মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৭:৩১ অপরাহ্ন

ইচ্ছে হয় আবার দেওবন্দে যাই

ইচ্ছে হয় আবার দেওবন্দে যাই

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : বড় ইচ্ছে জাগে আবার দারুল উলূম দেওবন্দে চলে যাই। বেশ কয়েক বছর ধরে প্ল্যান করছি, দেওবন্দে যাব। কিন্তু যেতে পারি না।

পাঁচ সাত বছর আগে একবার প্রোগ্রাম বানালাম, দেওবন্দে এবার সফর হবে। সঙ্গে এক বন্ধুকে নিলাম। দুজনে মিলে পাসপোর্ট জমা দিলাম ভারতীয় দুতাবাসে। কিন্তু ভিসা পেলাম না।

আবার ২০১৭ সনে আরেক বন্ধুকে নিয়ে দেওবন্দ যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ভিসার জন্য ভারতীয় দুতাবাসে আবেদন করলাম, আলহামদুলিল্লাহ, ভিসা পেয়ে গেলাম এক বছরের। কিন্তু দুঃখের বিষয়, যার সঙ্গে যাব, সে বন্ধুটির ভিসা হল না।

এক বছর ভিসার মেয়াদ ছিল। কিন্তু কোন সাথী আর পেলাম না দেওবন্দে যাওয়ার। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেল।

তবুও হাল ছাড়ি নাই, দেওবন্দ যাবই ইনশাআল্লাহ।

মনটা এখনো ছটফট করে। দেওবন্দের স্মৃতি গুলো বারবার তাড়া করে আমাকে। দারুল উলুমের প্রতিটা দরস গাহ, ছাত্রাবাস, শিক্ষা ভবন, মসজিদে কদীম, মসজিদে রশিদ, ছাত্তা মসজিদ, খানকায়ে মাদানীয়া, সব কিছু যেন আমাকে আবার ডাকছে। আবার যেন ফিরে যাই দারুল উলুমের সে সব জায়গায়।

দেওবন্দ এমন একটি মারকাজ, যাকে কোন দিন কেউ ভুলতে পারবে না। বিশেষ করে যারা একবার দারুল উলুমে পড়েছে, তারাতো একেবারে পাগল দেওবন্দের জন্য। সে প্রতিটি মুহূর্ত স্মরণ করবে দেওবন্দ কে।

অনেকে মনে করে, বাংলাদেশে দাওরায়ে হাদীস শেষ করে আবার দেওবন্দে কেন? এ প্রশ্নটির সম্মুখিন আমি নিজে।
আমি নিজে যখন দেওবন্দে যাওয়ার ইরাদা করলাম, বহু শুভাকাংখি আমাকে এসব প্রশ্নে ঝাঝরা করেছিলেন। কিন্তু আমার তো প্রবল আগ্রহ ছিল সেখানে যাওয়ার, একারণে কোন বাঁধা আমাকে কাবু করতে পারেনি।

সকল প্রকার বাঁধা উপেক্ষা করে ছুটে ছিলাম দারুল উলূমের পানে। কারো বুঝে আসুক চাই না আসুক, দেওবন্দ আমার যেতেই হবে।

দেওবন্দে আমার কোন ফায়দা হোক আর না হোক, আমি দেওবন্দ যাবই। এরকম জযবা আর মন- মানসিকতা ছিল তখন। সত্যি এরকম জযবার কারণে আমার মত ক্ষুদ্র মানুষের জন্য দেওবন্দের যাত্রা সহজ হয়ে ছিল।

আমার একজন শ্রদ্ধেয় উস্তাদ, মাওলানা জাফর আহমদ সাহেব, ( শায়খুল হাদীস, শায়েখে ছানী, মালিবাগ জামেয়া শারইয়্যাহ) তিনি একদিন আমাদের ক্লাসে বলেছিলেন, কোন কাজে ইশকের ( জযবা) এর প্রাধান্য না থাকলে সে কাজ করা সম্ভব হয় না।

তিনি বলতেন, হজ্জ ওহি করেগা, যেছ কি আকল পর ইশক গালেব হো” হজ্জ ঐ ব্যক্তি করতে পারে, যার মধ্যে ইশকের প্রাধান্য থাকে। আমি হজে যাবই। কোথায় টাকা পাব, আর আমার পরিবার কিভাবে চলবে, সেটা আমি জানিনা। আমার যেতেই হবে। এরকম মন- মানসিকতা যার, সে খুব তাড়াতাড়ি হজ্জে যেতে পারবে।

এরকম দেওবন্দ যাওয়ার ক্ষেত্রে তার মন- মানসিকতা এরকম হওয়া চাই। দেওবন্দ আমার যেতেই হবে। সেখানে গেলে কি ফায়দা হবে আমি জানিনা।

ব্যস, হুজুরের এই সবক আমার অনেক প্রেরনা যুগিয়ে ছিল। দাওরায়ে হাদীস শেষ করে, বেফাক পরীক্ষা দিয়েই চলে গিয়ে ছিলাম দারুল উলুম দেওবন্দে।

তবে দারুল উলুম দেওবন্দে গিয়ে আমার কি উপকার হয়ে ছিল, সে গুলো বর্ননার ভাষা নেই। সে ফায়দার লিখনী হবে অনেক লম্বা। পাঠক স্রোতারাও হবে বিরক্ত।

এতটুকু বলেতে চাই, উস্তাদদের মুখে শুনেছি, মুজাহিদে আজম শামসুল হক ফরিদপুরী ( রহঃ) বলতেন, (তিনি তখন লালবাগ জামিয়াতে) আমার এই লালবাগ জামেয়াতে ১২ বছর পড়লে যা হবে, দারুল উলুম দেওবন্দের সদর গেট দিয়ে ঢুকে মাদানী গেট দিয়ে বের হলে তার থেকে বেশী ফায়দা হবে।

আসলে একদম কম বলেন নি আল্লামা ফরিদপুরী রহ.। দারুল উলুম যাওয়ার পরে বুঝলাম, কেন আমাদের আকাবির আছলাফগন দেওবন্দে আসার ব্যাপারে এত তারগীব দিয়েছেন। তারা কেন এত গুরুত্ব দিয়েছেন দেওবন্দে পড়ার ব্যাপারে।

দারুল উলূম দেওবন্দের একটা বড় বৈশিষ্ট আমার কাছে মনে হয়েছে, প্রতিটি ছাত্রের জেহেনকে ধোলাই করা। যাকে বলে মগজ ধোলাই।

এই দেওবন্দ তো আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টি ভঙ্গি বহন কারী এক জামাত। যারা মা আনা আলাইহি ওয়া আসহাবি এর উপর কায়েম- দায়েম থাকার কোশেশ করে। দেওবন্দ এর ছাত্রদের সেই চিন্তা- চেতনা লালন করে। যেটা সব চেয়ে বড় কারিশমা দারুল উলূমের।

আমি নিজের কথাই বলি, দেওবন্দ যাওয়ার পুর্বে যে অবস্থা ছিল আমার, দেওবন্দ থেকে ফিরে যেন বদলে গেলাম। আমার ধ্যান- ধারণা যেন পাল্টে গেল। আকাবির আছলাফের বাতলানো পথে নিজেকে সঁপে দিলাম।

রুহানী খোরাক পেয়ে ধন্য হয়েছিলাম যেন সব চেয়ে বেশী। শায়েখ মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী (রহ.) শায়েখ আব্দুল হক আজমী রহ., ফেদায়ে মিল্লাত আসআদ মাদানী রহ. এরকম বুজুর্গদের সোহবত পাওয়াটা ছিল সবচেয়ে বড় পাওনা। এক প্রশান্ত মন নিয়ে ফিরে ছিলাম নিজ দেশের বুকে।

সে সব স্মৃতিগুলো এখন বারবার ভেসে উঠে, মনে হয় আবার দেওবন্দে চলে যাই।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com