১১ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৮শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৮শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

আবার ঢাকামুখী মানুষের স্রোত

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : চলমান লকডাউনে স্বাস্থ্যবিধি মেনে রোববার থেকে দোকানপাট ও শপিং মল খোলার সিদ্ধান্ত আগেই জানিয়েছিল সরকার। কিন্তু ঢাকার বিপণিবিতানের কর্মীরা কী করে গ্রাম থেকে কর্মস্থলে ফিরবেন বা ফেরার পথে স্বাস্থ্যবিধি কী করে নিশ্চিত করা হবে, তার কোনো নির্দেশনা আসেনি সরকারের তরফ থেকে। ফলে শনিবার বাংলাবাজার-শিমুলিয়া ও দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া নৌপথে স্রোত নেমেছিল ঢাকায় দোকানে কাজ করা মানুষের।

তাঁদের ভাষ্য, দোকানপাট খোলার সিদ্ধান্ত হলেও গণপরিবহন বন্ধ থাকায় ছোট ছোট যানে কয়েক গুণ ভাড়া যেমন গুনতে হয়েছে, তেমনি স্বাস্থ্যবিধি মানার বালাইও ছিল না। ফেরি চলাচল সীমিত থাকায় নৌঘাটে উপচে পড়া ভিড় তৈরি হয়। পরিস্থিতি এতই নাজুক হয় যে ফেরিতে যাত্রীর চাপ সামলাতে গিয়ে জরুরি যানবাহন পারাপারে হিমশিম পরিস্থিতি তৈরি হয়।

শিবচর (মাদারীপুর) প্রতিনিধি জানান, দোকানপাট খোলার ঘোষণায় করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথ দিয়ে গতকাল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ফিরেছেন কর্মজীবীরা। গণপরিবহন বন্ধের সঙ্গে ফেরি চলাচল সীমিত এবং লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় গন্তব্যে পৌঁছতে গিয়ে প্রত্যেক যাত্রীকেই গুনতে হয়েছে কয়েক গুণ ভাড়া।

বিআইডাব্লিউটিসিসহ ঘাটসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলা থেকে মাইক্রোবাস, মোটরসাইকেল, ইজি বাইকসহ বিভিন্ন যানবাহনে বাড়তি ভাড়া দিয়ে ঘাটে আসছেন যাত্রীরা। ইজি বাইক, সিএনজি, মোটরসাইকেলে বরিশাল থেকে ৫০০ থেকে ৬০০, গোপালগঞ্জ থেকে ৫০০, খুলনা থেকে এক হাজার ৭০০, মাদারীপুর থেকে ২০০, বাগেরহাট থেকে ৬৫০ টাকাসহ প্রতিটি যানবাহনেই কয়েক গুণ ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

গতকাল সকাল থেকেই বাংলাবাজার-শিমুলিয়া নৌপথে ঢাকামুখী যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যায়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভিড় আরো বাড়ে। মাত্র চার-পাঁচটি ছোট ফেরি চলায় সংকট প্রকট রূপ নেয়। এ রুটের ৮৭টি লঞ্চ, বেশির ভাগ ফেরি বন্ধ থাকায় চলাচলকারী চার-পাঁচটি ফেরিতে যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়। গায়ে গায়ে শুধু ধাক্কাই নয়, একজন পারলে অন্যজনের ওপর উঠে পদ্মা নদী পাড়ি দেয়—এমন অসহনীয় দৃশ্য দেখা দেয়। প্রখর রোদে যাত্রীরা হেঁটে ঘাটে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন। যাত্রীর চাপ সামাল দিতে ঘাট এলাকায় পুলিশ, নৌ পুলিশ ও বিআইডাব্লিউটিসিকে হিমশিম খেতে দেখা যায়। কোথাও দেখা যায়নি স্বাস্থ্যবিধি মানার লক্ষণ।

বরিশাল থেকে ঢাকাগামী সুরুজ মিয়া বলেন, ‘এলিফ্যান্ট রোডে গার্মেন্টের দোকানে চাকরি করি। দোকান খোলার সিদ্ধান্ত হওয়ার পর মালিক ফোন দিয়ে আজই যেতে বলেছেন। বরিশাল থেকে মোটরসাইকেলে তিনজন আনল, একেকজনের ভাড়া ৬০০ টাকা। কোথায় থাকল করোনা? ফেরিতেও গাদাগাদি। এর মধ্যেই যেতে হচ্ছে।’

নবাবপুরের কাপড় ব্যবসায়ী ইব্রাহিম খলিফা চরম ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘দোকানও খুললেন আবার বাস-ফেরি বন্ধ রাখলেন। লাভ কী হলো? গোপালগঞ্জ থেকে বিভিন্নভাবে ৮০০ টাকায় ঘাটে এলাম। এখন দেখি ফেরি ছাড়ছে না। আজব সিদ্ধান্ত।’

বিআইডাব্লিউটিসি বাংলাবাজার ঘাট ম্যানেজার মো. সালাউদ্দিন বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির কারণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী দিনের বেলা সীমিত আকারে চার-পাঁচটি ফেরি দিয়ে যাত্রী ও জরুরি যানবাহন পারাপার করা হচ্ছে। রাতের বেলা নির্দিষ্ট সময়ে পণ্যবাহী ও পচনশীল দ্রব্যের ট্রাক পারাপার করা হচ্ছে।’

গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) প্রতিনিধি জানান, শনিবার গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলার বহু মানুষ মাহেন্দ্র, অটোরিকশা, মোটরসাইকেল ও ভাড়ায়চালিত মাইক্রোবাসে করে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আসছেন। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় নৌপথ পাড়ি দিতে তাঁরা ফেরিতে গিয়ে উঠছেন। আবার অনেকে ফেরির অপেক্ষায় না থেকে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নৌকায় চেপে নদী পাড়ি দিচ্ছেন।

ঢাকামুখী মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকাল যাঁরা রাজধানীতে ফিরেছেন, তাঁদের বেশির ভাগই ফুটপাতের দোকানি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন দোকানের কর্মচারী। মাগুরার শ্রীপুর থেকে আসা ফয়সাল মাহমুদ নামে এক যুবক জানান, ঢাকায় গাউছিয়া সুপার মার্কেটে প্রসাধনীর (কসমেটিকস) একটি দোকানে তিনি সেলসম্যানের চাকরি করেন। লকডাউনের কারণে দোকান বন্ধ থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়িতে চলে আসেন। পরে দোকান মালিকের ফোন পেয়ে গতকাল ভোরে গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন।

বিআইডাব্লিউটিসির দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (এজিএম) মো. ফিরোজ শেখ বলেন, ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে উভয় ঘাটে যাত্রীবাহী বাসের জন্য নির্ধারিত টিকিট কাউন্টার বন্ধ রয়েছে। তবে রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স, লাশবাহী গাড়িসহ পণ্যবোঝাই ট্রাক পারাপার স্বাভাবিক রাখতে সীমিত আকারে ফেরি সার্ভিস চালু রাখা হয়েছে। লঞ্চ চলাচল বন্ধ থাকায় অনেক যাত্রী ফেরি পারাপার হচ্ছেন।’

আঞ্চলিক প্রতিনিধি, মানিকগঞ্জ জানান, দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষ গতকাল ফেরিতে পদ্মা পার হয়ে পাটুরিয়া ঘাটে এসে রাজধানীর উদ্দেশে পাড়ি জমান। গণপরিবহন বন্ধ থাকায় প্রাইভেট কার, সিএনজি, মোটরসাইকেলে করে প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ভাড়া দিয়ে তাঁরা গন্তব্যে যান। অনেককে রিকশা ও ভ্যানে ভেঙে ভেঙে গন্তব্যের উদ্দেশে রওনা দিতে দেখা গেছে।

বিআইডাব্লিউসিটি পাটুরিয়া ঘাটের ব্যবস্থাপক মো. আবদুস সালাম জানান, কঠোর লকডাউনের শুরু থেকে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া রুটে রোগীবাহী অ্যাম্বুল্যান্স ও জরুরি পণ্যবাহী যানবাহন ছাড়া সব ধরনের যানবাহন পারাপার বন্ধ রয়েছে। তবে রবিবার থেকে শপিং মল ও দোকানপাট খোলার খবরে লোকজন ঢাকা ফিরছে। এ কারণে যানবাহনের পাশাপাশি শত শত লোক হুমড়ি খেয়ে ফেরিতে উঠছে। এই নৌ রুটে আপাতত ছোট তিনটি ফেরি চলাচল করছে।

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com