই তখন কলমের জোর দেখেছি। কেউ কাউকে সহজে ছাড় দেন নি। সে সময়কার কলম যোদ্ধাদের এখনো ফেসবুকে দেখতে পাই। বহাল তবিয়তে আছেন। এখনো তাদের কলম গর্জে ওঠে।

শেষ মেষ কিন্তু স্বীকৃতি এসে গেল। লড়াই হলো দু গ্রুপের। পক্ষ – বিপক্ষের তুমুল লড়াই। স্বীকৃতির ফল ভোগ করল সবাই। যারা এতদিন বিপক্ষে ছিল, তারা কিন্তু আর স্বীকৃতি নিতে পিছে থাকেনি। বরং মিডিয়ার সামনে প্রথম সারিতেই তাদের দেখা গেল।

অথচ যারা মূল লড়াই করেছিল, তারা কিন্তু তেমন ফেসে আসতে পারিনি। বিপক্ষের লোকগুলো পরে হাইলাইট হওয়ার জন্য বেশী দৌড় ঝাঁপ করেছেন।

পরবর্তীতে বঙ্গভবন বলেন আর সোহরাওয়ার্দীর শোকরানা মাহফিল বলেন- সবখানেই দেখা গেছে। সবার আগে, কিভাবে নিজের কৃতিত্ব জাহির করা যায়। কিভাবে সকল সুফলগুলো নিজেদের ঘরে তোলা যায়।

স্বীকৃতির সেই চ্যাপ্টারগুলো শেষ হয়ে গেছে। এখন আর সেই বিতর্ক নেই। এখন নতুন এক বিতর্ক, যার নাম হল, সরকারি অনুদান গ্রহণ বিতর্ক।

বিষয়টা কিন্তু কেমন কেমন মনে হচ্ছে। হঠাৎ করে কেন এই বিতর্কের জন্ম হল। কওমী মাদ্রাসাগুলো কিন্তু বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় এম পি, মন্ত্রীদের অনুদান পেয়ে থাকে। বাংলাদেশের কোন মাদ্রাসা বাকি নেই, যেখানে মন্ত্রী বা এমপিদের কিছু না কিছু অনুদান যায়নি। বহু মাদ্রাসাতে স্থানীয় এমপি, মন্ত্রী, মেয়র, চেয়্যারম্যান সাহেবগণ অনুদান দিয়ে থাকেন। তখন কিন্তু কোন কথা হয় না।

বিগত চার দলীয় জোট সরকারের সময়, জামাত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ, যিনি তখন সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী। আমাদের কওমী মাদ্রাসার বহু আলেম তার কাছে হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। কেউ কেউ তার থেকে অনুদান নিতে সক্ষম হয়েছিল। আবার কেউ কেউ অপমান অপদস্থ হয়েছিল। কোন কিছুই হাসিল করতে পেরেছিলেন না।

তখন কিন্তু কেউ উসুলে হাশ্তেগানার দোহাই দিলেন না। কেউ নিষেধও করলেন না। জোট সরকারের অনেক এমপির পিছনে আমাদের কওমী অঙ্গনের কিছু আলেম জোঁকের মত লেগে থাকতেন। কিন্তু কেউ বলেননি এটা উসুলে আকাবিরের খেলাফ।

বর্তমান আওয়ামী সরকারের অনেক মন্ত্রী, এম পির কাছেও আমাদের ওলামায়ে কেরাম যেয়ে থাকেন বারবার। অনেক কিছু হাসিলও করেন। তখন কিন্তু সবই হালাল হয়ে যায়।

আজ কওমীর শিক্ষকগণ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। বিশেষ করে মফস্বলের শিক্ষকদের নাজুক অবস্থা। আরো যে কত খারাপ হবে,সেটা ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।

শোনা যাচ্ছে, আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নাকি এরকম অবস্থা চলবে। তাহলে কওমীর শিক্ষকদের হালাত কি হবে আল্লাহ মালুম।

এই দুরাবস্থার মধ্যে সরকারের তরফ থেকে কিছু সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, সেটা নিয়ে শুরু হয়েছে বিতর্ক। কিছু ওলামায়ে কেরাম বিবৃতির মাধ্যমে সেটাকে ভাল লক্ষ্মণ হিসেবে দেখছেন না। অস্বীকার করেছেন তারা এই সাহায্য নিতে।

আমি এখানে বেশী কিছু বলতে চাই না। কেননা, যারা অনুদান গ্রহণের বিপক্ষে, তারাও আমার মুরুব্বী। তাদেরও শ্রদ্ধা করি। তবে এখানে কয়েকটি বিষয় আমাদের লক্ষ্য করা দরকার। তাহলে মুরুব্বীদের ভুল ভাঙবে আশা করি।

এক, সরকার কি কওমী মাদ্রাসাগুলোকে এমপিও ভুক্ত করতে চেয়েছে?

দুই, শিক্ষকদের কি সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে?

আমরা জানি, দুটোর কোনটা নয়। সরকার কোন কওমী মাদ্রাসাকে এমপিও ভুক্ত করছে না। আবার সরকারি স্কেল অনুযায়ী বেতনও দিবে না। তাহলে সমস্যা কোথায়?

আগেও যেরকম কওমী মাদ্রাসাগুলো বিভিন্ন সময়ে সরকার বা স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সাহায্য পেয়েছিল, এখন সেরকমই পাবে। সুতরাং এটা নিয়ে আর বিতর্ক থাকার কথা নয়।

জোট সরকারের সময় যেভাবে আলী আহসান মুজাহিদ, কামাল ইবনে ইউসুফ, মুফতী আমিনী, মুফতী ওয়াক্কাস সাহেব, মুফতি শহিদুল ইসলাম, শাহিনুর পাশা, তারা যেরকম কওমী মাদ্রাসাতে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল, বর্তমান সরকার সেই কায়দায় দিতে চাচ্ছেন।

জোট সরকারের নেতাদের দান-অনুদান দেয়াটা যেমন উসুলে হাশ্তেগানার খেলাফ হয়নি, বর্তমান সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়ার দ্বারাও উক্ত উসুলের খেলাফ হবে না। আল্লাহ আমাদের সকলের উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com