২৭শে নভেম্বর, ২০২০ ইং , ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

উপনির্বাচনে দলীয় কোন্দলে ভোটার উপস্থিতি তলানিতে

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : জাতীয় সংসদের উপনির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি তলানিতে ঠেকেছে। রাজধানীর দুই আসনে সর্বোচ্চ ভোট পড়েছে ১৪ শতাংশের একটু বেশি। সম্প্রতি পাঁচটি আসনের উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয় পেলেও একটি আসন ছাড়া অন্যগুলোয় ভোটার উপস্থিতি নিয়ে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে হতাশা রয়েছে। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা মনে করছেন, ভোটার উপস্থিতি এত কম হওয়ার পেছনে বড় কারণ দলীয় তীব্র কোন্দল। যে আসনে কোন্দল যত বেশি সে আসনে ভোটার উপস্থিতির হারও তত কম।

আওয়ামী লীগের সূত্রগুলো জানায়, উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ শেষে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা ভোটের সার্বিক মূল্যায়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে অবহিত করেছেন। সেখানে অন্যান্য কারণের পাশাপাশি দলীয় কোন্দল এবং প্রার্থীদের ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা জানান, ভোট নিয়ে আওয়ামী লীগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতারা একটি বিশ্লেষণ কেন্দ্রীয় সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে জানিয়েছেন। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ বরাবরই রাজনৈতিকভাবে এগিয়ে থাকতে নানা তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ, গবেষণা করে থাকে। সে উদ্দেশ্যেও উপনির্বাচনের ফলাফল বিশ্লেষণ করা হয়েছে। বিশ্লেষণে ভোটার উপস্থিতি কমের বিষয়টিও এসেছে। সেখানে অন্য কারণের পাশাপাশি দলীয় তীব্র কোন্দল ভোটার উপস্থিতি কম হওয়ার কারণ হিসেবে এসেছে। যে আসনে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করেছেন, ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটকেন্দ্রে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন, সেখানে আশানুরূপ ভোট পড়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফর উল্যাহ বলেন, ‘উপনির্বাচনে ভোটারদের আগ্রহ এমনিতেই কম থাকে। সে ক্ষেত্রে যেখানে আমাদের দলীয় অবস্থান অনেক ভালো, প্রার্থী বাড়ি বাড়ি গেছেন, সেখানে কিন্তু ভোটার উপস্থিতি ভালো হয়েছে। সিরাজগঞ্জ-১ আসনে ৫২ শতাংশ ভোট পড়েছে। কারণ সেখানে আমাদের প্রার্থীর শক্তিশালী অবস্থান রয়েছে।’

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘আওয়ামী লীগ একটি আধুনিক দল। আমরা বরাবরই তৃণমূল থেকে নানা তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের মাধ্যমে বিশ্লেষণ ও গবেষণা করে থাকি। উপনির্বাচনও তার ব্যতিক্রম নয়। নানা কারণেই উপনির্বাচনে ভোট কম পড়েছে। এর মধ্যে আমাদের সাংগঠনিক বিষয় ও এলাকায় প্রার্থীদের অবস্থানও রয়েছে। সিরাজগঞ্জ-১ আসনে আমাদের প্রার্থীর পারিবারিকভাবেই শক্ত অবস্থান রয়েছে। তিনি নিজেও এমপি ছিলেন এবং বিনয়ী ও ভদ্র মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁকে ভোট দিতে বিপুলসংখ্যক ভোটার কেন্দ্রে গেছেন। আবার কয়েকটি আসনের প্রার্থীরা প্রথমবারের মতো ভোট করেছেন। ফলে তাঁদের সঙ্গে অনেক ভোটারের এখনো যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি। এই প্রার্থীরা আগামী দিনে তাঁদের কাজের মধ্য দিয়ে ভোটারদের মাঝে অবস্থান গড়ে তুলবেন।’

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের একজন সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যতই মানুষের ভোটে আগ্রহ কম থাকুক, আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর থানা, ওয়ার্ড, ইউনিট কমিটিতে যত নেতাকর্মী আছেন, শুধু তাঁরা নিজেরা পরিবারসহ ভোটকেন্দ্রে গেলেই তো ২০ শতাংশ ভোট পড়ার কথা। ঢাকায় এত কম ভোটার উপস্থিতির মূল কারণ আমাদের অনৈক্য।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদের ৫ আসনের উপনির্বাচনে ঢাকা-১৮ আসনে ৫৬ জন, ঢাকা-৫ আসনে ২০ জন, পাবনা-৪ আসনে ২৮ জন, নওগাঁ-৬ আসনে ৩৪ জন, সিরাজগঞ্জ-১ আসনে তিনজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।

গত ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা-১৮ আসনের উপনির্বাচনে মোট ভোটার ছিল পাঁচ লাখ ৭৭ হাজার ১৮৮। আসনটিতে ১৪.১৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হাবিব হাসান পেয়েছেন ৭৫ হাজার ৮২০ ভোট। অথচ আসনটিতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন ৫৬ জন। এঁরা প্রত্যেকে দুই থেকে তিন হাজার করে ভোটার কেন্দ্রে নিয়ে এলেও দেড় থেকে দুই লাখ ভোটার উপস্থিত হওয়ার কথা। কিন্তু ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের স্থানীয় অনেক নেতাকে তৎপর দেখা যায়নি।

ঢাকা-৫ আসনের উপনির্বাচনে মোট ভোটার ছিল প্রায় পৌনে পাঁচ লাখ। এর মধ্যে মাত্র ১০.৪৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পান ৪২ হাজার ৭১৬ ভোট। আসনটিতে আওয়ামী লীগের ২০ জন মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। আসনটিতে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের মধ্যে তীব্র দলীয় কোন্দল রয়েছে। বেশির ভাগ নেতাই ভোটের মাঠে নামেননি। ফলে উপনির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়েছে ঢাকা-৫ আসনে।

গত ১৭ অক্টোবর নওগাঁ-৬ আসনে ভোটগ্রহণ হয়। আসনটিতে মোট ভোটার ছিলেন তিন লাখ ছয় হাজার ৭২৫ জন। এর মধ্যে ৩৬.৪৯ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। নৌকার প্রার্থী এক লাখ পাঁচ হাজার ৫২১ ভোট পেয়ে জয়ী হন।

পাবনা-৪ আসনে মোট ভোটার ছিলেন তিন লাখ ৮২ হাজার। আসনটিতে ৬৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। এর মধ্যে নৌকার প্রার্থী পান দুই লাখ ৩৯ হাজার ৯২৪ ভোট। এই আসনে আওয়ামী লীগের দলীয় কোন্দল তীব্র ছিল। তবে ভোটের কিছুদিন আগে আসনটিতে কোন্দল মিটিয়ে নৌকাকে বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় একজন সাংগঠনিক সম্পাদককে পাঠানো হয়। তিনি সেখানে কিছুদিন অবস্থান করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মাঠে নামান। ফলে আসনটিতে ভোটার উপস্থিতি আশানুরূপ হয়।

সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ৪৫ হাজার ৬০৩ জন। প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী তানভীর শাকিল জয় পান এক লাখ ৮৮ হাজার ৩২৫ ভোটে। সম্প্রতি পাঁচটি আসনের উপনির্বাচনে সিরাজগঞ্জ-১ আসনেই আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন ফরম সবচেয়ে কম বিক্রি হয়। আসনটিতে মাত্র তিনজন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন। এর মধ্যে প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা মোহাম্মদ নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয়কে প্রার্থী করে আওয়ামী লীগ। মনোনয়ন পাওয়ার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে জয়ের পক্ষে মাঠে নামেন। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আন্তরিক ও ঐক্যবদ্ধ চেষ্টার ফলেই বিপুলসংখ্যক ভোটার ভোটকেন্দ্রে আসেন বলে মনে করছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতারা।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com