২৯শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৩ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

একাত্তর টিভি ও আলেমদের দায়

একাত্তর টিভি ও আলেমদের দায়

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একযোগে প্রচার হচ্ছে, ‘৭১ টিভি বয়কট করুন’। আগাগোড়া সবারই এখন একই আওয়াজ। প্রথমে কে আওয়াজ দিয়েছেন জানি না। তবে শুনছি, জনাব বড় হস্তীমার্কা হুজুর সাহেব নাকি প্রথমে উস্কে দিয়েছেন। এখন সবাই সেই আওয়াজে তাল মিলাচ্ছেন। মানে উনি যে ফর্মুলা দিবেন, সেটাই চলবে।

প্রথম কথা, ৭১ টিভি বয়কট করতে বলছেন, আচ্ছা, হুজুররা কয়জন টিভি দেখেন? কতজন হুজুরের বাড়ীতে টেলিভিশন আছে? এখন যদি আমাদের ঐসব হুজুর সাহেবের বাসায় টেলিভিশন, ডিস লাইন থেকে থাকে, তাহলে তিনি করলেই তো হয়ে যায়। এখানে একচেটিয়াভাবে সকলকে উস্কে দেওয়ার তো কোন অর্থ হয় না।
দ্বিতীয়তঃ এখানে ৭১ টিভি বন্ধ করেন, বয়কট করেন, তাতে দুঃখ নেই, আমিও আপনাদের সাথে আছি। তবে আমাদের হুজুরদের কি চরিত্রের পরিবর্তন হবে না? মাঠে-ময়দানে যে সকল বক্তারা নির্লজ্জভাবে বক্তৃতা করেন, সেসব হুজুরদের কোন ব্যবস্থা নেওয়া হবে না? তাদের কি শাসন করা হবে না? নাকি “ওয়াজ-ব্যবসায়”” ভাটা পড়ার ভয়ে ও ব্যাপারে মুখে কুঁলুপ এটে দেওয়া হয়েছে?

এমন ফালতু কথা বলে আজকাল ওয়াজ মাহফিলের বক্তারা, সব কিছু কিন্তু ৭১ টিভি ওয়ালারা পায়নি। আরো অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করে থাকে। যেগুলো অনেক মারাত্মক। ওয়াজ মাহফিলে যেন যৌনতার সুড়সুড়ি!
গ্রামগঞ্জে এখনো বহু ওয়ায়েজ আছে, তারা এসব রাস্তা অবলম্বন করে চলেছে। আবার, অনেকে ওয়াজের নামে ছড়াচ্ছে ভ্রান্ত আক্বীদা। অনেকে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য দিচ্ছে অপব্যাখ্যা। অনেকে অযথা উগ্রতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে বক্তৃতা-বয়ানের নামে। আবার অনেকে একের পর এক এমন বেফাঁস মন্তব্য করে চলেছে, যা লিখে বোঝানো যাবে না।

এর আগে বিভিন্ন লিখনীতে আমরা দেখেছি, আবার ইউটিউব এবং সরাসরি ময়দানে দেখেছি…। মূর্খ ওয়ায়েজ, কমেডি ওয়ায়েজ, কৌতূক করে ওয়াজের স্টেজে বসে। অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করে। ওয়াজের মাহফিলে গান গায়। হিন্দি-বাংলা ছায়াছবির ডায়ালগ এবং জনপ্রিয় গানগুলো ওয়াজের হুজুরদের কাছ থেকে শোনা যায়। মানে এমনভাবে ওসব হুজুররা গান গায়, তাতে যেন যৌনতার দিকে মানুষকে আহ্বান করে।

বড় দুঃখজনক, আমাদের আলেম সমাজ সে বিষয়ে কোন কথা বলেন না। বরং ও ব্যাপারে নীরব। ওসব বক্তাদের কোন শাসন করেন না।সতর্ক করেন না। অথচ উচিত ছিল, ঐ সকল নির্লজ্জ হুজুরদের টুঁটি চেপে ধরা। তাদেরকে আগে সতর্ক করা। তাদেরকে ময়দান থেকে বের করা।

রাবেতাতুল ওয়ায়েজীন গঠন করা হয়েছে। জানি না ওনারা কী জন্য তাদের এ সংগঠন গড়েছেন। অন্ততঃ ওসব বেহায়া বক্তাদের বয়কট করার প্রয়োজন ছিল। যারা অশ্লীল ভাষা ব্যবহার করবে, ইসলামের অপব্যাখ্যা দিবে… তাদের একেবারে আউট করে দেওয়া।

কিন্তু আমরা নিজেরা সংশোধন না হয়ে ৭১ টিভিকে বয়কট করতে বলছি। তাহলে আমাদের যেসব হুজুররা ওয়াজ মাহফিলে অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করবে, ওগুলো কি হালাল? ওনারা কি সারাজীবন ঐ রাস্তায় থাকবেন?
৭১ টিভি বাস্তবতা তুলে ধরেছেন। মৌলভী সাহেবদের মাঝে যে ত্রুটি আছে, সেগুলো জাতির সামনে পেশ করেছেন। কিন্তু এখন এমন অবস্থা, এক নাগাড়ে সকলে তাদের বিরুদ্ধে।

আমি আগেও বলছি,৭১ টিভি যদি ইসলাম বিরোধী কিছু করে থাকে, আমি সেটা সমর্থন করি না। কিন্তু আমাদের নিজেদের দোষ ঢেকে শুধু তাদের উপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া এটা কোন মু’মীনের আখলাক নয়। এটা কোন আলেমদের সিফাত নয়।

সবচেয়ে বড় দুঃখজনক হল, আমরা আলেম হয়ে যেভাবে ৭১ টিভি এবং তার সাথে সংশ্লিষ্টদের গালিগালাজ করছি, তা বর্ণনার ভাষা আমার নেই। আমরা দাবী করি, আমরাই সবচেয়ে বড় আদর্শবান। আমরা হক-হক্কানীয়্যাতের উপর দণ্ডায়মান। কিন্তু আমরা ৭১ টিভি-ওয়ালাদের যেভাবে ভাষা খারাপ করে হেনেস্তা করছি, এটা কোন আলেমদের আখলাক-চরিত্র হতে পারে না।

“নিজে করলে কুরু কুরু অন্য করলে মাকরুহ” –নিজে করলে হালাল আর অন্যরা করলে সেটা হারাম…? এ রকম বাইন্ডিং তথা ভণ্ডামী থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। অনেক শরীয়ত বিরোধী কাজ অবলীলায় করে যাচ্ছি, সেগুলো নিয়ে আমরা ভাবিও না। কিন্তু অন্যের ভুল খুব চোখে পড়ে !

আমাদের যবান এবং লিখনীতে আরো সাবধানতা অবলম্বন করা চাই। আমাদের মতানুযায়ী না হলে, সে বেশ্যা (?) হয়ে গেল? ঢালাওভাবে ৭১ চ্যানেলের মহিলাদের যেভাবে খারাপ ভাষা ইউজ করা হচ্ছে, এটা কাম্য নয়।
হেফাজতের আন্দোলনের সময়ে শাহবাগে লাকীদের আমাদের অনেকে “বেশ্যা” বলেও গালি দিয়েছে, বেহায়া-বেশরম বলেছি…। এবার শাহবাগের এই বেহায়া মহিলাদেরকে কী বলবেন? না! এবার কিছু বলা যাবে না!! কেননা, সে আমাদের মনের কথা বলছে!

এ রকম টেন্ডেন্সি থেকে বেরিয়ে আসা দরকার। গালিগালাজ করা, ভাষা খারাপ করা, এর দ্বারা ইসলামের কোন উপকার হবে না। উল্টো আমাদের ভেতর থাকা এইসব বদ লোকগুলোর এমনসব ইসলামবিরোধী আচরণের কারণে মানুষজন ইসলাম সম্পর্কে মন্দ ধারণা করতে দেখা যাচ্ছে। সাউন্ড-সিষ্টেম সব জায়গায় চলে না। ফুল ভলিয়ম সব জায়গাতে দেওয়া যায় না। কখনো কমানো, কখনো বাড়ানো লাগে। সাউন্ডগ্রেনেড মেরে সবকিছু সোজা হয় না। উত্তম আখলাক ও সহনশীলতা অতি জরুরি বিষয়।

একচেটিয়াভাবে কাউকে আক্রমণ না করে, হেকমত-প্রজ্ঞার সাথে তাদের পিছনে মেহনত করা যেতে পারে।
শেষ কথা হল, আত্মসমালোচনার পথ খোলা রাখুন। নিজেদের ভুল সংশোধন করা যায় কীভাবে, সেটা নিয়ে চিন্তা করুন। নিজ ঘরানার লোকদের সংশোধনের মাধ্যমে ইসলামকে অযথা নিন্দায় ফেলা থেকে সুরক্ষা দিন। অহেতুক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়ে দ্বীন ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করবেন না। আমাদের আখলাক এমন হওয়া উচিত, যেন আমাদের চরিত্রগুণে মানুষ দ্বীন-ইসলামে ধাবিত হয়। আল্লাহ আমাদের সবাইকে সহী বোঝার তাওফীক দিন। আমীন।

লেখক : সমাজচিন্তক, আলেম ও শিক্ষক

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com