২২শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং , ১০ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ২৮শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

করোনা ভাইরাস, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

স্বাস্থ্য। রিন্টু আনোয়ার

করোনা ভাইরাস, ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

চীনে করোনা ভাইরাসের হানার জেরে বিশ্বব্যাপি স্বাস্থ্যগত জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা। সেইসাথে ভাইরাসটির সংক্রমণ, প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে বিশ্বের সমস্ত হাসপাতালকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ভাইরাসটির সংক্রমণ এড়াতে বিশ্বের অনেক দেশের বিমানবন্দরে চীনা নাগরিকদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। সতর্কতা প্রশ্নে পিছিয়ে নেই বাংলাদেশও। চীনে প্রাদুর্ভাব হওয়া ‘করোনা ভাইরাস’ এর বিস্তার রোধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে থার্মাল স্ক্যানিং শুরু করতে দেরি হয়নি। এ বিষয়ে বিমানবন্দরের কর্মীদের বিশেষ প্রশিক্ষণও দিয়েছে আইইডিসিআর৷ এরইমধ্যে চীনাদের বাংলাদেশের অন অ্যারাইভাল ভিসা বাতিল করা হয়েছে।

করোনা থেকে রক্ষায় চীন থেকে ফিরিয়ে আনা ৩১২ জনের দশজনকে আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হয়েছে। লক্ষণ হিসেবে জ্বর, সর্দি দেখে তাদের সাত জনকে কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। একই পরিবারের বাবা-মা এবং সন্তানসহ ৩ জনকে ভর্তি করা হয়েছে সিএমএইচে। করোনাভাইরাস আক্রান্ত সন্দেহে চীন থেকে বাংলাদেশের নাগরিকদের দেশে ফিরিয়ে আনার ঘটনাকে অবৈজ্ঞানিক বলেছেন কেউ কেউ। তাদের মতে, ফেরত আনাদের মধ্যে একজন আক্রান্ত থাকার অর্থ এই ভাইরাসকে চীন থেকে উড়িয়ে নিয়ে আসা। তা ছাড়া পরীক্ষায় ধরাও পড়বে না, কারণ এই ভাইরাস দু’সপ্তাহ পর্যন্ত শনাক্ত হয় না। এই মতের ব্যক্তিদের পরামর্শ ফেরত আনাদের চিকিৎসাটা চীনে হওয়াই ভালও ছিল। কারণ তাদের চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের চেয়ে অনেক উন্নত। ১৪ দিন চায়নায় আলাদা জায়গায় রেখে এরপর কি আনা যেতে না?

গবেষকরা যেহেতু ১৪ দিনের একটা সময়ের কথা বলেছে; সেটা তো চায়নাতেই আলাদা রেখে এরপর ফিরিয়ে আনা যেত। অস্ট্রেলিয়া তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে তাদের মূল ভূখণ্ডের ২০০০ মাইল দূরে একটা দ্বীপে আলাদাভাবে রেখেছে ১৪ দিনের জন্য। আর আমাদের আশকোনার হাজি ক্যাম্প। তা পৃথিবীর সব চাইতে ঘনবসতি পূর্ণ শহর ঢাকা লাগোয়া। এই ভাইরাস যদি ঢাকা শহরের মত একটা শহরে ছড়িয়ে যায়; তাহলে এর ফল কি হবে একমাত্র মহান আল্লাহ্ই জানেন।

করোনার চেয়ে দুর্বল চিকুনগুনিয়া, ডেঙ্গু মোকাবেলায় আমরা কামান দাগিয়েও কিছু করতে পারিনি। এমন কি সিটি নির্বাচনী ঢামাঢোলেও কোনো আলোচনা হয়নি এ নিয়ে।

করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশটির সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বিশেষ বৈঠকে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বলেছেন, ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে চীন। তাকে বা চীনাদের এভাবে নরম কথায় কষ্ট বা দুরাবস্থা স্বীকারের অভ্যাস কম। এরপরও ভয়াবহতার প্রকাশ ঘটেছে চীনা প্রেসিডেন্টের কথা। বোঝাই যাচ্ছে, পরিস্থিতির ভয়াবহতা ও ব্যাপকতা। চীনে এখন পর্যন্ত এই ভাইরাসে মৃতের সংখ্যা তিন শতাধিক। আগেই বলা হয়েছে এটা প্রকৃত সত্য নয়। আংশিক তথ্য। চীন সরকার যতটা বলছে তার চেয়েও পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সরকারিভাবে যে সংখ্যা বলা হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে আক্রান্তের সংখ্যা আরও কয়েক গুণ বেশি।এখন পর্যন্ত সেখানে প্রায় এক লাখ মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত বলে দাবি চিকিৎসা সংশ্লিষ্টদের। কেবল উহান শহরেই অন্তত ৯০ হাজার মানুষ করোনাভাইরাসে আক্রান্ত।

গত ডিসেম্বরের শেষের দিকে হুবেই প্রদেশের রাজধানী শহর উহানে প্রথম ফ্লু টাইপের এই করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। এমন এক সময় এই ভাইরাসটি দেখা দিল যখন চীন নববর্ষ উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। নববর্ষের ছুটিতে চীনের কোটি কোটি মানুষ দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে ঘুরতে যায়। এমন অবস্থায় এই ভাইরাস আরও বেশি ছড়িয়ে পরতে পারে বলে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সে কারণে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি খারাপ হতে শুরু করায় চীনা কর্তৃপক্ষ উহান থেকে চলাচলকারী সকল যানবহন বন্ধ ঘোষণা করেছে। হুবেই প্রদেশে ভ্রমণে কড়া সতর্কতা জারি করেছে দেশটির সরকার। চীনে এই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর গত ২১ জানুয়ারি চীন থেকে আসা বিমানযাত্রীদের পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ সরকার। রোববার পর্যন্ত ২ হাজার ১৯০ জনকে পরীক্ষা করা হলেও কারও শরীরে করোনা ভাইরাস পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। চীন থেকে আসা দুই হাজার জনকে পরীক্ষা করে করোনা ভাইরাস শনাক্ত করা না গেলেও বাংলাদেশ ঝুঁকিতে রয়েছে বলে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বনের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে একবার ভাইরাস চলে এলে দ্রুতই তা বহু মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। তাই জনসচেতনতা বাড়ানো তাগিদও দিচ্ছেন তারা।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশেরও বাণিজ্যিক সম্পর্ক গাঢ় বলে ব্যবসায়ী ও নাগরিকদের বেশ আসা-যাওয়া রয়েছে। বাংলাদেশে অনেক প্রকল্পে চীনা নাগরিকরা কাজ করছেন। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল ও পাকিস্তানে নতুন ধরনের এই ভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার খবর গণমাধ্যমে এসেছে। আক্রান্ত সন্দেহে ভারতের কেরালা ও মহারাষ্ট্রে শতাধিক মানুষকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। এ ছাড়া, চীনে প্রাদুর্ভাব ঘটলেও বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, নেপাল, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফ্রান্স এবং যুক্তরাষ্ট্রেও লোকজন এই ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছে।

এরইমধ্যে ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে চীনের অন্য অঞ্চলসহ থাইল্যান্ড, তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায়। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও এ ভাইরাসে আক্রান্ত এক ব্যক্তিকে শনাক্ত করা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের সবাই সম্প্রতি উহান ভ্রমণ করেছেন বা সেখানে বসবাস করেন। প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছে এ ভাইরাস মানুষের ও প্রাণীদের ফুসফুস সংক্রমণ করতে পারে। ভাইরাসজনিত ঠাণ্ডা বা ফ্লু’র মতো হাঁচি-কাশির মাধ্যমে মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়ে পড়ছে করোনা ভাইরাস। এতে সংক্রমিত হওয়ার প্রধান লক্ষণগুলো হলো শ্বাসকষ্ট, জ্বর, কাশি, নিউমোনিয়া ইত্যাদি। শরীরের এক বা একাধিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিষ্ক্রিয় হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো এখনো ভাইরাসটির কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় সংক্রমিত ব্যক্তিদের থেকে দূরে থাকা।

বাংলাদেশ-চীন বাণিজ্য সম্পর্ক, নিয়মিত যাতায়াতের ব্যাপকতায় কারো ভাইরাসটি বহন করে নিয়ে আসা অসম্ভব নয়। বাংলাদেশের বিমাবন্দরের কর্মীদের এর আগে সার্স ভাইরাস ও সোয়াইন ফ্লু নিয়ে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে এবার করোনা ভাইরাস হ্যান্ডেল করা সহজ হবে বলে আশা করা যায়৷ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে দেশের স্থল বন্দরগুলোতেও। ভাইরাসটি নতুন হওয়ায় এখনই এর কোনও টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি রোগটি ঠেকানোর চিকিৎসাও নেই। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মানুষকে নিয়মিত হাত ভালোভাবে ধোয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠান্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। এশিয়ার বহু অংশের মানুষ সার্জিক্যাল মুখোশ পরা শুরু করেছে। আপাতত প্রতিকার হিসেবে এ ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলছেন বিজ্ঞানীরা।

ধারনা ও তত্বগতভাবে নানা কথা বলা হলেও নতুন হওয়ায় ভাইরাসটি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো অজানা। তবে ভাইরাসটি মার্স এবং সার্সের চেয়ে কম সিভিয়ার, সেটা বোঝা যায়। এটি শুরু হয় জ্বর দিয়ে। এরপর দেখা দেয় কাশি, গলা ব্যথা৷ অনেকের তীব্র শ্বাসকষ্ট হয় এবং নিউমোনিয়া হয়ে যায়। এর প্রতিষেধক এখনো আসেনি। প্রতিরোধক হচ্ছে- হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, বারবার হাত ধোয়া। হাত দিয়ে নাক বা মুখ না ঘষা। ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা। বলা হয়ে থাকে অনেক কিছু শেখার আছে চীনের কাছে। বিদ্যার্জণের গুরুত্ব বোঝাতে সুদূর চীন যাওয়ার তাগিদ রয়েছে ইসলামেও। দ্রুততা ও শটকাটে কঠিন কাজকে সহজ করার শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে চীনের এই করোনা ভাইরাস মোকাবেলার তৎপরতায়ও। রহস্যময় ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নতুন একটি হাসপাতাল নির্মাণ শুরু করেছে চীন। উহান সেন্ট্রাল সিটিতে হাসপাতালটি তৈরি হবে মাত্র ১০ দিনে। ২৫ হাজার বর্গফুটের হাসপাতালটিতে শয্যাসংখ্যা এক হাজার।

এর আগে, ২০০২-০৩ সালে চীনে সার্স ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে প্রায় সাড়ে তিনশ ও হংকংয়ে প্রায় তিনশ জনের মৃত্যু হয়। তখন বেইজিংয়ের আশপাশে সিভিয়ার অ্যাকুইট রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা সার্স ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দিতেও নতুন হাসপাতাল তৈরি করা হয়। বেইজিংয়ে সেসময় যে কাঠামোতে হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়, করোনা ভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসায় নতুন হাসপাতালটিও একই কাঠামোর। গত বছর কয়েক থেকে নানা ছুতায় অভিজ্ঞতার্জণের জন্য রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকা খরচ করে বিদেশ সফরের একটি বাতিক তৈরি হয়েছে বাংলাদেশে।

চলমান ভাইরাস মৌসুমে বাংলাদেশ থেকে এ বিষয়ে অভিজ্ঞতা নিতে আগ্রহী মেলেনি। এই শ্রেণিটি বড় মতলববাজ। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বাতিক কেটে গেছে? পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে এলে চীনে ম্যাজিক গতিতে তৈরি হাসপাতালগুলো দেখে অভিজ্ঞতা অর্জণের কথা ভাবা যেতেও পারে। নিশ্চয় তখন আগ্রহীর অভাব হবে না। আক্রান্তের ঝুঁকিও থাকবে না।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com