৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

চাল চিকন করার প্রতারণারোধে উদ্যোগী সরকার

চাল চিকন করার প্রতারণারোধে উদ্যোগী সরকার

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম : মোটা চাল কেটে চিকন করে বেশি দামে বিক্রি করে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন এক শ্রেণির অসাধু মিল মালিক। এই প্রতারণা রোধে বাজারে থাকা চালের উৎস ধানের জাত নির্ণয়ের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য ২১টি জেলায় একটি সমীক্ষা চালানো হবে।

এসব জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বিভিন্ন নাম ব্র্যান্ডের চাল কোন কোন জাতের ধান থেকে তৈরি করা হচ্ছে, তা নির্ণয় বা অনুসন্ধানের জন্য খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) ১৩ জন কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

এই সমীক্ষার তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং তা তদারকির জন্য ১৩ জন কর্মকর্তা এসব জেলা ভ্রমণ করছেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা গত ৭ অক্টোবর থেকে কাজ শুরু করেছেন। তারা ৩১ অক্টোবরের মধ্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা থেকে নির্ধারিত প্রশ্নপত্র মোতাবেক তথ্য সংগ্রহ কার্যক্রম সম্পন্ন করে পরবর্তী তিনদিনের মধ্যে সচিত্র প্রতিবেদন জমা এবং ডাটা এন্ট্রি দেবেন বলে খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে।

তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মন্ত্রণালয় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা এই কাজটি শেষ করতে পারবেন না। তাদের আরও সময়ের প্রয়োজন হবে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (সংগ্রহ ও সরবরাহ) এবং খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের মহাপরিচালক মো. তাহমিদুল ইসলাম বলেন, ‘ভোক্তাকে কাঙিক্ষত চাল কিনতে সহায়তা করা, প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করা এবং ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে বাজারে পাওয়া বিভিন্ন নাম ব্র্যান্ডের চাল কোন কোন জাতের ধান থেকে তৈরি করা হচ্ছে তা নির্ণয় বা অনুসন্ধানের জন্য একটি সমীক্ষা পরিচালিত হচ্ছে। এজন্য খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের কাজ চলছে। কর্মকর্তারা কাজ করছেন। তাদের সুপারিশের ভিত্তিতে আমরা পরবর্তী ব্যবস্থা নেব।’

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, চালকল মালিকরা মোটা চাল চিকন করে মিনিকেট, নাজিরশাইল, কাজল নামে বাজারজাত করছেন। এতে মোটা চালের ভেতরের অংশ বেশি দামে কিনে প্রতারিত হচ্ছেন ক্রেতারা। এছাড়া চালের উপরিভাগে যে পুষ্টি থাকে তা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন ওই চালের ভোক্তা। এতে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।

ধান গবেষণা, বিএডিসি ও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, দেশে উৎপাদিত চালের ৮৫ শতাংশই মোটা, আর ১৫ শতাংশ চিকন।

বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, দেশে বোরো ও আমন মৌসুমে ব্যাপকভাবে চাষ হয় ব্রি ২৮ ও ব্রি ২৯ ধান। কিন্তু চালের বাজারে এই নামে কোনো চাল নেই। বাজারে মিনিকেট ও নাজিরশাইল নামে চাল পাওয়া যায়, কিন্তু এই নামে ধানের কোনো জাত নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্রি-২৮ এবং কিছু ক্ষেত্রে ব্রি-২৯ ধান কেটে ‘মিনিকেট’ নামে বাজারজাত করা হয়। একইভাবে ব্রি ২৯ ধান অধিক ছাঁটাই ও পলিশ করে চালের নাম দেয়া হয় ‘নাজিরশাইল’।

সমীক্ষার জন্য খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের গবেষণা পরিচালক মো. হাজিকুল ইসলাম, মাহবুবুর রহমান ও ফিরোজ আল মাহমুদকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। এছাড়া সহযোগী গবেষণা পরিচালক মিজানুর রহমান, আলিমা নুসরাত জাহান, মোস্তফা ফারুক আল বান্না, মো. ইসমাইল মিয়া, মো. আবুল হাসেম দায়িত্ব পেয়েছেন।

আরও দায়িত্বে রয়েছেন গবেষণা কর্মকর্তা হিল্লোল ভৌমিক, মো. মেহেদী হাসান সোহাগ, ধীমান সেন, প্রসেনজিৎ শিকদার এবং ডকুমেন্টেশন অফিসার শহীদুল্লাহ।

এই ১৩ জন কর্মকর্তা সমীক্ষার জন্য যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, বগুড়া, নওগাঁ, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, শেরপুর, ময়মনসিংহ, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, জামালপুর, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা, নোয়াখালী, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা ভ্রমণ করবেন।

গবেষণা পরিচালক হাজিকুল ইসলাম বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে লোকজন কাজ করছেন। আমরা যাচ্ছি। ডাটা সংগ্রহ চলছে। আমরা অন্যান্য কাজ নিয়েও ব্যস্ত আছি। এরমধ্যেই কাজটি করার চেষ্টা করছি। ডাটা সংগ্রহের কাজ করে কাজটি সম্পন্ন করতে কিছুটা সময় লাগবে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা দেখতে চাই, আমাদের দেশে চালের ব্র্যান্ডিংটা কীভাবে হচ্ছে। কোন চাল কোন ধানের জাত থেকে আসছে। আমরা এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য দেব। এরপর সরকার সিদ্ধান্ত নেবে এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে।’

‘চালের ক্ষেত্রে অনেক কিছু শোনা যায়। বাস্তবতাটা কী আমরা সেটা দেখব। এরপরই এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট করে বলা যাবে। ডাটাগুলো আসার পর তা অ্যানালাইসিস করে বলা যাবে আমাদের মোটা চাল কত হয় আর বাজারে কী পরিমাণ মোটা চাল পাওয়া যায়। চিকন চাল কী পরিমাণ হয়, বাজারে কী পরিমাণ চিকন চাল পাওয়া যায়’-বলেন গবেষণা পরিচালক হাজিকুল ইসলাম।
গবেষণা পরিচালক ফিরোজ আল মাহমুদ বলেন, ‘আমরা দেখতে পাচ্ছি, এটি একটি সময়সাপেক্ষ কাজ। আমরা কয়েকটি জেলায় এরমধ্যে গিয়েছি। কোয়েশ্চেনিয়ার অনুযায়ী তথ্য সংগ্রহ করেছি। ২১টি জেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। আমরা ইতোমধ্যে অর্ধেক জেলা থেকে তথ্য পেয়ে গেছি। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে হয়তো আমরা সব তথ্য পেয়ে যাব।’

তিনি বলেন, ‘বাজারে অনেক ব্র্যান্ডের চাল বিক্রি হচ্ছে। চালকল মালিকরা অটো রাইস মিলে চাল তৈরি করে নিজস্ব নামে ব্র্যান্ডিং করে বাজারে দিচ্ছে। ব্রি-২৮ ও ব্রি-২৯ নামের ধান থেকে আসা চাল বাজারে একই নামে বিক্রি হচ্ছে কি-না! যে চালটা কিনে খাচ্ছে ভোক্তারা তার ধানের জাত সম্পর্কে তারা জানে কি-না। ভোক্তা যদি এটা না জানে, নিশ্চয়ই তারা প্রতারিত হচ্ছে। আমরা এই বিষয়টিই অনুসন্ধানের চেষ্টা করছি।’

‘আমরা দেখছি, কোন চাল কোন ধান থেকে আসছে। চালের ব্র্যান্ড নাম কী! ব্র্যান্ড নামের সঙ্গে ধানের নামের সামঞ্জস্যতা কতটুকু-আমরা সবকিছু রিপোর্ট আকারে দেব’- যোগ করেন গবেষণা পরিচালক ফিরোজ আল মাহমুদ।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com