৪ঠা আগস্ট, ২০২০ ইং , ২০শে শ্রাবণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই জিলহজ্জ, ১৪৪১ হিজরী

কৃত্রিম পা সংযোজনে আশার আলো

মতামত। আবু সালেহ মোহাম্মদ মুসা

কৃত্রিম পা সংযোজনে আশার আলো

অঙ্গ হারিয়ে আজ ওরা অসহায়। ওদের কষ্টকর জীবনের শেষ নেই। টাকা পয়সার অভাবে একটু উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ নেই ওদের। ওরা গরীব অসহায় পঙ্গু কেউ সড়ক দুর্ঘটনায়, কারোর বা হাত-পা কাটা হয়েছে নানাবিধ অসুখের কারণে, ওরা এখন প্রতিবন্ধী। সহজে চলতে ফিরতে ওরা পারে না। কে নেবে ওদের দায়িত্ব তার কোনো খবর নেই। আর্থিক অসছলতার কারণে ওরা কৃত্রিম হাত, পা সংযোজন করতে অক্ষম। আমাদের উচিৎ ওদের পাশে দাঁড়িয়ে ওদের জীবনে আশার আলো জ্বালিয়ে দিতে চেষ্টা করা, নতুন করে জীবনে ফিরে দেখতে দেয়া।

ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে সম্প্রতি এ বছরের মতো শেষ হলো কৃত্রিম পা সংযোজনের আয়োজন। লাখ লাখ মানুষের কষ্টকর এ অনুভূতি ঘোঁচানো কম কথা নয়। কিছু প্রতিষ্ঠান একত্রিত হয়ে এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে যেখানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং সহযোগিতা বড় ভূমিকা রেখেছে। এ উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। গত ১৪ ডিসেম্বর ১০৫০ জনের কৃত্রিম পা সংযোজনের মাধ্যমে এ কার্যক্রম এ বছরের মতো সমাপ্ত হলো। প্রয়োজনীয় সবকিছু ভারত থেকে আমদানির পর সরকার কর্তৃক শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়ায় এ বছর অনেক বেশি মানুষ এ সুবিধা ভোগ করতে পেরেছে। তবে এখনো তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল বলতে হয়, কারণ দেশে এখনো হাজার হাজার পা না থাকা মানুষের কৃত্রিম পা সংযোজন এর আকুতি সমাজকে ব্যাথিত করে নারী ও শিশুদের এ বেদনা আরো কষ্টের। গরীব অসহায় অশিক্ষিত এই মানুষগুলো গ্রাম থেকে শহরে এসে এ সুযোগ নিতে বড়ই অপারগ। ওদের পাশে দাঁড়িয়ে একটু সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা খুবই জরুরি যেখানে সরকার চেষ্টা করছে সহযোগিতার হাত বাড়াতে আন্তরিকভাবে। ওদের জন্য ক্যাম্প চলাকালীন পঙ্গু হাসপাতালের আশেপাশে কোনো স্থানে ২-৩ দিনের একটু থাকা খাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। যদিও সকাল-বিকাল হালকা নাস্তা ও দুপুরের খাবার ক্যাম্প আয়োজক কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে দেয়া হয়। কারণ এত মানুষের রেজিস্ট্রেশন ও আনুষঙ্গিক পায়ের মাপ নিয়ে কৃত্রিম পা তৈরির জন্য ২-১ দিন সময় লাগে। দূর-দূরান্ত থেকে, গ্রামের অজপাড়াগাঁ থেকে ঢাকা শহরে আসা ও দু’একদিন অবস্থান করা ওদের পক্ষে অসম্ভব। কারো সহায়তা ছাড়া ওরা এ কাজ করতে অক্ষম। এমন অনেক আছেন যারা কখনো ঢাকাই আসেননি। তথাপি বহু অসুবিধার পরও ওরা কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের পর স্বাভাবিক জীবনে ফিরার স্বপ্ন দেখে। প্রয়োজন শুধু সকলের সহযোগিতা।

সরকারের সহযোগিতায় ‘মঈন ফাউন্ডেশন’ সম্পূর্ণ ফ্রী কৃত্রিম পা সংযোজনের সুযোগ দিতে গত পাঁচ বছর ধরে কাজ করে যাছে। মূলত তাদের আর্থিক সহায়তায় এ কার্যক্রম চলছে। ভারতের জয়পুর ফুট (বিএমভিএসএস) এর মেডিকেল টিম এ কার্যক্রম সম্পন্ন করছে। এ প্রতিষ্ঠানটি ১৯৭৫ সাল থেকে এ যাবত বিশ্বের সিরিয়াসহ ৩৩টি দেশে এ কার্যক্রমের মাধ্যমে প্রায় ৬ লক্ষ তিন হাজার কৃত্রিম হাত পা সংযোজন করেছে। এছাড়াও গত ৩১ মার্চ ২০১৯ পর্যন্ত তারা সারা বিশ্বে ক্যালিপার্স – ৪,৬০,১০৫ টি, ক্রাচ-স্টিক্স-স্প্লিন্টস-ব্রেস- ৫,২৭,০৫৯ টি, ট্রাইসাইকেল/হুইল চেয়ার- ১,৩৫,৯০১ টি, হেয়ারিং এইড -৬০,৪৩০টি, সার্জারি- ৭৪৭২ টি প্রতিবন্ধীদের মধ্যে সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশে কৃত্রিম পা সংযোজন এর জন্য সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলো হছে – বাংলাদেশ অর্থোপেডিক্স সোসাইটি, নিটোর, মিতুলি মাহবুবসহ আরো অনেক। ‘মঈন ফাউন্ডেশন’ এর সহায়তায় ‘জাফরী ফ্রি মেডিকেল সার্ভিসেস’ দেশের প্রত্যন্ত গ্রামের প্রায় একশত রোগীকে তাদের নিজেদের তত্ত্বাবধানে এ সুযোগ পেতে নিরলসভাবে কাজ করে যাছে। প্রয়োজনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে থাকা খাওয়াসহ বেশি অসছলদের জন্য কিছুটা আর্থিক সহায়তায় দিয়েও তারা এগিয়ে আসে। মোটকথা ‘মঈন ফাউন্ডেশনের’ আর্থিক সহায়তায়, সরকারের শুল্ক মুক্ত সহযোগিতা ও অপর প্রতিষ্ঠান সমূহের সম্মিলিত ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় এমন সুন্দর একটি উদ্যোগ সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হছে।

পা হারানো মানুষগুলোর অধিকাংশই পুরুষ তবে কিছু মহিলা ও শিশুও রয়েছে। পুরুষ মানুষের অনেকেই পরিবারের প্রধান, অথচ এদের কর্মসংস্থানের সুযোগ কম। এদের একটু সুস্থতায় হাজার হাজার পরিবার আজ নতুন উদ্যমে পথচলা শুরু করেছে। কারো একটি বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দু’টি পা সংযোজনের মাধ্যমে অনেকের জীবনযাত্রায় আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়েছে। এতে বহু পরিবার এবং পরিবারের শিশুরা বেঁচে গেছে। এ এক অনন্য নজীর স্থাপিত হয়েছে সকলের জন্য, সম্মিলিত উদ্যোগে অসহায়ের পাশে দাঁড়ানোর। পা সংযোজনের পর এদের করো কারো বক্তব্য ছিল – আজ ৩২ বছর পর হাঁটতে পারছি, আজ ৩০ বছর পর হাঁটতে পারছি, আমাদের পা না থাকায় কিছু মানুষের কটূক্তি আর শুনতে হবে না, আমরা আবার নতুন জীবনে ফিরে যাবো, আমি স্কুলে গেলে আর লজ্জা পেতে হবে না, আমার জীবনের বড় দুরবস্থার আজ অবসান হলো, এখন থেকে আর ভিক্ষা করবো না, মেহনত করে সংসার চালাবো’। অনেকে কতজন আনন্দে কেঁদে ফেলেছে, ছোট্ট শিশুদের চোখে মুখে কি এক অপরুপ আনন্দের বহিঃপ্রকাশ, পা সংযোজনের পর সে নিজে নিজে হাঁটতে পারছে!

দেশে বহু বড় বড় প্রতিষ্ঠান আছে যারা এমন সমাজ উন্নয়নে এ ধরনের সমাজসেবামূলক কাজে এগিয়ে এসে দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে পারে। শুধু সরকারের অপেক্ষায় না থেকে আমাদের সহযোগিতায় অসহায় মানুষগুলো যেন আলোর পথে পরিচালিত হয় সে চেষ্টা করা প্রয়োজন। সকলের সমন্বিত উদ্যোগে দেশে যুগান্তকারী উন্নয়ন সম্ভব। শুধু হাতে হাত রেখে এগিয়ে যাওয়া। তবেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আমরা সম্পৃক্ত করতে পারবো নতুন নতুন উদ্যোগে, অসহায়ের পাশে দাঁড়িয়ে সহমর্মিতায় হাত বাড়িয়ে দিতে।

দেশ এগিয়ে যাছে, এ যাত্রায় সকলের অংশগ্রহণ জরুরি। আমরা বীরের জাতি, কোন সমস্যাই আমাদেরকে দাবিয়ে রাখতে পারবে না বঙ্গবন্ধুর এ উক্তি আমরা ধারন করবো মনে প্রাণে। জনহিতকর কাজে দেশের অসহায় জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে সকলে আরও সহানুভূতিশীল হবে। প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানির ক্ষেত্রে সকল প্রতিবন্ধকতা দূর হবে, সকলে আরও বেশি আন্তরিক হবেন তাদের কাজে সরকারের সহযোগিতার পাশাপাশি বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আগ্রহ সৃষ্টি হবে এবং দেশের অসহায় সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে পা সংযোজনের সুব্যবস্থা সহজ হবে এমন আশাবাদ নিশ্চই অযৌক্তিক হবে না।

ভালো কাজে সকলের সহযোগিতা প্রদান আশাব্যঞ্জক। দুর্নীতি দমনে সরকার বদ্ধপরিকর। সরকারের এ প্রতিশ্রুতি সফল করতে প্রয়োজন আমাদের সকলের ভূমিকা। সরকারের পাশাপাশি আমরা সবাই এগিয়ে আসলে উন্নয়ন তার নিজের গতিতে চলতে পারবে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়া সফল হবে। বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে।

আমাদের কাজ এবং চাওয়া হতে হবে নতুন প্রজন্মের জন্য নতুন দিগন্তের মতো, যেখানে থাকবে না কলহ বিবাদ, হানাহানি, বিছেদ। শুধু এগিয়ে যাওয়া হাতে হাত রেখে। এ ধরনের উদ্যোগে জনস্বার্থে আগামীতে আরও অনেকে, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেবেন, দিতে এগিয়ে আসবেন, এ আস্থা রাখা যায়। আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য হবো যথেষ্ট।

লেখক : শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com