১২ই মে, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ , ২৯শে বৈশাখ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ , ২৯শে রমজান, ১৪৪২ হিজরি

এতেকাফের ফজিলত ও বিধান

মাহতাব উদ্দীন নোমান

রমজানের বৈশিষ্ট্যগুলোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এই মাসের শেষ দশকে এতেকাফ করা হয়। এতেকাফ হলো দুনিয়ার সকল সম্পর্ক ত্যাগ করে আল্লাহ তাআলার ঘরে তাঁর প্রেমে ডুবে থেকে একান্তে ইবাদত করার জন্যই অবস্থান করা।

রমজানের রোজার দ্বারা মানুষ নিজের অন্তরের ফেরেশতা শক্তিকে বিজয়ী ও পশু চরিত্রকে দমনের সাধনা করার পরে এর চেয়ে আরো উঁচু পর্যায়ে আল্লাহর সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং ঊর্ধ্ব জগতের সাথে সম্বন্ধ স্থাপনের জন্য এতেকাফের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ ও উপকারী বিষয়কে রমজানের শেষ দশকের সাথে সম্পৃক্ত করা হয়েছে।

এতেকাফরত ব্যক্তি দুনিয়ার সবার নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এবং সকলের থেকে দূরত্ব অবলম্বন করে আপন মালিক ও মাওলার ঘরে পড়ে থাকে। তাঁকেই স্মরণ করে, তারই ধ্যানে মগ্ন থাকে, তারাই তাসবীহ ও প্রশংসা করে, তার দরবারে তওবা ইস্তেগফার করে, নিজের অন্যায় অপরাধ ও গুনাহার জন্য কান্নাকাটি করে, দয়াময় মালিকের কাছে রহমত ও মাগফেরাত প্রার্থনা করে, তার সন্তুষ্টি ও নৈকট্য কামনা করে।

এভাবেই তার দিন কাটে এবং এ অবস্থায় রাত চলে যায়। এরচেয়ে সৌভাগ্য একজন বান্দার আর কি হতে পারে। এছাড়াও মাহে রমজানের বরকতময় সময় গুলোর যথাযথ মূল্যায়ন এতেকাফ করা ছাড়া অন্য কোনভাবে কখনোই সম্ভব নয়। কেননা এটি একটি বিরামহীন নেক আমল।

এটি রমজানের একটি বিশেষ নেক আমল যা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিনা প্রয়োজনে কখনো ছাড়েননি। তিনি নিজেও করেছেন এবং তার স্ত্রীগণও করেছেন। আম্মাজান আয়েশা রাযি বলেন, ‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশকে এতেকাফ করতেন। তার এই রীতি মৃত্যু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। পরবর্তীতে তার স্ত্রীগণও এতেকাফ করেছেন।’ ( বুখারী ২০২৪ মুসলিম ১১৭২)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতেকাফের গুরুত্ব এবং প্রয়োজন বোঝানোর জন্যই জীবনের শেষ রমজানে ২০ দিন এতেকাফ করেছেন। আবু হুরায়রা রাযি থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফ করতেন। যে বসর তার ইন্তেকাল হয় ওই বছর ২০ দিন এতেকাফ করেছেন। (বুখারী ৪৯৯৮)

এতেকাফের উপকারিতা

১. এতেকাফের সবচাইতে বড় উপকারিতা হচ্ছে এতেকাফরত ব্যক্তি সকল প্রকার গুনাহ থেকে বিরত থাকতে পারে। আর গুনাহ থেকে বিরত থাকাই সবচাইতে বড় কেরামতি। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফরত ব্যক্তি সম্পর্কে বলেছেন, ‘এতেকাফরত ব্যক্তি সকল গুনাহ থেকে দূরে থাকে।’ (ইবনে মাজা ১৭৮১)

২. এতেকাফরত ব্যক্তি মসজিদে অবস্থান করার কারণে শবে কদরের সকল ফজিলত এবং সওয়াব পেয়ে যাবে। কেননা আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শবে কদর পাওয়ার জন্যই এতেকাফ করেছিলেন। (বুখারী; ৮১৩, মুসলিম; ১১৬৭)

৩. এতেকাফরত ব্যক্তি মসজিদে অবস্থান করে পরবর্তী নামাজের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে। আর পরবর্তী নামাজের জন্য অপেক্ষা করার অনেক সওয়াব রয়েছে।

ক. নামাজের জন্য অপেক্ষা করার দ্বারা নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়। (বুখারী; ৬৫৯, মুসলিম; ৬৪৯)

খ. নামাজের অপেক্ষারত ব্যক্তির জন্য ফেরেশতারা দোয়া করে। হে আল্লাহ আপনি তাকে মাফ করে দেন, হে আল্লাহ আপনি তাকে রহম করুন। (বুখারী; ৪৪৫, মুসলিম; ৬৪৯)

৪. আল্লাহ তাআলা এতেকাফরত ব্যক্তি এবং জাহান্নামের মাঝে 3 খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। প্রতি খন্দকের দূরত্ব আসমান এবং জমিনের দূরত্বের সমপরিমাণ। যে ব্যক্তি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এক দিন এতেকাফ করে আল্লাহ তা’আলা তার মাঝে এবং জাহান্নামের মাঝে ৩ খন্দক পরিমাণ দূরত্ব সৃষ্টি করে দেন। প্রতি খন্দকের দূরত্ব পৃথিবী এবং আকাশ এর মধ্যবর্তী দূরত্বের সমপরিমাণ। (তাবরানী শরীফ)

৫. এতেকাফরত ব্যক্তি মসজিদে বসে বসে এই অগনিত সওয়াবের অধিকারী হয়ে যায়। আল্লাহর ঘরে থাকার কারণে যে নেক আমল গুলো সে করতে পারছে না ওই নেক আমলের সওয়াবও সে পায়। ‘এতেকাফ রত ব্যক্তি যে সব নেক আমল এতেকাফে থাকার কারণে করতে পারছে না, সেসব নেক আমলের পুরস্কারও তাকে ওই ব্যক্তির মতই দেওয়া হয়, যে এতেকাফে না থাকার কারণে এই নেক আমল গুলো করেছে।’

এবার এতেকাফের কিছু মৌলিক বিধি-বিধান সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক। এতেকাফ তিন প্রকার। যথা:

১. ওয়াজিব এতেকাফ। যেমন কেউ মুখে বলল আমি আল্লাহর জন্য এত দিন এতেকাফ করব অথবা কেউ মান্নত করলো যে আমার ঐ কাজ হয়ে গেলে আমি এতদিন এতেকাফ করব। আবার রমজানের শেষ দশকের এতেকাফ শুরু করার দ্বারা তা পূর্ণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়।

২. সুন্নাতে মুয়াক্কাদা এতেকাফ। রমজানের শেষ দশকে পুরুষদের জন্য জামাত হয় এমন মসজিদে এতেকাফ করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা কেফায়া। অর্থাৎ প্রত্যেক এলাকায় কমপক্ষে একজন এতেকাফে বসতে হবে। একজনের এতেকাফই সকল এলাকা বাসীর পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে। যদি একজনও এতেকাফে না বসে তাহলে পুরো এলাকাবাসী গুনাহগার হবে।

৩. নফল এতেকাফ। এটার জন্য কোন নির্ধারিত সময় সীমা নেই। যখনই মসজিদে যাওয়া হবে তখনই নফল এতেকাফের নিয়ত করা যাবে। যতক্ষণ মসজিদে থাকবে, এতেকাফের সওয়াব পেতে থাকবে। মসজিদ থেকে বের হলেই নফল এতেকাফ শেষ হয়ে যাবে। যেহেতু এর নির্ধারিত সময়সীমা নেই, সুতরাং তা ভেঙে গেলে কাজা করারও প্রয়োজন নেই এবং এর বিধি-বিধানও নেই।

এতেকাফের শর্তসমূহ : সুন্নত অথবা ওয়াজিব এতেকাফ গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক সুস্থ মস্তিষ্ক সম্পন্ন মুসলিম গোসল ফরজ হওয়ার মতো অপবিত্রতা থেকে পবিত্র হয়ে রোজা অবস্থায় এতেকাফের নিয়তে এমন মসজিদে অবস্থান করা জরুরী যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে হয় এবং নির্ধারিত ইমাম ও মুয়াজ্জিন রয়েছে।

মসজিদ থেকে কখন বের হতে পারবে : সুন্নত অথবা ওয়াজিব এতেকাফরত ব্যক্তির জন্য সব সময় মসজিদে অবস্থান করতে হবে। শুধু তিন অবস্থায় সে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে।

১. মানবীয় প্রয়োজন পূরণে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে। যেমন পেশাব, পায়খানা করা, ফরজ গোসল করা, শরীরে কোন নাপাক লাগলে তা দূর করা, ওযু ভেঙে গেলে ওযু করা ইত্যাদি। এই সকল বিষয় মসজিদের বাথরুমে পূরণ করতে হবে। মসজিদের বাথরুম সংকট হলে নিজের বাড়ি যেয়ে প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে। মসজিদের খাবার পৌঁছে দেওয়ার মানুষ না থাকলে, সূর্যাস্তের পরে খাবার আনার জন্য বাড়িতে যেতে পারবে।

ফরজ গোসল ছাড়া দৈনন্দিনের সাধারণ গোসলের জন্য মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবেনা, বের হলে এতেকাফ ভেঙে যাবে। অবশ্য পেশাব-পায়খানার উদ্দেশ্যে বের হয়ে বাথরুমে বসে দ্রুত কয়েক মগ পানি শরীরে ঢেলে নিলে এতেকাফের কোন ক্ষতি হবে না।

২. দ্বীনি প্রয়োজন দেখা দিলে এতেকাফকারী মসজিদ থেকে বের হতে পারবে। যেমন এই মসজিদে জুমা না হলে, অন্য মসজিদে জুমার নামাজ আদায়ের জন্য বের হতে পারবে।

সুন্নতে মুয়াক্কাদা এতেকাফকারী ব্যক্তির জানাযার নামাজের জন্য, রোগী দেখার জন্য, দ্বীনি মাহফিলে অংশগ্রহণের জন্য মসজিদ থেকে বের হতে পারবে না। তবে মানবীয় প্রয়োজনে অথবা দ্বীনি প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসা-যাওয়ার পথে বিলম্ব না করে জানাজার নামাজ পড়ে নিলে অথবা কোন রোগীরকে দেখে নিলে তার এতেকাফ ভাঙবে না।

মান্নতের এতেকাফকারী ব্যক্তি যদি মান্নত করার সময় জানাজার নামাজ, রোগী দেখা বা দ্বীনি মাহফিলে অংশগ্রহণের নিয়ত করে নেয়, তাহলে তার জন্য এই সমস্ত কাজ বৈধ আছে। এর দ্বারা তার এতেকাফ ভাঙবে না।

৩. মসজিদ থেকে বের হতে বাধ্য হলে এতেকাফকারী মসজিদ থেকে বের হয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্য মসজিদে চলে যাবে। এই কারণে তার এতেকাফ ভাঙবে না। যেমন মসজিদ ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হলে অথবা মসজিদের আশেপাশের লোকজন অন্যত্র চলে গেলে এবং মসজিদে জামাতের সাথে নামাজ বন্ধ হয়ে গেলে। কেউ জোরপূর্বক বের করে দিলে। শত্রুর পক্ষ হতে জান-মালের ক্ষতির আশংকা থাকলে ইত্যাদি। এই সকল কারণে সে মসজিদ থেকে বের হতে পারবে।

এতেকাফরত অবস্থায় যেসব কাজ মাকরুহ : এতেকাফের মূল উদ্দেশ্যই হলো, সকল প্রকার দুনিয়াবি সম্পর্ক ত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্যই আল্লাহর ঘরে একান্তভাবে তার এবাদত করা। সুতরাং এবাদতে বিঘ্নতা সৃষ্টিকারী সব কাজ মাকরুহ হিসেবে গণ্য হবে। যেমন অহেতুক কথাবার্তা বলা, মিথ্যা কথা বলা, চোগলখুরী করা, ঝগড়া করা ইত্যাদি। চুপ করে থাকাকে স্বতন্ত্র এবাদত মনে করা করে চুপ করে বসে থাকা মাকরুহ। কোন পণ্য মসজিদে এনে ক্রয়-বিক্রয় করাও মাকরুহ।

এতেকাফ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণসমূহ

১. বিনা প্রয়োজনে ইচ্ছা করে কিংবা ভুলে সামান্য সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হলে এতেকাফ ভেঙে যাবে।

২. এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে সহবাস করলে।

৩. এতেকাফ অবস্থায় স্ত্রীর সাথে হাসি তামাশা করা, চুম্বন করা, আলিঙ্গন করা সবই নাজায়েজ। এর দ্বারা যদি বীর্যপাত হয়ে যায় তাহলে এতেকাফ ভেঙে যাবে। বীর্যপাত না হলে ভাঙবে না তবে গুনাহগার হবে। তবে কুদৃষ্টির কারণে বীর্যপাত হয়ে গেলে অথবা স্বপ্নদোষ হলে এতেকাফ ভাঙবে না।

৪. ইচ্ছাকৃতভাবে রোজা ভেঙ্গে ফেললে তার রোজার সাথে সাথে এতেকাফও ভেঙে যাবে।

৫. এতেকাফকারী মুরতাদ হয়ে গেলে, পাগল হয়ে গেলে অথবা একদিন এক রাতের বেশি অচেতন থাকলে তার এতেকাফ ভেঙে যাবে।

৬. এতেকাফরত নারীর মাসিক শুরু হলে অথবা বাচ্চা প্রসব পরবর্তী রক্তস্রাব শুরু হলে এতেকাফ ভেঙে যাবে।

এতেকাফ ভেঙে গেলে করণীয় : ওয়াজিব এতেকাফ অথবা রমজানের শেষ দশকের সুন্নত এতেকাফ ভেঙে গেলে, যে দিনের এতেকাফ ভেঙে গেছে পরবর্তী যেকোনো সময়ে রোজা সহ শুধু সেই দিনের এতেকাফের কাযা করতে হবে। তবে উত্তম হলো পরবর্তীতে রোজাসহ পুরো দশদিনের এতেকাফ কাযা করা।
নারীদের এতেকাফ : এতেকাফের মত এত গুরুত্বপূর্ণ আমলের সওয়াব থেকে নারীরাও বঞ্চিত হবে না।

তারাও চাইলে এই এতেকাফের সওয়াব অর্জন করতে পারবে। কোন নারী এতেকাফ করতে চাইলে ঘরের যেকোনো রুমে এতেকাফে বসতে পারে। এই রুমটি তার জন্য মসজিদের মত হবে। পূর্বে উল্লেখিত প্রয়োজন ছাড়া সেখান থেকে বের হতে পারবে না। বের হলে তার এতেকাফ ভেঙ্গে যাবে। এতেকাফ রত অবস্থায় ঘরের কাজে ব্যাস্ত না হয়ে পুরো সময়টা এবাদত এর মধ্যে কাটানোই তার জন্য উত্তম। তবে যদি সে নিজের এতেকাফের রুমেই সবজি কাটে বা কাপড় সেলাই করে বা প্রয়োজন হলে রান্না করে তাহলে কোন সমস্যা নেই।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকেই এতেকাফের মাধ্যমে একান্তে আল্লাহ তাআলার ইবাদত করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

লেখক: খতীব ও শিক্ষক

আরও পড়ুন: রমজানের সঙ্গে কোরআনের সম্পর্ক নিগূঢ়

শেয়ার করুন


সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত © ১৯৮৬ - ২০২১ মাসিক পাথেয় (রেজিঃ ডি.এ. ৬৭৫) | patheo24.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com