২৫শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ৯ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৭ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য নয়

সচেতনতা । কাজী আফতাবুন নাহার জ্যোতি

কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য নয়

রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার মেয়ে রাবেয়া। পাঁচ বছর আগে রাবেয়ার বিয়ে হয় পাশের গ্রামের দিন মজুর শহিদের সাথে। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করার পর রাবেয়ার দরিদ্র বাবা অভাবের কারণে মাত্র ১৬ বছর বয়সে তার বিয়ে দেয়। বিয়ের প্রথম বছরের মাথায় রাবেয়ার কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। দ্বিতীয় বারের মতো কন্যা সন্তান প্রসব করার পর স্বামী, শাশুড়ির আচরণ পাল্টে যেতে থাকে। দুই কন্যা সন্তান জন্ম দেয়ায় রাবেয়াকে তার স্বামী মাঝে মাঝেই নির্যাতন করে। একদিন কন্যাসন্তানসহ রাবেয়াকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দেয় তার স্বামী ও শ্বাশুড়ি। নিরুপায় হয়ে আবার বাবার কাছে ফিরে আসে রাবেয়া।

আমাদের দেশে নিরবে নিভৃতে এ ধরণের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কন্যাসন্তান জন্ম দেওয়ার ক্ষেত্রে একজন নারীর কোনো ভূমিকা নেই এটা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমানিত। অথচ কোনো অন্যায় না করে হাজার হাজার নারী অত্যন্ত অমানবিকভাবে এই শাস্তি ভোগ করছে। এর জন্য অজ্ঞতা, অশিক্ষা, কুসংস্কার এবং নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দায়ী।

শিক্ষিত-অশিক্ষিত, ধনী-গরিব নির্বিশেষে আমাদের সমাজে অনেক ক্ষেত্রেই আমরা লক্ষ্য করে থাকি মেয়েশিশুর প্রতি অন্যরকম দৃষ্টিভঙ্গি ও বৈষম্যমূলক আচরণ। কন্যাশিশুর তুলনায় ছেলেশিশুকে একটু বাড়তি খাবার খাওয়ানো, যেকোনো অবদার পূরণেও কন্যাশিশুকে কম গুরুত্ব দেয়া এগুলো খুব স্বাভাবিক ঘটনা। জন্মের পর থেকেই এক ধরণের অবজ্ঞা ও বিধিনিষেধের বেড়াজালে কন্যাশিশুরা বেড়ে ওঠে। কন্যশিশুর প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ শুরু হয় মূলত পরিবার থেকেই। তবে বর্তমানে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য অনেকখানি কমেছে।

বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাই দেশের ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের জন্য পুরুষের পাশাপাশি নারীর স্বতস্ফুর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি। আর উন্নয়নে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন বৈষম্যহীন পারিবারিক ও সামাজিক ব্যবস্থা, যেখানে কন্যাশিশুরা নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাবে। এটা নিশ্চিত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি জরিপের সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১০-১২ বছর বয়সী কিশোরদের তুলনায় কিশোরীরা শকতরা ৮ ভাগ কম ক্যালরি পায়। পুষ্টির এ বৈষম্য কিশোরীর স্বল্প উচ্চতা ও রক্তা স্বল্পতার প্রধান কারণ।

আজকে কিশোরী আগামী দিনের মা। মানবজাতিকে টিকিয়ে রাখার গুরুত্বপূর্ণ যে কাজটি নারী করে থাকে, তাদের জীবন প্রক্রিয়াই কন্টকাকীর্ণ। অনেক পরিবারের কন্যাশিশুরা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার পায় না। শিশুর মেধার বিকাশ ছোট বেলাতেই হয়। সুস্থ মা’ই পারে সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে। তাই শিশুকাল থেকেই যদি কন্যাশিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করা না হয় তবে সে পরবর্তীতে একটি সুস্থ শিশুর জন্ম দিতে পারবে না। আর শিশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে হবে পরিবার থেকেই।

ইউনিসেফ-এর প্রতিবেদনে দেখা গেছে এখনও ৪৮ ভাগ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের নিচে। ফলে একজন কিশোরী অল্প বয়সেই মা হচ্ছে, যা মাতৃমৃত্যু ও স্বল্প ওজনের শিশু জন্মের অন্যতম কারণ। টেকসই উন্নয়নের পূর্বশর্ত নারী-পুরুষের সমতা হলেও সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারী তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত এমনকি অনেকেই নিজের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে না।

সমাজে আমরা নিজেদের আধুনিক মানুষ ভাবলেও কন্যা শিশুর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন খুব বেশি ঘটেনি। আজকের কন্যা শিশুই আগামী দিনের একজন নারী ও মা। অনেক কন্যা শিশু সমাজে অবহেলা-অনাদরে প্রতিকুল পরিবেশ পাড়ি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। পুত্র সন্তানটির মত কন্যা সন্তানটিকে শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে পারলে সে পরিবার ও সমাজে সর্বতোভাবে গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠতে পারে। আজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীরা ক্ষমতাসীন। নারীর গ্রহণযোগ্যতা সর্বজন স্বীকৃত। সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এই সত্য উপলদ্ধি করতে হবে। সমাজের কু-সংস্কার আর কু-শিক্ষার বেড়াজাল ছিড়ে সভ্যতার আলোয় বিকশিত হতে হবে। তাই কন্যা শিশু ভেবে নয় সন্তান হিসাবে তাদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে প্রতিটি অভিভাবককে। আর এখনই কন্যা শিশুর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য, অবহেলা, নির্যাতন বদ্ধ করতে হবে। সকল ক্ষেত্রে সাধারণ জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রচার প্রচারনা বাড়াতে হবে। কন্যাশিশু নয়, মানুষ হিসাবে সব কিছুতে সমান অধিকার তারও প্রাপ্য। সবাইকে এই বাস্তবতা মানার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।

সরকারি বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে প্রাথমিক শিক্ষায় কন্যাশিশুর অগ্রগতি ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিক্ষার মাধ্যমে নারীর জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করে কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্য ও বঞ্চনা দূরীকরণের জন্য সরকার শিক্ষাকে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে গ্রহণ করেছে। সে লক্ষ্যে সরকার বিগত বছরগুলোতে ছাত্রী ও নারীদের শিক্ষায় অংশগ্রহণ উৎসাহিত করার জন্য নারীবান্ধব কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। ছাত্রী উপবৃত্তি দেয়ার ফলে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছাত্রী অনুপ্রবেশ এবং জেন্ডার সমতা নিশ্চিতকরণে বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে। ছাত্রী উপবৃত্তির টাকা এখন আর ব্যাংকে গিয়ে আনতে হয় না, ঘরে বসে মোবাইলের মাধ্যমে পাওয়া যায়। শিক্ষা নারীর ক্ষমতায়নের চাবিকাঠি, তাই শিক্ষা কন্যাশিশুর উন্নয়ন, বাল্যবিবাহ রোধ এবং শিশু মৃত্যুর হার কমানোর নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ফজিলাতুন নেসা ইন্দিরা বলেছেন, কন্যাশিশুর উন্নয়নের মাধ্যমে পরিবার, সমাজ, দেশ ও বিশ্ব উপকৃত হয়। দেশের উন্নয়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য দূর করার জন্য কন্যা শিশুর উন্নয়ন দরকার। আজকের কন্যাশিশুরা ২০৪১ সালের উন্নত বাংলাদেশের নেতৃত্ব দেবে। তাই সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি সম্পর্কে সচেতন ও উদ্বুদ্ধ করার পাশাপাশি কারিগরি প্রশিক্ষণ দিয়ে নারীদের স্বাবলম্বী করছে সরকার। নারীদের বাদ দিয়ে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। এজন্য সরকার সকল উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় শিশুদের বিশেষ করে কন্যাশিশুদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল বিষয় অন্তর্ভূক্ত করেছে। সরকারের ১৫টি মন্ত্রণালয় ৮০ হাজার ১৯০ কোটি টাকার শিশুকেন্দ্রিক বাজেট বাস্তবায়ন করছে।

বর্তমান সরকার সমন্বিত উপবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় জুলাই ২০১৯ থেকে শ্রেণিভিত্তিক উপবৃত্তি, টিউশন ফি ও অন্যান্য সুবিধা প্রদান করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিরর শিক্ষার্থীরা মাসিক ২০০ টাকা হারে এক বছরে ২ হাজার ৪ শত টাকা, টিউশন ফি প্রতি মাসে ৩৫ টাকা করে এক বছরে ৪ শত ২০ টাকাসহ মোট উপবৃত্তি পাবে ২ হাজার ৮শত ২০ টাকা। অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মাসে ২৫০ টাকা হারে এক বছরে ৩ হাজার টাকা এবং প্রতিমাসে টিউশন ফি বাবদ ৩৫ টাকা করে ৪২০ টাকাসহ এক বছরে মোট উপবৃত্তি পাবে ৩ হাজার ৪ শত ২০ টাকা। নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীরা মাসে ৩০০ টাকা হারে এক বছরে ৩ হাজার ৬শত টাকা, টিউশন ফি ৫০ টাকা হারে ৬০০ টাকা এবং এককালীন পরীক্ষার ফি বাবদ ১ হাজার টাকাসহ মোট ৫ হাজার ২শত টাকা উপবৃত্তি পাবে। সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্নাতক ও সমমান পর্যায়ে উপবৃত্তি ও অন্যান্য ভাতার হার মাসিক ২ শত টাকা হারে এক বছরে মোট ২ হাজার ৪ শত টাকা, বই ক্রয় বাবদ ১ হাজার ৫ শত টাকা এবং পরীক্ষার ফি বাবদ ১ হাজার টাকাসহ মোট ৪ হাজার ৯ শত টাকা পাবে। ২০১৯ সালে মোট ১২ লাখ ১৯ হাজার ৩৫২ জন শিক্ষার্থীকে সরকার উপবৃত্তি প্রদান করেছে ৬ শত ৫২ কোটি ৮১ লাখ ৩১ হাজার ৮ শত ৪০ টাকা।

সরকার কন্যা শিশুদের এগিয়ে নেওয়ার জন্য প্রাক প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন শিক্ষা উপকরণ বিতরণ ও ছাত্রী উপবৃত্তি প্রদান করছে। এছাড়া ডিগ্রি পর্যন্ত ছাত্রীদের অবৈতনিক শিক্ষা ছাড়াও স্কুলে মিড-ডে মিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং বছরের প্রথম দিনে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ করার ফলে বাংলাদেশে নারী শিক্ষার হার দ্রুততার সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইউনিসেফ-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় সমাজসেবা অধিদপ্তর ‘চাইল্ড সেনসিটিভ সোস্যাল প্রটেকশন ইন বাংলাদেশ’ (সিএসপিবি) শীর্ষক প্রকল্প ২০১৬ সাল থেকে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এ প্রকল্পের স্বল্পমেয়াদী উদ্দেশ্য হলো নারী, শিশু ও যুবসম্প্রদায়ের কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা এবং উপযুক্ত সেবা প্রাপ্তির মাধ্যমে নির্যাতন, অবহেলা, শোষণ ও পাচার বিলোপ সাধন করা; শিশু অধিকার সনদ ও আন্তর্জাতিক চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ আইনী কাঠামো এবং বিশেষ শিশু নীতি গ্রহণ ও দেশের সকল শিশু বিশেষ করে দুস্থ শিশুদের কল্যাণ সাধন; কন্যাশিশুদের প্রতি সহিংসতা, নির্যাতন এবং শোষণ প্রতিরোধকল্পে ইতিবাচক সামাজিক আদর্শের অনুশীলন, উন্নয়ন সুদৃঢ় করা।

হাজার বছরের কন্যাশিশুর প্রতি এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে সময় লাগবে। তবু পরিবর্তন এসেছে, আসবেই, কেননা পৃথিবী থেমে থাকেনা। জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সচেতনতার দরুন পরিবর্তন আসতে বাধ্য। বাংলাদেশে কন্যাশিশুরা লেখাপড়ায় অনেক এগিয়ে গেছে। আবার গার্মেন্টস সেক্টরে কাজ করে এমন শ্রমিকের ৮০ ভাগই নারী এবং তাঁদের বড় একটি অংশের বয়স বিশের নিচে। ফলে অল্প বয়স থেকেই স্বাবলম্বী হবার ফলে গ্রামীণ জনসংখ্যার একটি বড় অংশের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তিত হয়েছে।

কন্যাশিশু ও নারীকে অবজ্ঞা, বঞ্চনা ও বৈষম্যের মধ্যে রেখে কখনোই একটি ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে উঠতে পারে না। বৈষম্যহীন এবং সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে, নারী ও কন্যাশিশুর সমগ্রিক বিকাশ অত্যন্ত জরুরি। সেটি শুরু করতে হবে কন্যাশিশুর নিরাপত্তা এবং সর্বোচ্চ বিনিয়গের মধ্য দিয়ে। পুষ্টি, স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে তাদের জন্য সমসুযোগ ও সমঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করার জন্য বর্তমান সরকারের যে প্রচেষ্টা তা আরো এগিয়ে নিতে আমাদের সকলের সচেতনতা দরকার।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com