মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

কেমন ছিলেন খতীব উবায়দুল হক রহ.

কেমন ছিলেন খতীব উবায়দুল হক রহ.

মাওলানা আমিনুল ইসলাম : ঢাকা মালিবাগ মাদ্রাসায় পড়াকালীন সময়ে প্রতি শুক্রবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে যেতাম। উদ্দেশ্য থাকত, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পাঠাগারে বইপড়া। সকাল থেকে একটানা বিকাল পর্যন্ত। আবার কখনো জুমা থেকে রাত পর্যন্ত পাঠাগারে বই পড়ে সময় পার করতাম। যেহেতু জুময়ার দিন, তাই বায়তুল মোকাররম মসজিদে জুমার নামাজ আদায় করা হতো।

তখন বায়তুল মোকাররমের খতীব ছিলেন মাওলানা উবায়দুল হক সাহেব রহ.। প্রথমে তাঁর সম্পর্কে বিস্তারিত জানা ছিল না। যখন তাঁর আলোচনা শোনে মুগ্ধ হতে লাগলাম। তাঁর অভিনব পদ্ধতিতে খুতবা দেওয়া দেখলাম, তখন থেকে উবায়দুল হক ( খতীব) সম্পর্কে জানা শুরু করলাম।

একজন বিজ্ঞ আলেম ছিলেন খতীব উবায়দুল হক রহ.। ইলমের গভীরতা ছিল অনেক। তাঁর মতো মুহাক্কিক আলেম সমকালীন জামানায় কমই ছিল।

অত্যন্ত সাবলীল ভাষায় বয়ান করতেন। সর্বস্তরের মানুষের বোধগম্য হত বক্তৃতাগুলো। যেরকম একজন উঁচু মানের আলেম ছিলেন তিনি। আবার বাংলা ভাষার প্রতি বড় আকর্ষণ ছিল তাঁর। বক্তৃতার মাধ্যমে বোঝা যেত তিনি বড় একজন সাহিত্যিক।

আমি আগে কখনো লাঠি হাতে নিয়ে কাউকে খুতবা দিতে দেখিনি। সর্ব প্রথম বায়তুল মোকাররমে জুময়ার নামাজ আদায় করতে গিয়ে খতীব উবায়দুল হককে লাঠি হাতে খুতবা দিতে দেখেছিলাম। বিষয়টা আমার কাছে যেহেতু নতুন ছিল, তাই অনেক আগ্রহ ভরে তাঁর খুতবা শুনতাম।
দরাজ কণ্ঠের অধিকারী ছিলেন তিনি।স্পষ্টভাষী। কোন জড়তা ছিল না তাঁর কথায়।

বায়তুল মোকাররম ছাড়াও ঢাকার বিভিন্ন জায়গার প্রোগ্রামে খতীব সাহেবের বক্তৃতা শুনেছি। ঢাকা শহরের বহু মাদ্রাসার অনুষ্ঠানে তাঁকে আমরা পেতাম সবসময়। বড় ভাল লাগত তাঁর কথাগুলো।

খতীব উবায়দুল হকের সাথে সবচেয়ে বড় পরিচিতি আমাদের, সেটা হল, তিনি কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম সিপাহসালার ছিলেন। তাঁর সংগঠনের নাম, “আন্তর্জাতিক মজলিসে তাহাফ্ফুজে খতমে নবুওয়্যাত” এই সংগঠনের ব্যানারে কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিতেন। আমরা ছিলাম সেই সংগঠনের কর্মী।

তিনি বায়তুল মোকাররমের মত জায়গার দায়িত্বশীল হওয়ার পরেও খতমে নবুওয়্যাত আন্দোলন করে গেছেন। যেটা ছিল সবচেয়ে অবাক করার বিষয়।
খতীবের পদটি একটি সরকারি পদ। তারপরেও তিনি কোন কিছু পরোয়া করেন নি। খতমে নবুওয়্যাতের ডাক দিতেন মাঝে মধ্যে।
বাংলাদেশের সকল আলেমদের এক প্ল্যাট-ফরমে নিয়ে এসেছিলেন এই খতমে নবুওয়্যাত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে। দলমত নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ছিল সবাই।

তিনি যেরকম খতমে নবুওয়্যাত আন্দোলনকে চাঙা করে ছিলেন, এরপর আর কেউ সেরকম পারেনি। ঢাকার ঐতিহাসিক মানিক মিয়া এভিন্যুতে সর্বকালের সেরা যে এক সমাবেশ হয়েছিল, তা আজো দেশবাসীর মনে আছে। এদেশের সেরা আলেম এবং সর্ব স্তরের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল সেদিন।

এরপর তিনি কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনের আরেক বড় কর্মসূচি দিয়েছিলেন, সচিবালয় ঘেরাও। সত্যি সেদিন সচিবালয় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।

এরকম বহু কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তিনি খতমে নবুওয়্যাত আন্দোলন করে গেছেন। আমরাও তাঁর ডাকে সাড়া দিতাম সব সময়। সে সময় কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলন এত জোরদার ছিল, সরকার ও বিরোধী দল সকলেরই টনক নড়ে গিয়ে ছিল।

উবায়দুল হক সাহেবের সাহসী পদক্ষেপে সে সময় ভীতি সৃষ্টি হয়েছিল সকলের। জাতীয় সংসদের মত জায়গায় খতীব সাহেবের সমালোচনা করতে দেখা গেছে। তিনি কেন এ আন্দোলন করছেন, এ বিষয় নিয়ে কথা হয়ে ছিল অনেক।

শুধু কাদিয়ানীবিরোধী আন্দোলনের কারণে তাঁকে অনেক ঝড় সামলাতে হয়েছে। তাঁর মত গুরুত্ব পূর্ণ পদে বসে এরকম সাহসিকতার সাথে সংগ্রাম করে যাওয়াটা ছিল দুরূহ ব্যাপার। তবে খতীব সাহেব সে দুঃসাধ্য সাধন করেছিলেন।

খতীব সাহেবের ইন্তেকালের পরে কাদিয়ানী বিরোধী আন্দোলনকে আর কেউ চাঙা করতে পারেনি। তাঁর মত সাহসিকতা আর কেউ দেখায়নি। তিনি যেভাবে আন্দোলনকে অনেক উপরে উঠায়ে ছিলেন, সে পর্যন্ত আর যায়নি কখনো।

ঠিক তাঁর অবর্তমানে বায়তুল মোকাররমের মত গুরুত্বপূর্ণ পদে, তাঁর মত যোগ্য মানুষ আর মেলেনি। তাঁর স্থান আজো শূন্য। কত খতীব এলো আর গেল। কিন্তু উবায়দুল হক সাহেবের মত এরকম যোগ্যতা সম্পন্ন, সেরকম দরদী ও সংগ্রামী মানুষের দেখা এখনো মেলেনি বায়তুল মোকাররমে। অদূর ভবিষ্যতে পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ।

খতীব সাহেবের একটা বড় গুণ ছিল, বাংলাদেশের সর্ব স্তরের আলেমদের মাঝে তাঁর গ্রহণ যোগ্যতা ছিল। সব আলেম তাঁকে শ্রদ্ধার নজরে দেখতেন। তাঁর ব্যাপারে কারো কোন অভিযোগ ছিল না।

এরকম গ্রহণ যোগ্য ব্যক্তির এখন বড় অভাব পড়েছে। যাকে দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নিচু হবে, আজ সেরকম নেই। বড় এক সম্পদ হারিয়েছি আমরা।
মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমিন।

লেখক : শিক্ষক ও সমাজ বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com