২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

আদর্শ ও মানবিক চেতনায় মনুষ্যত্বের বিকাশ

আদর্শ ও মানবিক চেতনায় মনুষ্যত্বের বিকাশ

মুফতী তামীমুল ইসলাম ফরিদী :: ‘আদর্শ ও মানবিক চেতনায় মনুষ্যত্বের বিকাশ’- এই উক্তিটি খালিফায়ে ফেদায়ে মিল্লাত, কুতবে বাঙ্গাল, রাহবারে হক, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ হাফিজাহুল্লাহ সাহেবের। অবশ্যই কথাটির যথার্থ গুরুত্ব রয়েছে। সামনে পিছনে, ডানে বামে যাদেরকেই একটু বা অনেক বড় হতে দেখেছি, তাঁদের বড় হওয়ার পিছনে একটা একটা করে আদর্শ, পরিচ্ছন্ন, মকবুল ও মানবিক চেতনার গল্প লুকিয়ে আছে। ঐ চেতনার গল্পটাকে হয়তো তারা প্রকাশ করতে চান না। ফলে অনেকের কাছেই তা অধরাই থেকে যায়। অজানাই রয়ে যায়। তবে বড় হওয়ার সামনে-পিছনে, সম্মুখে-আড়ালে থাকা ঐ আদর্শ, পরিচ্ছন্ন, মকবুল ও মানবিক চেতনার গল্পটাই বেশী সহায়ক।

ঐ চেতনার গল্পটাই তাঁদেরকে বড় পর্যায় তুলে নিয়ে গেছে। মানুষের হৃদয়ে ভালবাসার আগুন না থাকলে মানুষ জ্বলে উঠে না। মানুষের মনে ভালবাসা থাকতে হয়। মনে চেতনা থাকতে হয়। বুকে সৎ সাহস থাকতে হয়। তাহলে গন্তব্যে এগিয়ে যাওয়া সহজ হয়। পথ চলা মসৃন হয়।

সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মালে এতটা বড় হওয়া যায় না, কুড়েঘরে অনাহারে, অর্ধাহারে, ক্ষুধার্থ মায়ের ঘরে জন্মালে যতটুকু হওয়া যায়। এ ক্ষেত্রে ক্ষুধার আগুন বুকে দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকলে সে আগুনকে সঠিক পরিমাপে মুল্যায়ন করে আদর্শ, পরিচ্ছন্ন, মকবুল ও মানবিক চেতনার আবহে ভালোবাসা বক্ষে নিয়ে পথ চলতে পারলে অনেক দূর সীমানা পর্যন্ত এগিয়ে যাওয়া যায়। তখন রুখতে চাইলেও কেউ আর রুখতে পারে না মহান মালিক ও তাঁর সহায় হয়ে যান।

তাই বুকে কিছু ভালবাসার আগুন ও ধারন করে রাখতে হয়। অন্তরে কিছু ব্যাথাও জমিয়ে রাখতে হয়। কিছু কষ্টকে আলিঙ্গন করেই জীবন চালাতে হয়। কষ্টমুক্ত জীবন দিয়ে সাদা মাটা ভাবে জীবনটা চলে যায়। কিন্তু জাতির জন্য রেখে যাওয়ার মত কিছু থাকে না। যাঁরা অনেক কিছু রেখে গেছেন তাঁদের কেউ বিলাসী ছিলেন না। কষ্ট তাঁদের নিত্য দিনের বন্ধু ছিল। তাই তাঁদের জীবন থেকে আমরা অনেক কিছুই পেতে পারি। সেগুলোকে বক্ষে ধারণ করে চলতে পারি বন্ধুর পথ।

আমার একজন আদর্শ উস্তাদ আছেন। সঙ্গতঃ কারণে তাঁর নামটা উচ্চারণ করব না। তিনি আমার দৃষ্টিতে একজন নাতিশীতোষ্ণ মহৎ পুরুষ। হয়তোবা “নাতিশীতোষ্ণ মহৎ পুরুষ” শব্দটি যথাযথ হিসেবে ব্যবহার করতে পারিনি। বা শব্দটি আমাদের জন্য ব্যবহার করা ঠিক নয়। তবুও করলাম।করতে হলো।কারন আমার অপরিপক্ক ও দুর্বল মেধার ডিকশনারিতে এরচেয়ে ভালো শব্দ এ মুহূর্তে খুঁজে পাচ্ছিনা।

তো এ চেতনা প্রসঙ্গে হযরতের একটি প্রসিদ্ধ বানীই রয়েছে। তিনি প্রায়শই বলেন একথা, “আলেম হবে শীতল মস্তিষ্কের অধিকারী, সে কখনো উত্তেজিত হবে না”।

কথাটির সর্বোৎকৃষ্ট উদাহরণ আমাদের পেয়ারে হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তাই একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে হযরত ওয়ালা তাঁর বক্ষে যে আদর্শ, পরিচ্ছন্ন, মকবুল ও মানবিক চেতনা ধারণ করতেন সেই চেতনা আর কারো থেকে নয় স্বয়ং পেয়ারে হাবীব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর থেকেই তিনি গ্রহণ করেছেন।

আমি আমার ছোট্ট এই জীবন চলার পথে হযরত ওয়ালার সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত সবটুকু সময়ে তাঁকে সম্মুখে, আড়ালে অনুস্বরণ করার যথাসধ্য চেষ্টা করেছি, করি এবং আরবে কারীমের মর্জি হলে সামনেও করব ইনশাআল্লাহ। তাঁর থেকে আমার ইস্তিফাদা ও (অর্জন) বেশ।

হযরতকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি, তিনি কখনো মসজিদ ও মাদরাসা থেকে কোন প্রকার ভাতা গ্রহণ করেছেন এমন টা কেউ দাবী করার দুঃসাহস নেই । তাঁর ব্যাপারে আমার আরেক উস্তাদের কাছে শুনেছি যে মসজিদ মাদরাসা থেকে বেতন ভাতা গ্রহণ করার মানসিকতা তাঁর তবিয়ত (স্বভাব) এর মধ্যেই নেই। তাই তিনি একজন হাদিস বিশারদ ও শাইখুল হাদীস হওয়া সত্বেও একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হিসেবে জীবিকা উপার্জন করেন। যা অনেকের নিকট পর্দার আড়ালে থেকে গেছে। আবার কন্ট্রাক্টবাজ বক্তাদের ভিড়ে তিনি একজন কন্ট্রাক্টহীন সফল ইসলাহী মুর্শিদ ( আধ্যাত্বিক রাহবার)। মসজিদে মসজিদে, খানকায়, মারাকাযে, মাদ্রাসায়, মাঠে-ময়দানে, অনলাইনে, অফলাইনে সব লাইনেই অহরহ তাঁর জীবন ঘনিষ্ঠ, আধ্যাত্বিক, সংশোধন ও আত্মশুদ্ধি মুলক বক্তব্য চলছে আর চলছে। ইলমি ময়দানেও তাঁর রয়েছে প্রশংসনীয় দূর্দান্ত দাপট। যা বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য হয়ে থাকবে উসওয়া তথা আদর্শ।

উম্মাহর ক্রান্তিলগ্নে অনেক জটিল-কঠিন বিষয়ের সমাধান ছিল তাঁর বাঁ হাতের কারামতি । আর এমন জীবন তো আদর্শ, পরিচ্ছন্ন, মকবুল ও মানবিক চেতনা ছাড়া অর্জন করা সত্যিই সম্ভব নয়। আদর্শ, পরিচ্ছন্ন ও মকবুল চেতনা ছাড়া স্বাভাবিক জীবন চালানো গেলেও সফল ব্যক্তি হওয়া অনেক কঠিন। শুধু কঠিনই নয় অনেক ক্ষেত্রে অসম্ভব ও বটে। তাই বুকে আদর্শ, পরিচ্ছন্ন ও মকবুল চেতনা নিয়ে চলতে হবে। যে আদর্শ চেতনা আন্দোলিত হলে জাতির পথ চলার রাস্তা সুগম ও সহজ হবে।

পানসে ও নিরামিষ চেতনা দিয়ে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। এমন চেতনা দিয়ে জীবনের অর্জনের কোঠা শূন্যেই থেকে যায়। জীবন হয়ে যায় অনর্থক। তাই জীবনটা সঠিকভাবে মুল্যায়ন করে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে আশা করা করা যায় কিছুটা হলেও সাফল্যের মুখ দেখা যাবে ইনশাআল্লাহ।

সুতরাং প্রতিটি মানুষের হৃদয়ে থাকা চাই একটি আদর্শ, পরিচ্ছন্ন ও মকবুল মানবিক চেতনা। এই চেতনার আবহে একজন মানুষ খুঁজে পাবে তাঁর প্রকৃত মনুষ্যত্ব।

আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন আমাদেরকে আদর্শ, পরিচ্ছন্ন, মকবুল ও মানবিক চেতনা বুকে ধারণ করে আল্লাহপাকের একজন প্রকৃত মানবিক বান্দা হয়ে ওঠার তৌফিক দান করুন, আমীন।

লেখক: মুহতামীম ও সুবক্তা

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com