৫ই এপ্রিল, ২০২০ ইং , ২২শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১১ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

করোনা কোন ছোঁয়াচে রোগ নয় | আবুদ্দারদা আব্দুল্লাহ

`ঈমানে মুফাচ্ছলের মধ্যে সাতটা বিষয়ের উপর ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে ভালো মন্দ তাকদিরের উপর ঈমান আনা’

আমি ঢাকা শহরে যখন প্রথম আসি তখন আমার বয়স পাঁচ কি ছয় বছর। ঢাকায় আসার তিন চারদিন পরেই মালিবাগ মাদ্রাসার মক্তবে ভর্তি হয়েছি। আব্বা প্রত্যেকদিন ফজরের নামাজের পরে মাখনযুক্ত একটা বনরুটি কিনে দিতেন। বিসমিল্লাহ বলে বনরুটি খেয়ে মক্তবে যেতাম। মক্তব ছুটি হওয়ার পরে আব্বা আর আমি একসাথে যখন খানা খেতে বসতাম তখন কি কি পড়েছি মক্তবে তার বিস্তারিত শুনতেন। ছোটখাটো কোন দোয়া শিখলে সেটা বলতে বলতেন। আমি বলতাম। আব্বার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠতো। তিনিও আমার সাথে সাথে ঠোঁট মেলাতেন।

আমার আব্বা পড়াশোনা তেমন করতে পারেন নাই, সুযোগ ছিলো না একদম। তা ছাড়া আব্বা একদম ছোট থাকতেই দাদা মারা গিয়েছিলেন। দাদী আর ছোট দুই বোনকে দেখাশোনা করতে গিয়ে পড়াশোনা তেমন করতে পারেন নাই। তবে শৈশবে মুজাহিদে আজম মাওলানা শামসুল হক ফরীদপুরী রহমাতুল্লাহি আলাইহির সংস্পর্শ পেয়েছিলেন। সে কথা এখনো খুব গর্ব করে বলেন। আমাদের সব ভাই-বোনের হাফেজ হওয়ার পিছনে ছদর সাহেব হুজুর রহমাতুল্লাহি আলাইহির দোয়াও আছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত লেখার ইচ্ছা আছে ইনশাআল্লাহ।

তো খাবার সময়ে প্রত্যেকদিন আমার কাছ থেকে আব্বা মক্তবের পড়া শুনতেন। যেদিন নুরানী কায়দা শেষ করে আমপারা নিলাম। সেদিন আব্বা জিগ্যেস করলেন, ঈমানে মুজমাল, ঈমানে মুফাচ্ছল পারি কি না। আমি বললাম, না।
বললেন, মক্তব আজকে গিয়ে অন্তত ঈমানে মুজমালটা যেন শিখি। সেদিন ঈমানে মুজমাল শিখলাম। বিকালবেলা আব্বাকে ঈমানে মুজমাল শুনালাম। খুব খুশি হলেন। বাখরখানি আর মিষ্টি খাওয়ালেন আমাকে। খুব সুস্বাদু লাগলো। বাখরখানির লোভে পরেরদিন ঈমানে মুফাচ্ছলও মুখস্থ করে ফেললাম। আবারও বাখরখানি আর মিষ্টি কপালে জুটলো।

ঈমানে মুফাচ্ছলের মধ্যে সাতটা বিষয়ের উপর ঈমান আনার কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে একটা হচ্ছে ভালো মন্দ তাকদিরের উপর ঈমান আনা। আব্বা তাকদিরের বিষয়ে গুরুত্ব সহকারে অনেক কিছু বললেন। আমাদের আকাবিরদের তাকদিরের উপর ঈমান কত মজবুত ছিলো সেসব বললেন।

আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি তখন মালিবাগ মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল। কাজী সাহেব হুজুরের উদাহরণ দিলেন। সব বড় বড় আল্লাহ ওয়ালাদের উদাহরণ। আমার কেন জানি মনে হয়, মালিবাগ মাদ্রাসার বড় বড় মুহাদ্দিসানে কেরামদের ছোহবতে থাকতে থাকতে আব্বা নিজেই একজন মহিরুহে পরিণত হয়েছেন। প্রায় পয়ত্রিশ বছর মালিবাগ মাদ্রাসায় খেদমত করেছেন। এখনো আব্বার কথা শুনলে অবাক হয়ে হা করে থাকিয়ে থাকি। আব্বা যখন বয়ান করেন তখন অনেক বড় বড় আকাবিরদের কথার উদাহরণ দেন। জ্ঞানের কথা বলেন। বয়ানে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন নামাজের উপরে। যখনই যার সাথে দেখা হয় নামাজের প্রতি গুরুত্বের কথা বলেন। নামাজের জন্য কখনো কাউকেই তিল পরিমাণ ছাড় দেন না। নামাজে অলসতার কারণে আমরা অনেক মার খেয়েছি আব্বার হাতে। সেই দিনগুলোর কথা এখন খুব মনে পড়ে। মন থেকে আব্বার জন্য দোয়া আসে।

বাসে উঠলে বাসের হেল্পার, ড্রাইভার। লঞ্চে উঠলে লঞ্চ চালক, রিক্সায় উঠলে রিক্সা চালক ইত্যাদি যারে যেখানে পান সুযোগ হলেই নামাজের দাওয়াত দেন। লঞ্চে পদ্মা নদী পার হতে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘন্টা সময় লাগে। এই সময়টাতেও চুপচাপ বসে থাকেন না। ছোটখাটো একটা মজমা জমিয়ে বসেন। নামাজের দাওয়াত, হজ্ব করার দাওয়াত দিতেই থাকেন। শয়তানের ওসওয়াসার কারণে আমরা তখন লজ্জায় কুঁকড়ে যাই কারণ আব্বাকে তখন ক্যানভেসার মনে হয়। পরক্ষণে আবার তওবা করি, মনটা ভালো হয়ে যায়। কারণ আব্বার কারণে এই লোকগুলো হয়তো নামাজ পড়বে। যাদের টাকা আছে তারা হজ্জ করবে। সেটা হাশরের ময়দানে নাজাতের উসিলা হবে আব্বার জন্য এবং আমাদের সকলের জন্য।

তো যেদিন ঈমানে মুফাচ্ছল শিখলাম সেদিন তাকদিরের উপর ঈমান আনার কথা বেশ গুরুত্বের সঙ্গে বললেন। জোর দিয়ে বললেন। এই কারণে যখনই কোন বিপদের সম্মুখীন হই কিম্বা আনন্দের মুখোমুখি হই তখনই শৈশবে আব্বার সেই তালিমের কথা মনে পড়ে।সাথে সাথে আল্লাহ পাকের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ হই। সফলতা পেলে শুকরিয়া করি আর ভুল কিছু করলে ইস্তেগফার পড়ি ৷ ধৈর্য ধরার দরকার হলে ধৈর্য ধরি। বেশ আনন্দ লাগে।

`ইসলামে ছোঁয়াচে বলে কোন রোগ নেই। এই রোগ যার ভাগ্যে আছে তার হবেই হবে। সুতরাং তাকদিরে যারা বিশ্বাস করেন তারা এই কথা বলতেই পারেন না’

বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল টিমের সাবেক একজন ফুটবলার। আমার খুব পরিচিত একজন মানুষ। তিনি মাঝেমধ্যে আমাকে ফোন দেন। হতাশার কথা বলেন। আমি তাকে উৎসাহ দেই, তাকদিরের উপর ঈমান আনার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করি। আব্বার কাছ থেকে পাওয়া আমার শৈশবের শিক্ষার কথা বলি। বিপদে আপদে আল্লাহ পাকের দিকে মুতাওয়াজ্জুহ হওয়ার কথা বলি। আমার সেই ভাই আল্লাহ পাকের রহমতে এখন হতাশামুক্ত। বেশ ভালো লাগে।

ইদানীং করোনাভাইরাস নামে একটা রোগ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। এর থেকে বাঁচার উপায় হিসেবে গবেষকরা বিভিন্ন ধরনের বয়ান দিচ্ছেন। যেমন, কারো সাথে হাত মেলানো যাবে না, কোলাকুলি করা যাবে না। কারণ হিসেবে তাঁরা বলছেন করোনা ছোঁয়াচে রোগ।

ইসলামে ছোঁয়াচে বলে কোন রোগ নেই। এই রোগ যার ভাগ্যে আছে তার হবেই হবে। সুতরাং তাকদিরে যারা বিশ্বাস করেন তারা এই কথা বলতেই পারেন না। তিরমিজি শরীফে পড়েছি কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত এক সাহাবীর কথা। সবাই যখন খেতে বসতেন তখন তিনি দূরে থাকতেন। তখন নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে সাথে নিয়ে এক পাত্রে খাবার খেয়েছেন এবং ঘোষণা করেছেন যে, ছোঁয়াচে বলে কোন রোগ নেই।

বাংলাদেশে করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পরে গত কয়েকদিনে সালাম দেয়ার পরে মোছাফাহা করতে যেয়ে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি। কেউ সালামের পরে মোছাফাতে (হাত মেলানো) আগ্রহী না। আর কোলাকুলি তো দূরের কথা। অথচ এগুলো নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাত। সুন্নাত পালন করলে রোগ পালায় অথচ আমাদের অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো।

আমার পীর ও মুরশিদ আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ সাহেবের লিখিত, “মাওলানা ফরিদ এখন কারাগারে” বইটার মধ্যে হুজুর বসন্ত এবং যক্ষ্মা রোগের কথা উল্লেখ করতে যেয়ে লিখেছেন যে, “যক্ষ্মা ও বসন্ত রোগীদের সাথেই আমার জেলের পুরো সময়টা কেটেছে। এরাই একান্ত ভালোবাসায় আমার থালা বাসন কাপড় চোপড় ধুয়ে দিতো। প্রতিদিন মুছে ঘর সাফ সুতরা করে দিতো”। হুজুর কোথাও ছোঁয়াচে রোগের কথা উল্লেখ করেন নি।

এমনকি তারা হুজুরের জামা কাপড় পর্যন্ত ধুয়ে দিয়েছে তারপরেও হুজুরের কিছু হয়নি। কারণ একটাই, সেটা হচ্ছে তাকদির। তাকদিরে অর্থাৎ আপনার কপালে যেটা আছে সেটা একদিন না একদিন হবেই। রোগীদের সেবা যত্ন করতে হবে। যদি রোগ বালাই ছোঁয়াচে হতো তাহলে রুগীকে সেবা যত্ন কিম্বা দেখতে যাওয়ার কথা নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন না।

সেদিন শুনলাম, করোনা সন্দেহে ইরানে একলোককে আত্মীয় স্বজন ত্যাগ করে চলে গিয়েছে। কত মারাত্মক একটা সংবাদ। এরকম আচরণ আমাদের বাংলাদেশে হচ্ছে কি না কে জানে। আল্লাহ পাক এসব আচরণ থেকে আমাদেরকে হেফাজত করুন।

বাদবাকি সবসময় পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে। নিজের আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার কথাও ইসলাম বেশ জোর দিয়ে বলেছে। বেশি বেশি দোয়া ইস্তেগফার পাঠ করতে হবে। আল্লাহুম্মা ইন্নী আউজুবিকা মিনাল বারাছি ওয়াল জুনুনিবওয়াল জুযামি ওয়ামিন সাইয়িইল আসকাম। প্রত্যেক নামাজের পরে একশবার এই দুয়াটা পড়া। আল্লাহ পাক করোনা নামক মহামারী থেকে পুরো বিশ্বকে হেফাজত করুন।

লেখক : গল্পকার

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com