১৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৩রা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ২৯শে মুহাররম, ১৪৪২ হিজরী

চার আলেমের পিতা এবং আমার পর্যবেক্ষণ

ডাক দিয়ে যাই । লাবীব আবদুল্লাহ

চার আলেমের পিতা এবং আমার পর্যবেক্ষণ

তখন আমি ছাত্র৷ পড়ি জামিয়া আরাবিয়া মাখযানুল উলূম ময়মনসিংহে৷ তালতলা মাদরাসা৷ আমার প্রাণের মাদরাসা৷ যার সাথে আমার স্মৃতি দুই যুগের৷ আমি আজ আমার কোনো স্মৃতির কথা লিখবো না৷ লিখবো মাদরাসার একজন প্রতিবেশীর কথা৷ মাদরাসার প্রতিবেশীরা সাধারণত মাদরাসায় সন্তান পাঠায় কম৷ পাঠালেও আলেম হয় কম৷ মাওলানা বা আলেম হলেও তা হয় নামেমাত্র৷ আপনার পাশের মাদরাসার প্রতিবেশীর চারপাশ খেয়াল করলেই বিষয়টি প্রতিভাত হবে৷ উদ্ভাসিত হবে৷ প্রতিবেশিরা আঁড়ি আঁড়ি ভাব রাখে মাদরাসার সাথে৷ দূর থেকে কষ্ট সহ্য করে মাদরাসার ডাল ভাত খেয়ে আলেম হয়ে ছড়িয়ে পড়ছেন দেশ বিদেশে কিন্তু মাদরাসার প্রতিবেশীর কেউ ঠিকমতো মাদরাসায় সন্তান দিচ্ছেন না৷ বিষয়টা বাত্তির নিচে অন্ধকারের প্রবাদের কাছাকাছি৷ আমি আজ ব্যাতিক্রম এক প্রতিবেশীর কথা বলবো৷

দুই
আমি যখন মাখযানের ছাত্র সেই মাখযানের ও আজকের মাখযান আকাশ পাতালের ফরাক৷ এখন মাদরাসার সীমানা প্রাচীর চার দিকে৷ বহুতল ভবন উত্তরে দক্ষিণে৷ পুকুরটি ভরাট৷ পুবে লম্বা টিনের ঘর৷ আরামদায়ক বাথরুম ও এসিযুক্ত মেহমানখানা৷ উন্নতির নানা পর্ব মাখযানের৷

আমি ১৯৮৬ সালের কথা বলছি৷ মাদরাসার নিজস্ব মসজিদ নেই নামায দারোগা বাড়ি মসজিদে৷ দক্ষিণ পশ্চিম কোনে একটি টাট্টি বাথরুম৷ একটি কল বড় একটি পুকুর৷ পুকুর পাড়ে উত্তরে তল্লার বেড়া৷ পুকুরের ঘাট নেই পাক্কা ঘাট৷ পুকুরের পশ্চিম পাড়ে লেচু ও কাঁঠাল গাছ৷ পূর্ব পাশে কাঁঠাল৷ পুকুরের পূব উত্তর কোনে একটি বাঁশঝাড়৷ বর্তমান মসজিদের উত্তরে পরিত্যক্ত একটি টিনের দুচালা মূল দরসগাহ৷ সাথেই বর্তমান মাঠটি যেখানে সভা হয় এবং ঈদের বিশাল জামাত হয় সেটি তখন ধান ক্ষেত৷ আমি তখন এক বছর ফেরারি ও যাযাবারি জীবন কাটিয়ে পুণঃবার কওমী মাদরাসায় পড়ার নিয়তে হেদায়েতুন্নাহু জামাতে ভর্তি হয়েছি৷ মাদরাসার তিন কিলোমিটার দক্ষিণে কল্পায় জায়গীর থাকি৷ রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে এবং দুপুরের ভাত মাগরিবের আগে ভক্ষণ করতে পারি মাদরাসা থেকে কল্পায় গিয়ে৷ দরস আমাদের সেই উত্তরের তল্লার বেড়ার নির্মিত ঘরে৷ পুকুর পাড়ে৷

আমি একটি কামরায় দেখতাম একজন বিনয়ী উস্তাযকে৷ তিনি সব সময় কিতাব নিয়ে বসে থাকেন৷ নিমগ্ন মুতালাআয়৷ কম কথা বলেন তিনি৷ সদা মুখে হাসি৷ ছোট একটি চৌকিতে তিনি তেপায়ায় নিমগ্ন পাঠে৷ মাঝে মাঝে তিনি সেই তেপায়ায় পড়তে পড়তে ঘুমিয়ে যান আবার জেগে ওঠে কিতাবে চোখ রাখেন৷ এই উস্তাযের নাম রঈসুল ইসলাম৷ মুফতী রঈস (হাফিজাহুল্লাহু)৷ আমি কুদূরী, তাইসিরুল মান্তেক এবং বুখারি ছানি পড়ার সৌভাগ্য লাভ করেছি সেই উস্তাযজীর কাছে৷

তিনি বর্তমানে ময়মনসিংহ বড় মসজিদের ছানী ইমাম ও জামিয়া ফয়জুর রহমান রহ ময়মনসিংহের নাযেমে তালীমাত৷ আমি এই মুফতী সাব হুজুরের আব্বার কথা বলছি৷ তিনি টাঙ্গাইল জেলার ঘাটাইল থানা থেকে বাড়িঘর থেকে বিদায় নিয়ে মাখযানের প্রতিবেশী হয়ে ছিলেন৷ মাখযান মাদরাসার তখন যেহেতু প্রাচীর ছিলো না৷ তিনি মাদরাসার পশ্চিমের সীমানার কাছে জায়গা কিনে বাড়ি করলেন৷ পাঁচ ওয়াক্ত নামায মাদরাসার মসজিদেই পড়েছেন আমৃত্যু৷ এই মুরব্বীর জানাযাও হয়েছে মাদরাসার মাঠে৷

তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও সরল৷ টাঙ্গাইলের নিজস্ব কথার টোনে কথা বলতেন৷ চুপচাপ৷ তিনি মাদরাসার কাছে বাসা করেছেন ছেলেদের পড়া লেখার সুবিধার্থে৷ মসজিদের প্রতিবেশী এবং মাদরাসার প্রতিবেশী৷ ছয় ভাইয়ের সবার জন্য পৃথক জায়গা ক্রয় করেছেন৷ সবাই যেনো মাদরাসা ও মসজিদের কাছে থাকতে পারেন৷ মুফতী সাব হুজুর লালবাগ ও দেওবন্দে পড়েছেন৷ ইফতাও দেওবন্দে৷ এসএসসি পাশও৷

তিন
এই সফল অভিভাবকের এক ছেলে রফিউল ইসলাম৷ মাওলানা রফিউল ইসলাম৷ তিনি মাখযানেরই উস্তায ছিলেন আমাদের সময়৷ দুই দশক খেদমত করেছেন তিনি মাখযানে৷ আমরা পড়েছি এই হুজুরের কাছে কুতবি, কাফিয়া আরও কিছু কিতাব৷ তিনি কাফিয়ার বেমেছাল উস্তাদ৷ তিনি আমাদের ঘাটালি হুজুর৷ ঘাটালী হুজুর আমাদের আরবী পত্রিকা মাসিক আল কলম পড়তে দিতেন৷ আমরা আরবী ছোট ছোট বাক্য লিখলে তিনি তাসহীহ করে দিতেন৷ আমি ও গোলাম রব্বানী (বর্তমানে ঢাকা ভার্সিটির প্রফেসর) কলমে লেখা পাঠাতাম৷ একটি দুটি লেখার প্রাপ্তি স্বীকার উত্তরে আমাদের নাম ছাপা হতো৷ আমরা একটি আরবী দেয়ালিকা করে ছিলাম এই উস্তাজীর পূর্ণ নেগরানি ও উৎসাহে৷ একটি বাংলা দেয়ালিকা করেছিলাম এতেও তিনি ছিলেন প্রেরণাদায়ক৷ রব্বানী ও আমি ছিলাম দেয়ালিকার সম্পাদক! আল মিসবাহ ও নেদায়ে মাখযান ছিলো সেই সময়ের দেয়ালিকার নাম৷ পরে আল মানজুর৷ প্রিন্টেড আল মানজুরের সম্পাদকের ঘরেও আমার নাম যেতো৷

আমার আরবী টুকটাক বাক্য লেখার বীজ বপন করে ছিলেন যারা ঘাটালী হুজুর অন্যতম৷ ঘাটালী হুজুর পড়েছেন লালবাগ ও কামরাঙ্গীর চরে৷ সেই আশির দশকেই তিনি আমার উস্তায৷ ঘাটালী হুজুর বর্তমানে ময়মনসিংহ বড় মসজিদ মাদরাসায় খ্যাতিমান মুহাদ্দিস৷ কাফিয়ার শরাহ লিখেছেন এবং প্রকাশিত৷

এই সফল অভিভাকের আরেক ছেলে মাওলানা রমিজুল ইসলাম৷ তিনি ঐতিহ্যবাহী জামিয়া ইসলামিয়া চরপাড়া ময়মনসিংহের মুহাদ্দিস৷ মাসকান্দা মসজিদের খতীব৷

পড়েছেন দেওবন্দে৷ রমিজ ভাইয়ের মেয়ে একজন হাফেযা৷ আমার কাছেও পড়েছে মিফতাহুল জান্নাত মহিলা মাদরাসায়৷ রমিজ ভাই জুব্বা পরেন৷ পড়েছেন দেওবন্দে৷ পিতার মতোই কম কথা বলেন৷ মুখে হাসি ও বিনয়৷

এই সফল মানুষটির আরেক ছেলে রজিবুল ইসলাম৷ মাওলানা রজিব মাসিক আদর্শ নারীতে কিছু দিন ছিলেন৷ রজিব ভাইয়ের বিবি সাহেবা মিফতাহুল জান্নাতে পড়েছেন৷ রজিব ভাই যে মসজিদের খতীব ছিলেন তিনি সৌদী আরবে চলে যাওয়ার পর সেই মসজিদে খতীব ছিলাম সাত বছর৷ রজিব ভাই হাস্যময় চেহারার মানুষ৷ তিনি সৌদী প্রবাসী৷ ছয়তলা ভবনের মালিক৷ মাদরাসার কাছের বাসাটি পিতা যা ক্রয় করে ছিলেন৷

চার
এই সফল অভিভাকের আরেক ছেলে রফিকুল হক৷ তিনি আমার দেখা সেরা বুজুর্গ ও আমানতদার৷ মিফতাহুল জান্নাতে দশ বছর একসাথে ছিলাম৷ আমি ২০১১ সালে চলে আসি তিনি এখনও সেখানে হিসাব রক্ষক৷ আমি যেহেতু নাযেমে তালীমাত ছিলাম হিসাবপত্রও জমা দিতে হয়েছে আমার৷ তিনি এতো বিনয়ী আচরণ করতেন তা আমি কল্পানাও করি না কারোর কাছে৷ অথচ তিনি উল্লেখিত চার ভাইয়ের বড় ভাই৷ মুহতারাম রফিক সাহেবের ছেলে ও মেয়েরা আমার কাছে কিছু কিতাব পড়েছে মাখযানে মেয়েরা মিফতাহে৷ তিন চার জন এখন আলেম৷ আরেকজন ভাই সরকারি চাকুরি করেন কিন্তু ছেলে মেয়েরা মাদরাসায়৷ এই পরিবারের বীজ যিনি রোপণ করেছেন সেই সফল মুরব্বী ছিলেন আমানতদার৷ নামাযী৷ বিনয়ী৷ দানশীল৷ সুশীল৷ ভক্তি করতেন আলেম উলামাদের৷

এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কয়েক ডজন আলেম ও আলেমা৷ সুখী পরিবার৷ প্রত্যেকের ভবন পাকা৷ সবাই দীনি খেদমতে৷ মসজিদ ও মাদরাসা আবাদ করছেন৷ আমার দীর্ঘ পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে এঅ পরিবারের প্রথম প্রজন্মের চার ভাইয়ের আলেম হওয়ার পেছনে অন্যতম কারণ পিতা হালাল লুকমা খেতেন৷ আলেম উলামাকে ভক্তি করতেন৷ এই ভক্তি থেকেই দীনদারি রক্ষার নিয়তে তিনি হয়েছেন মাদরাসার প্রতিবেশী৷ আমার সৌভাগ্য এই পরিবারের উস্তাদের ছাত্র হতে পারে৷

আমার সৌভাগ্য এই পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের ছেলে ও মেয়েদের শিক্ষক হয়ে৷ আমার সৌভাগ্য এই সফল অভিভাকের কাছে দুআ নিতে পারায়৷ তিনি এখন কবর দেশে৷ ছেলে মেয়ে এবং নাতিন নাতনিরা দুআ করেন৷ স্মরণ করেন নানা ও দাদা হিসেবে৷ মুফতী সাব হুজুর জীবনে কোনো ইচ্ছাকৃত গোনাহ করেন মনে হয় না এবং তিনি আমার দেখা শীর্ষ হালালখানেওয়ালা হুজুর্গ৷ সহকর্মী মুহতারাম রফিক সাহেব বললেন,
আমার পাঁচ ভাই সপরিবারে যাচ্ছেন কাবার পথে৷ হজে৷
বললাম,
আপনাকেও আল্লাহ নেবেন তার ঘর জিয়ারতে৷
তাঁর চোখ ছলছল করছে তখন। তিনি বললেন, তালিমাত সাব আপনি দুআ করবেন৷

আমি কী দুআ করবো আমি তো এই রফিক সাবের দুআর মুহতাজ, কারণ তিনি হালাল রিজিকে জীবন যাপন করেন পিতার মতো৷ আমরা যারা অভিভাবক যদি সন্তানকে আলেম বানাতে চাই তাহলে হালাল খাবারের চেষ্টা করি এবং ভক্তি করতে শিখি আলেম উলামাকে যেমন হালাল খেতেন ও আলেমদের ভক্তি করতেন সফল অভিভাবক মুফতী সাবের আব্বু৷
আমার উস্তাযজীর আব্বু দুনিয়াতে সুখী ছিলেন৷

আখেরাতেও সুখী হবেন দুআ করি রবের কাছে৷

এই সফল অভিভাবক আমাদের প্রেরণা৷ একজন ত্যাগী ও সফল মানুষের উপমা আমাদের সমাজে৷

মাদরাসা ইবনে খালদুন ময়মনসিংহ

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com