মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৭:০৫ অপরাহ্ন

আশুরায় মর্সিয়া-ক্রন্দন : ইসলাম কী বলে

আশুরায় মর্সিয়া-ক্রন্দন : ইসলাম কী বলে

হুসাইন আহমদ বাহুবলী : আহলে বায়ত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সকল সাহাবীকে ভালবাসা আহলে সুন্নাত ও ওয়াল জামআতের আকীদার অন্যতম অংশ।

হযরত হাসান ও হুসাইন রা. যেহেতু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সম্মানিত কন্যা ফাতেমা রা.’র সন্তান এবং তাদের ফযীলতে বেশ কিছু সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে, তাই প্রতিটি মুসলিমের উচিত তাদেরকে প্রাণ দিয়ে ভালবাস। তাই আমরা হাসান ও হুসাইন রা.কে ভালবাসি।

তাঁদের ফযীলতে যে সমস্ত সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে,

ক) বারা বিন আযিব রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
ﺭﺃﻳﺖ ﺍﻟﻨﺒﻲ ﺻﻠﻰ ﺍﻟﻠﻪ ﻋﻠﻴﻪ ﻭ ﺳﻠﻢ ﻭﺍﻟﺤﺴﻦ ﺑﻦ ﻋﻠﻲ ﻋﻠﻰ ﻋﺎﺗﻘﻪ ﻳﻘﻮﻝ ﺍﻟﻠﻬﻢ ﺇﻧﻲ ﺃﺣﺒﻪ ﻓﺄﺣﺐ ﻭﺃﺣﺐ ﻣﻦ ﻳﺤﺒﻪ
আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে দেখেছি, তিনি হাসান বিন আলীকে কাঁধে নিয়ে বলেছেন, হে আল্লাহ! আমি তাঁকে ভালবাসি। সুতরাং তুমিও তাঁকে ভালবাসো এবং যে তাঁকে ভালবাসে তুমি তাকেও ভালবাসো। (বুখারী)

খ) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
ﺍﻟْﺤَﺴَﻦُ ﻭَﺍﻟْﺤُﺴَﻴْﻦُ ﺳَﻴِّﺪَﺍ ﺷَﺒَﺎﺏِ ﺃَﻫْﻞِ ﺍﻟْﺠَﻨَّﺔِ
হাসান ও হুসাইন জান্নাতবাসী যুবকদের সরদার হবেন। (তিরমিজী, আলবানী সহীহ বলেছেন।
সিলসিলায়ে আহাদীসে সহীহা, হাদীস নং- ৭৯৬)

গ) আনাস বিন মালিক রা. বলেন: হুসাইনের মাথা উবাইদুল্লাহ এর কাছে নিয়ে যাওয়া হলে সে তাঁর মাথাকে একটি থালার মধ্যে রেখে একটি কাঠি হাতে নিয়ে তা নাকের ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করিয়ে নাড়াচাড়া করছিল এবং তাঁর সৌন্দর্য দেখে সম্ভবত কিছুটা বর্ণনাও করে ফেলেছিলেন।
হাদীসের শেষের দিকে আনাস রা. বলেন: হুসাইন রা. ছিলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সবচেয়ে বেশী সাদৃশ্যপূর্ণ। (বুখারী)

ঘ) আব্দুল্লাহ ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছি, এরা দু’জন (হাসান ও হুসাইন রা.) আমার দুনিয়ার দু’টি ফুল। (বুখারী, হাদীস নং- ৫৯৯৪)

তাদের ফযীলতে এমনি আরও অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদের প্রতি হৃদয়ের ভালবাসা প্রকাশ করেছেন।

ইসলাম সম্পর্কে স্বল্প জ্ঞানের অধিকারী একজন মুসলিম এ সমস্ত হাদীস পড়ে বা শুনে এবং সেই সাথে কারবালা নিয়ে অনেক লেখকের কাল্পনিক ও মিথ্যা কাহিনী পড়ে আবেগময়ী হয়ে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে বিভ্রান্তিতে পড়া কোন অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়।

তাই বলে তাঁর আদরের নাতি ও ফাতেমা রা.এর পুত্র হওয়ার কারণে অতি আবেগী হয়ে তাদের প্রতি ভালবাসায় বাড়াবাড়ি করা এবং হযরত মুআবিয়া রা. বা অন্য কোন সাহাবীর প্রতি বিরূপ ধারণা পোষণ করা বা গালি দেয়া যাবে না।

মুসলিমগণকে এ কথা ভুলে গেলে চলবে না যে, রাসূলের অন্যান্য সাহাবীদের ফযীলতেও অসংখ্য সহীহ হাদীস বর্ণিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনেও তাদের ফযীলতে রয়েছে সুস্পষ্ট ঘোষণা।
সুতরাং সকল সাহবীকেই ভালবাসতে হবে। সুতরাং কারও ব্যাপারে কোন প্রকার বাড়াবাড়ি করা চলবে না।

ইয়াযীদের ব্যাপারেও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের ইমামগণ যে মূলনীতি বেঁধে দিয়েছেন, তার বাইরে যাওয়া যাবে না। তাদের কথা হচ্ছে, তার উপর লানত বর্ষন করা এবং তাকে গালি দেয়া যাবে না।

এমনিভাবে হাসান ও হুসাইন এবং আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসায় কোন প্রকার বাড়াবাড়ি। যেমনটি করে থাকে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা। কারণ আল্লাহ্ তাআলা এবং রাসূল সাল্লাল্লাল্লাহু সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দ্বীনের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করতে নিষেধ করেছেন।

ইসলামের শিক্ষা হচ্ছে কোন মুসলিমের মৃত্যুতে বিলাপ-উচ্চস্বরে ক্রন্দন করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ, নিঃসেন্দহে একটি পাপের কাজ।
ইমাম হুসাইন রা.এর মৃত্যু অন্যান্য মুসলিমদের মৃত্যু থেকে আলাদা কোন ঘটনা নয়। সুতরাংযে মুসলিম আল্লাহকে ভয় করে তার জন্য হুসাইন রা. নিহত হওয়ার ঘটনাকে স্মরণ করে বিলাপ করা, শরীর জখম করা, গাল, মাথা ও বুক থাবড়ানো বা এ রকম অন্য কিছু করা জায়েজ নেই। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
ﻟﻴﺲ ﻣﻨﺎ ﻣﻦ ﻟﻄﻢ ﺍﻟﺨﺪﻭﺩ ﻭ ﺷﻖ ﺍﻟﺠﻴﻮﺏ
“যে ব্যক্তি মুসীবতে পড়ে নিজ গালে চপেটাঘাত করল এবং শরীরের কাপড় ছিঁড়ল, সে আমাদের দলের নয়।” (বুখারী)

তিনি আরও বলেন: “মুসীবতে পড়ে বিলাপকারী, মাথা মুন্ডনকারী এবং কাপড় ও শরীর কর্তনকারীর সাথে আমার কোন সম্পর্ক নেই।”

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেন:
ﺇﻥ ﺍﻟﻨﺎﺋﺤﺔ ﺇﺫﺍ ﻟﻢ ﺗﺘﺐ ﻓﺈﻧﻬﺎ ﺗﻠﺒﺲ ﻳﻮﻡ ﺍﻟﻘﻴﺎﻣﺔ ﺩﺭﻋﺎً ﻣﻦ ﺟﺮﺏ ﻭ ﺳﺮﺑﺎﻻً ﻣﻦ ﻗﻄﺮﺍﻥ
মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাকে কিয়ামতের দিন খাঁজলীযুক্ত বা লোহার কাঁটাযুক্ত কোর্তা পড়ানো হবে এবং আলকাতরার প্রলেপ লাগানো পায়জামা পড়ানো হবে। (মুসলিম)

তিনি আরও বলেন:
ﺃﺭﺑﻊ ﻓﻲ ﺃﻣﺘﻲ ﻣﻦ ﺃﻣﺮ ﺍﻟﺠﺎﻫﻠﻴﺔ ﻻ ﻳﺘﺮﻛﻮﻧﻬﻦ : ﺍﻟﻔﺨﺮ ﻓﻲ ﺍﻷﺣﺴﺎﺏ ﻭ ﺍﻟﻄﻌﻦ ﻓﻲ ﺍﻷﻧﺴﺎﺏ ﻭ ﺍﻻﺳﺘﺴﻘﺎﺀ ﺑﺎﻟﻨﺠﻮﻡ ﻭ ﺍﻟﻨﻴﺎﺣﺔ
“আমার উম্মতের মধ্যে জাহেলী যুগের চারটি স্বভাব বিদ্যমান রয়েছে। তারা তা ছাড়তে পারবে না।

(১) বংশ মর্যাদা নিয়ে গর্ব করা,
(২) মানুষের বংশের নাম তুলে দুর্নাম করা,
(৩) তারকারাজির মাধ্যমে বৃষ্টি প্রার্থনা করা এবং
(৪) মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা।

তিনি আরও বলেন: মানুষের মাঝে দুটি জিনিষ রয়েছে, যা কুফরীর অন্তর্ভুক্ত। মানুষের বংশের বদনাম করা এবং মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা।” (মুসলিম)

তিনি আরও বলেন:
ﺍﻟﻨﻴﺎﺣﺔ ﻣﻦ ﺃﻣﺮ ﺍﻟﺠﺎﻫﻠﻴﺔ ﻭ ﺇﻥ ﺍﻟﻨﺎﺋﺤﺔ ﺇﺫﺍ ﻣﺎﺗﺖ ﻭ ﻟﻢ ﺗﺘﺐ ﻗﻄﻊ ﺍﻟﻠﻪ ﻟﻬﺎ ﺛﻴﺎﺑﺎ ﻣﻦ ﻗﻄﺮﺍﻥ ﻭ ﺩﺭﻋﺎً ﻣﻦ ﻟﻬﺐ ﺍﻟﻨﺎﺭ
“মৃত ব্যক্তির উপর বিলাপ করা জাহেলিয়াতের অন্তর্ভুক্ত। বিলাপকারী যদি তওবা না করে মারা যায়, তাকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ আলকাতরার প্রলেপ লাগানো জামা পড়াবেন এবং অগ্নি শিখা দ্বারা নির্মিত কোর্তা পরাবেন।” (ইবনে মাজাহ)

একজন বিবেকবান মুসলিমের উপর আবশ্যক হচ্ছে সে এ ধরণের মুসীবতের সময় আল্লাহর নির্দেশিত কথা বলবে।
আল্লাহ্ তায়ালা বলেন:
ﺍﻟﺬﻳﻦ ﺇﺫﺍ ﺃﺻﺎﺑﺘﻬﻢ ﻣﺼﻴﺒﺔ ﻗﺎﻟﻮﺍ ﺇﻧﺎ ﻟﻠﻪ ﻭﺇﻧﺎ ﺇﻟﻴﻪ ﺭﺍﺟﻌﻮﻥ
“যখন তাঁরা বিপদে পতিত হয়, তখন বলে, নিশ্চয়ই আমরা সবাই আল্লাহর জন্য এবং আমরা সবাই তারই সান্নিধ্যে ফিরে যাবো।” (সূরা বাকারাঃ ১৫৬)

হযরত হুসাইন রা.র মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র আলী বিন হুসাইন, মুহাম্মাদ এবং জাফর জীবিত ছিলেন। তাঁদের কেউ হুসাইন রা.’র মৃত্যুতে মাতম করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁরা ছিলেন আমাদের হেদায়েতের ইমাম ও আদর্শ।

বিলাপ করা, গাল ও বুকে চপেটাঘাত করা বা এ জাতীয় অন্য কোন কাজ কখনই এবাদত হতে পারে না।

আশুরার দিনে ক্রন্দনের ফযীলতে যে সমস্ত বর্ণনা উল্লেখ করা হয় তার কোনটিই বিশুদ্ধ নয়। বিলাপ করা জাহেলী জামানার আচরণ বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে তা থেকে বিরত থাকার আদেশ দিয়েছেন।

নবীদৌহিত্রের শাহাদাতের মর্মান্তিক ঘটনায় আমরাও শোকাহত। তবে আমরা শোক প্রকাশ করব ইসলামের নির্দেশিত পন্থায়।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com