২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা সফর, ১৪৪২ হিজরী

করোনায় করণীয়য় শীর্ষে যারা | মুহাম্মাদ আইয়ুব

করোনায় করণীয়য় শীর্ষে যারা | মুহাম্মাদ আইয়ুব

বয়স যখন সাত তখন থেকেই আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস। নতুন পুরাতন, টুটা ফাটা,বিখ্যাত অখ্যাত যখন যেখানে যা পেয়েছি সাথে সাথেই গোগ্রাসে গিলেছি। আব্বার দৃষ্টিতে পত্রিকা পড়া হারামের উর্ধ্বে। তাই তাঁর হাতে কত কিল গুতো যে পত্রিকার কল্যানে খেয়েছি তার হিসাব নাই। তারপরও পত্র পত্রিকার নেশা যায় নাই উল্টো উন্নতি হয়েছে।

আগে পড়তাম অফলাইনে এখন অনলাইনে। আগে হাতের নাগালে পেলে পড়তাম এক দুইটা আর এখন ইন্টারনেটের উসিলায় সারা দুনিয়ার সংবাদ হাতের মুঠোয়। করোনা যখন পৃথিবীতে তার ভয়াল থাবা বসাল তখন থেকেই দুনিয়ার সব খবরাখবরই একটু আধটু রাখছি। রাখা দরকার মনে করছি। যদি সংবাদ পড়ার অভ্যেসটা আজ না থাকত তাহলে একদিকে যেমন নমরূদি নির্দয়তা, ফেরাউনি নিষ্ঠুরতা আর কেয়ামতি স্বার্থপরতা চোখে পড়তনা, অপরদিকে নবীজীর মতো মানবতা, সাহাবাদের নিবেদিতা আর হাতেম তাঈয়ের আতিথেয়তা নজর কাড়ত না।

কিছু মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও অভাবীদের পাশে দাঁড়ায়নি!

আজকের করোনার কল্যাণেই আমরা দেখেছি ওয়াজ মাহফিলের নামে আজগুবী সব কথাবার্তা, ফেসবুক ইউটিউবে ফালতু লোকদের সয়লাব, চায়ের দোকানে অনর্থকদের সুনামি। কিছু মানুষ কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও অভাবীদের পাশে দাঁড়ায়নি! আবার কেউ কেউ তাদের অল্প পুঁজি নিয়ে গরিবের দুয়ারে দুয়ারে গিয়েছে!! অনেকে তাঁদের খুশবুর দোকানে সাটার লাগিয়েছেন!

অপরদিকে কতিপয় মহৎপ্রাণ ব্যাক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ অবস্থান থেকে কুরআন হাদিসের খুশবু ছড়িয়েছেন। করোনাতেও তাদের করণীয়র কথা ভুলে যাননি। পথহারা উম্মাহকে তাদের দায়িত্বের কথা হাতে কলমে বুঝিয়ে দিতে কার্পণ্যতা করেননি। বিশ্বাস না হয় এর উৎকৃষ্ট কিছু উদাহরণ নিতে পারেন

১। এই দেখুন ইকরা মাল্টিমিডিয়া! ইতিহাসের সত্য সন্ধানে তারা মুখোমুখি হয়েছেন শতাব্দীর বিস্ময়, মানবতার আকাশে জ্বলজ্বল করা এক সুরাইয়া তারকা আল্লামা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ দা.বা.-এর। ইতিহাসের লুকানো সত্যকে জনতার সম্মুখে উন্মোচন করতে আল্লামা মাসঊদ দা.বা.-কে সঙ্গে নিয়ে ইকরা মাল্টিমিডিয়া শুরু করেছে এক সোনালী যাত্রার। জন্ম দিতে চলেছে এক আলোকিত অধ্যায়ের।

পঁচিশ পর্বে সাজানো তাদের অসাধারণ এ আয়োজন অলরেডি শুরু হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। এবং মাত্র দিন কয়েকের ব্যবধানে সমগ্র বিশ্ব মাল্টিমিডিয়া কতৃক আয়োজিত এ অনুষ্ঠানের দুটি পর্ব দেখেও ফেলেছে। অভিনবত্বের সূর্য কিরণের আলোকোজ্জ্বল ছটায় বিশ্বকে সত্য ইতিহাসে আলোকিত করার এ যুগান্তকারী পদক্ষেপের জন্য ইকরা মাল্টিমিডিয়ার প্রত্যেক সদস্যকে ভরপুর জাযাকাল্লাহ। কি চমৎকার উদ্যোগ ভাবা যায়?!! আমি মনে করি ডিজিটাল আঙ্গিকে করা এ অনুষ্ঠান পথহারা জাতীকে নতুন করে জাগার স্বপ্ন দেখাবে এবং সামনে এগিয়ে চলার রসদ যোগাবে।

২। দিনরাত কর্মে আকন্ঠ ডুবে থাকার এক অনন্য সত্তার নাম শায়খ আরিফ উদ্দিন মারূফ দা.বা.। হুজুরের অভিধানে বসে থাকা বা জিরিয়ে নেওয়া নামক কোন শব্দ নেই। ভাবছিলাম করোনার দিনগুলোতে শায়খ বোধহয় অধ্যায়নে সময় পার করবেন। কিন্তু না! আমাদের সবাইকে অবাক করে দিয়ে ‘Hafiz Muaz Maruf’ ইউটিউব চ্যানেলের মাধ্যমে দেশবাসীকে উপহার দিতে থাকলেন একের পর এক প্রয়োজনীয় নিত্য নতুন ইসলামিক সমস্যার সমাধান। করোনায় করণীয়, রমজানকে কিভাবে অর্থবহ করে তুলব, শবে বরাত, শবে কদর; পালনীয় বর্জনীয়। ঈদের জামাআতের মাসআলা।

কি নেই হুজুরের আলোচনায়! শুধু ‘নেই’ শব্দটা ছাড়া সবকিছুই ছিল হুজুরের আলোচনায়। উপস্থাপনায় সাবলীলতা, ভাষার বিশুদ্ধতা, শ্রুতিতে মধুরতা, দালিলিক গভীরতা, মেজাজে প্রফুল্লতা। সেই সাথে ওষ্ঠধারে লেগে আছে নববী হাসির বিষ্ময়কর ঝিলিক! আরব অনারবে হুজুর মূলত লেখক ও তাফসীরকারক হিসেবে প্রসিদ্ধী লাভ করেছেন। কিন্তু এখন তো শায়খের অসাধারণ কন্টেন্টগুলো দেখে যে কোন দর্শকই হযরতকে একজন দক্ষ ইউটিউবার বলতে বাধ্য হবেন! আসলে যোগ্য আর প্রতিভাবানরা যেখানেই হাত দেন সেখানেই সোনা ফলান। আশা করি ইউটিউবে আগামী দিনগুলোতেও শায়খের এ কর্ম চঞ্চলতা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।

৩। তিনি তারুণ্যের অহংকার। একাধারে বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, মুহাদ্দিস, মুফাসসির, খতিব ও একজন আদর্শ শিক্ষক। নাম তাঁর মুফতি ফয়জুল্লাহ আমান কাসেমী। আমার মতে হুজুর উঁচু মাপের একজন লেখক হলেও পড়াশুনায় মগ্ন থাকেন সারাক্ষণ। লেখালেখি করেন কম। কিন্তু করোনায় বিধি বাম!

এবার রমজানে করোনার কল্যাণে হুজুরের লেখায় বাম্পার ফলন হয়েছে। দৈনিক যুগান্তর, আমাদের সময়, মানবকন্ঠ। অনলাইন নিউজ পোর্টাল পাথেয়, বি বার্তায় দু-হাত খুলে লেখেছেন। লেখনীর মাধ্যমে নিজের ভিতরে জ্বলতে থাকা উম্মতপনার অনল কিছুটা হলেও প্রকাশ করছেন।

গড্ডালিকা প্রবাহে ভেসে যাওয়া কওমি তরুণ লেখকদের মেজাজে শরীয়তের উপর নিয়ে আসার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। লক্ষ কোটি মুবারকবাদ আপনার মতো উম্মত দরদী মানুষদের । আজকে লিখনীর ময়দানে আপনার নিয়মিত হওয়া ‘মেঘ না চাইতে বৃষ্টির মতো’। অসহায় উম্মতের জন্য আপনার লিখনী সোনাঝরা বৃষ্টির মতন। আপনার এগিয়ে যাওয়া মানেই জাতীর কপালে সুদিনের হাতছানি।

করোনার দিনগুলোর মত সামনের দিনগুলোতেও অসম সাহস আর দরদ নিয়ে এগিয়ে যাবেন সামনে। আর আমাদের মতন কচি বালকদের ও হাত ধরে সামনে এগিয়ে নিবেন। ছোটদের এই প্রত্যাশা রইল হজরতের কাছে।

৪। তামিম ইকবাল খান। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ড্যাশিং ওপেনার। করোনার বিষাদময় দিনে সবার সুস্থ বিনোদন যোগাতে ইনস্টাগ্রামে আয়োজন করেছেন লাইভ আড্ডার। বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে পৌঁছে গেছেন ভারত,সাউথ আফ্রিকা অতঃপর নিউজিল্যান্ড। কথা বললেন নিউজিল্যান্ডের অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসনের সঙ্গে। সবাইকে অবাক করে দিয়ে উইলিয়ামসন বললেন তোমরা যে সাক্ষাতের শুরুতে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বল এটা আমার কাছে খুব ভাল লাগে।

উইলিয়ামসনের কথায় আমি যে খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছি তা না; তবে এই ভেবে ভালো লেগেছে যে, যারা মুসলিম হয়েও সালাম দেয়না বা দিতে কাচুমাচু করে তাদের জন্য অবশ্যই এটা শিক্ষনীয়। একজন অমুসলিম তোমার ধর্মের প্রশংসা করছে অথচ তুমি সেই প্রশংসিতটাকে ফেলে নিন্দনীয় বিষয়ে খাবলে পড়ছ। মুসলিম হয়েও গরু-গোবরদের অনুষ্ঠানে দেদারসে টাকা ঢালছ, সেখানেই ভীড় করে হৈ হুল্লোড়ে মজে যাচ্ছ!

মুসলিম হয়ে তাদেরকে পরমাত্মীয় বানিয়ে ফেলছ! সহিংস বৌদ্ধদের সাপোর্ট করে যাচ্ছ শান্তির বার্তা ছড়িয়ে দিতে! মনে রেখ, ওরা আদৌ শান্তির সমীরণ বইয়ে দিতে পারবেনা। ওরা পারবে মুসলিমদের কচুকাটা করে ছাড়তে। শান্তি যদি কেউ ছড়ায় তাহলে সে হচ্ছে প্রকৃত মুসলমান।

এবার আসি সেসব প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের কাছে যারা বলে ‘ইসলাম আর তরবারি সমার্থক’। তোমাদের কাছে আমার কোটি টাকার প্রশ্ন, নিউজিল্যান্ডের ক্যাপ্টেন উইলিয়ামসনের বুকে ইসলামের মহা প্রশংসনীয় সালামের প্রশংসা করতে কে বা কারা তরবারি বা পিস্তল ঠেকিয়েছে? কে তাকে বাধ্য করেছে মুসলমানদের সালামের প্রতি প্রশংসার ফুলঝুরি ছুটাতে?

আসল কথা হলো বাস্তবেই ইসলামের এই সাক্ষাৎ প্রথা অনেক সুন্দর।

তোমরা তো ভালো করেই জান যে, বিজাতীরা ইসলামের নাশ সাধনে সদা হায়েনার মতো হিংস্র আর তৎপর! তারপরও সে কেন বলতে গেল সালামের প্রথা খুব সুন্দর!!! আসল কথা হলো বাস্তবেই ইসলামের এই সাক্ষাৎ প্রথা অনেক সুন্দর। এখন কথা হচ্ছে ইসলামের কি শুধু সালামটাই সুন্দর?

না! চীর সত্য কথা হচ্ছে ইসলামের সবকিছুই সুন্দর! বিশ্বাস না হয় মুসলিম হয়ে দেখ। অবাস্তব মনে হলে ইসলামী অনুশাসন অক্ষরে অক্ষরে মেনে দেখ। মনে রেখো, জগতের সবাই তোমার সাথে ধোঁকাবাজি করলেও ইসলাম তোমার সাথে কোনদিন চিট করার কথা কল্পনাও করবে না। তুমি ইসলামকে মনে প্রাণে অনুস্বরণ করবে আর ইসলামের মালিক মহান আল্লাহ তোমাকে চীর শান্তির জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে ই ছাড়বে ইনশাআল্লাহ। বন্ধু! মনে রেখো, ‘বিশ্বাসে মিলে মুক্তি আর অবিশ্বাসে কচু।’

লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com