১৩ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ৩০শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ৩০শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

ইসলাহী আবহে উদ্ভাসিত তাড়াইলের বেলংকা

ইসলাহী আবহে উদ্ভাসিত তাড়াইলের বেলংকা

আশরাফ উদ্দীন রায়হান

‘মেরে মুহতারাম ভাইও, এই বেলংকার ময়দানে হাজার হাজার মানুষ যাঁরা আসছে, র্পথম মাওলা তাঁদের আশেক হইসে, এর পরে না তাঁদের পা-চলা আরম্ভ হইসে’— নন্দিত বক্তা ও আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকুতুহুমের বিশিষ্ট ছাত্র ও শাগরেদ— শায়খুল হাদীস মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমূদ দামাত বারাকাতুহুমের আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনার এ উক্তি গেঁথে যায় ইসলাহী ইজতেমায় আগত জাকীরিন-শাকীরিন বান্দাদের হৃদয়ে। আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা পাথরসম ঠায় ব্যাকুলচিত্তে তন্ময় হয়ে শোনে ‘খতীবে বাংলাদেশ’ অভিধায় বিভূষিত রাজধানীর বায়তুল মা‘রুফ জামে মসজিদের এই খতীবের বহুল প্রতীক্ষিত সুলূকসন্ধানী বয়ান।

আসরের শেষ ওয়াক্ত আর মাগরিবের আগের মধ্যবর্তী গোধূলীলগ্নে মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুনের হৃদয়জোড়ানো দরূদ ও সালামের শ্রুতিমধুর পাঠ এশকে রাসূলের মওজে দোলা দেয় মুমিনের তনু-মন। যেন মদীনার রওজায়ে আতহার থেকে রহমতের বারিধারা বর্ষণ হতে আরম্ভ করে বেলংকার ময়দানে! নিথর হয়ে সবাই শ্রবণ করে রাসূলের শানে সপ্রশংস পঙ্ক্তিমালা। যেন ‘জঠর যদি-বা রহিল অভুক্ত, শ্রবণ হইলো তৃপ্তমধু’।

‘আল্লাহু হাযীরী, আল্লাহু নাযীরি/ আল্লাহু শাহীদী, আল্লাহু মাঈ…’— ফাল্গুনের শিশিরঝরা রাতের শেষ প্রহরে কানে ভেসে আসে রংপুর থেকে আগত মাওলানা হুসাইন আহমদের চিরপরিচিত মধুবর্ষী এই জিকির। মাইক্রোফোন সামনে রেখে মঞ্চে উপবিষ্ট মাওলানা হুসাইন আহমদের সাথে সাথে হাজারো মানুষের হৃদয়োৎসারিত দলিত-মথিত আবেগসমেত ঠোঁট থেকে উচ্চারিত জিকিরের মিলিত আওয়াজ আকাশে-বাতাসে হয় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত!

তাহাজ্জুদ শেষে সুবহে সাদিকের আগে মঞ্চে আসেন সকলের মধ্যমণি— পীর ও মুর্শিদ আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা. বা.— শামিয়ানার নিচে ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জনপদের হাজারো ধর্মপ্রাণ মুসলমানকে নিয়ে হাত ওঠান আরহামুর রাহীমিনের দরবারে। আপন অস্তিত্বকে বিলীন করে দিয়ে আর বিনয়ের পরম শব্দ উচ্চারণ করে করে নিজেকে সঁপে দেন যাল-যালালী ওয়াল ইকরাম সমীপে। অনন্তর রোনাজারি-কান্নাকাটি করে মাবুদের কাছ থেকে গুনাহমাফি নিয়ে আসার অভূতপূর্ব দীর্ঘ মুনাজাত শেষ করেন। এভাবেই চলে যায় তিনটি দিন।

আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দামাত বারাকাতুহুমের নিজ জন্মস্থান কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলাধীন বেলংকা গ্রামে ফি-বছরের মতো এবারও আত্মশুদ্ধির প্রশিক্ষণ হিসেবে তিনদিনের এই ঐতিহাসিক ইসলাহী ইজতেমার আয়োজন করা হয়েছে। করোনা অতিমারি তথা কোভিড-১৯ পরিপ্রেক্ষিতে এ বছর আল্লাহপ্রেমিকদের এ মিলনমেলা শেষ পর্যন্ত হবে কি না— এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা থাকলেও ইসলাহী ইজতেমা ইন্তেজামিয়া কমিটির মুখপাত্র প্রিন্সিপাল মাওলানা সাঈদ নিজামী সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এ বছরের ১২, ১৩ ও ১৪ ফেব্রুয়ারি তথা শুক্র, শনি ও রবিবারে অনুষ্ঠিত হবে তিনদিনের এই ইসলাহী ইজতেমা, ইনশাআল্লাহ। ইজতেমার এ বিশাল আয়োজনের জন্য উদয়াস্ত পরিশ্রম করে যেতে হয় জামি‘আতুল ইসলাহ আল-মাদানিয়া মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষকবৃন্দের। ইজতেমার যথাযথ ইন্তেজাম করতে তাঁদের কর্মতৎপরতা অনেকাংশে বেড়ে যায়।

কিশোরগঞ্জের প্রতিটি উপজেলা ও দেশের অনেক জেলা থেকে প্রচলিত দাওয়াত ও তাবলিগের মতো জামাতবন্দী হয়ে ইজতেমায় শরীক হয় অসংখ্য মানুষ। রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য জায়গা থেকেও আগমন ঘটে দেশবরেণ্য পীর-মাশায়েখ, বযুর্গানে দীন, উলামায়ে কেরাম, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীসহ আওয়াম মানুষের। ইজতেমার ময়দানে আদবে-আমলে সময় কাটে তাঁদের। আত্মশুদ্ধিমূলক তিনটা দিন অনেককে আত্মোপলব্ধিতে তোলে নিয়ে আসে। অত্যাবশ্যক সূরা-কেরাতসমূহ সহীহ-শুদ্ধভাবে শেখা, নামাজের প্রশিক্ষণ, জিকিরের অনুুশীলন তথা উলামায়ে কেরামের মূল্যবান নসিহত শোনে আমলদার মানুষ হওয়ার সবক নেয় আল্লাহ-সন্ধানী উম্মত।

বেলংকা গ্রামে জন্ম আর বেড়ে ওঠার সুবাদে পনেরো-ষোলো বছর আগে শুরু হওয়া ক্ষুদ্র পরিসরের এই ইসলাহী মিলনমেলা কীভাবে আজকের এই বৃহদায়তন রূপ লাভ করেছে তার সাক্ষী আমি নিজেই। ইজতেমার জন্য এখন যে ময়দান করা হয়েছে, শৈশবে দেখেছি জায়গাটি ছিল রাস্তার দু পাশে দুটি জলাশয়। পরবর্তীতে মাটিভরাট করে ৮-১০ ফুট গভীর জায়াগাকে আজকের অবস্থায় নিয়ে আসা হয়েছে।

শহর-নগর, দেশের নানা প্রান্ত ও দূর-দূরান্ত থেকে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে ‘বেলংকা’ জায়গা করে নিয়েছে প্রিয় ও শ্রুতিমধুর এক নাম হিসেবে। সত্যিই স্নিগ্ধ শ্যামলিমার নৈসর্গিক ও নয়নাভিরাম আবহে পুলক আর সঞ্জাত আবেশ জাগিয়ে তোলে এ গ্রামটি। ছায়াঘেরা সবুজের সমারোহ আর ফসলী জমির মোহনীয় রূপ যে-কাউকেই আকৃষ্ট করে বেলংকার মায়া।

ইজতেমা উপলক্ষে বেলংকা ও তৎসংলগ্ন ইছাপশর, বোরগাঁও, হাছলা ও নগরকূল— এ পাঁচটি গ্রামের লোকজনের মাঝে দেখা যায় অন্যরকম এক আবেগ ও উৎসাহ-উদ্দীপনা। উপর্যুক্ত গ্রামসমূহের প্রায় প্রতিটি ঘরে আগমন ঘটে জীবিকার তাগিদে বাইরে থাকা পরিবারের পরিজন, আপনজন, আত্মীয়-স্বজন ও দূরাগত মেহমানদের। তিনদিনের এই ইসলাহী ইজতেমা হয়ে উঠে তাঁদের একত্র হওয়ার অন্যতম উপলক্ষ। এলাকার লোকজন আগ থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকে আগত মেহমানদের আপ্যায়ন ও যত্ন-আত্তির জন্য। অনুষ্ঠেয় ইজতেমার ফাল্গুন মাসের নির্ধারিত তারিখগুলো দৈনিক কয়েকবার তারা হিসাব করে— ইজতেমার আর কয়দিন বাকি আছে।

লেখক : রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী ও সম্পাদক, তাড়াইল পরিক্রমা
auraihan3824@gmail.com

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com