২০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ৪ঠা কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২রা রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

একটি সরকারি অনুদান ও উসুলে হাশতেগানা পর্যালোচনা | মুস্তাকিম বিল্লাহ

একটি সরকারি অনুদান ও উসুলে হাশতেগানা পর্যালোচনা। মুস্তাকিম বিল্লাহ

দৈনিক ১৬/১৭ ঘন্টার অধিক সময় ডিউটি পালন করতে হয় একজন মাদ্রাসা শিক্ষকের। যেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা কিংবা প্রাইভেট-ননপ্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কর্মচারীরা দৈনিক ছয় থেকে আট ঘণ্টা ডিউটি পালন করে। তাদের মাস গেলে এ্যাকাউন্ডে জমা হয়ে যায় মাসিক বেতন৷ রয়েছে নানাবিধ সুযোগ সুবিধা। পক্ষান্তরে একজন মাদ্রাসা শিক্ষককে বেতনের নাম পাল্টে, তাকে দেওয়া হয় অজিফা। তাও নামে মাত্র। জেলা শহরের একজন মাদ্রাসা শিক্ষককের মাসিক অজিফা পাঁচ থেকে ছ’হাজার টাকা। আরো কম।

দীর্ঘ প্রায় সতের ঘন্টা নেগরানী করে দৈনিক পারিশ্রমিক হিসাবে দেওয়া হয় ১৬৬ থেকে ২০০ টাকা৷ অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয় ছাত্রদের আবাসিক হল রুমের এক কোনায় পর্দাবৃত একটা আলীশান কামরা। যেখানে সেই শিক্ষকের জন্য কর্তৃপক্ষের থেকে দেওয়া হয় চারহাত দৈর্ঘ্য দুই হাত প্রস্থ তক্তা ভাঙ্গা একটা খাট। দৈনন্দিন ছয় থেকে সাতটা ক্লাশে পড়াতে যেগুলো শরাহ- ‍শুরুহাত (ব্যাখ্যাগ্রন্থ) মুতালাআ করতে হয় তার তালিকা অনেক দীর্ঘ। সে গুলো রাখার জন্য একটা তেপায়া শিক্ষককেই ব্যবস্থা করে নিতে হয়। এছাড়াও রেয়েছে আরো অনেক সুযোগ-সুবিধা।

“লিল্লাহিল হামদু কুল্লুহু।”

তারা আখেরাতকেই প্রাধান্য দেন৷ বিশ্বাস করেন, পার্থিব জীবন ক্ষনস্থায়ী৷ যার কারণে সহ্য করেন সব কষ্ট৷ মুখ খোলেন না তেমন কেউই৷ কিন্তু দেয়ালে যখন পিঠ ঠেকে যায়, আক্রান্ত ব্যক্তি তখন ধারালো তরবারির অগ্রভাগ ধরতেও কুন্ঠাবোধ করে না৷

`আমাদের দেশীয় হযরতগণ আজকের দিনেও রয়ে গেছেন দেড়’শ বছর আগের ঘোলা পানিতে। স্বকীয়তার শ্লোগানে বিসর্জনের সুরতে ধামাচাপা দিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। সে গুলো আজ ধামাতে চাপাই থাক। মুখ খুললে গন্ধ ছড়াবে মিডিয়া পাড়ার অলিগলিতে।’

কোথাও আরো কম অজিফায় চাকরির নাম পাল্টে খেদমত করেন আরো অনেকেই। তারা জানেন, যে শিক্ষা তারা দিয়ে থাকেন, সেটার মূল্য বা বেতন দেয়ার সামর্থ এই পৃথিবীর কারো নেই৷ কিভাবেইবা থাকবে! যখন শিক্ষাটা অপার্থিব জগতের, আর বেতন পার্থিব হিসাবের!

বাস্তবিকই এটা কোন চাকরী নয়। জাতির জন্য বিরাট খেদমত। যার সূচনা হয় ১৮৬৬ খৃষ্টাব্দে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। যা আজ অবধি চলে আসছে কচ্ছপ মন্থর গতিতে। যার শুরুটা ছিলো ডালিম গাছের তলায়৷ খোলা আকাশের নিচে৷ একজন উস্তাদের সামনে একজন ছাত্র৷

সময়ের বিবর্তনে উম্মুল মাদারীস দারুল উলুম দেওবন্দের উন্নয়ন হয়েছে অনেক। এখন ডালিম গাছের পরিববর্তে আলীশান ভবনে ছাদের নিচে শিক্ষা প্রদান করা হয়৷ সেখানে হয়েছে স্বাস্থ-সম্মত চোখ ধাঁধানো সারি সারি আলীশান ভবন। একই অবস্থা দেওবন্দের সন্তানদের মাদরাসাগুলোর৷ বিশেষ রুমগুলোতে এয়ারকান্ডিশনের সুব্যবস্থাও রয়েছে দেওবন্দ অনুসৃত অনেক মাদরাসায়। উন্নত হয়েছে খাবারের মানও। দু’বেলা থেকে হয়েছে তিনবেলা খাবারের আয়োজন। উলামায়ে দেওবন্দই কেবল নয় পাকিস্তানি হযরত উলামায়ে কেরামের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে সময়োপযোগী পরিবর্তনের ছাপ। উন্নতি ঘটেছে শিক্ষা ব্যবস্থারও।

পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর আলেম সমাজ যতটা প্রভাবশালী বাংলাদেশি আলেম সমাজ তার সামনে ‘তিফলে মক্তব’ বৈ কিছু নয়।

আমাদের দেশীয় হযরতগণ আজকের দিনেও রয়ে গেছেন দেড়’শ বছর আগের ঘোলা পানিতে। স্বকীয়তার শ্লোগানে বিসর্জনের সুরতে ধামাচাপা দিয়ে যাচ্ছে অনেক কিছুই। সে গুলো আজ ধামাতে চাপাই থাক। মুখ খুললে গন্ধ ছড়াবে মিডিয়া পাড়ার অলিগলিতে।

দেশীয় হযরতগণ দেওবন্দের আসাতিযায়ে কেরামের মতো সবাইকে নিয়ে চলেন না৷ নিজেকে নিয়েই সন্তুষ্টির ঢেকুর তোলেন৷ তাছাড়া যাদের তাকওয়া একজন কবি ফররুখের সামনে দাঁড়াতে পারে না, তাদের মুখে অন্তত স্বকীয়তার বুলি মানায় না। হযরত! স্বকীয়তা রক্ষার অর্থ লুঙ্গি খুলে পাগড়ি বাধাঁ নয়৷

করোনায় ক্রান্তিকালে সাহায্যের হাত খুলেছে সরকারি-বেসরকারি অনেক সেবা সংস্থা। আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন আপামর জনসাধারণ। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্যও বরাদ্ধ হচ্ছে নানান সুযোগ সুবিধা। এদিকে বেকায়দায় পড়ে যাচ্ছে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো৷ যার তালিকার অগ্রভাগে জ্বলজ্বল করছে এদেশের অনেক কওমি মাদ্রাসা। বুক ফাটছে তবে মুখ ফাটছে না এমন অবস্থা অনেক শিক্ষকদের।

সামান্য ক’টাকা বেতনের চাকরি। তাও চার-পাঁচ মাস বকেয়া রয়েছে অনেক মাদ্রাসা স্টাফদের। করোনাক্রান্তিকালে দ্রব্যমূল্যের চড়া দামে দাউদাউ করে জ্বলছে হাট-বাজার। মা-বাবা, স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালো নেই অনেক মাদ্রাসা শিক্ষক। তারা চাকরিজীবী তাই ত্রাণ তালিকায় নামও আসছে না তাদের। আত্নমর্যাদাবোধ রক্ষা করতে কারোর কাছে যেতেও পারছেন না।

এমন দূর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে যে পাশে দাঁড়াবে তাকে সাধুবাদ জানানো দোষের নয়। পেটে ভাত নেই। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার টাকা নেই। আর আপনি ইজি চেয়ারে বসে স্বকীয়তার ওয়াজ দিয়ে যাচ্ছেন। আরে ভাই! স্বকীয়তা কাকে বলে? আবেদন পত্র জমা দিয়ে মাদ্রাসাতে সরকারি সৌর বিদ্যুৎ, পানির ফিল্টার, রেশনের চাল ইত্যাদি গ্রহণ করা কি স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন নয়!

বিভিন্ন এনজিও, বিদেশি সেবা-সংস্থার দেওয়া অনুদান তো গিলে খান গোগ্রাসে! কোথায় থাকে তখন স্বকীয়তা? আপনার স্বকীয়তা এত ঠুনকো কেন? সুদখোর, ঘুষখোরের দান-সদকাও তো খসখস করে রশিদ কেটে গ্রহণ করা হয় নির্দ্বিধায়! মাদ্রাসা কার্যকারী কমিটির সদস্য নাম করা সুদখোর এমন চিত্রও কি নেই আমাদের সমাজে? কোথায় গেলো স্বকীয়তা?

কওমি মাদ্রাসা সমূহে সরকার কর্তৃক কোন অনুদান গ্রহণ করা হবে না এই শর্তে নেওয়া হয়েছে কওমি স্বীকৃতি। চলমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সরকারি ত্রাণ তহবিল থেকে আলেম সমাজকে নামে মাত্র কিছু ত্রাণ-অনুদান দিচ্ছে সরকার। এটা মৌলিক কোন অনুদান প্রদান নয়। সরকারি অনুদান ফেরত দেওয়ার বিষয়ে দেওবন্দের সাথে তুলনা করা হচ্ছে, ভালো কথা। দেওবন্দে অনুদান আনা হয়েছিলো স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে। আর আমাদের অবস্থা কি এক-ই? দেওবন্দের কয়জন শিক্ষকের পাঁচ মাসের অজিফা বকেয়া রয়েছে, দেখাতে পারবেন? উস্তাদদের বেতন ভাতা দিয়ে ছাত্রদের বৃত্তি-ভাতা দেওয়া হয় অনুসৃত দেওবন্দে। বাংলাদেশের কয়টা মাদ্রাসায় এই নিয়ম চালু আছে? এখানে মিলাতে যাবেন না?

`গ্রামের মসজিদের একজন ইমামের বেতন কয় হাজার টাকা হয় সেই ধারনা হয়ত রাজধানীর বেফাকের নেই। আপনারা একটা বছর ঢাকার বাইরে এসে থাকুন। দেখবেন উসূলে হাসতেগানার পাতা উইপোকায় খেয়ে ফেলবে।’

উসূলে হাশতেগানায় উল্লেখ আছে, “যেভাবেই হোক মাদ্রাসার ছাত্রদের খানা জারী রাখতে হবে। বরং ক্রমান্বয়ে তা বৃদ্ধি করার ব্যাপারে হিতাকাঙ্খি ও কল্যাণকামীদের সর্বদা স্বচেষ্ট থাকতে হবে।” কিন্তু কার্যত দেখা যায় কারণে-অকারণে ছাত্রদের খানা বন্ধ করে শাস্তি দেওয়া হয়। কোথায় লুকিয়ে রাখেন তখন উসূলে হাসতেগানার “সাদাপাতা”?

উসূলে হাসতেগানা ওহী নয়, যে সেটা মান্য করা ফরজের পর্যায়ে নিতে হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জেনেছি, মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড “বেফাক” থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মাদ্রাসা শিক্ষকদের সহায়তা দেওয়া হবে। তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। সুন্দর উদ্যোগ। ধন্যবাদ “বেফাক পরিবারকে।” তবে তারা নিয়ম জারী করেছে, কোন শিক্ষকের পাঁচ হাজারের বেশি অজিফা হলে কিংবা ইমামতি থাকলে তিনি সেই সহায়তা পাবেন না।

বাহ, চমৎকার! মানলাম একজন শিক্ষকের ধার্যকৃত বেতন ছ’হাজার টাকা। কিন্তু ডিসেম্বর থেকে আজকের দিন পর্যন্ত সব বেতন বাকি।তার বেতনের স্কেল দেখিয়ে বাজার থেকে বিনামূল্যে চাল, ডাল আনা যাবে তো হে কর্ণধরগণ!

গ্রামের মসজিদের একজন ইমামের বেতন কয় হাজার টাকা হয় সেই ধারনা হয়ত রাজধানীর বেফাকের নেই। আপনারা একটা বছর ঢাকার বাইরে এসে থাকুন। দেখবেন উসূলে হাসতেগানার পাতা উইপোকায় খেয়ে ফেলবে।

পরিশেষে কবি রফিক আজাদের মত একটা দাবি রেখে গেলাম প্রিয় হযরত সমীপে, “ভাত দেন হযরতগণ! তা না হলে উসূলে হাশতেগানা খাবো।”

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com