১লা অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

ইসলাহের টানে বেলঙ্কার ইজতেমায়

ইসলাহের টানে বেলঙ্কার ইজতেমায়

মুহাম্মদ সারোয়ার আলম ভূইয়া :: কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইলের অজপাড়া গাঁ বেলংকা। ফুলেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা মোগল আমল থেকে ঐতিহ্য ধরে রাখা একটি বাড়ি। এক পাশে ফুলেশ্বরী নদী অপর পাশে শান বাঁধানো বিশাল পুকুর। বাড়ির পশ্চিম পাশে দৃষ্টি নন্দন দোতলা মসজিদ। একটু সামনে এসেই পুকুরের পাড়ে দাওরায়ে হাদিস মাদরাসা।

১৫/১৬ একরের এ বাড়িটিকে কখনো মনে হয় পুরনো জমিদার বাড়ি বা রাজবাড়ি। ৩/৪ শত বছরের পুরনো ইটগুলোও নতুনভাবে বানানো বাড়িতে ঐতিহ্য হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। খুব কাছ থেকে খুটিয়ে খুটিয়ে দখলাম বাড়িটি।
বাড়ি সংলঙ্গ মাদরাসার মাঠে ১৪তম বার্ষিক ইসলাহী ইজতিমা হচ্ছে এবার। বিশাল প্যান্ডেলে হাজার হাজার মুরিদানের উপস্থিতিতে ইজতিমা শুরু হয়েছে আজ।

বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা কুমিল্লা জেলা শাখার প্রতিনিধি হিসাবে কুমিল্লা থেকে শুক্রবার বাদ মাগরিব রওয়ানা হয়ে ঢাকায় পৌছে রাত্রি যাপন করি।

বাদ ফজর হযরতুল আল্লাম মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ দা.বা- তনয় মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন-এর আহ্বানে হুজুরের বারিধারার ফ্ল্যাটে সকালের নাস্তা করি।

ফ্লোরে বিছানো বড় এক দস্তরখানে দেখতে পাই বিদেশী দুইজন মেহমানকেও। এক জন হলেন, আওলাদে রাসুল সায়্যেদ আফফান মনসুর পুরী। তিনি হলেন ভারতের একটি প্রখ্যাত মাদরাসার শাইখুল হাদীস ও সদরুল মুদাররিসীন।
নাস্তার পর্ব শেষ করে আমরা আওলাদে রাসূলের সফরসঙ্গী হয়ে ইজতিমার উদ্দেশে কিশোরগঞ্জের পথে রওয়ানা হই। বারিধারা থেকে রওয়ানা হওয়া দুটি গাড়িতে জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দরাও ছিলেন।

এই আওলাদে রাসূল একজন জায়্যেদ আলিম ও শাইখুল হাদিসই নন একজন সু বক্তাও। তেলাওয়াত খুবই শানদার। তাড়াইলের জনগণ হযরতের পিছে জুমআর নামাজ আদায় করার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল।

তাড়াইলে পৌঁছেই তিনি জুম’আর খুৎবা দিলেন একটু আকর্ষণীয় বয়ানের মাধ্যমে। আওলাদে রাসূলের বয়ানের আগে আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা উপস্থিত হাজারো মুরিদানদের তিনি ৩ দিন যেভাবে কাটানো উচীৎ, এর উপর দিক নির্দেশনামূলক বয়ান পেশ করেন।

দোয়া ও সালাতুল মাগরিব শেষ করে আমি খলিফায়ে ফিদায়ে মিল্লাত, শাইখুল মাশায়েখ, শাইখুল হাদীস আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা. এর বাড়িতে হযরতের সাথে দেখা করতে যাই। সাক্ষাতে হুজুর আন্তরিকতার সাথে হালপুরসি করলেন। বাড়ির ভেতর হুজুরের আরো এক ভাইয়ের সাথে কুশল বিনিময় করি। হুজুরদের ১১ ভাই, চার বোনের সু শিক্ষিত এক বড় পরিবার। দুই ভাই এ দেশের বড় আলেমে দ্বীন। ছোট এক ভাই খুবই সজ্জন স্বভাবের। তিনি মোগল বাদশাদের আমল থেকে তাদের পরিবারের ঐতিহ্যগত ফিরিস্তি তুলে ধরলেন।

চোখ তুলে তাকালাম পুরো বাড়ির আঙিনায়। অজস্র বৃক্ষরাজির মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। পুকুরের পানি কমে যাওয়ায় ইসলাহী ইজতিমায় আসা মুসল্লিরা সেই পুকুরের গহ্বরে নেমে রান্নার কাজ সেরে নিচ্ছেন। ধোয়া ও পানি নিষ্কাশনের সুবিধার কথা বিবেচনা করেই গ্রাম্য ধর্মপ্রাণদের এ পদ্ধতিগ্রহণ। পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটগুলো যেন রন্ধনশালা। গ্যাসের চুলা আর গ্যাস বোতলে ভরে গেছে পুকুরপাড়া।

সুবিশাল প্যান্ডেলে গাঁও গেরামের সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমান রাতের খাবারের রান্না সম্পন্ন করে শেষ বারের মতো প্রবেশ করছে। দেখতে মনে হচ্ছে যেন একটুকরো টঙ্গি ইজতিমা। ইজতিমায় আগত মুসল্লিদের যাতায়াত বেড়েই চলেছে। ইজতিমায় কোনপ্রকার বিশৃঙ্খলা যাতে সৃষ্টি না হয় পুলিশ বাহিনী নিরবচ্ছিন্নভাবে ডিউটি করে যাচ্ছেন।

বিভিন্ন জেলা থেকে আল্লামা মাসঊদ-এর আগত মুরিদানরা মাদরাসা ভবনের প্রায় পুরোটাই দখল করে নিয়েছেন। পুরো দাওরায়ে হাদিস মাদরাসার সবছাত্ররাই বিভিন্ন প্রকার খিদমত আন্জাম দিয়ে যাচ্ছে একদল নিবেদিত প্রাণকর্মীর মতো। মাঠের এক কোনায় দেখলাম একটি গরু নামানো হচ্ছে পিকআপ থেকে। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম, এ এলাকার এমপি সাহেব গরুটি পাঠিয়েছেন ইজতিমায় বিভিন্ন জেলা থেকে আগত মেহমানদের আপ্যায়নের জন্য।

মাদরাসায় প্রতিটি কক্ষে জমিয়তে উলামার দায়িত্বশীলদেরও দেখতে পেলাম। একসময়ে কওমী ছাত্রদের প্রশিক্ষণমূলক সংগঠন “লাজনাতুত তালাবার” কিছু পুরনো সাথীরও সাক্ষাৎ পেলাম। গল্প- স্মৃতি চারণে মনটা ভরে গেল। যেন একটা মিলনমেলা।

সালাতুল ঈশা আদায়ের জন্য মাঠে গেলাম। আশপাশ ঘুরে দেখি এলাকাসীর মধ্যে এক উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছে। দোকান পাটে বেচা-কেনার ধুম। ইজতিমার মাইকের আওয়াজ দোকান পাটেও পৌছার কারণে কিছু লোক দোকানেই বসে ওয়াজ শুনছে।
বাহ। আনন্দ জাগানিয়া এক ইসলাহী ইজতিমায় কাটছে একটা দারুণ মুহূর্ত…।

লেখক : আহ্বায়ক, বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা কুমিল্লা জেলা

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com