২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

চরমোনাই হাঁটছে আকাবিরদের পথে

রাজপাঠ । আমিনুল ইসলাম কাসেমী

চরমোনাই হাঁটছে আকাবিরদের পথে

মওদুদীর বাতলানো পথে নয়। মওদুদীর দৃষ্টিভঙ্গি লালন করা নয়। মওদুদীর কোন থিওরি অনুযায়ী চলছে না চরমোনাই। চরমোনাই চলছে আকাবিরে দেওবন্দের বাতলানো পথে। আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের দৃষ্টিভঙ্গি লালনকারী ওলামায়ে দেওবন্দের মাসলাক- মাশরাব অনুযায়ী।

মওদুদীর গোমরাহ আকিদা সমর্থন করেনা চরমোনাইয়ের পীর এবং তাঁর সংগঠন। আছমান- জমিনের ফারাক মওদুদীর চিন্তা- চেতনা এবং চরমোনাই এর চিন্তাধারার মধ্যে। মওদুদী সাহেব তো একজন ভ্রান্ত আকিদায় বিশ্বাসী। নবী ও সাহাবাদের সমালোচনাকারী এক ব্যক্তিত্ব। তার চিন্তাধারার মধ্যে বর্জ্য জমা হয়ে আছে। পক্ষান্তরে চরমোনাই এর পীরের সংগঠন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের চিন্তা- চেতনা লালনকারী একটি দল।

একজন লেখক লিখেছেন, “মওদুদীর পথে হাঁটছে চরমোনাই এর পীরের দল”। বড্ড ব্যাথা পেলাম লেখাটা পড়ে। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মওদুদীর অনুসারী জামাতকে অনুসরণ করে চলছে চরমোনাই এর পীরের সংগঠন। চরমোনাই নাকি মওদুদীর অনুসারী জামাতকে অক্ষরে অক্ষরে পালন করে যাচ্ছে!

বড় আশ্চর্য হলাম! “কোথায় আতর আলী আর কোথায় জুতার কালি”! চরমোনাই এর দৃষ্টিভঙ্গিতো সম্পূর্ণ দেওবন্দ তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের চিন্তাধারা অনুযায়ী। আর মওদুদী সাহেব তো একজন ভ্রান্ত চিন্তার ধ্বজাধারী। যাকে আলেমগণ গোমরাহ বলেছেন। সেই চরমোনাইকে মওদুদীর পথে হাঁটছে বলাটা বে- মানান। সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রোপাগান্ডা। মানুষের মাঝে বিভ্রান্তি ছড়ানো ছাড়া আর কিছু নয়।

চরমোনাই পীরের সংগঠন আকাবির- আছলাফের অনুসারী। ক্ষমতা দখলের রাজনীতি নয়। তারা রাজনীতি করে ইবাদত হিসেবে। এজন্য অত্যন্ত শান্তিপূ্র্ণভাবে তারা আন্দোলন – সংগ্রাম করে যাচ্ছে।

মওদুদীপন্থী ভাইয়েরা অভিযোগ করে থাকেন, ওলামায়ে কেরাম এবং চরমোনাই এর পীর নাকি রাজনীতিকে হারাম বলেছেন। এরপর তারা আবার নাকি রাজনীতি শুরু করেছেন। একটা ডাহা মিথ্যা অপবাদ। এর মত মিথ্যাকথা আর হতে পারে না। মওদুদীপন্থী ভাইদের কিছু লেখাপড়া করা উচিত। কিছু ইতিহাস নিয়ে চর্চা করা দরকার। তাহলে আপনাদের সঠিক জ্ঞানচক্ষু খুলে যাবে।

দেখুন! শত শত বছর ধরে ওলামায়ে কেরাম রাজনীতি করে আসছেন। এই ভারতবর্ষ স্বাধীন করার জন্য আলেমদের ত্যাগ- কোরবানীর কোন হিসাব নেই। হাজার হাজার আলেম রক্ত দিয়েছেন। হাজারো আলেম ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলেছেন। এই ভারত উপমহাদেশকে স্বাধীন করার জন্য। এদেশে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন তা ইতিহাসে জ্বলজ্বল করছে। আলেমগণ যদি গর্জে না উঠতেন, তাহলে কোনদিন এদেশে স্বাধীনতার সূর্য উদয় হত না, ইংরেজদের দাসত্ব বরণ করে চলতে হত সারাজীবন।

মওদুদীর অনুসারী ভাইদের ভাল করে জানা থাকা দরকার। ১৮৬৬ সনে দেওবন্দ মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, দেশকে স্বাধীন করার মানসে। এদেশে ইসলাম এবং মুসলমানদের টিকিয়ে রাখার জন্য। এই দেওবন্দ মাদ্রাসা স্বাধীনতা আন্দোলনের সুতিকাগার। এক মহীরুহে পরিণত হয়েছিল। দেওবন্দ মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা কাসেম নানুতবী রহ. থেকে নিয়ে সকল আলেমগণ মর্দে মুজাহিদের ভূমিকায় ছিলেন। দেওবন্দের সন্তান শায়খুল হিন্দ মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহ,, এই ভারতবর্ষকে স্বাধীন করার জন্য বিশ্বব্যাপি জাগরণ তুলেছিলেন। ইতিহাস বিখ্যাত তাঁর রেশমী রুমাল আন্দোলন সাড়া পড়েছিল বিশ্বব্যাপী।

হযরত শায়খুল হিন্দের মত হাজারো আলেম এবং পীর মাশায়েখ স্বাধীনতা আন্দোলনের বিপ্লবী সৈনিকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। এই মোবারক কাফেলার সর্বশেষ ব্যক্তি ছিলেন শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমাদ মাদানী রহ.।

সর্বশেষ ১৯২০ সালে আমাদের উলামায়ে দেওবন্দ সংগঠন কায়েম করেন যার নাম জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ। যেটার সাথে সকল আলেম এবং পীর মাশায়েখগণ জড়িত ছিলেন।

জনাব মওদুদী সাহেব তো এক সময় এই জমিয়েতের সাথে ছিলেন। কিন্তু তাঁর বেপরোয়া কলমের খোঁচায় আলেমদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হল। তিনি যেভাবে বাড়াবাড়ি শুরু করলেন, তাতে তিনি ছিলেন ক্ষমার অযোগ্য। উলামায়ে কেরামের কোন কথা তিনি কর্ণপাত করেন নি। বরং অহমিকার সাথে তিনি স্বীয় ভ্রান্ত- চিন্তা- চেতনায় অটল-অবিচল ছিলেন।

১৯৪১ সনে মওদুদী সাহেব তার ভ্রান্ত চিন্তা- চেতনা নিয়ে জামাতে ইসলামী দল প্রতিষ্ঠা করেন। সেই থেকে আস্তে আস্তে তার সংগঠন ছড়িয়েছে। আমাদের ওলামায়ে কেরামের শত শত বছর পরে মওদুদী সাহেব তার ব্যক্তিগত চিন্তা নিয়ে সংগঠনের যাত্রা শুরু করেছেন। সুতরাং একথা বলার অবকাশ নেই, আমাদের আলেম সমাজ রাজনীতি হারাম বলেছেন। ওলামায়ে কেরাম এবং পীর মাশায়েখ থেকে তিনি কোন ক্ষেত্রে অবদান বেশী রেখেছেন। বরং মওদুদী সাহেবের চিন্তাধারা আবিস্কার হওয়ার পর মুসলিম সমাজে ফেতনার দ্বার উম্মোচন হয়েছে। মুসলিম সমাজে ভাগাভাগি স্হান পেয়েছে। মওদুদী সাহেবের দর্শন লালন করে হাজার হাজার সরলপ্রাণ মুসলিম গোমরাহীর জালে আবদ্ধ হয়েছে।

মওদুদী সাহেব এবং তার সংগঠনের কোন দিকের কোন সাদৃশ্য নেই চরমোনাই এর সাথে। আকাশ – পাতালের পার্থক্য দেখা যায় দুই সংগঠনের মাঝে। এক. আকিদাগত তো পার্থক্য রয়েছেই। যেটা সবচেয়ে বড় পার্থক্য। মানুষের মূল হাতিয়ার তো আকিদা- বিশ্বাস। মওদুদী সাহেব এবং তাঁর অনুসারীরা ভ্রান্ত – আকিদা বিশ্বাস লালন করে থাকেন।

পক্ষান্তরে চরমোনাই এবং ওলামায়ে কেরাম আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাতের চিন্তা- চেতনা লালনকারী। তাঁরা নবীগণকে মাসুম মনে করেন। সাহাবায়ে কেরামকে মিয়ারে হক মনে করেন। কিন্তু মওদুদী সাহেব সম্পূর্ণ উল্টো।

দুই. মওদুদী সাহেবের সংগঠনের নাম জামায়াতে ইসলামী। আর চরমোনাই এর সংগঠনের নাম ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।

তিন. মওদুদী সাহেবের অনুসারী ছাত্র সংগঠনের নাম ইসলামী ছাত্র শিবির” আর চরমোনাই এর ছাত্র সংগঠনের নাম “ইসলামী শাসনতন্ত্র ছাত্র আন্দোলন”।

চার. মওদুদীর অনুসারী জামাতের কোন যুব সংগঠন নেই। কিন্তু চরমোনাই এর রয়েছে ‘যুব আন্দোলন”।

পাঁচ. মওদুদীর অনুসারী সংগঠন যেমন জামাত- শিবিরের অধিকাংশ কর্মীকে সুন্নাতের অনুসারী বলা যায় না। তারা দাঁড়ি মুন্ডায়, দাঁড়ি ছাঁটে, এই অপরাধকে তেমন কিছু মনে করে না।

পক্ষান্তরে চরমোনাই এর অধিকাংশ লোক সুন্নাতের পাবন্দী। তারা টুপি- পাগড়ী ওয়ালা। দাঁড়ি মুন্ডানো, দাড়ি কাঁটা- ছাটাকে চরম অপরাধ মনে করে।

ছয়. চরমোনাই এর ছাত্র সংগঠন যেখানেই থাকুক, তারা সুন্নাতে নববীর পাবন্দী। কিন্তু শিবিরের ভাইয়েরা সম্পূর্ণ বিপরীত।

সাত. শিবিরের শিল্পীগোষ্ঠী, সাইমুম শিল্পীগোষ্ঠী। আর চরমোনাই এর “কলরব “। তবে এখানে আকাশ- পাতালের ব্যবধান। কলরব” যেটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন আইনুদ্দীন আল আজাদ রহ,,। তিনি শিল্পীদের সম্পূর্ণ সুন্নাতের পাবন্দী করে গড়ে তুলেছিলেন। সেই যে “কলরব ” শিল্পীদের পাগড়ী মাথায় বেঁধে দিয়ে গেছেন, আজো তাদের মাথায় পাগড়ী শোভা পাচ্ছে। কিন্তু সাইমুম শিল্পী গোষ্ঠী এরকম কোন কিছু আজো জাতিকে দেখাতে পারিনি।

আট. চরমোনাই এর, প্রতিটি সংগঠন সর্বক্ষেত্রে সুনাম- সুখ্যাতি অর্জন করেছে। রাজনীতির ময়দানে পরিচ্ছন্ন রাজনীতি, শিক্ষাঙ্গনে শান্তির সুবাতাস বয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মওদুদী সাহেবের অনুসারীরা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত। ৭১ সনের স্বাধীনতা আন্দোলনে তারা পাকিস্তানের পক্ষে কাজ করেছেন। যার জন্য তাদের রাজনীতি আজ প্রত্যাখ্যাত। যুদ্ধাপরাধের দায়ে জড়িয়ে পড়েছিলেন নেতারা।

৭১ স্বাধীনতা যুদ্ধে চরমোনাই মাদ্রাসায় ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প। স্বয়ং মরহুম পীর ইসহাক রহ. মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ছিলেন। যার সাথে মুক্তিযোদ্ধাগণ পরামর্শ করতেন, দুআ নিতেন। এজন্য “মওদুদীর পথে হাঁটছে চরমোনাই পীরের দল” সম্পূর্ণ ডাহা মিথ্যা। চরমোনাইকে বিতর্কিত বানানোর নয়াকৌশল বলা যেতে পারে।

চরমোনাই হাঁটছে আকাবিরদের পথে মওদুদীর পথে নয়।

আল্লাহ আমাদের সবার উপর রহম করুন। আমিন।

লেখক : কওমি মাদরাসা শিক্ষক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com