৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

ইলহাম | সাখাওয়াত রাহাত

ইলহাম | সাখাওয়াত রাহাত

(গল্প শুধু গল্প নয়)

বারাকাত সাহেব বৃহস্পতিবার রাতে সাপ্তাহিক বয়ান শোনার জন্য কাকরাইল মসজিদে এসেছেন। মাগরিবের নামাজের পর মাওলানা জুবায়ের সাহেব বান্দার ডাকে আল্লাহর সাড়া দেওয়া এবং ইলহাম[১] সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা করলেন।

মাওলানা সাহেবের বয়ান শুনে তিনি খুব আশ্চর্য হলেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন- আল্লাহ তায়ালা কি এখনও অনুভূতি জাগ্ৰত করার মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন? মানুষকে গায়েবি নির্দেশ দেন? সত্যিই কি এখনো বান্দার ডাকে সাড়া দেন?

বয়ানের পর চা নাস্তা খেতে খেতে তিনি কয়েকজন তাবলীগের সাথীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করলেন। তাদের মধ্যে একাধিক সাথী এ বিষয়ে নিজের অভিজ্ঞতা জানালেন। আল্লাহ তাদেরকে বিভিন্ন উপায়ে কীভাবে নির্দেশনা দিয়েছিলেন সেসব কাহিনী শোনালেন। কিন্তু এসব ঘটনা শুনে তিনি থোরাই তৃপ্ত হলেন!

এশার নামাজ ও বয়ান শেষে বারাকাত সাহেব যখন বাসায় ফেরার উদ্দেশ্যে গাড়ি চালানো শুরু করলেন তখন রাত প্রায় দশটা বাজে। ব্যস্ত শহর ততক্ষণে ক্লান্তি কাটাতে ঘুমের অপেক্ষায়! তবে আজকের আলোচনা চিন্তা করতে করতে তাঁর মন মোটেই ক্লান্ত হয়নি!

গাড়িতে বসে তিনি মনে মনে দোয়া করতে শুরু করলেন- হে আল্লাহ! আপনি যদি এখনও লোকদের সঙ্গে কথা বলেন তাহলে দয়া করে আমার সঙ্গেও কথা বলুন! আমি শুনতে চাই! আমি আপনার আজ্ঞাবহ হওয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করব!

তিনি যখন শান্তিনগর বাজারের কাছাকাছি এলেন তখন হঠাৎ এক গ্যালন দুধ কেনার বিষয়ে অদ্ভুত এক চিন্তা শুরু করলেন!

কিছুক্ষণ পর তিনি মাথা নাড়লেন এবং উচ্চৈস্বরে বললেন: আল্লাহ! এটা কি তুমি? তুমিই কি এমনটা চাচ্ছ? কিন্তু তিনি কোনো উত্তর পেলেন না। তাই বাসার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখলেন।

কিন্তু আবারও তাঁর মনে ভাবনা এলো- এক গ্যালন দুধ কিনে ফেলি! এবার সশব্দে তিনি বললেন: ঠিকাছে আল্লাহ! এটাই যদি তোমার ইচ্ছা হয় তবে আমি দুধ কিনে নেব!

আনুগত্যের পরীক্ষা হিসেবে এটি তাঁর কাছে খুব কঠিন মনে হয়নি। তাছাড়া এই দুধ তিনি ফ্রিজে রেখে দীর্ঘদিন ধরে খেতে দুধ পারবেন।

একটু এগিয়ে মালিবাগ রেলগেট বাজারের সামনে তিনি গাড়ি থামালেন। এরপর দুধের গ্যালন কিনে আবারো বাসার পথ ধরলেন।

তিনি যখন রামপুরা বাজারের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন; তখন তিনি আবারও সেই তাগিদ অনুভব করলেন! এবার তাঁর মন বলছে- বাঁয়ের গলিতে চল!

তবে এই ভাবনাটাকে তিনি গুরুত্ব দিলেন না! কারণ উত্তর বাড্ডায় তাঁর বাসায় যেতে হলে তাঁকে বরাবর সোজা রাস্তায় যেতে হবে। বাঁয়ের রাস্তা ধরে তো তিনি বাসায় পৌঁছতে পারবেন না! এই ভেবে তিনি টিভি সেন্টার পার হয়ে রামপুরা ব্রিজের কাছাকাছি চলে এলেন।

কিন্তু আবার তিনি অনুভব করেছিলেন- রামপুরা বাজার সংলগ্ন বাম দিকের গলিতে তাঁর যাওয়া উচিত! তাই ইউটার্ন নিয়ে তিনি পিছনে ফিরে এলেন! একটু মজা করে বললেন: ঠিকাছে আল্লাহ! তুমি যেই গলিতে যেতে বলছ সেই গলিতেই যাব! অতঃপর তিনি গলিতে প্রবেশ করলেন!

গাড়ি চলতে চলতে ওয়াপদার কাছাকাছি আসার পর তাঁর মনে হল- এখানে গাড়িটি থামানো উচিত! কিন্তু কেন থামাবেন তা বুঝতে পারছেন না! তিনি স্টার্ট বন্ধ করে চারদিকে তাকালেন। দেখলেন এলাকাটা প্রায় নীরব সুনসান! দূর থেকে কেবল দুয়েকটা ঘেউ ঘেউ শব্দ ভেসে আসছে!

দোকানপাট তো ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে! এমনকি ল্যাম্পপোস্টের আধোজ্বলা লাইটগুলো ছাড়া বেশিরভাগ বাসাবাড়ির লাইটগুলোও ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গেছে! অধিকাংশ মানুষই হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে!

তাঁর মনে আবার একটা ভিন্ন অনুভূতি এলো! ‘যাও এবং রাস্তার দক্ষিণ পাশের বাড়ির লোকদের দুধ দাও!’

তিনি অবাক হয়ে বাড়িটির দিকে তাকালেন। বাড়িটিতে ছিল ভূতুড়ে অন্ধকার! দেখে মনে হচ্ছে- এ বাড়িতে দীর্ঘদিন ধরে কেউ থাকে না! আর থাকলেও তারা অনেক আগেই ঘুমিয়ে গেছে!

তিনি গাড়ির দরজা খুলতে শুরু করলেন। এক মুহূর্ত পরেই আবার গাড়ির সিটে ফিরে এসে বললেন:
আল্লাহ! এ তো নির্ঘাত পাগলামি!

এই বাড়ির লোকজন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। আমি যদি তাদের জাগ্রত করি তাহলে তারা খুব বিরক্ত হবে। আমাকে পাগল মনে করবে! এবং আমি খুব লজ্জিত হব!

কিন্তু আবারও তাঁর মনে হল- বাড়িটিতে তাঁর যাওয়া এবং দুধ দেওয়া উচিত!

অবশেষে তিনি গাড়ির দরজা খুলে বললেন: ঠিকাছে আল্লাহ! তুমি যা চাও তাই হবে! আমি ওই বাড়িতে যাব এবং তাদেরকে দুধ দেব! তুমি যদি আমাকে পাগলের মতো দেখতে চাও তবে তাই ঠিকাছে! আমি তোমার আজ্ঞাবহ হতে চাই! তোমার আদেশ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মানতে চাই!

তবে, আমি তিনবার ওই বাড়ির কলিংবেল বাজাবো। যদি এর মধ্যে তাদের কোনো সাড়া না পাই; তাহলে ফিরে আসব!

তিনি রাস্তা পেরিয়ে কলিংবেল বাজালেন। আশ্চর্য! প্রথমবার বেল বাজানোর সঙ্গে সঙ্গেই বাড়ির ভেতর থেকে আসা কিছু শব্দ তিনি শুনতে পেলেন! একজন পুরুষের কণ্ঠস্বর চেঁচিয়ে ওঠল- ‘কে? আপনি কী চান?’

দ্বিধাদ্বন্দ্বে বারাকাত সাহেব পালিয়ে যাওয়ার আগেই বাড়ির দরজা খোলা হল! লোকটি রঙিন লুঙ্গি এবং সাদা টি-শার্টে দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন। দেখে মনে হচ্ছে- মাত্রই তিনি বিছানা থেকে ওঠে এসেছেন!

লোকটি এক অদ্ভুত চেহারা নিয়ে বারাকাত সাহেবের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। দেখেই বোঝা যাচ্ছে- তাঁর বাড়ির দোরগোড়ায় এতরাতে একজন অচেনা মানুষকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি খুব একটা খুশি হননি!

গম্ভীর গলায় তিনি জিজ্ঞেস করলেন: কে আপনি? আপনার হাতে এটা কী?
বারাকাত সাহেব দুধের গ্যালন তাঁর হাতে দিয়ে বললেন: আমাকে আপনি চিনবেন না। নিন! এই দুধ আমি আপনার জন্য এনেছি!

লোকটি কিছু না বলে দুধের গ্যালন নিয়ে দ্রুত ভেতরে চলে গেলেন! তারপর একটি রুম থেকে একজন মহিলা এসে দুধ নিয়ে রান্নাঘরের দিকে ছুটে গেলেন! লোকটি একটি শিশুকে নিয়ে তাঁর পিছনে ছুটছিলেন! বাচ্চাটি কাঁদছিল!

একটু পর অশ্রুসজল চোখে লোকটি দরজায় দাঁড়ানো বারাকাত সাহেবের কাছে ফিরে এলেন। কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে লাগলেন: আমরা কেবলই ‘সালাতুল হাজাত’ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করছিলাম!

গতমাসে আমাদের খরচ অনেক বেশি হয়ে গিয়েছিল। বাধ্য হয়ে এক মাসের জন্য আমরা কিছু টাকা ধার করেছিলাম। সেই টাকা পরিশোধ করে সংসারের নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র কিনতেই আমাদের টাকা শেষ হয়ে যায়! তাই আমাদের একমাত্র শিশুর জন্য নতুন দুধ কিনতে পারিনি। পুরনো দুধ আজ বিকেলেই ফুরিয়ে গেছে! আমার বাচ্চাটা ক্ষুধার জ্বালায় ঘুমুতে পারছে না!

আমি মাত্রই দোয়া করছিলাম এবং আল্লাহ তায়ালাকে বলছিলাম- দুধের জন্য আমার বাচ্চার কান্না আমি সইতে পারছি না আল্লাহ! দয়া করে তার জন্য একটু দুধের ব্যবস্থা করে দাও!

রান্নাঘর থেকে তাঁর স্ত্রী চিৎকার করে বললেন: আমি দোয়ার মধ্যে আল্লাহকে বলেছিলাম- আল্লাহ! একজন ফেরেশতার মাধ্যমে হলেও আমার ক্ষুধার্ত বাচ্চাটার জন্য কিছু দুধ পাঠান!
ভাই, আপনি কি ফেরেশতা?

বারাকাত সাহেব স্বামী-স্ত্রীর এসব কথাবার্তা শুনে কান্না সংবরণ করতে পারছিলেন না! মানিব্যাগে থাকা সব টাকা জোরকরে লোকটির হাতে দিয়ে তিনি দ্রুত ওই বাড়ি ত্যাগ করলেন।

ধীরপায়ে তিনি নিজের গাড়ির দিকে এগুলেন। তাঁর দু’চোখে অশ্রুধারা প্রবাহিত হচ্ছে! তিনি প্রমাণ পেলেন- আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ইলহাম সত্য! আল্লাহ তায়ালা এখনও বান্দার ডাকে সাড়া দেন! তিনি আমাদের প্রার্থনা শোনেন! আমাদের দোয়া কবুল করেন!

___________________________________________
[১] ইলহামের পারিভাষিক অর্থ হল, চিন্তা ও চেষ্টা ছাড়াই কোনো কথা বা কোনো বিষয় অন্তরে উদ্রেক হওয়া। আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দা গায়েবি নির্দেশপ্রাপ্ত হওয়া ইত্যাদি। তবে স্বপ্নের ন্যায় ইলহামও কখনো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়; আবার কখনো শয়তানের পক্ষ থেকে হয়!

যে ইলহাম শরীয়তের হুকুম আহকাম সম্পর্কিত নয় এবং তার বিষয়বস্তু শরীয়তপন্থী নয় বা শরীয়তের কোনো হুকুম আহকাম সম্পর্কিত এবং এর পক্ষে শরীয়তের দলীলও বিদ্যমান থাকে, শুধু এ ধরণের ইলহামকেই সহিহ ইলহাম বলা হবে এবং ধরা হবে এটি আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে হয়েছে। এটি আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত বলে পরিগণিত হবে। এ ব্যাপারে তাঁর শোকর আদায় করা দরকার।

আর যদি ইলহামে উপরিউক্ত শর্তগুলো পাওয়া না যায়, তাহলে ধরে নেওয়া হবে- তা শয়তানের প্রলাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। এ ধরণের ইলহাম থেকে বিরত থাকা এবং তা থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করা আবশ্যক।
(ফাতহুল বারী-১২/৪০৫, কিতাবুত তাবীর, বাব-১০, রূহুল মাআনী-১৬/১৬-২২, তাবসিরাতুল আদিল্লা-১/২২-২৩, মাওকিফুল ইসলাম মিনাল ইলহাম ওয়াল কাশফি ওয়াররুয়া-১১-১১৪)

হাদিসে এসেছে- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: নিশ্চয় মানুষের অন্তরে শয়তানের পক্ষ থেকেও কথার উদ্রেক হয়, ফেরেশতার পক্ষ থেকেও কথার উদ্রেক হয়। ফেরেশতার উদ্রেক হল- কল্যাণের প্রতি প্রতিশ্রুতি দান এবং হকের সত্যায়ন করা। যে ব্যক্তি এটি অনুভব করবে, তাকে বুঝতে হবে- তা আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে। তাই তার প্রশংসা করা উচিত। আর যে ব্যক্তি দ্বিতীয়টি অনুভব করবে, তাকে বিতাড়িত শয়তান থেকে আশ্রয় কামনা করতে হবে।

অতঃপর তিনি [সূরা বাকারার ২৬৮ নং] আয়াত পাঠ করেন, অর্থাৎ শয়তান তোমাদের অভাব অনটনের ভীতি প্রদর্শন করে এবং অশ্লীলতার আদেশ দেয়। পক্ষান্তরে আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে নিজের পক্ষ থেকে ক্ষমা ও অধিক অনুগ্রহের ওয়াদা করেন। (সুনানুল কুবরা লিন নাসায়ী; হাদিস নং ১০৯৮৫; সহিহ ইবনু হিব্বান; হাদিস নং ৯৯৭; মুসনাদে আবী ইয়ালা; হাদিস নং ৪৯৯৯, সুনানে তিরমিজি; হাদিস নং ২৯৮৮)

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com