মঙ্গলবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:০৯ অপরাহ্ন

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস : মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়

ডায়াবেটিস পরীক্ষা, ছবি সংগৃহীত

স্বাস্থ্য। ডা. এম মামুন

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস : মা ও শিশুর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ায়

ফাতেমা বেগমের সন্তান ধারণের তিন মাসের সময় ডাক্তারি পরীক্ষায় ডায়াবেটিস ধরা পড়ে। তারপর থেকে ডাক্তারের পরামর্শ মতো ঔষধ এবং সন্তান প্রসবের পূর্ব পর্যন্ত নিয়মিত ইনসুলিন নিতে হয়েছে তাকে। নির্ধারিত সময়ের প্রায় এক মাস আগে সিজারের মাধ্যমে সন্তান প্রসব করানো হয়েছিল। বাচ্চার ওজন ছিল মাত্র আড়াই কেজি। ফাতেমা বেগমের সন্তান ফাহাদের বয়স এখন তিন বছর। জন্মের পর থেকেই শিশুটির বিভিন্ন ধরনের অসুখ লেগেই আছে। বয়সের তুলনায় বৃদ্ধি কম, কোষ্ঠকাঠিন্য, জ্বর হলেই খিঁচুনি, ঠা-া, কাশি লেগেই থাকে। ডাক্তার জানান, গর্ভকালীন মায়ের ডায়াবেটিস এবং স্বল্প ওজন নিয়ে জন্মের কারণে শিশু ফাহাদের এ সমস্যা। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মা ও শিশু উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে ১৪ নভেম্বর আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস দিবস পালিত হয়ে আসছে। বর্তমান সরকার সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ২০১৯ সালের বিশ্ব ডায়াবেটিস দিবসের জন্য থিম নির্ধারণ করেছেন, “The Family and Diabetes” এর ভাবার্থ করা হয়েছে-“ডায়াবেটিস প্রতিটি পরিবারের উদ্বেগ”। পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা তৈরি করতে পারলে ডায়াবেটিসের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে ডায়াবেটিস প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সচেতনতা বৃদ্ধির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, পৃথিবীতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক ১০টি স্বাস্থ্য সমস্যার মধ্যে অন্যতম ডায়াবেটিস। পৃথিবীতে এ মুহূর্তে ৪৫ কোটির অধিক লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। বাংলাদেশে প্রায় ৮০ লাখ লোক ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের মতে, প্রতি দুজন ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের মধ্যে একজন জানেই না সে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে। একজন প্রাপ্তবয়স্ক ডায়াবেটিস আক্রান্ত মানুষের আকস্মিক মৃত্যুর আশঙ্কা একজন সুস্থ মানুষের চেয়ে ৫০ ভাগ বেশি। আশঙ্কা করা হচ্ছে যে, ২০৪০ সাল নাগাদ বিশ্বব্যাপী মানুষের মৃত্যুর পঞ্চম কারণ হবে ডায়াবেটিস। আর তখন মৃত্যু বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে।

মায়ের ডায়াবেটিস গর্ভের বাচ্চার ওপর অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন-বাচ্চার জন্মগত ত্রুটি হতে পারে, গর্ভপাত হতে পারে, রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে, গর্ভের বাচ্চার ওপজন বেড়ে অস্বাভাবিক হতে পরে, সময়ের আগে ডেলিভারি হয়ে যেতে পারে, গর্ভের বাচ্চার আকস্মিক মৃত্যু ঘটতে পারে, বাচ্চা জন্মের পর শ্বাস-প্রশ্বাসে কষ্ট হতে পারে ও হাইপো গ্লাইসেমিয়া ঘটিত জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাছাড়াও অন্তঃসত্ত্বা মায়ের হৃদরোগ ও অন্যান্য জটিলতায় মাতৃমৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যায়।

গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি সেইসব নারীদের থাকে যাদের পরিবারে কারো ডায়াবেটিস আছে, আগে অধিক ওজনের (চার কেজি বা বেশি) সন্তান অথবা ত্রুটিযুক্ত সন্তান জন্মদানের ইতিহাস থাকলে; অজ্ঞাত কারণে পেটে অথবা জন্মের পরপরই সন্তান মারা যাওয়ার ইতিহাস থাকলে; বারবার সন্তান নষ্ট হওয়ার ইতিহাস থাকলে; গর্ভাবস্থায় সন্তানের পানির পরিমাণ অতিরিক্ত হলে কিংবা পূর্ববর্তী গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস থাকলে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায় দ্বিগুণ।

বর্তমানে গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত নারীর সংখ্যা ৬ থেকে ১৬ শতাংশ। দেশের ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি। অধিক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে আরো ১ কোটি। আর গর্ভবতী মায়েদের প্রতি চার জনের একজনরই ডায়াবেটিস হয়ে থাকে। একে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বলে। গর্ভবতী মহিলাদের ১-৩% এ প্রকারের ডায়াবেটিসে ভোগে, সচারাচর গর্ভাবস্থার ১৪-২৬তম সপ্তাহে। গর্ভকালীন ২ থেকে ৫ শতাংশ নারী ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। এদের মধ্যে ৮৭ দশমিক ৫ শতাংশ মা গর্ভজনিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন এবং ১২ দশমিক ৫ শতাংশ মা গর্ভধারণের আগে থেকে ডায়াবেটিসে ভোগেন।

গর্ভকালীন সময়ে মায়ের রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে অর্থাৎ সকালে খালি পেটে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৬.১ মিলি. মোল/লি. (১১০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা তার চেয়ে বেশি অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে ৭.৮ মিলিমোল/লিটার (১৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা তার চেয়ে বেশি হলে তাকে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হিসেবে শনাক্ত করতে হবে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে তেমন নির্দিষ্ট কোনো লক্ষণ নেই তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঝাপসা দৃষ্টি, ঘন ঘন প্র¯্রাব, যোনিপথ ও চামড়ার সংক্রমণ, অতিরিক্ত ক্লান্তি, অতিরিক্ত পানির তৃষ্ণা, ঘন ঘন মূত্রত্যাগ, বমি বমি ভাব অথবা বমি করা ইত্যাদি লক্ষণগুলো ডায়াবেটিস হলে প্রকাশ পায়। আবার ক্ষুধা বৃদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ওজন কমে গেলে এটি গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার একটি বিশেষ লক্ষণ।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস মা ও সন্তান উভয়ের ক্ষেত্রেই অনেক জটিল সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। মায়ের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থায় রক্ত চাপ বৃদ্ধি পেতে পারে, গর্ভ থলিতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি পেতে পারে, নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। প্রসাবের রাস্তায় ইনফেকশন হয়ে গর্ভের বাচ্চা নষ্টও হতে পারে। প্রসবকালীন সময়ে প্রসব দেরি হতে পারে। প্রসব পরবর্তী সময়ে দুধ আসতে দেরি হতে পারে। বাচ্চার ক্ষেত্রে মাথা বড়ো হতে পারে। এছাড়া এক্ষেত্রে শিশুর জন্মগত ত্রুটিও দেখা যেতে পারে যেমন- অহবহপবঢ়যধষু, Anencephaly, Microcephaly, netural Tube defect, ASD, VSD etc. হতে পারে।

গর্ভকালীন ডায়াবেটিসের চিকিৎসার জন্য শুধুমাত্র ইনসুলিন ইনজেকশন ব্যবহার করতে হবে। ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় মুখে খাওয়ার ঔষধ ব্যবহার না করাই ভালো। যাদের গর্ভধারণের আগে থেকেই ডায়াবেটিস আছে এবং মুখে খাওয়ার ঔষধ ব্যবহার করেন তাদের ক্ষেত্রে গর্ভসঞ্চার হয়েছে বোঝার সাথে সাথেই মুখ খাওয়া ঔষধ বন্ধ করে ইনসুলিন ব্যবহার শুরু করতে হবে।

গর্ভাবস্থায় সকলেরই সঠিক পরিমাণে ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে রোগীকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা মেনে চলতে হবে। সাধারণভাবে খাদ্য তালিকায় দৈনিক ৪০ ভাগ আমিষ, ৪০ ভাগ শর্করা ও ২০ ভাগ চর্বি জাতীয় খাদ্য বা ফ্যাট থাকতে পারে। গর্ভকালীন সময়ে অবশ্যই একজন পুষ্টিবিদ অথবা একজন ডায়াবেটিস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মতো খাদ্য তালিকা মেনে চলতে হবে। ডায়াবেটিক রোগীদের গর্ভাবস্থায় নিয়মিতভাবে হাল্কা হাঁটার অভ্যাস থাকতে হবে। তবে কোনো অবস্থাতেই কোনো ভারি ব্যয়াম করা ঠিক নয়। নিয়মিতভাবে রক্তের সুগার পরীক্ষা ও ইনসুলিনের মাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। এছাড়াও নিয়মিত রক্তচাপ মাপা, গর্ভস্থ শিশুর বৃদ্ধি সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তা পরিমাপ করাও একজন গর্ভবতী ডায়াবেটিক নারীসহ সকল ডায়াবেটিক রোগীর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কোনো জটিলতা না থাকলে একজন গর্ভবতী ডায়াবেটিক নারীর প্রসব স্বাভাবিকভাবে হতে পারে। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস থাকলেই সিজারিয়ান অপারেশন করতে হবে এমন কোনো কথা নেই। প্রসবের পর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব শিশুকে মায়ের বুকের দুধ খেতে দিতে হবে।

ভালো স্বাস্থ্য সুস্থ জীবনের প্রতীক। ডায়াবেটিক রোগের বিষয়ে সচেতনতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সরকার দেশব্যাপী স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় ডাক্তার ও নার্স নিয়োগসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধিতে পর্যাপ্ত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকার গ্রামীণ জনপদের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। যে সকল গর্ভবতী নারী কমিউনিটি ক্লিনিক থেকে প্রসবপূর্বক ও প্রসবোত্তর সেবা গ্রহণ করেননি, স্বাস্থ্য সহকারী ও পরিবারকল্যাণ সহকারীগণ তাদের খুঁজে বের করে কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা ব্যবস্থায় নিয়ে আসেন। এছাড়াও সরকার টাইপ ওয়ান ডায়াবেটিক রোগীদের বিনামূল্যে ইনসুলিন দেওয়ার চিন্তা করেছে।

সর্বোপরি ডায়াবেটিস একটি জটিল কিন্তু নিয়ন্ত্রণযোগ্য রোগ। প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে মা ও সন্তানের জটিলতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।প্রয়োজন শুধু সচেতনতা, নিয়মিত ঔষধ সেবন এবং নিয়মতান্ত্রিক শৃঙ্খলাপূর্ণ জীবন যাপনে অভ্যস্ত হওয়া।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com