১০ই আগস্ট, ২০২০ ইং , ২৬শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৯শে জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

ইসলামপন্থিদের দলকানা মানসিকতা

বিশ্লেষণ । সগীর আহমদ চৌধুরী

ইসলামপন্থিদের দলকানা মানসিকতা

আয়া সোফিয়ায় এরদোয়ানের সেকুলার ভাবনা

আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরে লক্ষণীয় যা-

১। আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তরে এরদোয়ানদের কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। সেকুল্যারিজমের অভিভাবক সেনাবাহিনী, আদালত, রাজনীতিক প্রতিদ্বন্ধী, সুশীল সমাজ ও মিডিয়া এর প্রত্যেকটি ছিল তার জন্য অটল পাহাড়ের মতো বাধা। ক্ষমতায় এসেই ডিক্রি জারি করে, ক্ষমতা প্রয়োগ করে কিংবা বল প্রয়োগের মতো অহমিকা করে এটা করতে পারতেন, কিন্তু সেটা হিতে বিপরীতও হতে পারতো। না, তিনি ব্যাপারটাকে জনপ্রিয় হতে দিয়েছেন, এটি একটা গণদাবিতে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য অপেক্ষা করেছেন, এরই মধ্যে সেনাবাহিনী, আদলতসহ যেখান থেকে বাধার সম্মুখীন হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা সব জায়গায় সংস্কার করেছেন, আধ্যাত্মিক ও ঐতিহ্যগত চেতনাকে সেখানে পুনরুজ্জীবিত করেছেন। সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক সংগ্রাম করেছেন।

২। তিনি সিদ্ধান্তকে চাপিয়ে না দিয়ে জনগণের মধ্যেই এর চাহিদা তৈরি করেছেন। অনেকে মনে করেন, এরদোয়ান কাজটি করেছেন একান্তই তাঁর রাজনীতিক স্বার্থে, সামনের নির্বাচনে ভোটের আশায়। বাস্তবতা হচ্ছে, বিষয়টি এমনভাবে গণদাবিতে রূপান্তরিত হয়েছিল যে, বাম ও সেকুলারপন্থী দলগুলোও তাদের ভোটার হারানোর ভয়ে এই দাবিতে সোচ্চার হয়েছিল, সংসদে বিল ওঠানো হলে সেক্যুলার, বাম ও জাতীয়তাবাদী দল-মত নির্বিশেষে সকলেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে করতালির মাধ্যমে বিলকে স্বাগত ও সমর্থন জানিয়েছে। রাজনীতিক স্বার্থের কথা বললে এখানে শুধু এরদোয়ানের নয়, বরং অন্যান্য বাম-সেক্যুলার সবারই রাজনীতি স্বার্থ রয়েছে।

৩। অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ থেকে বলতে পারি, আমাদের দেশের ইসলামপন্থি দলগুলো ইসলামকে শুধু রাজনীতিক স্বার্থেই ব্যবহার করে, রাজনীতিক স্বার্থ না থাকলে কাজটা ইসলামি হলেও তাতে তেমন আগ্রহ থাকে না। এজন্য আমাদের দেশে যেকোনো ইসলামি কর্মসূচিতে ক্রেডিট নেওয়ার প্রতিযোগিতা দেখা যায়, কার কি অবদান সেই কীর্তন গাইতে দেখা যায়, দলের আত্মপ্রচার দেখা যায়। এটা যে শুধু রাজনীতিক স্বার্থেই তা তো খুলে বলার দরকার নেই। সমগ্র ইসলামপন্থিদের জন্য আরও সমস্যার ব্যাপার হচ্ছে, ইসলামি দলগুলো কেউই কারো দ্বারা ইসলামের খেদমত হোক সেটা মনে প্রাণে চায় না। যা হবে সেটি সবই তার দলের দ্বারাই হোক, দলের মাধ্যমেই হোক, যাবতীয় ক্রেডিট তার দলেরই থাকুক।

তুরস্কে আয়া সোফিয়া মসজিদে রূপান্তরে এরদোয়ানের কোনো একক ক্রেডিট ছিল না, তিনি বা তার দল দাবিও করেনি, সরকারের ধর্মমন্ত্রী দীর্ঘ খুতবা দিয়েছেন, কিন্তু তিনি নিজের প্রেসিডেন্টের নামটা পর্যন্ত একবারের জন্য বলেননি। অর্থাৎ এরদোয়ানের পক্ষে এখানে রাজনীতিক স্বার্থ হাসিলের দুরভিসন্ধি ছিল না, কোনো নির্বাচনী ধান্ধা ছিল না, একান্তই ইসলামের খেদমতই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এরদোয়ানের বিচক্ষণতা এখানেই যে, তিনি এই ইস্যুতে বাম-সেক্যুলারদেরও এক কাতারে আনতে পেরেছেন। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের কাজ হচ্ছে, বাম ও সেক্যুলারদের বিরুদ্ধে শুধু বিবৃতিবাজি করা, তাকফীর করা, মার মার কাট কাট করা।

তুরস্কে এরদোয়ানরা কৌশলে বাম ও সেকুলারদেরকেও আধা ইসলামপন্থি করে ছেড়েছেন, ইসলামি ইস্যু ও দাবিতে মাঠে নামিয়েছেন। অথচ বাংলাদেশে ইসলামপন্থিরা এ পর্যন্ত একটি ইসলামি ইস্যু বা কোনো দাবিকে এভাবে জনপ্রিয় করতে পারেনি। এমনকি দীর্ঘ দু’যুগের কাছাকাছি সময় জাতীয়তাবাদীদের সাথে থেকেও তাদেরকে ইসলামের কাছাকাছি নিয়ে আসতে পারেনি।

এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, ইসলামপন্থিদের দলকানা মানসিকতা। এরদোয়ান বা তার দলের ক্রেডিট নেওয়ার প্রয়োজন নেই, কিন্তু এমন একটি পরিস্থিতি বা পরিবেশ তারা সৃষ্টি করেছেন যে, ভবিষ্যতে সেুক্যুলার দলগুলো ক্ষমতায় গেলে তারাও বর্তমানের ধারাবাহিকতায় ইসলামের খেদমত এগিয়ে নিতে বাধ্য হবে। সেই ধরনের পরিবেশ বাংলাদেশে আদৌ সৃষ্টি হবে কি? সেই ধরনের মেধা, যোগ্যতা ও বিচক্ষণতা আছে? থাকলে থাকতে পারে, যদি তারা দলকানা না হতো।

লেখক : রাজনীতিক

একান্তই মতামত লেখকের, এর জন্য সম্পাদক দায়ী নন

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com