২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৪ঠা সফর, ১৪৪২ হিজরী

কওমীতে তৃতীয় শক্তির অনুপ্রবেশে ভয়াবহ সর্বনাশা

সরলকথা । আমিনুল ইসলাম কাসেমী

কওমীতে তৃতীয় শক্তির অনুপ্রবেশে ভয়াবহ সর্বনাশা

আলেম সমাজ সাধারণত নম্র- ভদ্র, বিনয়ী। কারো সাথে টক-ঝক পছন্দ করেন না। একে অপরের প্রতি তেড়ে আসে না কখনো। তাছাড়া মুরুব্বীদের প্রতি সবচেয়ে বেশী শ্রদ্ধাশীল হলেন ওলামায়ে কেরাম। কওমী মাদ্রাসাগুলোতে হর- হামেশা আদব- কায়দা শিক্ষা দেওয়া হয়। এ কারণে দেখা যায়, কোন জুনিয়র আলেম সিনিয়রদের উপর নাক গলায় না। সিনিয়রদের প্রতি থাকে সবসময় ভক্তি- ভালবাসা।

আবহমান কাল থেকে এধারা অব্যাহত রয়েছে। শতশত বছরের কওমীর ঐতিহ্য। এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ওলামায়ে কেরাম। নবীর ওয়ারিছদের নবী ওয়ালা আখলাক। পুরো সাহাবা আজমাঈনদের নঁকশে নমুনার উপর কদম রেখে চলেছেন এই বৃহত্তম দল। সাহাবীগণ যে রপ ছিলেন প্রিয় নবীর উপর ভক্তি ভালবাসা। সাহাবাদের উপর ছিল তাবেয়ীদের। আর তাবেয়ীদের উপর তাবে- তাবেয়ী। সূত্র পরম্পরা চলে আসছে। আদব-ভক্তি-ভালবাসার এক চক চকে নমুনা।

ওলামায়ে দেওবন্দ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টি ভঙ্গি লালন কারী এই জামাতের বড় বৈশিষ্ট্য উস্তাদ ভক্তি, মুরুব্বীদের প্রতি অপরিসীম শ্রদ্ধা-ভালবাসা। আজ পর্যন্ত কোন নজীর পাওয়া যাবেনা, যেখানে উস্তাদদের প্রতি ছাত্রদের অসাদাচারণ। গুরুর প্রতি অশ্রদ্ধা। মুরুব্বীদের উপর টপকিয়ে কিছু করা।

কত শত-সহস্র সমস্যা কওমীতে, কিন্তু কখনো আদব থেকে সরে যায়নি তারা। যতই আসুক ঝড়- ঝন্জা, আদবের প্রতি তাদের শত ভাগ দৃষ্টি। মনের বিরুদ্ধে গেলেও কোনদিন উস্তাদদের বিরুদ্ধে তারা যায়নি।

এখনো সেই অবস্থা বিরাজ করছে কওমী অঙ্গনে। আকাবির – আছলাফের বাতলানো পথ থেকে আজো সরে যায়নি। এখনো উস্তাদদের কে স্ব-শ্রদ্ধায় আলগিয়ে রাখেন। মাথার তাজ মনে করেন। উস্তাদদের পাদুকা সোজা করে ধন্য মনে করেন নিজেকে। এমন ভক্তি – ভালবাসার নজীর কওমী অঙ্গনে, যদি বলা হয়, উস্তাদের জুতা মাথায় নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে সারাদিন, তাতেও আপত্তি থাকবেনা কোন শিক্ষার্থীর। কোন প্রশ্ন তুলবেনা ত্বলাবা,ফুজালা, ও নবীন- প্রবীণ কোন আলেম।

বড় আফসোস! আর পরিতাপের বিষয়, কওমীর এই শত শত বছরের ঐতিহ্যকে ধুলোয় মিশাতে চায় কেউ কেউ। হাজার বছরের লালিত স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার করার দুঃসাহস দেখাতে চায় কিছু আলেম- উলামা বিদ্বেষী চক্র। ওলামায়ে দেওবন্দ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টি ভঙ্গি লালনকারী গোষ্ঠীর মাঝে চিড় ধরাতে চায়। নবী-সাহাবীদের যুগে যেভাবে মুনাফেকচক্র কাজ করেছিল, প্রিয় নবীর দাওয়াত- তাবলীগের মিশনকে ক্ষতি সাধন করার পাঁয়তারা করেছিল, এখনো মনে হয় সেই চক্রের পদলেহীরা আলেমদের ভিতরে ঘরের ইঁদুরের মত কাজ করে যাচ্ছে। লেবাসে কওমী, সুরত- সিরাতে দেওবন্দী, মাগার তাদের কর্মকৌশল ভিন্ন। বিভিন্ন সময়ে আলেমদের জামাতে প্রবেশ করে বিশৃংখলা ঘটায় তারা।

দেখুন! সরল প্রাণ আলেমদের ধোঁকায় ফেলে ওরা ওদের স্বার্থ ঠিকই হাসিল করে ফেলে। যুগ যুগ ধরে দেখে আসছি। তাদের আসল রুপ আলেম সমাজ কোনদিন ধরতে পারেনা। এমন এক দিকে নিয়ে যায় আলেমদের, যেখানে আলেমদের বৃহৎ ঐক্যকে বিনষ্ট করে ফেলে। ছিন্ন ভিন্ন হয় তখন আলেম- উলামা।

বড় কষ্ট লাগে, হাফেজ্জী হুজুরের আন্দোলন সংগ্রামের কথা অনেকের মনে আছে। কি এক জাগরণ তৈরী হয়েছিল। আলেম সমাজ যেন সেই সোনালী অতীত ফিরে পেয়েছিল। কাসেম নানুতবী রহ, শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান রহ, শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ, যেভাবে জাগরণ তুলে ছিলেন, আলেম এবং আওয়ামের মাঝে। ঠিক সেরকম না পারলেও, তাঁদের উত্তরসুরী হিসেবে তাঁদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করে চলে ছিলেন। বোঝা যেত হাফেজ্জীর আন্দোলনের সময়, কেমন ছিলেন আমাদের আকাবির আছলাফগণ, কেমন ছিল তাদের সংগ্রাম। হুবুহু সে রকম না হলেও আকাবিরগণের বাতিল মোকাবেলায় ত্যাগ – তিতিক্ষা এবং সংগ্রামের কিছু নমুনা ভেসে উঠত আলেম এবং জনতার হৃদয়ে।

সেই জাগরণ,সেই সংগ্রাম সবই ধুলিস্মাত হয়েছিল মুনাফেক চক্রের ইন্ধনে। প্রত্যক্ষ- পরক্ষো কুটিল ষড়যন্ত্রে মুখ থুবড়ে পড়ল। এক অমানিষার অন্ধকার চেপে বসল ইসলামী রাজনীতিতে। এভাবে যুগের পর যুগ,কাল থেকে মহাকাল, আলেমদের রাজনীতি, আলেম সমাজের দ্বীনি জাগরণে তৃতীয় শক্তি এসে যখনই ঘাপটি মেরে বসেছে,তখনই জ্বলে ওঠেছে অশান্তির দাবানল। আলেম- উলামার রাজনৈতিক প্লাট- ফরম নড়বড়ে হয়ে গেছে।

ইসলামী ঐক্য জোট, খেলাফত মজলিস, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম এরকম বহ রাজনৈতিক প্লাট ফরম তৈরী হয়েছে এবং দল গুলো বীর দর্পে ময়দানে এগিয়ে গেছে, কিন্তু শেষমেষ সুফল ঘরে তুলতে পারিনি কেউ। ছিন্ন ভিন্ন হয়েছি আমরা। মুনাফেক চক্রের অনুপ্রবেশে টুকরা হয়েছে কয়েকবার। এমনও নজীর আছে, খণ্ডিত টুকরা আবারও দ্বিখণ্ডিত!! আহ,, লিখতেও কষ্ট হয়।

সর্বশেষ হেফাজতের আন্দোলনের কথা তো সবার মনে আছে। কি উথ্থান আলেম সমাজের। সেই সাথে সাধারণ জনতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। হাফেজ্জীর আন্দোলনের পরে মনে হয় সবচেয়ে বড় জাগরণ। ইসলামের নামে কোন অরাজনৈতিক দলের বড় সমাগম আর হয়নি। রাজধানী ঢাকা সহ সারাদেশে মানুষ যেন তাদের কলিজা শীতল করেছিল আল্লাহু আকবার ধ্বনিতে। লক্ষ লক্ষ জনতার সমাগম ঢাকায়। রাজধানীর বাইরেও লাখো জনতার উপস্থিতি ছিল। আমাদের ছারে তাজ মুরুব্বী, শায়খুল ইসলাম মাদানীর খলিফা, আল্লামা আহমাদ শফীর দামাত বারাকাতুহুম এর আহবানে পিঁপড়ার সারির মত মানুষ জমা হত। যখনই ডাক দিতেন, লক্ষ লক্ষ জনতার উপস্থিতি নজরে আসত।

একটা চলমান আন্দোলন, লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হত যেখানে, সেই আন্দোলনে ব্রেক পড়ে গেল হঠাৎ। একদম যেন গৃহবন্দী হল সে সংগ্রাম।

কেন হল? কেন এভাবে মুখ থুবড়ে পড়ল? সেটাও কারো অজানা নয়। সবচেয়ে বড় সমাবেশের দিন, মুনাফেক চক্র যেভাবে আদাজল খেয়ে লেগেছিল, তাতে তো ময়দানে টিকে থাকাই তো ছিল অসাধ্য। ঐ মুনাফেক গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রে থেমে গেল সে আন্দোলন। কেননা, যেভাবে তুঙ্গে ওঠে ছিল আন্দোলন সংগ্রাম। পিলে চমকে গিয়েছিল তাদের।

ওরা হেফাজতের আন্দোলনকে বিতর্কিত করার জন্য এবং ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি বানানোর জন্য ছিল মরিয়া। রাস্তার দুধারের গাছ কেটে ফেলল তারা। দোকান- পাটে অগ্নি সংযোগ করেদিল। যেভাবে সুনাম- সুখ্যাতি নিয়ে এগিয়েছিল, মুনাফেক চক্রের অনুপ্রবেশে সবই হল এলোমেলো। হেফাজতের জনপ্রিয়তায় ধ্বস নামিয়ে ওরা চম্মট!!

সাম্প্রতিক সময়ে কওমী অঙ্গনে দেখা দিয়েছে ঘনঘটা অন্ধকার। বিরাজ করছে কালো মেঘ। এক অশান্তির লেলিহান অগ্নি শিখা প্রসারিত হচ্ছে। বুঝে উঠতে পারছিনা আমরা কেউ। আমাদের উম্মুল মাদারিস হাটহাজারী মাদ্রাসাকে কেন্দ্র করে বহু কিছু হয়ে যাচ্ছে। আমাদের মাথার তাজ আল্লামা আহমাদ শফি সাহেব কিন্তু এখনো জীবিত। তারপরেও চলছে পক্ষ- বিপক্ষ বোল- চাল। পাল্টাপাল্টি বিবৃতি। অনলাইনের মানুষগুলো মুখরোচক কথা গুলো বলে বেড়াচ্ছেন। কাঁট-ছাঁট কথা প্রচার হচ্ছে বেশী। হাটহাজারীর পাশে রয়েছে আরেক বড় প্রতিষ্ঠান নজিরহাট বড় মাদ্রাসা। সেটাও আমাদের। ছারে তাজ মুরব্বীদের কোরবানী রয়েছে এসব ইদারাতে। সেটাকে নিয়ে কথা হচ্ছে।

তবে আবারও কিন্তু মুনাফেক চক্রের ইন্ধন মনে হচ্ছে। বিজ্ঞজনদের ধারণা, আবারও ওরা কোন ষড়যন্ত্র করছে। ইন্ধন যোগাচ্ছে পক্ষ- বিপক্ষকে। অনলাইনেও দেখা যায় ওরা থেমে নেই। আলেমদের ভিতরকার বিষয়গুলো ব্যঙ্গ আকারে তুলে ধরছে তারা।

একবার ওরা আমাদের প্রাণের হাটহাজারীতে হামলা চালিয়েছিল। ভুলে যায়নি আমরা কেউ। তারা সব সময় দোষ ত্রুটি খুঁজতে থাকে আলেমদের। এই অবস্হায় খুবই সতর্ক হওয়া চাই। ওদের চিহ্নিত করা সময়ের দাবী। এখনো আল্লামা আহমাদ শফি জীবিত আছেন। তাঁর জীবদ্দশায় এসব অনৈতিক কাজ গুলো আমরা কামনা করি না।

এখতেলাফ যে আগে ছিলনা তা নয়। তবে আমাদের মুরুব্বীগণ কখনো মুনাফেক চক্রকে পাত্তা দেননি। ওদের মদদপুষ্ট হয়ে কখনো একে অপরের কাপড় ধরে টানাটানি করেন নি কোনদিন। কিন্তু বড় দুঃখজনক, তৃতীয় শক্তির অনুপ্রবেশ এবং তাদের পাতানো ফাঁদে যেন পা দিয়ে আলেম সমাজ ঐতিহ্য ভুলে গেছে।

সাবধান হোন, সতর্ক হোন, তৃতীয় শক্তিকে না বলুন। বিজ্ঞ আলেমদের পরামর্শ মোতাবেক চলুক আমাদের কওমীর প্রতিষ্ঠানগুলো। আল্লাহ না করুন, তৃতীয় শক্তির অনুপ্রবেশ হলে সর্বনাশ ডেকে আনবে জাতির। আল্লাহ হেফাজত করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com