শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০৭:২৯ অপরাহ্ন

জলবায়ু মোকাবিলায় নজীরবিহীন পদক্ষেপের প্রশংসায় বিশ্ব

এই সময়। সাদেকুর রহমান

জলবায়ু মোকাবিলায় নজীরবিহীন পদক্ষেপের প্রশংসায় বিশ্ব

জলবায়ূ পরিবর্তনের ক্ষতিকর ও বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ ব্যাপক সাফল্য দেখিয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় ২০০৯-’১০ অর্থবছরে নিজস্ব অর্থায়নে গঠন করে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড’। বিশ্বের কোনো দেশের নিজস্ব অর্থায়নে এ ধরনের ফান্ড গঠনের কোনো নজির নেই। পাশাপাশি বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এটিও বিশ্বে প্রথম।

প্রণয়ন করা হয়েছে ‘জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন ২০১০’সহ প্রয়োজনীয় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা। জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজন কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়নে ‘বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ রেজিলিয়েন্স ফান্ড (বিসিসিআরএফ)’ গঠন করা হয়েছে। এমনকি পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের নাম পরিবর্তন করে ২০১৮ সালে ‘পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়’ রাখা হয়েছে। এভাবেই জলবায়ুজনিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুরো বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশ। জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামের নেতৃত্বে স্থান পাচ্ছে বাংলাদেশ, লাভ করেছে আন্তর্জাতিক পুরস্কারও।

গত ১০-১১ জুলাই ঢাকায় আয়োজিত জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় দু’দিনব্যাপী জলবায়ু বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘গ্লোবাল কমিশন অন অ্যাডাপটেশন (জিসিএ)’ এর ঢাকা বৈঠকে জিসিএ’র চেয়ারম্যান ও জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব মি. বান কি-মুন বলেছেন, ‘অবশ্যই আমরা এখানে বাংলাদেশের কাছে শিখতে এসেছি। অভিযোজনের বিষয়ে শেখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক। অভিযোজন অনুশীলনে বাংলাদেশের জনগণ ও সরকার যে নেতৃত্ব অর্জন করেছে, তা অলৌকিকের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়’।

ওই সম্মেলনে বান কি মুন ছাড়াও মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের প্রেসিডেন্ট হিলদা সি. হেইন, সম্মেলনের কো-চেয়ার এবং বিশ্বব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. ক্রিস্টালিনা জর্জিওভা প্রমূখ জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় সামনের সারিতে থেকে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনন্য নেতৃত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
জিসিএ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমে গত এক দশকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক খাতে যে বিশাল উন্নতি হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতিকূল প্রভাবে আজ তা হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। জনগণের জন্য অভিযোজন ব্যবস্থা তৈরি করতে তাঁর সরকারের নিরলসভাবে কাজ করা প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, গত এক দশকে আমরা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবসমূহ অভিযোজনের মাধ্যমে নিরসনের জন্য বছরে প্রায় একশো কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করছি। এ সময় তিনি জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ড গঠন এবং এই ফান্ডে বাংলাদেশের নিজস্ব তহবিল থেকে জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচির জন্য ৪২ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি বরাদ্দের কথাও উল্লেখ করেন।

জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও ব্যবস্থাপনাগত উন্নতির মাধ্যমে দুর্যোগে প্রাণহানি কমিয়ে অনন্য এক নজীর গড়েছে বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, শুধু ১৯৭০ সালের ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে ৭ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষ মারা যায়। ২০০৭ সালের ঘূর্ণিঝড় সিডরে মারা যায় ৩ হাজার ৪শ’ জনের বেশি মানুষ। ২০০৯ সালের মে মাসে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাইক্লোন আইলার প্রভাবে ১১৯ জনের মতো মানুষ মারা যায়। আর চলতি বছর মে মাসে বয়ে যাওয়া সুপার সাইক্লোন ফণীতে কেউ মারা না গেলেও সে সময় অন্যান্য কারণে ১০ জন প্রাণ হারায়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জনসচেতনতা সৃষ্টি ও বৃদ্ধির উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপকূলীয় অঞ্চলে ১৭২টি মুজিব কেল্লা (সাইক্লোন শেল্টার) নির্মাণের মাধ্যমে দুর্যোগ মোকাবিলায় পথ রচনা করেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনের সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় পূর্বপ্রস্তুতি হিসেবে সাইক্লোন প্রিপেয়ার্ডনেস প্রোগ্রাম (সিপিপি) গ্রহণ করেন। সিপিপি’র বর্তমানে ৪৯ হাজার ৩শ’ ৬৫ জন প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। জাতির জনক সে সময় ৪৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের এক বাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হন।

তাঁরই রচিত পথে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় ৩৭৮টি মুজিব কেল্লা নির্মাণ করছে। এছাড়া দেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৩ হাজার ৮৬৮টি বহুমুখী সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হয়েছে। আরো ১ হাজার ৬৫০টি সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করা হবে। আগামী ৫ বছরে দেশের ২২ থেকে ২৪ ভাগ অঞ্চল গাছপালায় আচ্ছাদিত হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ২ লাখ হেক্টর উপকূলীয়-বনায়ন সৃষ্টি করে সবুজ বেষ্টনীর মাধ্যমে জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূল অঞ্চলকে সুরক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বাংলাদেশ অত্যন্ত সফলভাবে ৬ লাখ ১ হাজার ৭শ’ হেক্টর এলাকার সুন্দরবন ম্যানগ্রোভ বনের ব্যবস্থাপনা করছে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (২০১৬-২০২০) পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির জন্য অথনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে সমন্বয় করতে একটি সবুজ প্রবৃদ্ধি কৌশল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। মূলত জলবায়ু পরিবর্তন ব্যবস্থাপনা ও স্থিতিস্থাপকতা (অভিযোজন ও প্রশমন সমন্বয়ে), পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা। তিনটি থিমের ওপর ভিত্তিকরে এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। এছাড়া জলবায়ুর ঘাত-প্রতিঘাত সহ্য করে কাক্সিক্ষত উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় ‘বাংলাদেশ ব-দ্বীপ পরিকল্পনা-২১০০’ শীর্ষক শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের ডেল্টা ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতার আলোকে পন্থা অনুসরণ করে নেদারল্যান্ডস ও বাংলাদেশ বিশেষজ্ঞদের যৌথ সহায়তায় ২০১৮ সালে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। এই পরিকল্পনাটি ২০৩০ সালের মধ্যে আমাদের মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে একটি সমৃদ্ধ দেশের মর্যাদা অর্জন করতে সহায়ক হবে। ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০ সাল নাগাদ স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনাসমূহের সমন্বয়ের যোগসূত্র সৃষ্টি করবে বলে নীতিনির্ধারকরা আশা করছেন।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ বিষয়ক বেশ কিছু বলিষ্ঠ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিভিন্ন অংশীজনের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অভিযোজন ও স্বল্প-কার্বন নির্গমণ (এলসিডি)-এর জন্য বাংলাদেশ জলবায়ু কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা (বিসিসিএসএপি) প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশগত চ্যালেঞ্জসমূহ মোকাবিলা করতে জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি)-র সহায়তায় জাতীয় টেকসই উন্নয়ন কৌশল (এনএসডিএস) প্রণয়ন করা হয়েছে। পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাকে অন্যতম কৌশলগত অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করে টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃত কর্মপ্রক্রিয়া সুষ্পষ্ট করা হয়েছে।

পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যে প্রাক-শিল্প স্তরের চেয়ে প্রায় এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেট উপরে পৌঁছেছে। ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল মানব ইতিহাসে সবচেয়ে উষ্ণ বছর ছিল। ‘জার্মান ওয়াচ’র ক্লাইমেট চেঞ্জ ভার্নাবিলিটি ইনডেক্স- ২০১৮ অনুসারে, ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৬ সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিল ৬ষ্ঠ।
দক্ষিণ এশিয়ার জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) জলবায়ু এবং অর্থনীতি বিষয়ক প্রতিবেদনের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি ২ শতাংশ কমে যাবে। যদি বর্তমান হারে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে, তবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ১৯টি উপকূলীয় জেলা স্থায়ীভাবে ডুবে যাবে। এরই মধ্যে নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগে সমুদ্রতল বৃদ্ধি এবং লবণাক্ততা বাড়ার ফলে বাংলাদেশের বিস্তৃত এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বিভিন্ন তথ্য-প্রমাণ বলছে, বাংলাদেশে ইতোমধ্যে ৬০ লাখ জলবায়ু অভিবাসী রয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে এটি বেড়ে দ্বিগুণেরও বেশি হতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় হুমকি হয়ে দেখা দিতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়ে জাতিসংঘের আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) বলছে, সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা আর যদি এক মিটারও বাড়ে তাহলে ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ শতাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের বতর্মান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সাল নাগাদ ঝুঁকির মধ্যে থাকা বাংলাদেশের উপকূলবর্তী জেলাগুলোর ১৩ কোটি ৩৪ লাখ মানুষের মাথাপিছু জিডিপি ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ হ্রাস পাবে বলে মনে করছে বিশ্ব ব্যাংক। সংস্থাটি মনে করছে, এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াবে ১৭১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তথ্য অনুযায়ী, ঝুঁকির শীর্ষে থাকা ১০ জেলা হলো- কক্সবাজার, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, নোয়াখালী, ফেনী, খাগড়াছড়ি, বরগুনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা। এর মধ্যে বেশি ঝুঁকির মুখে রয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের মানুষ।

এতকিছুর পরও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব ও দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ নিজস্ব কৌশল অবলম্বন করে চলেছে। লবণাক্ততা, বন্যা ও খরাসহিষ্ণু ফসলের প্রজাতি উদ্ভাবন এবং চাষের মাধ্যমে এ বিষয়ে সক্ষমতা গড়ে তোলা হয়েছে। বিদ্যমান বাস্তবতায় দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জন্য বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক একটি বৈশ্বিক অভিযোজন কেন্দ্র নির্মাণ এখন সময়ের দাবি।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com