২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

কুরআনের পাখি ‘বারাহ’!

কুরআনের পাখি ‘বারাহ’!

(সত্য ঘটনা অবলম্বনে)

সাখাওয়াত রাহাত : এই গল্পটি দশ বছর বয়সী মিষ্টিমেয়ে বারাহ-এর। তাঁর বাবা-মা উভয়েই ছিলেন ডাক্তার। উন্নত জীবনের সন্ধানে তাঁরা মিসর থেকে সৌদিআরবে এসেছিলেন।

ছোট্ট বারাহ এই বয়সেই শুদ্ধভাবে পুরো কুরআন শরীফ মুখস্থ করেছিল! সে ছিল অত্যন্ত বুদ্ধিমতি। প্রখর ধীশক্তির অধিকারী। তাঁর মেধা ও গুণে মুগ্ধ হয়ে তাঁর শিক্ষক তাঁকে বলতেন- প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নয় বরং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তোমার পড়া উচিত!

তাঁর পরিবার ছিল ছোট এবং ইসলামের আদর্শে উজ্জ্বীবিত। পরিবারে সুখ শান্তির কোনো অভাব ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই তার ভাগ্যাকাশে হানা দেয় দুঃখের কালো মেঘ! মাত্র পাঁচদিনের ব্যবধানে সে হারিয়ে ফেলে আল্লাহর দেওয়া সবচেয়ে বড় দুই নেয়ামত!

একরাতে তাঁর মা পেটে তীব্র ব্যথা অনুভব করতে লাগলেন। বিভিন্ন পরীক্ষা এবং চেকআপের পর তিনি জানতে পারেন- তাঁর ক্যান্সার হয়েছে! এমনকি তিনি একেবারে এর শেষ পর্যায়ে পৌঁছে গেছেন!

মা ভাবলেন- বিষয়টি মেয়েকে জানানো উচিত। বিশেষত, সে যদি একদিন ঘুম থেকে জেগে ওঠে এবং তাঁর পাশে মাকে না পেয়ে..! তাই তিনি বারাহকে বললেন- মামণি! আমি তোমার আগেই জান্নাতে চলে যাব! তবে আমি চাই- তুমি প্রতিদিনই কুরআন পড়বে, যেন এটি ভুলে না যাও। জেনে রেখ, এটি তোমাকে উত্তম জীবনযাপনে অভ্যস্ত করবে! বিবিধ পাপ ও নানান কলুষতা থেকে রক্ষা করবে!

ছোট্ট মেয়েটি সত্যিই বুঝতে পারছিল না- তাঁর মা তাকে কী বলার চেষ্টা করছেন..! তবে সে তাঁর মায়ের অবস্থার পরিবর্তন এবং স্বাস্থ্যের অবনতি অনুভব করতে শুরু করেছিল। বিশেষত যখন মাকে স্থায়ীভাবে হাসপাতালে থাকার জন্য স্থানান্তরিত করা হয়েছিল।

ছোট্ট বারাহ তাঁর স্কুল ছুটির পর হাসপাতালে মায়ের কাছে আসতো। সন্ধ্যা অবধি মায়ের শিয়রে বসে মধুর স্বরে কুরআন তিলাওয়াত করতো। এরপর বাবা এসে তাঁকে বাড়িতে নিয়ে যেতেন।

একদিন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁর বাবাকে ফোন করে জানিয়ে দিলো- বারাহর মায়ের অবস্থা খুব খারাপ! যত দ্রুত সম্ভব তিনি যেন হাসপাতালে চলে আসেন। তাই বাবা স্কুল থেকে বারাহকে নিয়ে হাসপাতালে রওনা হলেন। তিনি মায়ের মুমূর্ষু অবস্থার কথা বারাহর কাছ থেকে গোপন রাখলেন।

তাঁরা যখন হাসপাতালের কাছে পৌঁছল তখন বাবা তাঁকে বললেন- তুমি গাড়িতেই বসে থাকো; আমি কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসছি! চোখের সামনে মায়ের মৃত্যু দেখলে সে হয়তো মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে- এ চিন্তা করেই বাবা তাকে গাড়িতে বসে থাকতে বলেছেন। সে যেন দুশ্চিন্তা না করে- তাই তাড়াতাড়ি ফিরে আসার আশ্বাস দিয়েছেন।

প্রিয় সহধর্মিণীর করুন প্রয়াণের কথা চিন্তা করতে করতে অশ্রুসজল চোখে বাবা তাঁর গাড়ি থেকে নামলেন। বারাহ তাঁর বাবার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। হাসপাতালে প্রবেশের জন্য তিনি যখন রাস্তা পার হচ্ছিলেন, ঠিক তখনই শা শা করে আসা একটি দ্রুতগামী গাড়ি তাঁকে ধাক্কা দিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল! কাঁদতে কাঁদতে বাবার কাছে ছুটে আসা মেয়ের সামনেই তিনি মারা গেলেন!

বারাহ-এর ট্র্যাজেডি এখনও শেষ হয়নি! তাঁর বাবার মৃত্যুর সংবাদটি মায়ের কাছ থেকে গোপন রাখা হয়েছিল। কিন্তু পাঁচদিন পর তাঁর মা-ও বারাহকে এই পৃথিবীতে একা রেখে চলে গেলেন! মাত্র পাঁচদিনের ব্যবধানে সে পুরোপুরি এতিম হয়ে গেল! তাঁর জীবনটাই ওলটপালট হয়ে গেল!

বারাহ তাঁর বাবা-মাকে হারিয়ে সম্পূর্ণ একা হয়ে যায়। তাঁর বাবা-মায়ের বন্ধুরা মিসরে তাঁর আত্মীয়দের খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেন। আত্মীয়রা যেন বারাহর দেখাশোনা করতে পারে তাই তারা এ উদ্যোগ নেন।

এরই মধ্যে একদিন হঠাৎ বারাহ তাঁর মায়ের মতো প্রচণ্ড পেটব্যথায় কাঁতরাতে থাকে! অসহ্য যন্ত্রণায় সে অস্থির হয়ে পড়ে! কয়েকটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা নিশ্চিত করেন- সে ক্যান্সারে আক্রান্ত!

ক্যান্সারের কথা শুনে উপস্থিত সবাই যখন মর্মাহত তখন বারাহ সবাইকে আশ্চর্য করে বলে ওঠে- আলহামদুলিল্লাহ! খুব শীঘ্রই আমি আমার বাবা-মাকে দেখতে পারব! তাদের সঙ্গে জান্নাতে খুব মজা করে থাকতে পারব! এ সুযোগ করে দেওয়ার জন্য আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ!

তাঁর বাবা-মায়ের বন্ধুরা বিস্ময়াভিভূত হয়ে ভাবতে লাগলো- এইটুকু একটা মেয়ে, যে বিপর্যয়ের পর বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছে- সে কতো ধৈর্যশীলা! আল্লাহ তায়ালা তাঁর জন্য যা নির্ধারণ করেছেন- তার প্রতি সে কতো সন্তুষ্ট!

ধীরে ধীরে সৌদিআরবের লোকেরা বারাহ ও তাঁর হৃদয় বিদারক গল্প জানতে শুরু করে। এমনকি একজন সৌদিয়ান তাঁর দেখাশোনার দায়িত্ব নেন। তিনি বারাহকে উন্নত চিকিৎসার জন্য যুক্তরাজের রাজধানী লন্ডনে নিয়ে যান।

সেখানে ‘আল-হাফিজ’ নামে একটি মিসরীয় ইসলামী চ্যানেল বারাহর সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা তাঁর বিশেষ সাক্ষাৎকার গ্রহণ করে। একপর্যায়ে তাঁকে কুরআন তিলাওয়াত করতে অনুরোধ করে। বারাহর কোকিল কণ্ঠের তিলাওয়াতে উপস্থিত সবাই অশ্রুসিক্ত হয়। তিলাওয়াত রেকর্ড করে তারা নিজেদের চ্যানেলে প্রচার করে। ফলে অল্প দিনেই আরববিশ্বে সে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। অসংখ্য মানুষ তাঁর সুস্থতার জন্য দোয়া করে।

কোমাতে যাওয়ার আগে তারা বারাহর সঙ্গে আবার যোগাযোগ করে। সে তখন তাঁর বাবা-মায়ের জন্য দোয়া চায় এবং এতিমদের সম্পর্কে একটি মর্মস্পর্শী নাশিদ গায়! পরবর্তীতে এ নাশিদ শুনে পাথরহৃদয় মানুষের চোখ থেকেও অশ্রু গড়িয়ে পড়ে!

হাসপাতালের সফেদ বিছানায় সে ক্রমেই কোমার নিকটবর্তী হচ্ছিল! কুরআন তিলাওয়াত এবং মৃত্যুর অপেক্ষা, এদুটি জিনিস সঙ্গে নিয়েই তাঁর দিন কাটছিল! একদিকে ক্যান্সার তাঁর দেহকে মৃত্যুমুখে পতিত করছিল; অন্যদিকে কুরআন তিলাওয়াত তাঁর অন্তরাত্মাকে জীবিত রাখছিল!

একসময় ক্যান্সার তাঁর দুই পায়ে ছড়িয়ে পড়ে! ডাক্তাররা সংক্রমণ ঠেকাতে তাঁর পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়! এমতাবস্থায়ও সে স্থিতিশীল এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট ছিল!

কিছুদিন পর ক্যান্সার তাঁর মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে! ফলে ডাক্তাররা জরুরিভিত্তিতে তাঁর মস্তিষ্কে আবারো অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু এরপর সে পুরোপুরি কোমায় চলে যায়! লন্ডনের সেই হাসপাতালে প্রায় ছয়মাস নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখার পর ডাক্তাররা তাঁকে মৃত ঘোষণা করে। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

#মাত্র দশ বছর বয়সে কুরআনের পাখি ‘বারাহ’ যত বড় বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিল এবং এসব ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যেও আল্লাহর ফায়সালার ওপর সন্তুষ্ট ছিল- তা সত্যিই বিরল! আমাদের মতো অনেক প্রাপ্তবয়স্কও হয়তো এগুলো মোকাবেলা করতে সক্ষম হতো না!

সতিকারার্থেই সে ছিল কুরআনের পাখি! কুরআনের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠেছিল! ক্যান্সারের বিভীষিকাময় দিনগুলোতেও সে কুরআন তিলাওয়াত ছাড়েনি! দুরারোগ্য ব্যাধির কারণে মাঝে মাঝেই সে অজ্ঞান হয়ে পড়ত! অথচ জ্ঞান ফেরার পর পুনরায় কুরআন তিলাওয়াতে নিবিষ্ট হতো! অথচ পূর্ণ সুস্থ থাকা সত্ত্বেও আমরা কুরআন তিলাওয়াত করি না। সামান্য পরীক্ষা বা বিপদাপদে আল্লাহর প্রতি আমাদের কতো অভিমান! জীবন নিয়ে আমাদের কতো অভিযোগ!

আল্লাহ তায়ালা ‘বারাহ’ এবং তাঁর মা-বাবাকে কবুল করুন এবং আমাদেরকে এই গল্প থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তাওফিক দান করুন।

লেখক : তরুণ আলেম

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com