মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ০৮:২৯ অপরাহ্ন

গণপিটুনিতে মৃত্যু : সামাজিক অস্থিরতা ও করণীয়

গণপিটুনিতে মৃত্যু : সামাজিক অস্থিরতা ও করণীয়

মনজু আরা বেগম : সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে বেশকিছু প্রাণহানি ঘটেছে। ‘পদ্মাসেতু নির্মাণে মানুষের মাথার প্রয়োজন’-এ রকম একটি গুজবকে কেন্দ্র করে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে মর্মান্তিকভাবে বেশকিছু প্রাণহানি ঘটেছে দেশে। গুজব ছড়ানোর ফলে গণপিটুনি, হত্যা ইত্যাদি অরাজকতার ফলে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি হয়েছিল।

গুজবের পাশাপাশি সামাজিক অস্থিরতার অন্যান্য আরো কারণের মধ্যে ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, ব্যবসায়িক কারণে হত্যা, ব্যক্তিগত রেষারেষির মতো অতি তুচ্ছ কারণে হত্যা, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু, রেলক্রসিং পারাপারে মৃত্যু, ইত্যাদিও উল্লেখযোগ্য।

সমাজে এমন অস্থিরতা থাকলে আতঙ্কিত হয় সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন সংস্থার হিসেব মতে, গত কয়েকমাসে সারাদেশে প্রায় ৩৬ জন গণপিটুনিতে মৃত্যুবরণ করেছে। গত ২০ জুলাই ছেলেধরা সন্দেহে তাসলিমা বেগম নামে ঢাকার উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক নারীকে গণপিটুনিতে হত্যা করা হয়। তাসলিমা বেগমের দুই সন্তান তাহসিন ও তাসমিন। মায়ের শোকে ১১ বছরের ছেলে তাহসিনের মুখে কোনো কথা নেই। চার বছরের মেয়ে তাসমিন এখনও মা ফিরে আসার অপেক্ষায় দিন গুনছে। মা না এলে সে ভাত খাবেনা। সন্তানের ভর্তির ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে গিয়ে একটা বিদ্যাপিঠের ভিতরেই মাকে প্রাণ দিতে হয়। অবুঝ দুই সন্তানকে এ সমাজ, এ রাষ্ট্র এখন কি জবাব দিবে? সামাজিক অস্থিরতার জন্য আর কতো মূল্য দিতে হবে আমাদের?

সন্দেহের বশবর্তী হয়ে এভাবে মৃত্যু কোনোভাবেই কাম্য নয়। সমাজে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পায় এবং তা থেকেই সৃষ্টি হয় অরাজকতা এবং অপরাধ প্রবণতা। ফলে স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়, রাস্তাঘাট, বিপণিবিতান, এমনকি নিজ গৃহেও মানুষ নিরাপদ থাকে না। জীবনের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার সাথে সাথে আমাদের মানবিক বোধগুলোও দিন দিন লুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয় হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দয়ামায়া, আদর ভালবাসার মতো সুকুমার অনুভূতিগুলো আমাদের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে দ্রুত। আর হারিয়ে যাচ্ছে বলেই প্রকাশ্য দিবালোকে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে খুন এবং গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে। মানবসৃষ্ট অন্যান্য দুর্যোগে প্রতিনিয়ত ডুবে যাচ্ছে সমাজ।

দেশে আইন আছে, বিচার ব্যবস্থাও আছে। কিন্ত এসবের তোয়াক্কা না করেই মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার মানসিকতা অগণতান্ত্রিক ও মানবিক মূল্যবোধ বিরোধী। পরিবার, সমাজ বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের নীতি নৈতিকতা যথাযথভাবে শেখানোর প্রতি আরো জোর দিতে হবে। ভাল রেজাল্টের জন্য সন্তানদের যন্ত্রমানব বানাতে দিনরাত ব্যস্ত আমরা। অথচ সন্তানদের মধ্যে নীতি, নৈতিকতা, মানবতা, মূল্যবোধ, শিষ্টাচার, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ইত্যাদি জাগ্রত হচ্ছে কিনা, আদর্শ সন্তান হিসেবে গড়ে উঠছে কিনা, এসব দেখার সময় যেন নেই আমাদের। শিশুরা নৈতিকতা ও মূল্যবোধ বিষয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করে পরিবার এবং এরপরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি সমাজ থেকে। কিন্ত আমাদের চারপাশে প্রতিনিয়ত যা ঘটছে তা থেকে শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। প্রযুক্তি আমাদের গতি দিলেও কেড়ে নিয়েছে আবেগ আর অনুভূতি। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমাদের মানবিক উৎকর্ষতা লোপ পাচ্ছে।

উদ্দেশ্যমূলকভাবে গুজব ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে। হত্যাকা-ের মতো জঘন্য অপরাধ ঘটানো হচ্ছে। এসব হত্যাকা-ের ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করেছে। যেসব অনলাইন গণমাধ্যমের সাহায্যে এই গুজব ছড়ানো হচ্ছিল তাদের ফেসবুক আইডি, ইউটিউব লিঙ্ক এবং অনলাইন পোর্টাল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এ ব্যাপারে সদা সতর্ক রয়েছে। গুজব চিহ্নিত হওয়ার সাথে সাথে সে বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। সরকারের দ্রুত পদক্ষেপের কারণে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই গুজব নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে এ কথা সত্য। আমরা উন্নয়নের মহাসড়কে উঠেছি ঠিকই, কিন্ত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নে আমাদের আরো এ অগ্রগতি হওয়া দরকার। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ছাড়া কোনো দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। উন্নয়ন যাদের জন্য সেই মানুষই যদি সমাজে প্রতিনিয়ত নিরাপত্তাহীনতায়, হতাশায় নিমজ্জিত থাকে, তাহলে উন্নয়নের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলেও কোনো লাভ নেই। কোনো সভ্য সমাজে নিরাপত্তাহীনতা কাম্য নয়, কারণ সকল সমাজ ও দেশের অন্যতম অনুষঙ্গ সমাজ ও দেশে বসবাসরত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। নিরাপত্তাহীনতা আর বিষণ্নতা দেশের সবচেয়ে কর্মক্ষম ও প্রয়োজনীয় যুবসমাজকে একসময় মাদকের করাল গ্রাসে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। সমাজের এ অস্থিরতা দূর করতে না পারলে, মাদক গ্রহণসহ অন্যান্য অপরাধ থেকে যুব সমাজকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। ফলে আগামী প্রজন্ম সমাজের জন্য, দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

যেকোনো উন্নয়নের ভালো-মন্দ দুটো দিকই থাকে। ভালোকে আমরা গ্রহণ করবো এবং খারাপকে বর্জন। আর এ ব্যাপারে পরিবারকেই সচেতন হতে হবে সবার আগে। দেশকে উন্নয়নের দিকে এগিয়ে নেয়ার জন্য তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়ন অবশ্যই প্রয়োজন, তবে তা যেন সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি বা তরান্বিত না করে, সেদিকে আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। পরিবার থেকে সন্তানদের এ ব্যাপারে সচেতন করে তুলতে হবে। পারিবারিক বন্ধনকে সুদৃঢ় করতে, সন্তানদের মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করতে শিশুদের পারিবারিক সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিশুদের শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি নীতি-নৈতিকতা, আইনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ইত্যাদি বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিক্ষা দিতে হবে।

আমাদের গর্ব, ঐতিহ্য পারিবারিক বন্ধনকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে হবে। আর তা না করতে পারলে দেশের উন্নয়ন পরিপূর্ণ হবে না। পূর্ণতা পাবে না আমাদের সামাজিক উন্নয়ন। অবক্ষয় আমাদের ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাবে, যা জাতি হিসেবে কখনই কাম্য নয়। সার্বিক অস্থিরতা দূর করতে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রসহ সকলকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। আইন নিজের হাতে তুলে নেয়া অপরাধ। এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে মিডিয়াসহ সকলের আন্তরিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। আমাদের সকলের সমন্বিত আন্তরিক প্রচেষ্টায় সমাজ সুন্দর হবে-নিরাপদে থাকবে সবাই।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com