৭ই জুলাই, ২০২০ ইং , ২৩শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

একাকী নয়; জামাতের সাথেই ইদের নামাজ আদায় করুন

একাকী নয়; জামাতের সাথেই ইদের নামাজ আদায় করুন

মুফতী ফয়জুল্লাহ আমান ❑ করোনার এই সংকটময় সময়ে এসে গেল পবিত্র ইদুল ফিতরের ক্ষণ। ইদের নামাজ দিয়েই শুরু হয় ইদের উদযাপন। ইদের নামাজ ছাড়া ইদ যেন কল্পনাই করা যায় না। দেড় হাজার বছরে কখনও ইদের নামাজ পরিত্যক্ত হবার ইতিহাস পাওয়া যায় না। ইদের নামাজ ইসলামের অন্যতম এক শেয়ার। শেয়ার বলা হয় ধর্মের পরিচায়ক ও অবিচ্ছেদ্য অঙ্গকে।

এমন এক সময় এই ইদ এলো যখন সারা বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মৃত্যু মুখে নিপতিত হচ্ছে, আরও অসংখ্য মানুষ রোগাক্রান্ত হয়ে কঠিন সময় পার করছে। যত দুর্যোগই আসুক আমাদের জীবনে ইবাদত বন্দেগী আমাদের করেই যেতে হবে। শরিয়ত যেভাবে নির্দেশ করে সেভাবেই আমাদের প্রতিটি হুকুম পালন করতে হবে।

মূলত ইদের নামাজ জুমার নামাজের মতই।

আমাদের দেশে বেশ কিছু দিন মসজিদ বন্ধ ছিল। এখন উন্মুক্ত করে দেওয়া হলেও অনেকেই সতর্কতামূলক ঘরেই নামাজ পড়ছিলেন। এখন ইদের সময় তারা কী করবেন? বিশেষত যারা কোয়ারেন্টাইন বা আইসোলেশনে আছেন এবং যারা করোনার ভয়ে ভীড় থেকে দূরে থাকতে চান তারা কিভাবে ইদের নামাজ আদায় করবেন?

খুব সংক্ষেপে আমরা এ বিষয়ে শরিয়াতের নির্দেশনা তুলে ধরব। মূলত ইদের নামাজ জুমার নামাজের মতই। জুমার জন্য যেসব শর্ত ইদের জন্যও সেই একই শর্ত। জুমা সাপ্তাহিক ইদ আর ইদ হচ্ছে বাৎসরিক আয়োজন। সাপ্তাহিক ইদের মত হলেও বাৎসরিক আয়োজনে কিছুটা শিথিলতা রয়েছে। জুমার নামাজ ফরজ আর ইদের নামাজ ওয়াজিব। (অন্য মাযহাবে সুন্নাত।) জুমার নামাজের পূর্বে দুটি খুতবা দিতে হয়। জুমার খুতবা ওয়াজিব। ইদের নামাজের খুতবা ওয়াজিব নয়, সুন্নত। ইদের খুতবা দিতে হয় নামাজের পর। জুমার সঙ্গে ইদের নামাজের আরেকটি পার্থক্য হচ্ছে, ইদের নামাজে অতিরিক্ত ছয়টি তাকবির দিতে হয়। প্রথম রাকাতের শুরুতে আর পরের রাকাতে রুকুর আগে তিন তিনটি তাকবির দেওয়ার নিয়ম। রাসূল সা. ইদের দিন সম্পর্কে বলেন, হাযা ইদুনা ইয়া আহলাল ইসলাম। হে মুসলিম উম্মাহ! এটা আমাদের ইদ। [বুখারী ১/১৩৪]

ইদের নামাজ ফরজ করলে স্বতস্ফূর্ত জামাত আদায়ের আনন্দ থাকত না।

ইদের শর্তগুলো কিছুটা সহজ রাখার কারণ ইদের গুরুত্বহীনতা নয় বরং কড়াকড়ি করে ইদের আনন্দ যেন মাটি না হয় সে উদ্দেশ্যেই আল্লাহ তায়ালা ইদকে সহজ করেছেন। ইদের নামাজ ফরজ করলে স্বতস্ফূর্ত জামাত আদায়ের আনন্দ থাকত না। আল্লাহ তায়ালা এ জন্যই ফেরেশতাদের সামনে মুমিনদের নিয়ে গর্ব করেন। ইদের জামাতে যারা অংশগ্রহণ করে তাদের সব গুনাহ মাফ করে দেন। রাসূল সা. ইরশাদ করেন, ‘আসমানে ইদের দিনকে পুরস্কার দিবস নামকরণ করা হয়। ইদের নামাজ শেষে ফেরেশতারা ঘোষণা করতে থাকে, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের পাপসমূহ মাফ করে দিয়েছেন, তোমরা পূত পবিত্র হয়ে গৃহে ফিরে যাও। [তাবারানি কাবির, সাদ ইবন আউস রা. থেকে বর্ণিত, তারগিব ২/১৫৯]

যারা মসজিদে যেতে পারছেন না বা সতর্কতামূলক যেতে চান না তাদের ইদের নামাজ জামাতেই পড়তে হবে। জামাত ছাড়া একাকী পড়ার বিধান শাফেয়ী মাজহাবে আছে। হানাফি মাজহাবের স্পষ্ট বক্তব্য হচ্ছে, জামাত ছাড়া একাকী ইদের সালাত আদায় করা যায় না। [ইবন রুশদ, ১/১৫৯, মুহিতে বুরহানি ২/২২৯] রাসূল সা. বা সাহাবায়ে কেরাম কখনও একাকী ইদ আদায় করেননি। কোনো একটি বর্ণনায়ও একাকী ইদের নামাজ আদায়ের কথা পাওয়া যায় না।
মসজিদ ছাড়া ঘরে ইদের জামাত করা যাবে? হ্যাঁ অবশ্যই করা যাবে যদি শর্ত পাওয়া যায়। শর্ত হচ্ছে ইমাম ছাড়া কমপক্ষে তিন জন বয়স্ক পুরুষ থাকতে হবে। বড় ঘরের বৈঠক খানায় অথবা বাড়ির ছাদে বা উঠানে অথবা যে কোনো খোলা জায়গায় ইদের নামাজ আদায় করা যাবে। হযরত আনাস রা. একবার ইদের নামাজ পড়তে পারেননি, তো তিনি বাড়ির সবাইকে একত্র করে তাঁর গোলামকে ইদের নামাজের ইমামতি করতে বললেন। [বুখারী শরীফ ১/১৩৪]

এসব শর্ত সবার জন্য পালন করা সহজ হবে না। সবার তো আর বড় বাড়ি নেই। বাড়ির সামনে খোলা জায়গাও নেই। সে ক্ষেত্রে ইদের নামাজ নয়, বরং চার রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করার কথা বলেছেন হযরত ইবন মাসউদ রা.। [ইবন আবি শাইবা ৪/২৩৫] আতা ইবন রাবাহ বলেছেন, কোনো কারণে ইদের নামাজ পড়তে না পারলে দুরাকাত চাশতের নামাজ আদায় করবে। [বুখারী ১/ ১৩৪] হানাফি মাযহাবে এ জন্য দু রাকাত ও চার রাকাত উভয়টির অনুমোদন রয়েছে। তবে চার রাকাত পড়া উত্তম লেখা হয়েছে ফতোয়ার কিতাবাদিতে। [মুহিত ২/২২৯, শামী, আলমগিরি, বাদায়ে, বাহর, মাজমাউল আনহুর, মুখতাসারুত তাহাভি]

সাধারণ নফল নামাজের মতই এ নামাজ পড়তে হবে।

ইদের নামাজের বদলে চাশতের নামাজ পড়লেও আল্লাহ ইদের সওয়াব দিয়ে দিবেন ইনশাল্লাহ। যাদের ইদের জামাতে শরিক হবার তৌফিক হয় তারা সবাই ইদে শরিক হবেন। যাদের মসজিদে বা ঘরে জামাত করতে সমস্যা হয় তারা অবশ্যই মহল্লার মসজিদে ইদের জামাত শেষ হবার পর ঘরে দুই রাকাত বা চার রাকাত চাশতের নামাজ আদায় করে নিবেন। অতিরিক্ত ছয় তাকবির দেওয়া লাগবে না। নিয়ত করতে হবে নফল নামাজের। যে কোনো সুরা দিয়ে নামাজ আদায় করা যাবে। সাধারণ নফল নামাজের মতই এ নামাজ পড়তে হবে। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা আমাদের সবাইকে সুন্দরভাবে ইদুল ফিতর উদযাপন করার তাওফিক দিন। দ্রুতই আমাদের দেশকে করোনামুক্ত করেন এবং সবধরনের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করেন। আমীন।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com