১লা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৬ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

আবদুল হাফিজ মক্কী মুসলিম উম্মাহর একজন অভিভাবক

ফয়জুল্লাহ ফাহাদ ● মুসলিম বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ইসলামি ব্যক্তিত্ব, মুসলিম উম্মাহর অন্যতম আধ্যাত্মিক রাহবার, বিশ^ব্যাপী খতমে নবুওয়ত কার্যক্রমের আগ্রগামী সিপাহসালার, শাইখুল হাদিস যাকারিয়া রহ.-এর প্রিয়তম শিষ্য ও অন্যতম খলীফা শাইখুল আরব ওয়াল আজম শায়েখ আবদুল হাফিজ মাক্কী রহ. যিনি জন্ম নিয়েছিলেন ঐতিহ্যবাহী একটি রাজপরিবারে, কিন্তু রাজত্বের সিংহাসন ছেড়ে বেছে নিয়েছিলেন দীনতা ও গরিবানা জিন্দেগী। কুদরতের ফয়সালা বড়ই আজীব! খোদা তাকে গেথে দিলেন দাওয়াত ও তাবলীগ, খতমে নবুওয়ত ও সুলুক-আত্মশুদ্ধির মতো সর্বব্যাপী, বিপুলগতিমান একটি মিছিলে স্রোতপ্রবাহের ন্যায় বয়ে চললেন তিনি। ছুটে গেলেন দেশ থেকে দেশান্তরে। কি এশিয়া, কি আমরিকা, কি ইউরোপ, কি আফ্রিকা, কোথাও কি বাদ আছে যেখানে তাঁর কদম পড়েনি? যেখানে নেই তাঁর ভক্ত অনুরক্ত, যেখানে তাঁরই প্রচেষ্টা ও সহযোগিতায় জারি হয়নি বহু দীনি প্রতিষ্ঠান ও কার্যক্রমের ধারাবাহিকতা!

আজ হাজারো মাইল দূর থেকে কাঁদছে মানুষ তাঁর বিরহে। কাঁদছে বাংলাদেশের আলেম সমাজ। ভারত, পাকিস্তান ও তামাম মুসলিম বিশে^র আলেম-উলামা, দ্বীনদরদী ও ইসলাম প্রিয় মানুষ। ধন্য আফ্রিকাবাসী যাদের মাটিতে রচিত হয়েছে অসংখ্য সাহাবীর কবর, আজ সেখানে সেই মিশনে গিয়েই জীবনের শেষ মুহূর্তটুকু ব্যয় করলেন মুসলিম বিশে^র এই মহান ব্যক্তিটি। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আজ একটি কথা আমার মনে বারবার অনুরণিত হচ্ছে, আরবের বাসিন্দা এই মহান ব্যক্তিটি কেন সুদূর আফ্রিকায় গিয়ে শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করলেন? কেন আজ সারাবিশ্ব তাঁর বিরহে কাঁদছে? যেন হাজারো মাইল দূর থেকে মানুষ আজ তার বিরহে বেদনাবিধুর, শোকে মুহ্যমান? কেন আজ পৃথিবীর আনাচে-কানাচে মানুষের মুখে মুখে তাঁরই জয়গান, তাঁরই গুণকীর্তন? এই প্রবন্ধে এই প্রশ্নের জবাব খুঁজে ফিরবো। তারও আগে আমরা জানবো কীভাবে কুদরত তাকে প্রতিপালন করেছিলেন। অদৃশ্য রহমত ও করুণা কিভাবে তাকে ছায়া দিয়েছিল।

হযরত শায়েখ মাক্কীর জীবন পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় জীবনের পরতে পরতে রয়েছে কুদরতের অসীম রহমতের বারিধারা। হযরতের জন্ম হয়েছিল একটি রাজ পরিবারে। হযরত ঊর্ধ্বত পূর্বপুরুষ ছিলেন রাজা আবদুস সালাম মালিক। কাশ্মিরের অন্তর্গত ইসলামাবাদের পাশর্^বর্তী একটি এলাকার তিনি অধিপতি ছিলেন। হযরতের বাবা ছিলেন স্বনামধন্য ধনাঢ্য একজন ব্যবসায়ী। সৌদি আরবের প্রসিদ্ধ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের মালিক ছিলেন তিনি। কিন্তু কুদরতের ফয়সালা ছিল অন্য কিছু। তাই হযরত রাজ-রাজত,¡ অর্থ-বৈভবে বিত্তবান হওয়ার পথ ছেড়ে দীনহীন জীবনের দিকে ধাবিত হলেন।

কে জানতো ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবস্থ অমৃতসরে এক কাশ্মিরী রাজ বংশে নেওয়া সেই আবদুল হাফিজ একদিন বিশ^ব্যাপী দীনের মশাল নিয়ে ছুটে যাবেন, অলীকুলের শিরোমনি হয়ে লাখো আল্লাহপ্রেমিকের মাথার মুকুট হয়ে আলো ছড়াবেন, হ্যাঁ, আসমানে তাই ফয়সালা হয়েছিল। তাই কুদরতের ইশারায় জমিনের সর্বোত্তম স্থানে তার লালন-পালনের ব্যবস্থা হয়েছিল। এ ছিল তার প্রতি আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের অশেষ কৃপা ও নিয়ামত। হযরতের বাবা হিজরত করে অমৃতসর থেকে মক্কা মুর্কারমায় পাড়ি জমালেন।

১৯৫৩ খ্রিস্টাব্দে হযরতের বাবা যখন স্বপরিবারে মক্কা মুর্কারমায় হিজরত করেন তখন তার বয়স ছিল সাত বছর। ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তাঁর প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পুরো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা-দীক্ষা হেজাজের পবিত্র ভূমিতেই ব্যবস্থা হয়েছিল এবং সম্পন্ন হয়েছিল। উচ্চ মাধ্যমিকে তার ফলাফল এত ভাল হয়েছিল যে সৌদী সরকার সরকারী খরচে তাকে ইউরোপ, আমেরিকায় উচ্চ শিক্ষার জন্য গমন করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিল, কিন্তু আসমানের ফয়সালা ছিল ভিন্ন। কুদরত সিদ্ধান্ত করে রেখেছিল অন্য কিছু। আত্মীয় স্বজন, বন্ধু-বান্ধবের চাপ ও অসন্তুষ্টি সত্ত্বেও হযরতের বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন, আবদুল হাফিজকে আমরিকা, ইউরোপ পড়াশোনার জন্য পাঠাব না, ওকে হিন্দুস্থান পাঠাবো, সেখানে সে আলেমদের জুতা সোজা করবে।

ঘটনা তাই। ধনাট্য পরিবারের অসম্ভব সম্ভাবনাময় এক তরুণ, সাফল্যের সঙ্গে উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে ইউরোপ আমেরিকায় নয় কোন বিশ^খ্যাত বিশ^বিদ্যালয়েও নয়, ছুটে গেলেন হিন্দুস্তানের সাহারানপুর। হযরত ইউসুফ কান্ধলভী রহ.-এর সুহবতে থাকলেন কিছুদিন। তারপর হযরতের ইন্তিকালের পর হযরতজী ইনামুল হাসান রহ.-এর সুহবত গ্রহণ করলেন। একচিল্লা, দুইচিল্লা করে করে এক সাল শেষ করলেন। বাবাকে চিঠি লিখলেন, বাবা! আমার মনে আর পড়াশোনার উদ্দেশ্যে ইউরোপ আমেরিকায় যাওয়ার ইচ্ছে নেই। যদি দীনের কাজের জন্য যাওয়ার সুযোগ হয়, তাহলে আল্লাহর অনুগ্রহ। এখন আমার পরবর্তী কর্মসূচি কী? বাবা জবাবে জানালেন, যেখান থেকে তোমার হৃদয়ের এমন পরিবর্তন এসেছে এবার সেখান থেকেই তোমার পরবর্তী কর্মসূচী ঠিক করে নাও।

অবশ্য, হযরত যাকারিয়া রহ.-এর খেলাফত দেওয়ার পরই হযরতকে তিন চিল্লার জন্য আমরিকা পাঠিয়েছিলেন। তখন আমেরিকার বিভিন্ন রাষ্ট্র সানফ্যান্সিসকো, থ্যাইল্যন্ড, ইংল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশে তাবলিগি সফর করেছেন।

এভাবে আল্লাহ তায়ালা নিজ কুদরতে হযরতকে তাবলীগ জামাতের সর্বব্যাপী দীনি কাজের চলমান বাহনে উঠিয়ে দিলেন। দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে গেলেন দাওয়াত নিয়ে। মক্কা মুর্কারমায় তাবলীগে জামাতের জিম্মাদারও ছিলেন তিনি। হযরত প্রায় প্রতি বছর আগমন করতেন টঙ্গির বিশ্ব ইজতিমায়। হযরতের বাবা মালিক আবদুল হক ছিলেন আপাদমস্তক ধর্মানুরাগী, আলেম প্রেমিক। হযরত শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. এর সঙ্গে ছিল তার গভীর সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা। জীবন দিয়ে খেদমত করেছেন তিনি হযরত শাইখুল হাদীসের। হযরত তাঁর আববীতিতে লিখেছেন সেইসব খেদমতের নজীর বিহীন চিত্র। বাবার এই রক্ত ছেলেতেও সঞ্চারিত হয়েছিল। মক্কা মুর্কারমায় হযরত যখনই যেতেন আবদুল হাফিজ মক্কীও বাবার মতো জান-প্রাণ দিয়ে খেদমত করতেন। অতঃপর হিন্দুস্থানে এসে হযরতের খেদমতেই নিয়োজিত হলেন। নিজের মুরশিদ, মনিব হিসেবে গ্রহণ করলেন। নিজেকে সঁেপ দিলেন হযরতেরই হাতে। শুরু হল আরেক অসীম জগত পানে অভিযাত্রা।

৩৮৭হিজরীর রমজানে ইতিকাফে থাকাকালে এক রাতে হযরত ডেকে নিয়ে তাকে ইজাজতের ইমামা পরিয়ে দিলেন। তারপর থেকে জীবনের সবগুলো রমযানই হযরতের সাথে কাটিয়েছেন। হযরত কাছে বসিয়ে বসিয়ে মুরাকাবা ও তাসবিহের প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। রাজ ও ধনাট্য পরিবারের সেই অসাধারণ তরুণ এখন প্রবলবেগে ছুটে চলেছে মহান আল্লাহর নৈকট্যলাভের ঊর্ধ্বজগত পানে। হযরত শায়েখের স্নেহমায়া ও সোহাগপ্রীতির প্রেমাকর্ষণে শেষ কয়েক বছর আর ছেড়ে যেতে পারেন নি কখনো। পুরো সময়ই শায়েখের খেদমত ও সুহবতে কাটিয়ে ছিলেন। হযরত শায়েখের ওফাতের পর মক্কা মুর্কারমায় গিয়ে খানকাহি মামুলাত চালু করলেন। হারামাইনের কাছে বসে হিজাজের মানুষের আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর সাথে তায়াল্লুক সৃষ্টির পথ দেখালেন। সৌদি আরবে প্রচলিত তাসাউফ সম্পর্কে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও দূরীভূত করলেন। সৌদি আরবেই সীমাবদ্ধ থাকেনি তাঁর জ্যোতির্ময়তা ও নূরানিয়্যাতের এ প্রবাহ। দেশে দেশে ছুটে গেলেন। আফ্রিকা, আমেরিকা, জাম্বিয়া, গাম্বিয়া, পাকিস্তান, ভারতসহ অনেক দেশে। হাজারো হাজারো ভক্ত অনুরক্ত হল। সেখানেই গেলেন মানুষের মাথার মুকুট হয়ে থাকলেন। এই তো এই খানকাহি দাওয়াতের কাজেই তো ছুটে গিয়েছিলেন আফ্রিকায় সেখান থেকে আর ফিরে এলেন না।

হযরত মাক্কী রহ. তাঁর শায়েখের কাছে বায়আত হওয়ার পর সুহবতে থাকতে থাকতে মনো জগতে এক নতুন আবর্তন দেখা দিল। হযরতের কাছে গিয়ে আরজ করলেন, হযরত! আমি ইলম অর্জন করার আগ্রহ হৃদয়ে অনুভব করছি। হযরত দারুণ খুশি হলেন এবং মাদরাসার আসাতেযায়ে কেরারমকে ডেকে কিতাবাদী পড়ার ব্যবস্থা করে দিলেন। পরের বছর রমজানের পর নিয়ম তান্ত্রিকভাবে সাহারানপুর মাজাহেরুল উলূম মাদরাসায় ভর্তি হলেন। হযরত শায়েখ যাকারিয়া রহ. এখনেই বুখারী শরীফের দরস দিতেন। এ বছরই ছিল হযরতের বুখারীর সর্বশেষ দরস।

হযরত মাক্কী রহ. প্রিয়তম মুরশিদ, ও মনিবতুল্য শায়েখের কাছে বুখারীর সবক নিলেন। বছর শেষে চূড়ান্ত পরীক্ষায় দাওরা হাদীসের সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করলেন। হযরত শায়েখের অনুমতিক্রমে মক্কা মুর্কারমায় মাদরাসা সাওলাতিয়ায় মেশকাত শরীফের দরস প্রদান করতে শুরু করলেন। কিছুদিন অতিবাহিত হতে না হতেই শায়েখের কিতাব “আওযাঝুল মাসালিক” “বাযলুল মাজহুদ” ছাপানোর প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। শায়েখের অনুমতিক্রমে হযরত মক্কী চলে গেলেন মিশরে কাহেরায়। কয়েক বছর সেখানে অবস্থান করে শায়েখের কিতাব ছপানোর কাজ সমাপ্ত করলেন। শায়েখের অনুমতি নিয়ে তাঁর লিখিত কিতাব “শরীয়ত ও তরীকত কা তালাযুম” আরবীতে রূপান্তরিত করলেন। রিয়াজুস সালেহীন কিতাবটিও শায়েখের কাছে দরস নিয়ে তার ব্যাখ্যাগ্রন্থ রচনা করার অনুমতি নিলেন। শুরু হল হযরত মক্কীর জীবনের নতুন অধ্যায়। হাদীসের খেদমতে ছুটে চললেন বিপুল গতিতে। রচনা করলেন ‘ইসতেজাবুদ দুআ বা’দাল ফারাইয’ এবং ‘মাকামুল ইমাম ইলা আবি হানিফা’সহ আরও অনেক কিতাব। হাদীসের দরস দানের পাশাপাশি রচনা, সম্পাদনা, এবং হাদীসের নতুন নতুন কিতাব প্রকাশের ক্ষেত্রে এক বিস্ময়কর নজীর স্থাপন করলেন। ‘শারহু মুশকিলিল আসার’-এর মতো দুর্লভ দুর্লভ হাদিসের গ্রন্থ পৃথিবীর আনাচ-কানাচ থেকে অনুসন্ধান করে বের করলেন এবং ছাপিয়ে বিশ্বের আলেম সমাজের হাতে তুলে দিলেন। সর্বশেষ নিজ শায়েখের কিতাব ‘লামিউদ দুরারি’ এর সাথে ‘আল আবওয়াবু ওয়াত তারাজিমু’ এবং উর্দু তাকরীরাত একত্র করে আরবীতে ভাষান্তর করে আরও নানান উপকারী দিক সংযোজনসহ বুখারী শরীফের এক সর্বোৎকৃষ্ট ভাষ্যগ্রন্থ ‘কানযুল মুতাওয়ারি’ নামে ছেপে প্রকাশ করলেন। সত্যিই যা উলামায়ে দেওবন্দের এক অমূল্য কীর্তি হিসেবে সর্বমহলে স্বীকৃত ও সমাদৃত হল।

হযরত মক্কী রহ. ছিলেন দীনের বহুমুখী খেদমত আঞ্জাম দানকারী এক বিরল ব্যক্তিত্ব। তাসাউফ ও সুলুকের ময়দানে যেমন ছিলেন, আধ্যাত্মিকতা ও বিলায়েতের উঁচস্তরের মুকুট পরিহিত এক রাজাধিরাজ, তেমনি হাদিসের খেদমত ও ইলম চর্চায় ছিলেন এক আগ্রগামী মহান ব্যক্তিত্ব। দাওয়াত ও তাবলীগের ময়দানেও তার জুড়ি ছিল না। তবে তাঁর স্বতন্ত্র ঐকান্তিকতা এবং বিশেষ স্পৃহা ছিল খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণের প্রতি। কাদিয়ানী সম্প্রদায়ের ভয়ানক ফিতনা থেকে মুসলমানদের ঈমান হেফাজত এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর পবিত্র শানকে অভিশপ্ত মির্যা কাদিয়ানীর ছোবল থেকে হেফাজতের জন্যে তিনি বিপুল প্রত্যাশা ও প্রবল প্রেরণা পোষণ করতেন।

হযরত মাক্কী রহ. ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল খতমে নবুওয়ত মুভমেন্ট-এর কেন্দ্রীয় আমীর। বিভিন্ন দেশে এর শাখা রয়েছে। হযরত রহ. যে দেশে যেতেন সেখানে খতমে নবুওয়তের কাজের জন্য ব্যাকুল হয়ে লোক খুঁজতেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের ব্যাপারে হযরতের মনোযোগ ও ব্যাকুলতা প্রবল হয়ে উঠেছিল। কতক আলেমকে হযরত খতমে নবুওয়তের কাজের জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন, উৎসাহিত করেছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে খতমে নবুওয়তের সবচে উল্লেখযোগ্য ও স্মরণীয় ঘটনাছিল ১৮৯৩ সালে মানিকমিয়া এভিনিওতে খতমে নবুওয়ত সম্মেলন। সেখানে লাখো লাখো নবী প্রেমিক মুসলিম জনতার ঢল নেমেছিল। আগমন করে ছিলেন দেশ-বিদেশের বিশ^খ্যাত মুসলিম ব্যক্তিবর্গ। এমনকি কা‘বা শরীফের ইমাম সাহেবও আগমন করেছিলেন যদিও তিনি সম্মেলনে অংশ নিতে পারেন নি। মৌলিকভাবে এ সম্মেলন ছিল হযরত মক্কী রহ.-এর পরিকল্পনা, উদ্যোগ এবং অনুপ্রেরণার ফসল। এখানেই শেষ নয় এই সম্মেলনের আর্থিক সহায়তায়ও হযরত মক্কী রহ.-এর বেনজীর পরিশ্রম ও প্রয়াস এক বিরল ইতিহাস হয়ে আছে। বাংলাদেশে বুদ্ধিবৃত্তিক ও গবেষণামূলক দাওয়াতি প্রতিষ্ঠান খতমে নবুওয়ত মারকায ঢাকা“ ও হযরতেরই চিন্তা ও ছায়ার প্রতিফলন মাত্র। এভাবে দেশে দেশে খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণের প্রয়াসে হযরত মক্কী রহ.-এর অনন্য আলোকিত একটি নাম।

শুধু খতমে নবুওয়ত সংরক্ষণ, দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত, আধ্যাত্মিকতা ও দীনীজ্ঞানের প্রচার প্রসারেই কেবল নয়; বরং মুসলিম বিশে^ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক চিন্তায়ও হযরত মক্কী ছিলেন এক সচেতন ব্যক্তিত্ব। রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও সচেতনতা ছিল তাঁর এক বিশেষ স্বাতন্ত্র্য। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক বিশ্লেষণে তাঁর বিচরণ ছিল অনেক ঊর্ধ্বে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ঐক্যজোট গঠন এবং খেলাফতে মজলিস গঠনে তাঁর অবদান সর্বমহলে স্বীকৃত। জোট সরকারের আমলে জামাতের ডিগবাজি থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে হযরত যে পরামর্শ দিয়েছিলেন তা গ্রাহ্য না করায় আজও এর খেসারত আলেম সমাজকে দিতে হচ্ছে। এইতো গেল বছর চরমোনাইর বাৎসরিক মাহফিলে লাখো লাখো জনতার সামনে বিশ^ রাজনীতির কেন্দ্রস্থল আইএস-এর ভ্রষ্টতা এবং হিং¯্রতার কথা কতনা সুন্দর ও সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরলেন। স্টেইজে বসে থেকে শুনা সেই শব্দগুলো আজো আমার কর্ণকোহরে অনুরণিত হয়।

দীনি কাজ, দীনি প্রতিষ্ঠান, সংস্থাও সংগঠনের আর্থিক সহযোগিতায় একটি উজ্জ্বল অধ্যায় হযরত মক্কী রহ.-এর জীবন। বিশে^র কতো জায়গায় কতো প্রতিষ্ঠান, মারকায ও ইদারাইনা চালু হয়েছে এবং চলছে তাঁরই সহযোগিতায়। এই ক্ষুদ্র একটি বাংলাদেশের কথাই যদি বলি, এখানেও হযরতের আর্থিক সহযোগিতার এক বিরাট ফিরিস্তি। সেই সুদূর নোয়াখালিতেও একটি দীনি প্রতিষ্ঠান চলছে তাঁরই সহযোগিতায়। খতমে নবুওয়তের অসংখ্য কাজ সম্পন্ন হয়েছে তাঁরই আর্থিক আনুকূল্যে। বাংলাদেশের স্বনামধন্য একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানেরও ফান্ড গঠন করে দিয়েছিলেন হযরত রহ.। আরও একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানে তাঁরই বিরাট সহযোগিতা রয়েছে। আর্থিক সহযেগিতার অভিযোগে বিশে^র দুটো দেশ তার ভিসা বন্ধ করে রেখেছিল। আর্থিক সহযোগিতায় তিনি একটি অন্যন্য উপমা। তারুণ্যে তাঁরই শায়খ শায়খুল হাদিস রহ. তাকে এ বলে মৃদু শাসনও করেছিলেন, তুমি কতজনের মন যোগাবে, সব মানুষের দায়িত্ব ও বোঝা তোমার নিজের কাঁধে কেন উঠিয়ে নিতে হবে। কিন্তু বার্ধক্যে পৌঁছেও তিনি তা ছাড়তে পারেন নি। তাঁর কাছে আবদার করে কেউ নিরাশ হয়নি। নিজে গাড়ি ড্রাইব করে করে আহলে খাইরের কাছে নিয়ে যেতেন এবং আর্থিক ফান্ড গঠনের চেষ্টা করতেন। মুসলিম বিশ্বের একজন হিতাকাক্সক্ষী অভিভাবকের জিম্মাদারী তিনি নিজের কাঁধে স্বেচ্ছার উঠিয়ে নিয়েছিলেন।

হযরত মক্কী রহ. এর জীবনের সবচেয়ে তাৎপর্যময় অধ্যায় তাঁর চরিত্র মাধুরিমা। তাঁর বিভাময় নূরে ঝলমল উদ্ভাসিত চোহরাটাই ছিল তাঁর উত্তম গুণাবলীর প্রতিচ্ছবি। কী সরল সুন্দর হাসি! কী অসীম দিগন্তের মতো বিস্তৃত তার বক্ষ! কী মধুময় ও মার্জিত ছিল তাঁর জবান! নোয়াখালীর গাজি একটানা সতের বছর খেদমত করেছেন হযরত মক্কীর। গাজি বলেন, হযরত কোনদিন আমায় ধমক দেননি, কড়া ভাষা ব্যবহার করেন নি কোন কাজের জন্য। রাতে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরতেন। গাজি খাবার প্রস্তুত করতে কিংবা দোকান থেকে খাবার কিনতে উদ্যত হলে বলতেন, যা আছে তাই খেয়ে নিই। তোমার কষ্ট হবে। আলেমদের, খোলাফাদের দেখলেই টান দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। এই তো গত বছর চরমোনাই মাহফিলে যাওয়ার ব্যাপারে কেউ একটু আপত্তি জানাল, হযরত এটাতো মূর্খদের মাহফিল এখানে যাওয়া.. .. হযরত জবাব দিলেন, আমিও মূর্খ, ঐ মূর্খদের দলে গিয়ে শরীক হয়ে যাব। আগের বছর আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দা.বা. এর বাসায় যাওয়ার ব্যাপারে আপত্তি উঠল, তখন একইভাবে জানিয়ে দিলেন, আমি সেখানে যাবই, যারা পছন্দ করবে তারা আমার সাথে যাবে, যারা পছন্দ না করবে তারা যাবে না। আমি নিজ চোখে দেখেছি, একজন আলেম হযরতকে বারবার পীড়াপীড়ি করছিলেন একটা প্রোগ্রামের জন্য। হযরত একটুও বিরক্ত না হয়ে বললেন, আমাকে ক্ষমা করবেন। ভীষণ বিরক্তি, পেরেশানিতেও চেহারায় বিন্দু বিরক্তিভাব প্রকাশিত হত না। মক্কায় হযরতের খানকাহ হল বিশে^র নানা দেশের আলেম উলামা ও দীনদার মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। সবধরনের খাবার সরবরাহ করা হয় যে কোন মেহমানের সম্মানার্থে। হজের মৌসুমে বহুলোকের আশ্রয় এই খানকাহ। মানুষের আবদার রক্ষা করতে গিয়ে নানাবিধ শরীরিক কষ্টও সইতে হতো অনেক সময়।

হযরত রহ.-এর জীবনের পরতে পরতে ছিল মহান মহীয়ান দয়াময়ের দয়া ও রহমতের বারিধারা। অনারবে জন্ম নিয়ে লালিত হলেন পবিত্র নগরীতে, ইউরোপ আমরিকায় পড়ালেখার সুযোগ পেয়েও চলে গেলেন হিন্দুস্থানে আলেমদের জুতা বহন করতে। তারপর একে একে দাওয়াত ও তাবলীগ, খানকাহি মেহনত, ইলম চর্চায় যোজন যোজন মাইল অতিক্রম করে পৌঁছে গেলেন শীর্র্ষে, অনেক ঊধ্বের্, আর খতমে নবুওয়তের মিশনকে জীবনের ব্রত বানিয়ে নিলেন। কুদরতের অসীম কৃপায় সেই রাজ পরিবারের সন্তান আরব অনারবে লাখো মানুষের মাথার মুকুট হয়ে, লাখো দীনদরদী মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে, দীনের মশাল নিয়ে ছুটে চলেছেন দেশ থেকে দেশান্তরে। এই ছুটে চলার পথেই আফ্রিকার মাটিতে জীবনের শেষ নিঃশ^াস ত্যাগ করে চলে গেলেন পরপারে। রেখে গেলেন উজ্জ্বল ইতিহাসের আরও একটি উপমা।

কী ছিল তাঁর ভাগ্য! যে আফ্রিকায় রচিত হয়েছে অসংখ্য সাহাবীর কবর; যারা দীন প্রচারের লক্ষ্যে স্বদেশ ছেড়ে সুদূর আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছিলেন। তাদেরই পথ ধরে এই নবীপ্রেমিক আফ্রিকার মাটিতেই নিজের শেষ মুহূর্তটি কাটালেন। কী সুন্দর ছিল তাঁর মৃত্যু! পরম শান্তিতে সালাম পেশ করতে করতে প্রবেশ করলেন অনন্তকালের জগতে। জবানে জারি ছিল সালামুন কাওলাম মির রাব্বির রাহীম।

খোদার কী অসীম করুণা তাকে ঘিরে রেখেছিল! মসজিদে নববীতে হল তাঁর জানাযা। আর শায়িত হলেন রাওযায়ে আতহারের কাছে একদম কাছে! জান্নাতুল বাকীতে, যেখানে শুয়ে আছেন অসংখ্য সাহবায়ে কেরাম, এবং তাঁরই প্রেমাষ্পদ, মনিব হযরত শাইখুল হাদীস রহ. এবং তাঁরও শায়েখ হযরত খলীল আহমদ সাহারানপুরীসহ অনেক অনেক আকাবীর।

লেখক: তরুণ আলেম ও শিক্ষক, খতমে নবুওয়ত মারকায ঢাকা.

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com