২৭শে মে, ২০২০ ইং , ১৩ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৩রা শাওয়াল, ১৪৪১ হিজরী

করোনায় শরীয়তের দিকনির্দেশনা জানালেন আল্লামা বোখারী

করোনায় শরীয়তের দিকনির্দেশনা জানালেন আল্লামা বোখারী

বিশ্বব্যাপী মরণঘাতী করোনা ভাইরাস ও শরীয়তের দিকনির্দেশনামূলক ফতোয়া প্রদান করেছেন জামিআ ইসলামিয়া পটিয়ার মহাপরিচালক ও শাইখুল হাদিস আল্লামা মুফতি আব্দুল হালীম বোখারী। নিচে পাথেয় টোয়েন্টিফোরডটকম- এর পাঠকদের জন্য উপস্থাপিত হলো-

প্রথম কথা হলো, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন-
أَلَا لَهُ الْخَلْقُ وَالْأَمْرُ ۗ
অর্থাৎ, আল্লাহ তা‘আলাই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা এবং হুকুমদাতা। (সূরা আ‘রাফ-৫৪)

অতএব সু-স্বাস্থ্য এবং রোগ উভয়টি আল্লাহ তা‘আলার হুকুমেই হয়।

দ্বিতীয়ত রাসূলে কারীম (স.) ইরশাদ করেন, لاَ عَدْوَى অর্থাৎ,ইসলামে ব্যাধি সংক্রমণের কোনো বাস্তবতা নেই (সহীহ বোখারী, হাদিস নং-৭৫৫৭)। তাই সকল মুসলমানের মৌলিক আকিদা হবে, যে কোনো রোগ সরাসরি আল্লাহর হুকুমেই প্রকাশ পায়।

তৃতীয়ত যেহেতু পৃথিবী আসবাবের জগত, তাই ইসলাম আসবাবকেও স্বীকৃতি দিয়েছে। যেমন হাদিসে বলা হয়েছে-
فِرَّ مِنَ الْمَجْذُومِ كَمَا تَفِرُّ مِنَ الأَسَدِ ‏
অর্থাৎ, কুষ্ঠরোগী থেকে এমনভাবে পলায়ন করো, যেমন তুমি সিংহ থেকে পলায়ন করে থাকো (সহীহ বোখারী, হাদিস নং-১৭৬৭)।
এতে বোঝা গেলো, সংক্রমণ এটাও আল্লাহর হুকুমে হয়। রোগের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই।

চতুর্থ বিষয় হলো, রাসূলুল্লাহ (স.) থেকে হযরত আলী (রা.) বর্ণনা করেন-
لَا تُدِيمُوا إلَى الْمَجْذُومِينَ النَّظَرَ وَإِذَا كَلَّمْتُمُوهُمْ فَلْيَكُنْ بَيْنَكُمْ وَبَيْنَهُمْ قَدْرُ رُمْحٍ .
অর্থাৎ, তোমরা কুষ্ঠরোগীদেরকে বারবার দেখতে যেয়োনা, আর তাদের সাথে যখন কথা বলবে তখন তাদের এবং তোমাদের মাঝখানে একটি বর্শার পরিমাণ দূরত্ব থাকা উচিত। (মুসনাদে আহমদ, হাদিস নং-৫৮১)

পঞ্চম বিষয় হলো, সাক্বীফ গোত্রের একটি প্রতিনিধি দল রাসূল (স.)-এর নিকট উপস্থিত হয়। তাদের মধ্যে একজন কুষ্ঠরোগী ছিলো। তিনি রাসূল (স.)-এর হাতে হাত দিয়ে বায়‘আত হতে চেয়েছিলেন। হুজুর (স.) তার হাতে হাত না-মিলিয়ে ইরশাদ করলেন- قدْ بَايَعْنَاكَ فَارْجِعْ অর্থাৎ, আমি তোমাকে (স্পর্শ না-করেই) বায়‘আত করালাম, অতএব তুমি চলে যাও। (সহীহ মুসলিম, হদিস নং-২২৩১)

ষষ্ট বিষয় হলো, হাদিস শরীফে প্লেগ সম্পর্কিত বর্ণনায় এসেছে-
إِذَا سَمِعْتُمْ بِالطَّاعُونِ بِأَرْضٍ فَلاَ تَدْخُلُوهَا، وَإِذَا وَقَعَ بِأَرْضٍ وَأَنْتُمْ بِهَا فَلاَ تَخْرُجُوا مِنْهَا، وفي رواية فَلاَ تَخْرُجُوا فِرَارًا مِنْهُ.
অর্থাৎ, তোমরা যদি কোনো স্থানে তাঊন তথা প্লেগ প্রকাশ পাওয়ার কথা শোনো, তখন তথায় প্রবেশ করোনা। আর যদি তোমাদের বসবাসের এলাকায় প্লেগ দেখা দেয়, তখন সেখান থেকে পালিয়ে যেয়ো না। (সহীহ বোখারী, ২/১৬২৫, হাদিস নং ৫৭২৭-৫৭২৮)

এতে বোঝা যায়, হুজুর (স.) প্লেগ-বিদূষিত এলাকায় এজন্য যেতে নিষেধ করেছেন যে, সেখানে গেলে প্লেগে আক্রান্ত হবার সম্ভাবনা আছে। যেহেতু পৃথিবী আসবাবের জগত। আর যারা পূর্ব থেকেই প্লেগ-বিদূষিত এলাকায় আছে, তাদেরকে সেখান থেকে বের হতে এজন্য নিষেধ করেছেন যে, সমস্ত সুস্থ ব্যক্তি যদি এলাকা ছেড়ে চলে যায়, তখন রোগীদের চিকিৎসা সেবা দেওয়ার মতো কেউ থাকবেনা। আবার সে যদি নিজের সাথে রোগের জীবাণুসমূহ নিয়ে অন্য এলাকায় যায়, তবে সেখানেও এই রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। অতএব, করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ মহল যে সমস্ত বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন এবং সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন- তা শরীয়তের দৃষ্টিতে বাস্তবায়ন করা জরুরী। যদি কোনো ব্যক্তি এই রোগে আক্রান্ত হয়, সমাজের অন্য লোকদের দায়িত্ব হলো, তার চিকিৎসা ও সুস্থতার জন্য যথাযথ চেষ্টা করা। আর রোগীর দায়িত্ব হলো, এমন কাজ থেকে বিরত থাকা, যার দ্বারা অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে।

চলমান পরিস্থিতিতে জামাত ও জুমার বিধান:

চলমান পরিস্থিতিতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। তবে এই পরিমাণ সতর্কতা নয়, যার দ্বারা শরীয়তের জরুরী আমল বর্জিত হয়। সুতরাং করোনা ভাইরাসের কারণ দেখিয়ে ব্যাপকভাবে মসজিদে জুম‘আ এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে নিষেধ করা যাবেনা।

উল্লেখ্য যে, একটি হাদিসে অতিবৃষ্টির সময় ঘরে নামাজ পড়ার কথা বলা হয়েছে। এটার সাথে করোনা ভাইরাসকে তুলনা করা যাবে না। কারণ, বৃষ্টি একটি নিশ্চিত বিষয়, আর কারোনা ভাইরাসে সংক্রমণ অনিশ্চিত ও সন্দেহযুক্ত বিষয়। বেশি মানুষ একত্রিত হলেই যে ভাইরাস সকলকে আক্রান্ত করবে, এটা আবশ্যক নয়। বরং আল্লাহ তা‘আলার হুকুম হলেই ভাইরাসাক্রান্ত হবে। যেমন: দেশের নিরাপত্তার জন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বাহিনীর বিরাট সংখ্যক লোক সমগ্র পৃথিবীব্যাপী বিস্তৃত।

শুধুমাত্র লোক সমাগমই যদি ভাইরাস সংক্রমণের কারণ হতো, তাহলে এদের কেউ ভাইরাসমুক্ত হতে পারতো না। তাহলে এই কারণ দেখিয়ে মসজিদে গিয়ে অল্প সময়ে নামাজ আদায় করতে কেন ব্যাপকভাবে নিষেধ করা হবে? সুতরাং করোনা ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগাক্রান্ত ব্যক্তিগণ এবং বিশেষভাবে জ্বর, সর্দি ও কাশির রোগীদের ক্ষেত্রে ঘরেই নামাজ আদায় করার পরামর্শ থাকবে। আর সুস্থ ব্যক্তিগণ স্বীয় অবস্থান থেকে সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণপূর্বক অল্প সময়ে মসজিদে নামাজ পড়বে, তবে অজু ও ফরজ নামাজের আগের-পরের সুন্নাতসমূহ ঘরেই আদায় করবে। যেহেতু অজুও একটা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, তাই অজুর সমস্ত আহকাম শরীয়ত নির্দেশিত পদ্ধতিতে খুবই গুরুত্ব সহকারে আদায় করবে। জীবাণু দূরীকরণে অজুর সাথে সাবান, হ্যান্ড-ওয়াশ ইত্যাদি ব্যবহারের পরামর্শও দেওয়া যেতে পারে।

জুম‘আর নামাজে ইমামগণ বয়ান, খুতবা, নামাজ এবং মুনাজাত খুবই সংক্ষিপ্ত করবেন। সাথে সাথে মসজিদের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার পরিপূর্ণ ব্যবস্থা করতে হবে এবং মুসল্লিগণকে মসজিদে আসার সময় ‘মাস্ক’ ব্যবহার করতে নির্দেশ করা হবে। কিন্তু একেবারে জামা‘আত বন্ধ করে দেওয়া কোনো চিকিৎসা নয়; বরং এটা একটি আধ্যাত্মিক রোগ এবং আকিদার দুর্বলতা। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ مَنَعَ مَسَاجِدَ اللَّهِ أَنْ يُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ وَسَعَى فِي خَرَابِهَا
অর্থাৎ, ঐ ব্যক্তির চেয়ে বড় জালিম আর কেউ নেই যে আল্লাহর মসজিদগুলোতে আল্লাহর যিকির আদায় করতে নিষেধ করে এবং মসজিদগুলোকে অনাবাদ করতে চেষ্টা করে। (সূরা বাক্বারা-১১৪)

সপ্তম বিষয় হলো, ইতিহাস দ্বারা প্রমাণিত যে, হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে প্লেগ দ্বারা একটি এলাকার তিন-চতুর্থাংশ লোক মৃত্যুবরণ করে, আর হযরত আনাস (রা.)-এর ৮৩ জন সন্তান প্লেগ-আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করে; কিন্তু তখনও কোনো মসজিদ বন্ধ করা হয়নি। সুতরাং রোগীরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ঘরে পড়বে, আর জুম‘আর দিনও মসজিদে না এসে ঘরে জোহরের নামাজ আদায় করবে। তবে ভাইরাস ও ভাইরাস-আক্রান্ত রোগীদের অজুহাতে ঢালাওভাবে সকলের জন্য জামা‘আত বন্ধ করা যাবে না। ইসলামী শরীয়তে জামা‘আতের গুরুত্ব এতই বেশি যে, যুদ্ধ চলাকালীন কঠিন মূহুর্তেও জামা‘আত আদায়ের তাগিদ দেওয়া হয়েছে এবং তার নির্দিষ্ট পদ্ধতিও বলা হয়েছে।

এই মুসিবত থেকে উত্তরণের পথ ও পন্থা:

মনে রাখতে হবে যে, করোনা ভাইরাস থেকে মুক্তিলাভ করার জন্য আসল পন্থা হলো, আল্লাহ পাকের দরবারে তাওবা করা এবং নিজেদের পাপের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন-
وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيُعَذِّبَهُمْ وَأَنْتَ فِيهِمْ وَمَا كَانَ اللَّهُ مُعَذِّبَهُمْ وَهُمْ يَسْتَغْفِرُونَ
অর্থাৎ, আপনি (রাসূল) যতদিন তাদের মাঝে অবস্থান করবেন, ততদিন আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে শাস্তি দেবেন না। অনুরূপভাবে তারা যতদিন ইস্তেগফার তথা ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবে ততদিন আল্লাহ তাদের উপর আজাব নাযিল করবেন না। (সূরা আনফাল-৩৩)

বর্তমানের সংকটকালীন সময়ের জরুরী দোয়া এবং করনীয় আমলসমূহ:

১. রাসূল (স.)-এর নির্দেশের অনুসরণে রোগ মুক্তির উদ্দেশ্যে সকলে সালাতুল হাজাত আদায় করবে। এটা অত্যন্ত উপকারী ও পরীক্ষিত ফলদায়ক আমল।
২. নিম্নোক্ত দোয়াসমূহ বেশি বেশি পাঠ করবে:
(ক) رَبِّ اغْفِرْ لِي، وَارْحَمْنِي
(ইবনে মাজাহ, হাদিস নং-৮৯৪)
(খ) اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْبَرَصِ وَالْجُنُونِ وَالْجُذَامِ وَمِنْ سَيِّئِ الأَسْقَامِ
(আবু দাঊদ, হাদিস নং-১৫৫৪)
৩ بِسْمِ اللَّهِ الَّذِي لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهِ شَيْءٌ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ.
হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে, এই দোয়া সকালে পাঠ করলে সারাদিন নিরাপদে থাকবে আর বিকালে পাঠ করলে সারারাত্রি নিরাপদে থাকবে। (আবু দাঊদ ২/৩৫৩, কিতাবুল আদব, হাদিস নং-৫০৮৬,)
৪. আয়াতুল কুরসী পাঠ করবে। রাসূল (স.) সমস্ত বিপদ-আপদ থেকে নিরাপদ থাকার জন্য সাহাবায়ে কেরামকে আয়াতুল কুরসীর তেলাওয়াত শিক্ষা দিয়েছেন। এটা পাঠ করে নিজের শরীরে এবং বাচ্চাদের শরীরে দম করবে।
৫. সকাল-বিকাল সূরা ফাতিহা তেলাওয়াত করবে। সূরা ফাতিহার আরেক নাম দোয়ার সূরা।
৬. সকাল-বিকাল সূরা ফালাক এবং সূরা নাস পাঠ করে নিজের শরীরে এবং বাচ্চাদের শরীরে দম করবে।

আল্লাহ পাক আমাদের সকলকে করোনা নামক এই মহামারি ভাইরাস থেকে হেফাজত করুন এবং ভাইরাসাক্রান্ত সকলকে এই রোগ থেকে মুক্ত করে সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন যাপনের উপযোগী করে দিন।

দোয়া কামনায়
মোহাম্মদ আবদুল হালীম বোখারী
মহা-পরিচালক, আল-জামিয়া আল-ইসলামিয়া পটিয়া, চট্টগ্রাম।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com