২৭শে নভেম্বর, ২০২০ ইং , ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

উম্মাহর অধপতন-কারণ ও প্রতিকার | মাওলানা সাদ কান্ধলবী

মাওলানা সাদ কান্ধলবী দা.বা.। তাবলীগ জামাতের অন্যতম প্রধান মুরব্বী। হযরতজী ইলিয়াস র.এর বংশের চতুর্থ এ পুরুষ প্রতি বছরই বিশ্ব ইজতেমায় গুরুত্বর্পুণ বয়ান পেশ করেন। তার বক্তব্যের প্রতিটি কথা খুবই বাস্তব ও সময়োপযোগী হয়ে থাকে। মুসলিম উম্মাহর ক্রমাগত অবনতি ও এ সংকট উত্তরনে তার সুচিন্তিত কথাগুলো বেশ গুরুত্বের দাবী রাখে। বিশ্ব ইজতেমা ২০১৭ এর দ্বিতীয় পর্বের তার বয়ানটির অনুলিখন পেশ করা হলো। উর্দূ থেকে ভাষান্তর করেছেন মোহাম্মদ জিন্নুরাইন। পরিমার্জন ও গ্রন্থনা করেছেন তানজিল আমির- বিভাগী সম্পাদক

মেরে মোহতারাম দোস্ত বুযুর্গ আওর আযিযো! এ বিষয়ে আমাদের সকলের এখন সর্বাধিক চিন্তা-ভাবনা করা প্রয়োজন যে, দুনিয়াতে দ্বীনের ব্যাপক প্রচার প্রসার থাকা সত্বেও এতো উদাসীনতা কেন? জেহালত কেন বৃদ্ধি পাচ্ছে? ইলমের এতো চর্চা থাকা সত্ত্বেও মানুষ কেন নৈরাশ হয়ে যাচ্ছে! কেন আমলের উপর চলতে পারছে না সবাই! হালাল হারামের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন তা মানতে পারি না? দ্বীনের মধ্যে মোয়ামালাত-মোয়াসারাত তথা লেনদেন ইত্যাদির ঘাটতি দেখা দিচ্ছে কেন? মানুষের মধ্য থেকে দীনের এস্তেকামাত কেন বের হয়ে যাচ্ছে! যা দ্বীনকে দ্রুত বদলে দিচ্ছে! হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ. বলেন, শরীর থেকে কাপড় খোলা বা বদলে দেয়ার মতো দ্বীনকেও মানুষ বদলে দিচ্ছে। কুফুরি ইরতেদাদ দ্রুত দ্বীনকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এর কারণ কী? আগে কারণ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের।

দ্বিতীয় প্রশ্ন এই যে, উম্মতের ইরতিদাদ তথা ধর্মান্তরিত হওয়া এতটাই সহজ হয়ে গেছে কেন? হযরতজী মাওলানা ইলিয়াস রহ. বলতেন, শরীর থেকে কাপড় খোলা বা বদলে দেয়ার মতো দ্বীনকেও মানুষ বদলে দিচ্ছে। কুফুরি ইরতেদাদ দ্রুত দ্বীনকে পরিবর্তন করে দিচ্ছে। এর কারণ কী? আগে কারণ খুঁজে বের করতে হবে আমাদের। আমি যে প্রশ্নগুলো করলাম, এর সারকথা হলো, মুসলমানের নিজ ধর্মে দৃঢ়তা ও সুরক্ষা কেনো নেই?

তার কারণ শুধু এটিই যে, মানুষকে আল্লাহ তা’আলা যে যোগ্যতাগুলো দান করেছেন। একজন মানুষের জীবন, সম্পদ, জ্ঞান ও ইলমের যে বিপুল যোগ্যতা রয়েছে । এ সব যোগ্যতা যদি দুনিয়াবী সব কিছু বাদ দিয়ে শুধু আল্লাহর জন্যই উৎসর্গিত ও ব্যয় না হয় তাহলে অন্তরে স্বীয় দ্বীনের ব্যাপারে স্বভাবজাত মহব্বত সৃষ্টি হবে না। এটাই মানুষের সৃষ্টিগত চরিত্র। যে জিনিসের উপর মানুষের জান-মাল খরচ হয়, ওই জিনিসের প্রতিই মানুষের স্বভাবজাত মহাব্বত সৃষ্টি হয়। আর যে জিনিসের সাথে মানুষের স্বভাবজাত মহব্বত সৃষ্টি হয় তার অনিষ্ঠতা ও ক্ষয়ক্ষতি সহ্য হয়না। দোকানদারের দোকানের লোকসান, জমিনওয়ালার জমিনের ক্ষয় ক্ষতি, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতা হারানো, মালদারের সম্পদের লোকসান শুধু এইকারণে সহ্য হয় না যে, এসব জিনিসের উন্নতির জন্য সবকিছু ব্যায় করা হয়েছে। এ কারণেই ওই জিনিসের সাথে তার ফিতরি তথা স্বভাবজাত ভালোবাসা সৃষ্টি হয়েছে।

তেমনীভাবে একজন মুসলমান নিজের জান, মাল, সময় এবং তার সব কিছু যদি দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যয় না করে, তাহলে দ্বীনের প্রতি তার স্বভাবজাত ভালোবাসা বাকি থাকবে না। আর স্বভাবজাত ভালোবাসা যদি না থাকে, তবে নিজের সত্ত্বা থেকে নিয়ে পৃথিবীর শেষপ্রান্তে অবস্থানরত মুসলমানের বেদ্বীনি হবার অনুভূতি বা চিন্তা হবে না। নিজের ঈমানকে বাঁচানোর কোনো ফিকির বা চেষ্টাও তার থাকবেনা। মানুষের ধর্মান্তরিত হওয়া তার মাঝে কোন ব্যাথা সৃষ্টি করবেনা। কারণ দীনের প্রতি তার স্বভাবজাত ভালোবাসাই তৈরি হয়নি। তাই দীনের বড় কোন ক্ষতিও তার কাছে কিছু মনে হবে না।

মেরে দোস্ত বুযুর্গ! যতদিন পর্যন্ত মুসলমান দ্বীনের দাওয়াতের উপর ছিলো, ইসলামে শুধু প্রবেশেরই রাস্তা ছিলো। বের হবার কোনো রাস্তা ছিলো না। দাওয়াতের ব্যাপকতা দ্বীনের মধ্যে এমন পূর্ণতা এনে দিয়েছিলো, যা কোরআনে পরিষ্কার বর্ণিত আছে “ওয়ামান আহসানু কাওলাম মিম্মান দাআ ইলাল্লাহ ” উলামায়ে কিয়াম বলেছেন যে এর দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, তার থেকে পূর্ণ দ্বীন এবং মাযহাব কার হতে পারে যে নিজের আমলের পাশাপাশি অপরকে ওই আমলের দিকে দাওয়াত দিতে থাকে। তারপর বলা হয়েছে ইন্নানি মিনাল মুসলিমিন। যে এমন ব্যাক্তি সর্বদিক থেকে বাতিলের আগমনী রাস্তাকে এবং লোভলালসাকে এমনভাবে ছুড়ে ফেলবে, যেভাবে সাহাবায়ে কিরামগণ দাওয়াতের ফরজ কাজকে আঞ্জাম দেওয়ার সময় বড় বড় হুকুমত ও রাষ্ট্রসমূহকে এবং বড় বড় বাদশাদেরকে এমন কঠিনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন যে, দ্বীনবিরোধীরা তদ্দ্বারা বুঝে নিয়েছিলো যে, তাদের নিকট শুধু দ্বীনই প্রিয়। এই দ্বীনের বিপরীতে তারা নিজেদের জানমাল সন্তানসন্ততির, যে কোনো প্রকার ক্ষয়ক্ষতিকে, যে কোনো প্রকারের দুনিয়াবি লালসাকে কিছুই মনে করতেন না।

ijtema04আব্দুল্লাহ ইবনে হুজায়ফা রা. জামা’আতের সাথে রোমে অবস্থানরত ছিলেন। রোমের বাদশা তাকে বন্দী করালো। তাঁর সামনে খ্রিষ্টান ধর্মকে পেশ করলে তিনি খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণে অস্বীকৃতি জানালেন। বাদশা বললো, তুমি এ ধর্ম কবুল করো, আমি তোমাকে আমার বাদশাহীর অর্ধেক প্রদান করবো। এই সমস্ত ঘটনাবলী শুধু সাহাবাদের পরিচিতি বর্ণনা করার জন্য নয়। বরং এই সকল ঘটনাবলী উম্মতের প্রতিটি ব্যাক্তিকে এই কথা শিক্ষা দেওয়ার জন্য যে, যদি উম্মত নিজেদের ফরযে মানসাবী দাওয়াত ইলাল্লাহ এর দিকে ফিরে আসে তবে আজও মুসলমান নিজেদের ধর্মের মোকাবেলায় সমস্ত দুনিয়ার রাজত্ব, ধনসম্পদ, পদমর্যাদা, দুনিয়ার সকল জিনিসকে, ভয়ভীতির স্থানকে এরূপ তুচ্ছতাচ্ছিল্ল করবে যে, যেমন সাহাবায়ে কিরাম স্বীয় জামানার মধ্যে এই সকল জিনিসকে কোন পরওয়াই করেননি। আব্দুল্লাহ ইবনে হুজায়ফা রা. বললেন, শুধু এতটুকু নয়, বরং আরবের সকল বাদশাহির সাথে তোমার পূর্ণ রাজত্বকেও মিলিয়ে যদি আমার সামনে এনে দাও, তাহলে আমি মহানবীর দ্বীন তো দূরের কথা, দ্বীনের একটি আমলকেও ছাড়তে রাজি নই । বাদশা এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলো যে, উক্ত সাহাবীকে মালের লোভ দেখিয়ে কখনই দ্বীন থেকে সরানো যাবে না। বাদশা এবার বললো, হয়তো তুমি খ্রিষ্টান হয়ে যাও, নতুবা আমি তোমাকে কতল করবো। তিনি বললেন, তোমার যা ইচ্ছা করো, কিন্তু আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দ্বীনকে সামান্য সময়ের জন্যও ছাড়তে প্রস্তুত নই।

মেরে মোহতারাম দোস্ত! এই উম্মত নিজের দ্বীনের ফরযে মানসাবীর উপর অটল ছিলো। উম্মত দায়ী ছিলো । বিপরীতে সমস্ত মানুষ, সমস্ত বাতিলশক্তি মাদউ তথা দাওয়াত গ্রহণকারী ছিলো। হযরতজি বলতেন, উম্মত দুই অবস্থা থেকে কখনো মুক্ত নয়। হয়তো দায়ী তথা দাওয়াত প্রদানকারী হবে নতুবা অপরের দাওয়াত গ্রহণকারী হবে। যদি উম্মত দায়ী হয় তবে, বাতিলের দাওয়াতের ঊর্ধ্বে ও বাতিলের দাওয়াতের উপর প্রভাববিস্তারকারী হবে। আর যদি এই দাওয়াতকে ছেড়ে দেয়, তবে বাতিলের দাওয়াতের দ্বারা পরাজিত ও প্রভাবিত হয়ে যাবে।

আমি অত্যন্ত সতর্ক করে এ কথাটিই আপনাদের সামনে আরজ করছি যে, সাহাবায়ে কিরামগণের সাথে সকল প্রকার গায়েবী নুসরতের যে সমস্ত ঘটনা ঘটেছে, মুসলমানের স্বীয় দ্বীনের উপর দৃঢ়তা এবং বাতিলের মোকাবেলায় মুসলমানদের জয়ী হওয়ার বুনিয়াদী শর্ত ছিলো দাওয়াত ইলাল্লহ। সে দাওয়াত ইলাল্লাহ আজ মুসলমান ছেড়ে বসেছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com