৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

ক্রান্তিকালে মনে পড়ে আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ.

সরলকাব্য । আমিনুল ইসলাম কাসেমী

ক্রান্তিকালে মনে পড়ে আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ.

বারবার স্মরণ হয় বেফাকের সাবেক মহাসচিব আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ, এর কথা। একটানা ত্রিশ বছর বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ-এর খেদমত করেছেন। কোন ধরনের আপত্তি আসেনি কারো। এখনতো ঐ দায়িত্বে বসার ছয়মাস পরেই অভিযোগ শুরু হয়ে গেছে। পুরো দেশব্যাপি আন্দোলন।পদত্যাগ করুন। খেয়ানতের অভিযোগ। স্বজনপ্রীতি। প্রশ্নপত্র ফাঁস। আরো কত কি?

কিন্তু আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ. ছিলেন ঐ পদের একজন মানানসই ব্যক্তিত্ব। তাঁর ব্যাপারে কারো কোন অভিযোগ ছিল না। দীর্ঘদিন বেফাকে শ্রম দিয়েছেন, মেধা ব্যয় করেছেন। বেফাকের জন্যই জান কোরবান করেছিলেন তিনি।

আজকের বেফাক, এটা এমনি এমনি হয়নি। এর পিছনে আব্দুল জব্বার সাহেবের যে কোরবানী, তা বণনা করে শেষ করা যাবে না। খেয়ে না খেয়ে পড়ে থেকেছেন বেফাকের অফিসে। রাতদিন শ্রম দিয়েছেন। কোন টাইম -টেবিল ছিল না। তিনি যেন চব্বিশ ঘন্টা কাজ করতেন। একদম নিজের সংসারের জন্য মানুষ যেভাবে শ্রম দেয়, অনুরূপ শ্রম দিয়েছেন।

বেফাকের প্রাথমিক অবস্থা তো এত ভাল ছিল না। তখন কয়টা মাদ্রাসা বা এসেছে। সেই আশির দশকে যখন আমরা ওনাকে দেখেছি, তখন তো সকল কওমী মাদ্রাসা বেফাকের অন্তর্ভুক্ত হয় নি। এমনকি ঢাকা শহরের উল্লেখযোগ্য কিছু প্রতিষ্ঠান ছাড়া সবই ছিল বেফাকের বাইরে। সবাই নিজ নিজ গতিতে চলত।কিন্তু আব্দুল জব্বার সাহেবের প্রচেষ্টা। তাঁর শ্রম। তাঁর মোজাহাদা।তাঁর নিষ্ঠাবান দায়িত্ববোধে বেফাকে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে কওমী মাদ্রাসাগুলো।

আমরা আরো আশ্চার্য হব, হাটহাজারী মাদ্রাসা এত বড় প্রতিষ্ঠান, তারা কিন্তু বেফাকে ছিল না। আল্লামা আহমাদ শফি রহ.-এর জীবদ্দশায়, তিনি যখন বেফাকের সাথে সম্পৃক্ত হলেন, তখন থেকে হাটহাজারী মাদরাসা বেফাকে এলো। ঢাকার লালবাগ মাদরাসা, যাত্রাবাড়ী মাদরাসা বেফাকে অনেক পরে এসেছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ি মাদরাসা এই সেদিন এসেছে।

যাইহোক, বেফাকের শুরু জীবন ছিল বহু কষ্টের, অনেক ঝড়- ঝন্জা উপেক্ষা করে তাদের চলতে হয়েছে। অনেক সাবধানে কদম ফেলতে হয়েছে। অর্ধাহারে- অনাহারে কেটেছে কর্মকর্তাদের। ফি সাবিলিল্লাহ, খেদমত করেছেন অনেকে।

সেই বেফাক এখন বিশাল প্রতিষ্ঠান। দেশ থেকে বিদেশে যার সুনাম- সুখ্যাতি। যার অবদানে কিন্তু কওমীর চেহারা পাল্টে গেছে। এক মহীরুহে অবতীর্ণ হয়েছে। সবকিছুরই মূলে ছিলেন সাবেক মহাসচিব আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী। তাঁর সাজানো – গোছানো সব কিছু। তাঁর কর্মের প্রতিফল-সুফল এখন এদেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী ভোগ করে যাচ্ছে।

আমি নিজে বেফাকের সাবেক মহাসচিব আব্দুল জব্বার সাহেবকে সর্বপ্রথম দেখেছিলাম সেই ১৯৮৯ সনে। ফরীদাবাদ মাদ্রাসার একটা রুমের মধ্যে তখন বেফাকের কাজ চলত। একটা বাক্স নিয়ে বসে থাকতেন। সাথে দু একজন কর্মকর্তা-কর্মচারী। এরপর বেফাকের অফিস আসল নয়াপল্টনে।
ফকিরাপুল পানির ট্যাংকির বিপরীতে। এটা নব্বই দশকে। একটা বিল্ডিং এ ভাড়া করা অফিস।

আমাদের উস্তাদ মাওলানা আবুল ফাতাহ ইয়াহইয়া সাহেব রহ, যিনি বেফাকের সহকারী মহাসচিব ছিলেন। তিনি অনেক শ্রম দিয়েছিলেন বেফাকে। তাঁকেও দেখেছি, আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ, এর ভুয়সী প্রসংসা করতে।মানে বেফাকের সর্ব সেক্টরে আব্দুল জব্বার সাহেবের অবদান। বেফাকের প্রসার, কওমী মাদ্রাসাগুলোকে এক ছায়াতলে আবদ্ধ করা, শিক্ষার মান উন্নয়ন, শিক্ষা কারিকুলাম সংশোধন, যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্হার সাথে তাল মিলিয়ে বেফাকে জেনারেল সাবজেক্ট অন্তর্ভুক্ত করণ, এসব কিছুতে তিনি অবদান রেখেছেন।

কওমী মাদ্রাসাকে জাতির সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে আব্দুল জব্বার রহ. সীমাহীন মোজাহাদা এবং কোরবানী দিয়েছেন। এদেশের দ্বীনি শিক্ষা প্রসারে এবং জাতিকে সঠিক পথে পরিচালিত করার একজন নিষ্ঠাবান রাহবার ছিলেন তিনি। দ্বীনি শিক্ষার পরতে পরতে তাঁর অবদান। বাংলাদেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, রুপসা থেকে পাথুরিয়া সব জায়গাতে কদম পড়েছিল তাঁর। গোটা বাংলাদেশের কওমী মাদ্রাসা গুলো এক প্লাটফরমে ওঠানোর জন্য তিনি দ্বারে ঘুরেছেন। শিক্ষার মান উন্নয়নের জন্য আন্তরিক ভাবে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। যে কারণে এখন কওমীর সন্তানেরা সুফল ভোগ করে যাচ্ছেন।

একজন মর্দে মুজাহিদ আলেম ছিলেন আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ.। শুধু মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন নয়। পাশাপাশি বাতিলের মোকাবেলায় তাঁর মিশন চালু ছিল। এদেশে যখনই কোন ফেতনার আভির্ভাব ঘটেছে, ইসলাম বিরোধী কার্যক্রম করার চেষ্টা করেছে, আব্দুল জব্বার সাহেব তখন গর্জে ওঠেছেন। কাদিয়ানী, বেদআতী, নাস্তিক- মুরতাদ, যত ধরনের ফেতনা এসেছে, তিনি তৎক্ষণাৎ আলেমদের সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। কখনো কোন বাতিলের সাথে আপোস করেননি।

তিনি একজন খ্যাতিমান লেখক ছিলেন। কলমে শক্তি ছিল প্রচুর। বিভিন্ন গবেষণামূলক বই রয়েছে। যে গুলো পড়লে বোঝা যায়, একজন জাঁদরেল আলেম এবং গবেষক ছিলেন তিনি। তাছাড়া বেফাকের অনেক বইতে তাঁর লিখনী পাওয়া যায়। বিভিন্ন বই তিনি সম্পাদনা করেছেন। অনেক গল্প – কবিতা তিনি রচনা করেছেন।অসংখ্য প্রবন্ধ তিনি লিখেছেন।

উল্লেখযোগ্য গ্রন্থাবলী

১/ ইসলাম ও আধুনিক প্রযুক্তি।
২/ মাদ্রাসা শিক্ষার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র।
৩/ ভারত উপমহাদেশে মুসলিম শাসন ও গৌরবময় ইতিহাস।
৪/ ইসলামে নারীর অধিকার।
এরকম অনেক লিখনী আব্দুল জব্বার সাহেবের পাওয়া যায়। অনেক গভীর পড়াশুনা ছিল। গতানুগতিক কোন লেখক নয়। অনেক মুতালায়ার পর তিনি লেখালেখি করতেন। যে কারণে তাঁর লেখাগুলো ছিল ব্যতিক্রমধর্মী।

একজন বাগ্মী ছিলেন। বিভিন্ন দ্বীনি জলসা এবং সেমিনারে তাঁর কণ্ঠ উচ্চারিত হতো মোজাহিদের মতো। বহু মাদ্রাসার বিশেষ অতিথির আসন অলংকৃত করেছেন। বিশেষ করে ছাত্রদের তরবিয়তী প্রোগ্রামে তাঁকে বেশী দেখা যেত। সাবলীল ভাষায় তাঁর কথামালা ফুটে উঠত।

জন্ম

আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী সাহেব ১৯৩৭ সনে বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার অন্তর্গত সহবতকাঠি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

শিক্ষাজীবন

তিনি ঢাকার বড় কাটরা মাদ্রাসাতে অত্যান্ত সুনামের সাথে লেখাপড়া করেন। ১৯৬১ সনে দাওরায়ে হাদীস পাশ করেন।

উল্লেখযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলী
১/ আল্লামা কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ,
২/ শায়খুল হাদীস আল্লামা আজিজুল হক রহ,
৩/ আব্দুল ওহাব পীরজি হুজুর রহ.

কর্মজীবন

১৯৬১ সনে দাওরায়ে হাদীস পাশ করার পর বড়কাটরা মাদ্রাসাতে শিক্ষকতা শুরু করেন। এরপর যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসায়। আব্দুল জব্বার সাহেবের সবচেয়ে বড় অবদান তাঁর বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া এর জন্য। প্রায় তিন যুগ কেটে গেছে তাঁর বেফাকে। এর মধ্যে একটানা পঁচিশ বছর তিনি মহাসচিব ছিলেন। কওমী শিক্ষা ব্যবস্হাকে ঢেলে সাজিয়ে ছিলেন তিনি। দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে এক যুকান্তকরি পদক্ষেপ হাতে নিয়েছিলেন।

সর্বোপরি কওমী মাদ্রাসার দাওরায়ে হাদীসের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। কওমী অঙ্গনের বিভিন্ন মত-পথের লোকগুলোকে এক আঙিনায় নিয়ে এসে তিনি কওমী শিক্ষা ব্যবস্থার স্বীকৃতি আদায় করেছেন, তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। এদেশের কওমী মাদ্রাসার ইতিহাসে তিনি জ্বলজ্বল করবেন চিরদিন। দীর্ঘ সময়ের এই মহান সেবক, এই নিষ্ঠাবান মুজাহিদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে তাতে সন্দেহ নেই। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর অভিভাবক্ত করেছেন যুগ যুগ। যার প্রতিদান মহান রবের দরবারে পাবেন নিশ্চয়ই।

আজকের এই ক্রান্তিকালে। সংকটময় মুহূর্তে। যখন দুর্যোগের ঘনঘটা। পক্ষ-বিপক্ষের বোলচাল। কলমের খোঁচা। বিশেষ করে অভিভাবকহীন বেফাক। মুরুব্বী শূন্য। আবার কিছু মানুষের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ। যেটা কোনদিন হয়নি, সে কাজও হচ্ছে। এমনই বিপদসংকুল অবস্থায় স্মরণ হয় সেই মহান ব্যক্তিত্ব আব্দুল জব্বার জাহানাবাদী রহ, এর কথা। বিশেষ করে তাঁর অবদান, ত্যাগ, কোরবানী, কোনদিন ভোলা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসে মেহমান বানিয়ে দিন। আমিন।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com