৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৯শে রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

গাড়ির ভারে ন্যুব্জ রাজধানী

নিজস্ব প্রতিবেদক ● বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকা ও এর আশপাশে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন মুখ যুক্ত হচ্ছে। জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়া মানেই যাত্রী বেড়ে যাওয়া। বাড়তি যাত্রী পরিবহনের জন্য ঢাকায় বাড়ছে গাড়ির চাপ। সূত্রমতে এ মহানগরীতে দিনে গড়ে ৩০৩টি গাড়ি নিবন্ধন করা হচ্ছে। ছয় বছরে এই মেগাসিটিতে নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে দ্বিগুণ। সারা দেশের প্রাইভেট কারের ৭৮ শতাংশ ও মোটরসাইকেলের ২৬ শতাংশই চলছে ঢাকার রাস্তায়

দেশে নিবন্ধিত মোট গাড়ির ৩৭ শতাংশই চলছে ঢাকায়। প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র, তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের বড় সুযোগ; শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সেবা রাজধানীমুখী। ফলে মানুষের মূলস্রোত রাজধানীকেন্দ্রিক। আর তাই মানুষের যাতায়াতের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে গাড়ি। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ-বিআরটিএর হিসাবে সারা দেশে গত নভেম্বর পর্যন্ত নিবন্ধন হয়েছে ২৮ লাখ ৪২ হাজার ৩১৯টি গাড়ি। এর মধ্যে একই সময় ঢাকায় নিবন্ধিত হয়েছে ১০ লাখ ৫০ হাজার ১২৪টি গাড়ি। অথচ আন্তর্জাতিক মানদ- অনুযায়ী, (রাস্তার তুলনায় গাড়ি চলার হার) রাজধানীর রাস্তায় সর্বোচ্চ দুই লাখ ১৬ হাজার গাড়ি চলতে পারে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ও জাতিসংঘের জনসংখ্যা তহবিল-ইএনএফপিএর পরিসংখ্যান থেকে জানা গেছে, দেশে জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার হার ১.৪৭ শতাংশ। কিন্তু ঢাকা মেগাসিটিতে এই হার ৩.৮২ শতাংশ।

সারা দেশের তুলনায় তা ২.৩৫ শতাংশ বেশি। দেশের জনসংখ্যার ১০ শতাংশের বসবাস ঢাকা ও এর আশপাশে। বাড়তি এ জনসংখ্যার জন্য বাড়তি গাড়ির প্রয়োজনে অতিরিক্ত ভার বইতে হচ্ছে ঢাকা মহানগরীকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গাড়ির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত গণপরিবহন ব্যবস্থা মেট্রো রেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট-বিআরটি নির্মাণ করতে হবে। বর্তমানে এ মেগাসিটিতে জনসংখ্যা এক কোটি ৭০ লাখ। ২০৩৫ সালে তা বেড়ে দাঁড়াবে দুই কোটি ৬৩ লাখে। এই সময়ের মধ্যে পাঁচটি রুটে মেট্রো রেল নির্মাণ ছাড়াও সড়ক বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে ঢাকার সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনায় বা আরএসটিপিতে। ঢাকার বিভিন্ন পরিবহন সমিতি ও বিআরটিএ কর্মকর্তারা জানান, ছোট গাড়ি নিয়ন্ত্রণ না করায় তা বাড়ছেই।

তীব্র যানজটে ট্রিপ অর্ধেকে নামা, নামকাওয়াস্তে ব্যক্তিনির্ভর পরিবহন ব্যবসা, শিল্প হিসেবে পরিবহন খাতের বিশেষ সুবিধা না পাওয়া, সর্বোপরি এ খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় ঢাকায় গণপরিবহনের বদলে ব্যক্তিগত পরিবহন বেড়ে ভারসাম্যহীন অবস্থা তৈরি হয়েছে। একমাত্র সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসির বাস বহরে ঢাকায় চলাচলের জন্য আনা দুই শতাধিক বাসও অচল রয়েছে। ঢাকা আঞ্চলিক পরিবহন কমিটির সর্বশেষ সভায় ২৪টি কোম্পানির জন্য বাস-মিনিবাস নামানোর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বিআরটিএ ঢাকা উত্তর সার্কেলের তথ্যানুসারে, বিআরটিএতে ঢাকায় নিবন্ধিত বাস ও মিনিবাস আছে ৩৭ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ২১০টি রুটে চলাচল করছে মাত্র ছয় হাজার ৮০০। ঢাকায় নিবন্ধিত সব ধরনের গাড়ির তুলনায় বাস ও মিনিবাস দশমিক ৬৪ শতাংশ। আশা করা হচ্ছে, ২০১৮ সালের মধ্যে চালু হবে পদ্মা সেতু। এ কারণে ঢাকা-মাওয়া রুটে নামছে নতুন নতুন বাস। কুড়িল উড়াল সেতুর সঙ্গে পূর্বাচলের সংযোগের জন্য রাজউকের ৩০০ ফুট সড়ক নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ।

সার্ভিস লেনসহ বিশ্বমানের এ সড়কে নতুন বাস ও মিনিবাস নামাতে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন পরিবহন মালিকরা। তবে ঢাকা মহানগরীর মূল সড়কগুলোয় নতুন বাস ও মিনিবাস নামাতে তাঁরা ততটা আগ্রহী নন। ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ-ডিটিসিএর সমীক্ষানুসারে, ঢাকায় গণপরিবহনে প্রতিদিন ২১ লাখ ট্রিপের প্রয়োজন। কিন্তু গণপরিবহনের অভাবে অর্ধেক ট্রিপও দেওয়া হয় না। কারণ সড়ক দখলে রাখছে ছোট ছোট গাড়ি। যেগুলো বেশি যাত্রী পরিবহন করে না। নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি আদর্শ নগরীতে মোট আয়তনের ২৫ শতাংশ সড়ক থাকতে হয়। ঢাকায় রয়েছে মাত্র ৭ শতাংশ। ক্রমেই সংকুচিত নগরীতে জনসংখ্যা বাড়ছে, বাড়ছে যানবাহন। তার মধ্যে ছোট গাড়ি বেড়ে যাওয়ায় যাত্রী পরিবহনের অব্যবস্থায় জনদুর্ভোগ বাড়ছেই।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com