৫ই জুলাই, ২০২০ ইং , ২১শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

একটি লাল রঙের খেলনা গাড়ি এবং…

একটি লাল রঙের খেলনা গাড়ি এবং…

সাখাওয়াত রাহাত :: সাদেক সাহেব একটি বড় মার্কেটে কেনাকাটা করতে এসেছেন। এ দোকান থেকে ও দোকান ঘুরে পসন্দের জিনিস কিনছেন। হঠাৎ একটি খেলনার দোকানে তার দৃষ্টি আটকে গেল। তিনি দেখলেন- পাঁচ ছয় বছরের একটি ছেলে দোকানীর সঙ্গে কথা বলছিল। ছেলেটির হাতে লাল রঙের একটি সুন্দর ‘খেলনা গাড়ি’ যা দোকানী কেড়ে নিতে চাচ্ছে!

তিনি কৌতুহলবশত দোকানে গিয়ে দেখলেন- দোকানী ছেলেটিকে বলছে, ‘আমি দুঃখিত, এই গাড়িটি কেনার মতো অর্থ তোমার কাছে নেই। তুমি কমদামি কোনো গাড়ি দেখো।’ তখন ছোট ছেলেটি সাদেক সাহেবের দিকে ফিরে তার কাছে থাকা টাকাগুলো দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করল: চাচ্চু! দেখুন তো আমার কাছে খেলনাটি কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা আছে কিনা?

সাদেক সাহেব তার নগদ টাকা গণনা করে জবাব দিলেন: চাচ্চু! সত্যিই গাড়িটি কেনার মতো পর্যাপ্ত টাকা তোমার কাছে নেই‌। ছোট্ট ছেলেটি তখনও গাড়িটি হাতে ধরেছিল!

সাদেক সাহেব তার কাছে গিয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলেন- এই খেলনাটি তুমি কেন দিতে চাও? তুমি কি এটি কাউকে দেবে?

ছেলেটি বললো- আমার ছোটভাই লাল রঙের গাড়ি খুব পসন্দ করে। আমি তাকে একটি লাল রঙের গাড়ি উপহার দিতে চেয়েছিলাম।

আমাকে গাড়িটি আমার মায়ের কাছে দিতে হবে, যাতে তিনি সেখানে যাওয়ার সময় আমার ভাইকে এটি দিতে পারেন। একথা বলার সময় তাঁর চেহারা মলিন হয়ে গেল। চোখ থেকে বিন্দু বিন্দু অশ্রু ঝরতে লাগল।

আমার বোন আল্লাহর সঙ্গে থাকতে গেছে .. বাবা বলেছেন- আমার মা খুব শিগগিরই আল্লাহকে দেখতে পাবেন! তাই আমি ভেবেছিলাম- মা চলে যাওয়ার আগেই গাড়িটি তাঁর কাছে দিয়ে দেব। যেন তিনি আমার ভাইকে গাড়িটি পৌঁছে দিতে পারেন..!

কথাগুলো শুনে সাদেক সাহেব চমকে ওঠলেন। তাঁর ভেতরটা মোচড় দিয়ে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।

ছেলেটি আবার বলতে লাগলো- আমি বাবাকে বলে এসেছি, মাকে এখন যেতে না দিতে। আমি মার্কেট থেকে ফিরে না আসা পর্যন্ত মা যেন অপেক্ষা করেন।

তারপর ছেলেটি পকেট থেকে তার ছোট ভাইয়ের একটি হাস্যোজ্জ্বল ছবি সাদেক সাহেবকে দেখালো। এরপর বললো- আমি আমার মায়ের সঙ্গে একটি ছবি তুলতে চাই; যাতে আমার ভাই আমাকে ভুলে না যায়। আমি আমার মাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমি চাই মা যেন আমাকে ছেড়ে চলে না যান। কিন্তু বাবা বলেছিলেন- তাকে আমার ছোট ভাইয়ের সঙ্গে থাকতে হবে। তারপরে সে আবার মলিন চোখে গাড়িটির দিকে তাকাল। খুব নিঃশব্দে..!

সাদেক সাহেব ছেলেটির অগোচরে মানিব্যাগ থেকে কিছু টাকা বের করে বললেন- চলো! আমরা আবার হিসেব করে দেখি, গাড়িটি কেনার জন্য তোমার কাছে পর্যাপ্ত টাকা আছে কিনা?

ছেলেটি বলল- ঠিকাছে। আশা করি গাড়িটি আমি কিনতে পারব। হিসেব করে দেখা গেল- গাড়ি কেনার পরেও কিছু টাকা অবশিষ্ট থাকবে!

ছেলেটি আল্লাহর শোকর আদায় করে বলল: হে আল্লাহ! আমাকে যথেষ্ট টাকা দেওয়ার জন্য তোমার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আলহামদুলিল্লাহ..

এরপর সে সাদেক সাহেবের দিকে তাকিয়ে বলল: আমি গতরাতে আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম- তিনি যেন গাড়িটি কেনার মতো টাকার ব্যবস্থা করে দেন, যাতে আমি মায়ের মাধ্যমে আমার ছোটভাইয়ের কাছে এটি পাঠাতে পারি। তিনি আমার দোয়া কবুল করেছেন!

আমি আমার মায়ের জন্য একটি সাদা গোলাপ কেনার টাকাও চাইব ভেবেছিলাম, কিন্তু আল্লাহর কাছে বেশি চাওয়ার সাহস করিনি। তবে চাওয়া ছাড়াই তিনি আমাকে গাড়ি এবং সাদা গোলাপ উভয়টি কেনার টাকা দিয়েছেন আলহামদুলিল্লাহ। আমার মা সাদা গোলাপ খুব পসন্দ করেন।

সাদেক সাহেব কেনাকাটার শুরুটা যেভাবে করেছিলেন শেষটা করলেন একেবারেই আলাদা! তিনি একটি মুহূর্তের জন্যও ছেলেটিকে মন থেকে বের করতে পারছিলেন না!

হঠাৎ দু’দিন আগে পড়া সংবাদপত্রের একটি নিবন্ধের কথা তাঁর মনে পড়লো! নিবন্ধটিতে এক মাতাল ট্রাকড্রাইভারের কথা লেখা হয়েছিল, যে একজন অল্পবয়স্কা মহিলা এবং একটি ছোট্ট ছেলেকে নিয়ে ছুটে চলা গাড়িতে আঘাত করেছিল। ছোট্ট ছেলেটি ঘটনাস্থলেই মারা গিয়েছিল। আর মাকে গুরুতর অবস্থায় হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়েছিল। ওই পরিবারটাই কি তবে এই ছেলের পরিবারের ছিল?

ছেলেটির সঙ্গে এই সাক্ষাতের দুদিন পর, সাদেক সাহেব খবরের কাগজে দেখতে পেলেন- ওই অল্পবয়সী মহিলা মারা গেছেন..! তিনি এতে খুব মর্মাহত হলেন। বারবার তার সেই ছেলেটির কথা মনে পড়ছিল। তার কথা ভেবে খারাপ লাগছিল। তিনি ওজু করে তার মায়ের জানাজার উদ্দেশ্য বের হলেন।

জানাজা ও দাফন শেষে তিনি ওদের বাড়িতে গেলেন। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন- ছেলেটি মায়ের খাটের পাশে একটি সুন্দর সাদা গোলাপ, লাল রঙের সেই গাড়ি এবং তার সঙ্গে তোলা তার মায়ের একটি ছবি বুকে জড়িয়ে প্রায় অচেতন অবস্থায় হাঁটু গেড়ে বসে আছে। এই ভারী পরিবেশে তিনি বেশিক্ষণ থাকতে পারলেন না। চোখের পানি মুছতে মুছতে বের হয়ে এলেন। তার কাছে মনে হচ্ছিল- তার জীবনটা চিরদিনের জন্য বদলে গেছে..!

মা এবং ছোট ভাইয়ের প্রতি ছেলেটির যে অকৃত্রিম ভালোবাসা ছিল তা কল্পনা করা কঠিন। সে হয়তো তাদের দুজনকে নিয়ে কতো কতো স্বপ্ন দেখেছিল। অথচ এক সেকেন্ডেরও কম সময়ে এক মাতাল চালক তার কাছ থেকে এই সমস্ত কিছু কেড়ে নিয়ে গিয়েছিল।

#একটি দুর্ঘটনা সারাজীবনের কান্না। ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এ যন্ত্রনা ভুলতে পারে না। তাই দ্রুতগতি বা চোখে ঘুম নিয়ে গাড়ি চালাবেন না। আর মাতাল হয়ে চালানোর তো প্রশ্নই আসে না। কারণ ইসলামে মদ্যপান সম্পূর্ণ হারাম।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের জন্য যেসব জিনিস নিষিদ্ধ করেছেন সেগুলো থেকে পুরোপুরি বিরত থাকার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। বিতাওফিকিল্লাহি তায়ালা..।
লেখক : আলেম তরুণ

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com