১২ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং , ২৭শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ১৫ই রবিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

কোরবানি, চামড়া শিল্প ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

কোরবানি, চামড়া শিল্প ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা

আবু সালেহ মোহাম্মদ মুসা : মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব ঈদুল আজহা। বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে আর কিছুদিন পরই উদ&যাপিত হবে দিনটি। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হযরত ইব্রাহিম (আঃ) এর দেখানো পথে পশু কোরবানির মধ্যে দিয়ে দিনটি উদ&যাপিত হবে। মানুষের মাঝে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে আরো সুদৃঢ় করতে গরিব অসহায় মানুষের প্রতি অন্যদের দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে কোরবানির পশুর মাংস সকলের মধ্যে বণ্টন বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানির পশুর চামড়া সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ একটি জরুরি কাজ। আমাদের রপ্তানি আয়ের একটি বড়ো অংশ দখল করে আছে চামড়াশিল্প। বিপুল জনসংখ্যার এই দেশে বিশেষভাবে রাজধানী ঢাকা শহরের জন্য কোরবানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়টি তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ বছর ডেঙ্গুজ্বর এর যে ব্যাপক প্রাদুর্ভাব তাতে সকলের সচেতনতায় যথাযথ পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার মধ্য দিয়ে এ সময়টি পার করা একান্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। এজন্য সরকারের পাশাপাশি জনসাধারণের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে কাজ করতে হবে।

ডেঙ্গু আতঙ্ক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পরিবেশকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা একান্ত জরুরি। ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে এডিস মশার প্রজনন যাতে কোনোভাবেই বৃদ্ধি না পায় ও আক্রান্ত রোগী থেকে নতুনভাবে কেউ সংক্রমিত হতে না পারে সেদিকে এখন সকলের দৃষ্টি। এই সময়ে কোরবানির পশুর বর্জ্য যেন অস্বাভাবিক কোনো পরিস্থিতির জন্ম দিতে না পারে সেদিকে সরকারের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ জাগরিত হবে এ বিশ্বাস সকলের। প্রতিবছর সিটি কর্পোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সুবিধার্থে কোরবানির জন্য স্থান নির্দিষ্ট করলেও তা সঠিকভাবে প্রতিপালিত হয় না। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সকলকে বিশেষভাবে উদ্যোগ গ্রহণ কাতে হবে। পাশাপাশি চামড়াশিল্প আমাদের রপ্তানি বাজারকে যেভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সেটি যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় তার প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ আমাদের চামড়া সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য এ সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়।

কোরবানির পশুর বিপুল পরিমাণ বর্জ্য, রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, হাড়, মাংস-চর্বি, খুর, শিং ইত্যাদি উচ্ছিষ্ট অংশ মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয় ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। ঈদের দিন এবং তার পরের দিন সাধারণত পশু কোরবানি হয়। রাজধানীতে নির্দিষ্ট জায়গা থাকা সত্ত্বেও কেউ যেন যত্রতত্র কোরবানি করে পরিবেশ নোংরা করে জনস্বাস্থ্যের হুমকি না সৃষ্টি করতে পারে সেদিকে সিটি কর্পোরেশনসহ সকলের লক্ষ্য রাখতে হবে। কোরবানি শেষ হওয়া মাত্রই সিটি কর্পোরেশনকে বর্জ্য অপসারণে লেগে পড়তে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব এ বর্জ্য অপসারণ করতে হবে।

কোরবানির পশুটি যেন রোগমুক্ত ও উপযুক্ত হয়, কোরবানির পূর্বে পশুটিকে গোছল এর মাধ্যমে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে ও কোরবানির জন্য নির্ধারিত জায়গাটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হতে হবে। পশুর চামড়া ছাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ; প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দক্ষ জনশক্তি দ্বারা ধর্মীয় নিয়মকানুন মেনে পশু কোরবানির চামড়া যাতে কোনোভাবেই নষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল করতে হবে। চামড়া কেটে ছিঁড়ে গেলে রপ্তানি যেমন বাঁধাগ্রস্ত হবে তেমনি সঠিক মূল্যও পাওয়া সম্ভব হবে না। বাংলাদেশ ২০১৪ সালে ২৬০ মিলিয়ন বর্গফুট ফিনিশড লেদার রপ্তানি করেছে যদিও এ সময় উৎপাদিত ফিনিশড লেদারের পরিমাণ ছিল ২৮০ মিলিয়ন বর্গফুট। একটু পিছনে তাকালে আমরা দেখতে পাই, ১৯৯০ সাল পর্যন্ত আমাদের দেশ কাঁচাচামড়া বা “ওয়েট ব্লু লেদার” এবং “ক্রাস্ট লেদার” বা প্রক্রিয়াজাত চামড়া রপ্তানি করতো। সময়ের ব্যবধানে চামড়া শিল্পের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি এখন ট্যানারি মালিকদেরও এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের বড়োবাজার হলো- ইতালি, যুক্তরাজ্য, জাপান, জার্মানি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ড, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, সিংগাপুর, স্পেন, পোল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ভারত, নেপাল, অস্ট্রেলিয়া, তাইওয়ানসহ বেশ কয়েকটি দেশ। বিকাশমান শিল্পের মধ্যে বর্তমানে বাংলাদেশে চামড়া শিল্প অন্যতম। সুতরাং আমাদের এ গুরুত্ব অনুধাবন করে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।

যেখানে-সেখানে গরুর হাট বসিয়ে রাস্তাঘাট বন্ধ, যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত ও নোংরা পরিবেশ যাতে কেউ সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য সিটি কর্পোরেশন গরুর হাটের জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করেছে। পরিবেশসম্মত কোরবানি ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়ে সরকার ২০১৫ সালে কোরবানির ঈদে ঢাকা মহানগরীর ৩৯৩টি, ২০১৬ সালে ঢাকা দক্ষিণে ৫৮৩টি এবং উত্তরে ৫৬৭টি এবং ২০১৭ সালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে ৬২৫টি এবং উত্তর সিটি কর্পোরেশনে ৫৪৯টি স্থানকে কোরবানির জন্য নির্ধারিত করে। পরবর্তীতে রাজধানীতে প্রয়োজন মতো এর সম্প্রসারণ করা হয়েছে যেন কোনোরকম যানজট বা পরিবেশের জন্য প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি না করে। এ বছর ১২টি সিটি কপোরেশন এলাকায় ৯৬টি পশুর হাট এবং ২৯৪১টি স্থান পশু জবাইয়ের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আশা করা যায় এ বছর রাজধানীতে এ কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হবে। যথাযথভাবে কোরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্ভব হলে পরিবেশ বিপর্যয় রোধের পাশাপাশি সকল জবাইকৃত পশুর উচ্ছিষ্ট সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব হবে। নিশ্চয়ই সার্বিক বিবেচনায় আমরা যার যার অবস্থান থেকে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে সকলেই সঠিক পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে আসবো।

লেখক : কলামিস্ট

০৬.০৮.২০১৯

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com