৭ই জুলাই, ২০২০ ইং , ২৩শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

একজন বাঘা কলম সৈনিকের বিদায়

একজন বাঘা কলম সৈনিকের বিদায়

মাওলানা আমিনুল ইসলাম ❑ এক ফ্রেমে বন্দী চারজন বাঘা কলম সৈনিক। কেউ কারো থেকে কম নয়। এরকম চারজন কলম মুজাহিদ এক সঙ্গে গড়ে উঠা এবং কলমী ময়দান দখল করার গল্প বুঝি আর করা যাবেনা। কেননা, একে একে বিদায় নিচ্ছেন সকলে।

আমার দেখা চারজনই এ যুগের শ্রেষ্ঠ লেখক। যাদের অধ্যবসায় কওমী অঙ্গনে এক নতুন দিগন্ত শুরু হয়েছে। অসাধ্যকে সাধন করেছে তারাই।

যে কওমী অঙ্গনে বাংলা ভাষা চর্চা কল্পনা করা যেতনা। বাংলায় পর্চা লেখা, বাংলা ভাষায় ছাত্রদের পাঠদান, বাংলা দেয়ালিকা, বাংলা ম্যাগাজিন, এগুলো স্বপ্নের মত ছিল। কিন্তু এই চার নক্ষত্রের প্রচেষ্টা, আর পিছন থেকে আগলে ধরেছিলেন, আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসউদ। রাহবারী করতেন আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহ. ও আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী।

তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রমে কওমী মাদ্রাসাগুলো আশার আলো জাগিয়ে তুলেছিল। এক নতুন আন্দোলন, যেটা মাতৃভাষা শিক্ষার আন্দোলন। সে আন্দোলনে তাঁরা ছিলেন সফল। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া তাদের সে আন্দোলনের সুফল ভোগ করছেন।

১৯৭৮ সনে ফরীদাবাদ মাদ্রাসা থেকে চার বন্ধুর এক সঙ্গে যাত্রা। লাজনাতুত তলাবার মিশন তখন থেকে। তারাই শেষ পর্যন্ত এই কওমী অঙ্গন কে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে ছিলেন। চার জন সেই মহান কারিগর। চার কলম মুজাহিদের কলমের খোঁচায় এজাতি যে কত উপকৃত হয়েছে, তাঁর ইয়ত্তা নেই।

এক. আল্লামা ইসহাক ফরিদী রহ.। প্রতিভাবান এক লেখক। বহু গ্রন্থ প্রণেতা। যার ধ্যান- জ্ঞান ছিল লেখা আর লেখা। ঢাকা চৌধুরীপাড়া মাদ্রাসার মুহতামিম ছিলেন। তিনি ইন্তেকাল করেছেন অনেক আগে।

দুই. আল্লামা আবুল ফাতাহ মোহাম্মাদ ইয়াহইয়া রহ.। আরেক কলম সৈনিক। যার অসম্ভব মেধার লিখনীতে জাতি অনেক উপকৃত হয়েছে। বিশেষ করে কওমীর ছাত্ররা তাঁকে বারবার স্মরণ করে। কওমী মাদ্রাসার সিলেবাসে তাঁর লিখনী। এমনি ভাবে জাতির উদ্দেশ্য তাঁর লিখনী অপরিসীম। তিনি ঢাকা মালিবাগ মাদ্রাসার মুহাদ্দিস ছিলেন।

তিন. মাওলানা আবু সুফিয়ান যাকী, যিনি রোববার (২৪ মে) ইন্তেকাল করলেন। একজন প্রতিভাবান কলম মুজাহিদ। কওমী অঙ্গনের সকলের কাছে অতিপরিচিত। যার অবদান চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। তিনি ঢাকাস্থ আওলাদ হোসেন মার্কেট মাদ্রাসার মোহতামিম ছিলেন।

চার. মাওলানা মুশতাক আহমাদ। আরেক কলম সৈনিক। যেভাবে কলম চলে, তেমনী চলে তাঁর যবান। বর্তমান কওমীর এক উজ্জল নক্ষত্র। আবার ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডেপুটি ডাইরেক্টর। বহু গ্রন্থ প্রণেতা। অনুবাদক। একজন গবেষক।

এই চার মহারথীর একজন শুধু জীবিত আছেন।তিনি ড. মুশতাক আহমাদ। আর বাকি তিনজন মহান প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন। তবে আজকে যিনি চলে গেলেন, কওমী অঙ্গনের অপুরনীয় ক্ষতি হল। আবু সুফিয়ান যাকী সাহেবের উর্দু-বাংলা অভিধান, যেটা কওমীর লক্ষ লক্ষ ছাত্রের হাতে। কত যে উপকৃত হয়েছে ছাত্ররা তার হিসাব নেই।

আমরা কওমী মাদ্রাসার ছাত্ররা ‘ফিরুজুল লুগাত’ এর উপর ভরসা করে বসে থাকতাম। সেটা উর্দু থেকে উর্দু। ছাত্ররা হিমশিম খেত। ভাল ভাবে বুঝতে সক্ষম ছিলনা।

আবু সুফিয়ান যাকী সাহেব ‘ফরহাঙ্গে জাদীদ’ নামে উর্দু-বাংলা অভিধান ছাত্রদের তুলে দিলে, ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছিল। যেটা বড় ছওয়াবের ভাগী হবেন আবু সুফিয়ান সাহেব। এমনি ভাবে তাঁর আরো বহু লিখনী। একজন সফল অনুবাদক। প্রবন্ধকার। গ্রন্হ প্রণেতা। মোটকথা, লেখালেখির জগতে তিনি অতি উজ্জল ছিলেন।

তিনি রোববার চলে গেলেন। ৩০ রমজান। নাজাতের শেষ দশকের শেষ দিন। আমরা আশাবাদী, আল্লাহ তাঁকে ক্ষমা করে জান্নাতুল ফিরদাউস নসীব করেন। আমিন।

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com