২৭শে নভেম্বর, ২০২০ ইং , ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

খলনায়কদের হাত থেকে মুক্তিপাক হেফাজতে ইসলাম

খলনায়কদের হাত থেকে মুক্তিপাক হেফাজতে ইসলাম

আমিনুল ইসলাম কাসেমী : “হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ” আবার জেগে উঠেছে। একটু দেরীতে হলেও এখন ময়দানে তারা। কয়েকদিন আগে চট্রগ্রামে মিছিল হয়েছে। ফ্রান্স সরকার কর্তৃক নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর ব্যঙ্গচিত্র প্রদর্শনের প্রতিবাদে হাটহাজারীতে মিছিল হয়। বর্তমানে সেই একই ইস্যুতে এখন ঢাকায় ফরাসী দূতাবাস ঘেরাও কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে।

আগামী ২ নভেম্বর ঢাকাস্থ ফরাসী দূতাবাস ঘেরাও করবে হেফাজতে ইসলাম।আল্লামা নুর হোসেন কাসেমী সাহেবের সভাপতিত্বে এবং প্রধান অতিথি থাকবেন আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেব।

অনেক ধন্যবাদ এবং শুভেচ্ছা হেফাজতে ইসলামের জন্য। সফলতা কামনা করি এই অরাজনৈতিক সংগঠনের। অনেকে তো হেফাজতকে বিলুপ্তপ্রায় সংগঠন হিসেবে আখ্যা দিচ্ছিলেন।কেউ হেফাজতকে আর ময়দানে দেখতে পাবেন না এমন মন্তব্য ছিল। কেউ বলতেন, হেফাজতে ইসলাম এখন লাইফসাপোর্টে আছে। অনেক বিজ্ঞমহল হেফাজতের কর্মকান্ড না দেখে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন।

এগুলোর মূল কারণ ছিল, হেফাজতের দীর্ঘদিনের আমীর। সেই ২০১০ সনে যখন হেফাজত প্রতিষ্ঠিত হয়, তখনই চেয়ারম্যান আল্লামা আহমাদ শফি রহ. । কিন্তু আল্লামা আহমাদ শফি রহ.- এর ইন্তেকালের পর এখনো হেফাজত নেতৃত্ব শূন্য। কাউকে আমীর হিসেবে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। তাছাড়া আল্লামা আহমাদ শফি সাহেবের ইন্তেকালের পূর্বে যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাবলী সংগঠিত হয়েছে, তাতে কিছু ওলামায়ে কেরামের মাঝে এখনো চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। এজন্য হেফাজতের আমীরের ব্যাপারে এখনো কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।

অবশ্য আমীর নির্ধারণের বিষয়ে দেরী হওয়ার আরেকটা কারণ, ওলামায়ে কেরাম কেউ বসে নেই। আল্লামা আহমাদ শফির ইন্তেকালের পরে কওমী মাদ্রাসার সবচেয়ে বড় শিক্ষাকোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়ার সভাপতি নির্বাচনে যথেষ্ট সময় দিতে হয়েছে আলেমদের। তাছাড়া বেফাকের মধ্যে যে অস্হিরতা দেখা দিয়েছিল,সেটা আগে সামাল দেওয়ার ব্যাপারে আলেমগণ বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন। এজন্য এখনো আমীর নির্বাচন সম্ভব হয়নি।

তারপরেও আমীর শূন্য থাকা অবস্থায় হেফাজত আবার জেগে উঠেছে। সামনে পা বাড়াচ্ছে। কদম বা কদম বিভিন্ন কর্মসুচিতে অগ্রসর হচ্ছে তারা। এজন্য সাধুবাদ জানাই তাদের।

যদিও ময়দানে আমীরের নেতৃত্বে লড়াই হয়। কিন্তু এবার লড়াই হবে আমীর ছাড়া। কিন্তু যদি ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাউকে বসানো হয়, তাহলে তো আর কথাই নেই।

কিন্তু কে হবেন সে ভারপ্রাপ্ত? কে আসবেন? সেটাকি আগে নির্বাচন করার প্রয়োজন ছিল না? নেতৃত্ব শুন্য হেফাজত কতদূর এগোবে আল্লাহ ভাল জানেন। কেননা, কখনো নেতৃত্ব ছাড়া কোন সংগঠন চলতে পারে না। সে যে দলই হোক, আগে তো তার আমীর নিযুক্ত করা উচিত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকালের পরে , তাঁকে দাফন করার আগে কিন্তু আমীর নিযুক্ত করা হয়েছিল। তারপরে দাফন কার্য সম্পাদন করা হয়।

হেফাজতে ইসলাম ওলামায়ে কেরামের সংগঠন। এর আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত ওলামায়ে কেরাম। সকলেই বুদ্ধি- বিবেক সম্পন্ন। কিন্তু আল্লামা শফির ইন্তেকাল হয়ে গেল মাসাধিকাল, এখনো হেফাজতের আমীর নিযুক্ত হল না। যেটা অত্যান্ত পরিতাপের বিষয়।

আমরা হকের দাবীদার আলেম সমাজ,কিন্তু আজো কিছু কিছু কাজে আমাদের চরম গাফলতি, যার থেকে উত্তরণের ব্যবস্হা করা সময়ের দাবি। আচ্ছা কেন হচ্ছে না হেফাজতের আমীর নিযুক্ত? এব্যাপারে কারো কিন্তু কিছু বুঝে আসে না। কোন কৌশলে দেরী করা হচ্ছে। কি তার কারণ।

তবে যাইহোক, হেফাজত যখন আবার ময়দানে চলে এসেছে আমীর নির্বাচন ছাড়া। তবে এবার কিন্তু আমাদের বেশী সতর্ক থাকতে হবে।

হেফাজতের আমীরের জীবদ্দশায় শাপলা চত্বরের সেই খলনায়কগণ যা করেছিলেন, এবার আমীরের অনুপস্থিতিতে ওরা কি করে, সেটার ভয় হচ্ছে। খলনায়কগণের ষড়যন্ত্রে হেফাজতের আন্দোলন তছনছ হয়েছিল। মাদ্রাসার নিরীহ ছাত্রদের মার খাওয়ায়েছিল। ছাত্রদের বিপদে ফেলে দিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিল কেউ কেউ।

সবচেয়ে আরো বড় ক্ষতি করেছিল, কিছু লোকের বেপরোয়া বক্তব্য।লাগামহীন ভাবে বক্তৃতা করে যেন আগুন জ্বালিয়েছিলেন। তার উস্কানীমুলক বক্তব্যে প্রশাসনকে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন তিনি।

বড় আশা ছিল ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি হবে এসব নিরীহ আলেম এবং তালেবুল ইলম। যার কারণে সেখানে স্বাধীনতা বিরোধীচক্র এবং সরকারের বিরোধী দলের লোকজন হাজির করা হয়েছিল। এবং তারা নানান অনৈতিক কর্মকাণ্ড হেফাজতের মধ্যে ঘটিয়ে আলেমদের এই মহান সংগঠনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছিল । যার মাশুল কিন্তু এখনো দিতে হচ্ছে আমাদের।

তবে এবার আমরা আশা করব, আর যেন ঐসব কুমতলব করা না হয়। হেফাজত তার লক্ষ্য উদ্দেশ্য ঠিক রেখে সামনে যাক, এটা আমরা কামনা করি। কিন্তু হেফাজতকে ঢাল বানিয়ে কেউ যেন স্বার্থ উদ্ধারে লিপ্ত না হয়, কেউ যেন হেফাজতকে ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি না বানায়,এটা খেয়াল রাখা চাই।

সবসময় খলনায়কদের সাইড করে রাখা দরকার। কেননা, ওদের মতলব কিন্তু ভাল নয়। ঐ যে বল্গাহীন বক্তার কথা বললাম, তাদের ব্যাপারে বেশী সতর্ক চাই। ওদের মতলব বোঝা বড় দায়। ওলামায়ে দেওবন্দের এই মহান সংগঠনের ভিতরে যদি আবার স্বাধীনতা বিরোধী চক্র এবং নবী সাহাবীদের দুশমুনদের অনুপ্রবেশ ঘটে, সেটা হবে আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত। এজন্য সাবধান!

পরিশেষে হেফাজতে ইসলাম খলনায়কদের থেকে মুক্তি পেয়ে নিজ গতিতে অগ্রসর হোক, এই কামনা রইল। আল্লাহ তায়ালা আমাদের উপর রহম করুন। আমিন।
লেখক : কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com