২৭শে মে, ২০২০ ইং , ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

ইতিকাফ: পূণ্যময় রজনীর সন্ধানে

ইতিকাফ: পূণ্যময় রজনীর সন্ধানে

মাওলানা আরিফ বিল্লাহ ❑ গত বৃহস্প্রতিবার থেকে শুরু হয়েছে মাহে রামাদানের একুশ তারিখ। এ দিন থেকে রামাদান মাসের নতুন একটি আমল শুরু হয়ে যায়। তা হলো ইতিকাফ। বিচ্ছিন্নতা-নি:সঙ্গতা-নিবেদিত হয়ে নির্জনে অবস্থান করা ইত্যাদি অর্থ হলো ইতিকাফ করা।

নির্জনতায় মগ্ন থাকা আম্বিয়ায়ে কেরাম আ: এর সুন্নাত ও আওলিয়ায়ে কেরামের আদাত। দুনিয়াতে বড়দের বড় বড় প্রাপ্তিগুলো নির্জনতার অবলম্বনেই হয়েছে। হযরত মুসা আ: স্রষ্টার সাথে কথা বলেছেন তূর পর্বতের নির্জনতার কোলে বসে। হযরত ঈসমাইল আ: শৈশব থেকে কৈশরে নবুয়াতে ধন্য হয়েছেন মক্কার বিজন মরুভূমিতে। আমাদের প্রিয়নবী সা. কোরআনের সবক নিয়েছেন হেরা গুহার নিস্তদ্ধতার মাঝে।

রাসূল সা: উম্মতের জন্য আবদ্ধস্থানে অচলায়ত অবস্থায় সচল পূণ্যের দুয়ারকে খুলে দিয়েছেন ইতিকাফের মাধ্যমে।

রামাদানুল মুবারকের শেষ দশকে পরিবার ও সকল বিষয় থেকে আড়াল হয়ে মসজিদের নির্জন কোণে ইবাদতে মশগুল থাকলে অবশ্যই ইতেকাফকারী শবে কদরের পূণ্যে ধণ্য হবে। রাসূল সা: উম্মতের জন্য আবদ্ধস্থানে অচলায়ত অবস্থায় সচল পূণ্যের দুয়ারকে খুলে দিয়েছেন ইতিকাফের মাধ্যমে।

রামাদানকে যে কারণে মহিমান্বিত করা হয়েছে, কোরআনকে যে রাত্রিতে দুনিয়ার আসমানে নাজিল করা হয়েছে সেই রজনী আর সেই ফযিলত ইতিকাফের এই দিনগুলিতেই লুকায়িত থাকে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে- আমি এই কোরআনকে রমাদান মাসে অবতীর্ণ করেছি। [সূরা বাকারা: ১৮৫] নিশ্চয় আমি কোরআনকে অবতীর্ণ করেছি বরকতময় এক রজনীতে। [সূরা দুখান: ০৩]

এই আয়াতে আল্লাহ কোরআন নাজিলের রজনীকে বরকতময় রজনী বলে উল্লেখ করেছেন। অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন- নিশ্চয় আমি কোরআনকে কদরের রাত্রিতে অবতীর্ণ করেছি। [সূরা কদর: ০১]

এই একটি রাত্রিই মুমিনের জন্য বৎসরের সেরা রাত্রি। এক রাত্রির জাগরণ মুমিন বান্দা পাবে হাজার রাত্রির ইবাদাত।একজন ব্যবসায়ী যেমন মুখিয়ে থাকেন সারা বৎসর সুযোগ লাভের আশায়, কখন পাবে সে কম্পানীর মূল্যছাড়ের অফার! হ্রাস মূল্যের অফার না ধরে একজন ব্যবসায়ী যেমন লাভের পূর্ণতা পায়না তেমনি রামাদান মাসকে সঠিকভাবে বরণ না করতে পারলে একজন মুমিন পূণ্যের পাল্লা ভারী করতে পারে না। এ মাসে একটি ফরজ আদায় করলে সত্তরটি ফরজের মূল্য মিলবে! কোথা পাবে মুমিন এই ফযিলত রামাদানের বাহিরে। যেখানে শয়তান অপরাধের ঢালি সাজিয়ে রাখে বান্দার চারপাশে।

রামাদান মাসে মুমিন বান্দা সারাদিন উপবাসব্রত পালন করে অনেক কষ্ট হজম করে। তবু সে রাত্রি জাগরণ করে পূণ্যের লাভে।

আমরা হাওড় বেষ্টিত কৃষক জাতি। বৈশাখ হলো আমাদের কৃষি সম্পদ ঘরে তোলার মাস। এমাসের লাভ ক্ষতির খতিয়ান আমরা সহজে বুঝি। এমাসে অবহেলা করলে সারা বছর তার খেসারত দিতে হবে, তাই কৃষক এই মাসে কষ্ট করে ফসল মাড়াই করে, ঘোলায় ধান তোলে। কৃষকের মন ভরে ওঠে খুশিতে, পরিবার মেতে ওঠে হাসিতে। রামাদান মাসে মুমিন বান্দা সারাদিন উপবাসব্রত পালন করে অনেক কষ্ট হজম করে। তবু সে রাত্রি জাগরণ করে পূণ্যের লাভে।

এমাসে আল্লাহ শয়তানকে আবদ্ধ করেছেন বান্দার কল্যাণে। কোন নফলকর্মও যেন ছুটে না যায় দিবস রজনীর কোন মুহুর্তে। একটি নফল আদায়ে বান্দা একটি ফরজ আদায়ের মূল্য পাবে। যে ফরজ নষ্ট করতে শয়তান অন্য মাসে হাজারো ফন্দি আঁটে। রাসূল সা. এই লাভগুলো ধরিয়ে দিতে উম্মাতকে এমাসে অনেক আমল দেখিয়েছেন। কিয়ামুল লাইলে কুরআন খতম করেছেন। সদকা করেছেন। বেশি বেশি নাওয়াফেল আদায়ে মগ্ন থেকেছেন। রামাদানের শেষ দশকে ইতিকাফে বসে আল্লাহর ইবাদাত করেছেন। “লইলাতুল কদর” বা পূণ্যময় রজনী লাভে পুলকিত হয়েছেন বারেবারে।

পেয়ারে হাবীব সা. জীবদ্দসায় যতগুলো রামাদান পেয়েছেন ততবারই ইতিকাফ করেছেন। প্রত্যেকবারই তিনি কদরের রজনীকে আলিঙ্গন করেছেন। উম্মাত যেন এই রজনী থেকে বঞ্ছিত না হয়, তাই ইতিকাফকে উম্মাতের জন্য বাধ্য করেছেন। রাসূল সা. বলেছেন- ইতিকাফকারী যদি গাফেল না হয় অবশ্যই সে মহিমান্বিত রজনীকে আলিঙ্গন করতে পারবে। কেননা যে ইতিকাফ করে সকল পাপ থেকে সে নিরাপদ থাকে। এবং সকল পূণ্যের স্রোতধারা সে পাইতে থাকে। তাই আসুন আমরা শবে কদরকে খুঁজি ইতিকাফকারীদের সাথে থেকে। ইবাদাত করি নির্জনতা উপলব্ধি করে। সুন্নাত ইতিকাফের নিয়ত করি আগামি রামাদানে হায়াত থাকলে।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com