৯ই এপ্রিল, ২০২০ ইং , ২৬শে চৈত্র, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ই শাবান, ১৪৪১ হিজরী

করোনা ভাইরাস : দালাল আলেমদের কথকতা

করোনা ভাইরাস : দালাল আলেমদের কথকতা

যারওয়াত উদ্দীন সামনূন : লিখছিলাম চলমান ইস্যু নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর বিষয়ে। তবে নিজের স্বাভাবিক মৃত্যুতে যেন জানাযায় আপনাদের পাই- তাই শুরুতে এক ওয়াজাহাতনামা লিখতে হচ্ছে।

সাধারণভাবে আমার স্বাভাবিক ধর্মীয় আবেগ বেশি। আমি ধর্ম নিয়ে ভাবতে পছন্দ করি। প্রেরণাটা ছোট বেলা থেকেই।

প্রায় ১২-১৩ বছর টাকা জমিয়ে আমি হজ্জ করেছি। বড় অংক তো বটেই, সামান্য একটা চিপস (আমার তখনো গোঁফ উঠেনি মুখে) বা বিস্কুট কেনার পয়সাটুকুও আমি জমিয়েছি। অবশ্য বুযুর্গদের দু’আও আমাকে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে সাহায্য করেছে।

আমার হিফজ শেষ করা আর বোনের বিয়ে কাছাকাছি সময়ে হয়েছে। বাবার দুই ঘনিষ্ঠতম মুরুব্বী হযরত মাওলানা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ ও মাওলানা মুফতি নুরুল্লাহ সাহেব -নাওয়ারাল্লাহু মারকাদাহুমা- এর একজন কাজী সাহেব হুযুর তো বিয়েই পড়িয়েছেন। আর যেহেতু মুফতি সাহেব হযুর ঢাকায় থাকতেন না, তাই বাবা কয়েকদিন পর আমাদের তিন ভাই ও বোনজামাইকে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া গেলেন হুযুরের সাথে সাক্ষাত করাতে। বিদায়ের সময় হুযুর আমাদের সবাইকে এক হাজার ও বাবাকে দুই হাজার টাকা হাদিয়া দিলেন হুযুরের বিখ্যাত বুক পকেট থেকে।

ছোট মানুষ, তখন ১ হাজার টাকা অনেক টাকা। আমি কি করবো বুঝতে না পেরে সাথে সাথেই ভাইয়ার হাতে দিয়ে দিলাম। যেন আমি কেবল বাহক, টাকাটা আমাকে দেয়া হয়নি। বাবা বিষয়টা লক্ষ্য করে হুযুরকে বললেন যে, ওর একটা হজ্জ ফান্ড আছে। খুব শখ হজ্জে যাবে। তারপর হুযুর কিছু একটা বললেন। আমার যেহেতু বড় আলেমদের থেকে ১০০ হাত দূরে থাকার অভ্যাস, ফলে সেই মুহুর্তের অভ্যাসের বিপরীত পরিবেশে প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিলাম। তাই ভুলে গেছি কথাটা।

অনেকদিন পর আল্লাহ্‌ তা’আলার দয়া ও করুণায় আমার হজ্জ ও যিয়ারত নসীব হয়, তারপর আরো একবার লিল্লাহিল হামদ।

জীবনে কোন অর্জন থাকার তো প্রশ্নই আসে না, তবে একাধিক শাফা’আতের হাদীসের উপর আমল করার তওফিক আল্লাহ্‌ দয়া করে আমাকে দিয়েছেন।

এবার মূল আলাপে যাই।

মসজিদুল হারামে অনেক বিশেষায়িত স্থান আছে দু’আ কবুলের। সেগুলো ছাড়াও পুরো মাতাফই দু’আ কবুলের জন্য বিশেষায়িত, যদিও স্তর বিন্যাসে তা থাকবে একটু নিচে। ‘আল্লাহ্‌ আমাকে জান্নাত দাও’ – এই দু’আর সুফল আপনি নগদ পাবেন না। কিছু দু’আ থাকে বেশ বড় কিছু প্রাপ্তির লক্ষ্যে। কিন্তু মাতাফ এতো চমৎকার স্থান যে, সেখানে যত ছোট দু’আই করুন তা-ও কবুল হয়ে যায়। একদিন মাগরিবের পর প্রকৃতির ডাক এল।

অগ্রাহ্য করে একটা তওয়াফ করলাম, ভুলেও গেলাম। তওয়াফ শেষে গ্লাসের পর গ্লাস যমযম খেলাম। একটু পর এশা, একটা সুবিধামত স্থানে বসে পড়লাম। খানিকবাদে সেই পুরনো ডাক দ্বিগুণ জোড়ালো হয়ে ফিরে এলো। এখন যদি উঠে যাই অযু করতে, তবে হজ্জের ভিড়ে এশার নামায ছুটে যাবে নির্ঘাত। কি করি! সহজ সমাধান। দু’আ করলাম। যতদূর মনে পড়ে এশার পর আরো একটা তওয়াফ করে তারপর বাসায় ফিরেছি।

বান্দার সাথে আল্লাহ্‌ তা’আলার মু’আমালা এমন না যে, বান্দাকে তিনি বড় কিছু না দিলে ছোট কিছু দিবেন। বরং আল্লাহ্‌ তা’আলার শান এটাই যে, সে ছোট কিছু চাইলে সেটাকে আরো বড় বানিয়ে তিনি কবুল করবেন।

এই মাতাফ এখন বন্ধ। হাতীমে নামায পড়ে, মুলতাযিমে বুক ঠেকিয়ে কান্নাকাটি করে, হজরে আসওয়াদে চুমো খেয়ে কেউ এখন আর দু’আ করতে পারছে না।

আপনার কি ধারণা, আরবের সাধারণ মানুষের জানা নেই কোথায় দু’আ করলে তারা মুক্তি পাবে করোনা ভাইরাস থেকে?

আপনার কি ধারণা, আরবের উলামায়ে কেরাম এতোটাই দালাল?

আব্দুল মুত্তালিব। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দাদা। যখন আবরাহা এলো কা’বা ধ্বংস করতে, তখন তিনি কি করলেন? আল্লাহ্‌র ঘরকে আল্লাহ্‌র যিম্মায় ছেড়ে দিলেন। আল্লাহ্‌ তা’আলা ঠিকই আবাবিল পাঠিয়ে কা’বার হেফাজত করেছেন। আমার আল্লাহ্‌ সেই একই সত্তা, আপনার আল্লাহ্‌ কে?

দৃশ্যটা কল্পনা করুন। মক্কা খালি। আব্দুল মুত্তালিব নিজের পথে। নিঃসন্দেহে পুরো মাতাফ তখন খালি। ঠিক এখনকার, এই মুহুর্তের মত।

আল্লাহ্‌ তা’আলা সেদিন যদি আবাবিল পাঠান তাঁর বায়তুল্লাহ যাদের কারণে খালি তাদের রুখতে, যারা বায়তুল্লাহের প্রতি মানুষের ভীতি তৈরী করছে তাদের বিরুদ্ধে, তবে আজকে কেন ছোট ছোট পাখিরা কেবল উড়ে বেড়াবে? তবে কি আব্দুল মুত্তালিবের চেয়ে আল্লাহ্‌র কুদরতের উপর আপনার বিশ্বাস কম?

আল্লাহ্‌ তা’আলা যদি আবারাহাকে ধ্বংস করেন বায়তুল্লাহে ইবাদত না হওয়ায়, তবে বছরের পর বছর ধরে একটা দালাল, কারো মতে –মা’আযাল্লাহ- মুলহিদ শায়খ সুদাইসীর পেছনে কেন বছরের পর বছর তাঁর বান্দাদের ইবাদত নষ্ট হতে দিচ্ছেন? সারা দুনিয়া থেকে মানুষ তাঁর ইবাদতের জন্য আসছে, কতজন কত কষ্ট করে আসছে, আল্লাহ্‌’র প্রেমে আসা তাঁর নিজেরই এই বান্দাদের সাথে –নাঊযুবিল্লাহ- তাঁর কি শত্রুতা যে তাদের ইবাদত তিনি –আপনার ফতওয়া মতে- নষ্ট হতে দিচ্ছেন?

কা’বার আশেপাশে অনেক উলটাপালটা করা যায়। ভিন্ন অর্থে নিয়েন না, এটা শাব্দিক অর্থে না। বা অনেকটা শাব্দিক অর্থেও। আল্লাহ্‌ তা’আলার রহমত ও মাগফিরাতের সাগরে সব ভেসে যায়। কিন্তু মসজিদে নববীতে ঢুকলেই আপনি পুরো সিধা হয়ে যাবেন।

প্রথম যেদিন যিয়ারতে গিয়েছি, প্রথমেই সুযোগ পেয়েছি রিয়াজুল জান্নাহতে নামায আদায়ের। এতো কাছ থেকেও আমার ফিরে যেতে মন চাচ্ছিলো প্রতি মুহুর্তে। হোটেলে না, একেবারে মক্কায়, বায়তুল্লায়। মন চাচ্ছিল আরো একটু কান্নাকাটি করে আসি। আরো একটু পাকসাফ হয়ে তারপর আসি।

আমি নাহয় গোনাহগার। তাই এমন মনে আসাটা স্বাভাবিক। কিন্তু উপলব্ধির বিষয় হলো, যারা আমার থেকে কোটি কোটি গুণ সৎকর্মপরায়ণ, বুযুর্গ – তাদের অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যায়।

আগেকার কথা বাদ দিন, এই একশ বছর আগেও মসজিদে নববীতে বেয়াদবী করায় প্রকাশ্যে মাটি ফাঁক হয়ে গিলে নেয়ার ঘটনা আছে।

সেইখানে, মিম্বরে রাসূলে বসে, যেই মানুষটা খুতবা দেয়, সে সরকারের দালাল?

সে লাঠির ভয়ে মেনে নেবে সব? কোটি কোটি মানুষকে ‘যিয়ারতুন নবী’ থেকে করবে বঞ্চিত? আপনার না আকীদা যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জীবিত?

আল্লাহ্‌ তা’আলা আপনাকে একটা মস্তিষ্ক দিয়েছেন। এটার কারণে আপনি একটা কুত্তা-বিলাইয়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠত্বের ভূষণে ভূষিত হয়েছেন। সেটা যদি ব্যবহার না করেন, তবে রাস্তায় গিয়ে খাবার খুঁজুন।

বিষয়টা মোটেও আবেগের নয়। আপনার ফালতু আবেগ দিয়ে ইসলামের কোন উপকার হয়নি। উল্টো প্রায়ই অপকার হয়েছে। কখনো কখনো –এখন যেমন- আপনার আবেগ এতোই ফালতু হয় যে, এর তখন লাভ কিংবা ক্ষতি পৌঁছানোর মত কিছু থাকে না। আপনি তখন রূপান্তরিত হন স্রেফ কেবল একটা আবর্জনায়।

মসজিদে মুসুল্লী আসা বন্ধ করা দরকার? করে দিন।

ফতওয়া দরকার? বিশ্ববিখ্যাত আলেমরা মুসুল্লীদের জন্য মসজিদ বন্ধের পক্ষে ফতওয়া দিচ্ছেন।
সিদ্ধান্ত নিতে সাহস দরকার? হারামাইনকে আল্লাহ্‌ আপনার চোখের সামনে রেখেছেন।
জিদটা কেন করছেন? আল্লাহ্‌ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য না সমাজে নিজের প্রভাব জিইয়ে রাখার জন্য? জিজ্ঞেস করুন নিজেকে, নিজের সাথীকে।

করোনা ভাইরাসটা কেউ একা মোকাবেলা করতে পারবে না। একজন যতই সাবধান থাকুক, সে মুক্তি পাবে না। যদি পুরো সমাজে একজনও অসতর্ক, অসচেতন থাকে, তবে সে পুরো সমাজকে ঝুঁকির মুখে ফেলবে।

একজন অসতর্ক মানুষ হাজারজনের জন্য বিষফোঁড়া

সমাজের প্রতিটা অঙ্গের নিজ নিজ দায়িত্ব পালন করতে হবে। প্রায় সবাই করছেও। শপিংমল খোলা কিনা সেই সংবাদের পেছনে ডাক্তাররা ছুটছেন না। বলছেন না যে, শপিংমল বন্ধ না করলে আমরা কেন চিকিৎসা করবো? এই আপত্তি তুললে একেবারে অযৌক্তিকও হতো না। কারণ দেশ যত উন্মুক্ত থাকবে, রোগী ততো বৃদ্ধি পাবে। রোগীর সংখ্যা বাড়লে আলেমদের কিছু যায় আসে না, আর ডাক্তারদের বিপদ বাড়ে।

কিন্তু না, প্রত্যেকে অপরের দিকে না তাকিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করছেন।

চিকিৎসাবিদরা নিজের প্রাণের মায়া ত্যাগ করে আপনাকে বাঁচাচ্ছেন।

প্রকৌশলীরা সামর্থ্যানুসারে ডাক্তারদের প্রাণ বাঁচাচ্ছেন প্রোটেকটিভ স্যুট তৈরী করে দিয়ে, কেউ দিচ্ছেন অর্থ।

শিক্ষাবিদদের অভিবাবক শিক্ষামন্ত্রণালয় স্কুল বন্ধ করে দিচ্ছে।

রাজনীতিবিদরা সভাসমাবেশ স্থগিত করছেন।

রসায়নবিদরা ব্যস্ত পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম তৈরীতে।

সাংবাদিকরা সংবাদ পৌঁছে দিচ্ছেন আমাদের হাতের মুঠোয়।

বিজ্ঞানীরা ডুবে আছেন গবেষণায়।

সমাজের আরো একটা অঙ্গ আছে। ধর্ম। মুসলিম প্রধান দেশের ধর্মবিদরা, তারা কি করছেন?

মসজিদ বন্ধ হলেই কি ধর্মবিদদের দায়িত্ব শেষ? না। এ তো হচ্ছে কেবল উটের দড়ি বাঁধা।

যদি প্রয়োজন হয়, তবে মসজিদে মুসুল্লীদের আগমন বন্ধ থাকুক।

মসজিদ বন্ধ হলেই কি ধর্মবিদদের দায়িত্ব শেষ? বলে কি! এসব তো হচ্ছে উটের দড়ি বাঁধা। যখন দড়ি বাঁধার পর্ব শেষ হবে, যখন বান্দার সামনে -আল্লাহ্‌ না করুন- ওয়াসাইলের দরজাগুলো বন্ধ হয়ে যাবে, তখন ‘আল্লাহ্‌’ নাম উচ্চারণ করার জন্য উলামায়ে কেরাম, হাফেয সাহেবরাই তো বাকি থাকবেন।

সব পেশাজীবীদের চেয়ে; রিক্ত হস্তে তাওয়াক্কুল তো একজন আলেমই করতে পারে। এটাই তো তাকে জীবনভর শেখানো হয়েছে। আল্লাহ্‌ তা’আলা রক্ষা করুন, হয়ত তখন আসবে সময়; সেই শিক্ষা বাস্তবায়নের।

এতোকিছু বলার পরও জোশ থামছে না?

ঠিক আছে।

গতপরশু সর্বপ্রথম মদীনা মুনাওয়ারায় মহামারী করোনা ভাইরাস প্রবেশ করেছে। গতকাল পর্যন্ত একজন রোগীর সন্ধান মিলেছে।

লেখকঃ তরুণ আলেম

 

মতামত বিভাগে প্রকাশিত লেখার দায় একান্তই লেখকের, সম্পাদনা নীতিতে উত্তীর্ণ নয়। আপনার লেখা পাঠাতে চাইলে ইমেইল করুনঃ patheo24@gmail.com – ঠিকানায়। 

 

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com