৩০শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৪ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১২ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

জাকাত | সাখাওয়াত রাহাত

জাকাত | সাখাওয়াত রাহাত

(বাস্তবতা অবলম্বনে)

মা! ওমা! কি অইছে তোমার?
মাগো! কতা কওনা ক্যান?
ও বাজান! মায় কতা কয় না ক্যান?

মায়ের ঝুলন্ত লাশের পাশে দাঁড়িয়ে চার-পাঁচ বছরের ছোট্ট খুকি ‘ময়না’র আর্তনাদ যেন থামতেই চায় না!
রিক্সাচালক রহিম মিয়ার স্ত্রী মর্জিনা বেগম গতরাতে গাছের ডালে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন!

নিরব অনেক কৌতূহলী দর্শকের মাঝে সাইমও নির্বাক হয়ে নিথর দেহটাকে দেখছিল৷ দেখছিল ছোট্ট ময়নাকেও; আর ভাবছিল- এমন ফুটফুটে চাঁদের মত একটা মেয়েকে রেখে কেনইবা তার মা…?!

করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে রহিম মিয়া গত দুইমাস রিকশা নিয়ে বের হতে পারেননি। ওদিকে মর্জিনা বেগম যেই মেসের খাবার রান্না করে দিতেন; লকডাউনের আগ মুহূর্তে সেই মেসের লোকজনও গ্ৰামে চলে গেছেন! তাই তার ইনকামটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল‌।

গত আট বছর ধরে তারা বাদশা ভাইয়ের বস্তিতে আছেন। দিন এনে দিন খাওয়া তিনজনের ছোট এই সংসার ধারদেনা করে কোনোরকমে লকডাউনের প্রথম মাস কাটিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় মাসের শুরু থেকেই তাদের পরিবারে বিরাজ করছে অচেনা শত্রুর চরম আতঙ্ক! এ আতঙ্ক যেনতেন আতঙ্ক নয়! এ আতঙ্কের নাম ‘ক্ষুধা’! এ শত্রু সাধারণ কোনো শত্রু নয়! এ শত্রুর নাম ‘কর্মহীনতা’!

জীবনযুদ্ধের আজন্ম দুই যোদ্ধাকেও এ আতঙ্ক পেয়ে বসেছে! নতুন এই শত্রু সম্পর্কে তারা একেবারেই অজ্ঞ! মুখে হাসি নেই; ঘরে খাবার নেই; বাইরে কাজ নেই! প্রায় জনশূন্য রাস্তায় কারো সঙ্গে দেখা হলে একটা কথাই শোনা যায়- মুখে মাস্ক পরুন! এ কেমন শত্রু? এ কোন ধরনের আতঙ্ক?

মাঝেমধ্যে কেউ কেউ বস্তিতে এসে প্যাকেটে মোড়া বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে যেতেন। সেসব প্যাকেটে কখনো খাবার আবার কখনো অন্যকিছুও থাকত। তাই কোনো প্যাকেটওয়ালা আসলেই ময়না দৌড়ে ছুটে যেত তার কাছে। প্যাকেট হাতে পাওয়ার পর খুশি মনে ঘরে ফিরত। কিন্তু প্যাকেট খুলে খাবারের পরিবর্তে মাস্ক ও হ্যান্ড স্যানিটাইজার দেখে তার সেই খুশি মুহূর্তেই উবে যেত!

কদাচিৎ চাল-ডালের ছোটখাটো যে প্যাকেটগুলো পাওয়া যেত সেগুলোতে তাদের পরিবারের আরো পনের দিন চলে গিয়েছিল। কিন্তু এরপর থেকে কেউ আর এদিকটায় আসেনি। ফলে খাবার হিসেবে টিউবওয়েলের পানি ছাড়া আর কিছুই তাদের কপালে জোটেনি!

গত পরশু মর্জিনা বেগম ও রহিম মিয়ার মধ্যে কথা কাটাকাটি ও তুমুল ঝগড়া হয়েছিল। এরপর থেকে অভিমান করে দু’জনেই পরস্পরের সঙ্গে কথা বলা বন্ধ রেখেছেন। অন্যদিকে জঠরজ্বালায় কলিজার টুকরা সন্তানের কান্না সহ্য করার ক্ষমতাও মর্জিনা বেগম হারিয়ে ফেলেছিলেন‌!

সাইম কতক্ষণ যে এ ভাব-বিমূঢ়তার মধ্যে ছিল বলতে পারবে না৷ দু’গাল বয়ে নেমে আসা উষ্ণ নোনাজলের স্পর্শে সম্বিত ফিরে পেল সে৷ অভাবের তাড়না ও দারিদ্রের অভিশাপ থেকে চিরতরে মুক্তি পেতেই ময়নার মা আত্মহননের কঠিন পথ বেছে নিয়েছেন!

সাইমের চোখের সামনে মানবসৃষ্ট সমাজ ও এর শ্রেণিবৈষম্যের কদর্য রূপ ভেসে ওঠে! এ নোংরা বৈষম্য সৃষ্টিকারীদের মতো করে সে ভাবতে চেষ্টা করে- বস্তির দুঃস্থ একজন মহিলা মারা গেলে সমাজের কী এমন ক্ষতি! ওরা বরং যত মরে ততো ভালো! বেঁচে থাকলে তো বস্তি উচ্ছেদ করে শহরের সৌন্দর্য রক্ষা করতে হয়! তারচে অসুখে, অনাহারে কিংবা গলায় দড়ি দিয়ে যদি মরে সাফ হয়ে যায় তাহলে আপদ দূর হয়!

সমাজের যত ক্ষতি সে তো কেবল শিল্পপতিরা ‘পরলোক গমন’ করলে! কোটিপতিরা ‘না ফেরার দেশে’ চলে গেলে! রাজনীতির রথী-মহারথীরা দয়া করে ‘দেহত্যাগ’ করলে!

সাইম গভীরভাবে চিন্তা করে দেখে- আমাদের সমাজে দারিদ্রের কষাঘাতে জর্জরিত অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থানের সুবিধাবঞ্চিত এরকম মানুষের সংখ্যা একটি-দু’টি নয়; অসংখ্য-অগণিত৷ রাতের বিছানা যাদের কখনো ফুটপাত, কখনো বটতলা! হৃদয়ের আকাশে যারা দেখে না কভু শান্তি-সুখের রঙধনু! প্রতিক্ষণে যাদের প্রস্তুত থাকতে হয় লাঞ্ছনা সইবার জন্য! সহানুভূতি-সহমর্মিতা যাদের কাছে সোনার হরিণ! সুখের ম্রিয়মান আলো আর দুঃখের নিকষকালো আঁধারে কেটে যায় যাদের জীবন!

এসব চিন্তা করে সে অস্থির হয়ে ওঠে! তার অনুসন্ধিৎসু মনে অনেক প্রশ্ন। এভাবে আর কতকাল সর্বহারাদের করুণ আর্তনাদে আকাশ-বাতাস আন্দোলিত হবে? তবে কি দারিদ্রের এ ঘোর অমানিশা থেকে দুস্থ মানবতার মুক্তি নেই? সে উত্তর খোঁজে হন্যে হয়ে।

হ্যাঁ, একমাত্র ইসলামেই রয়েছে এ গুরুসমস্যার সুন্দর সমাধান! ইসলামের জাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে দরিদ্রতাকে ‘আলবিদা’ জানানো সম্ভব৷ কারণ জাকাতের মাধ্যমে সম্পদের সুষম বন্টন হয়। ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনৈতিক সুব্যবস্থা গড়ে ওঠে। এছাড়া পুঁজিবাদের অবসান, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা আনয়ন, অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্ব দূরীকরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দরিদ্রের অভাব মোচনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জাকাত[১] গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।

এই জাকাত ব্যবস্থার মাধ্যমেই দরিদ্রতার মূলোৎপাটন হয়েছিল ইতিহাসের স্বর্ণযুগ তথা রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও তাঁর আসহাবের জামানায়৷ যে যুগে ক্ষুৎ-পিপাসার বোবাকান্নায় ভাসত না কারো বুক! জাকাত গ্রহণ করর মতো ছিল না কোনো লোক!

তাই সবার প্রতি সাইমের আহ্বান.. আসুন আমরা আবার আমাদের সমাজে প্রতিষ্ঠা করি জাকাতভিত্তিক অর্থ ব্যবস্থা। কেননা জাকাত আদায়ের ফলে ইসলামের দৃষ্টিতে একদিকে যেমন সম্পদের পবিত্রতা রক্ষা হয় অন্যদিকে সম্পদ বৃদ্ধি পায়। ধনী-গরীব বৈষম্য দূরীভূত হয়। বেকার সমস্যার সমাধান হয়। এবং সর্বোপরি সম্পদের সুষম বন্টন নিশ্চিত হয়। ফলে ভারসাম্যপূর্ণ অর্থনীতি গড়ে ওঠে; যা দেশ ও জনগণের জন্য খুবই কল্যাণকর।

#প্রিয় পাঠক! জীবন যুদ্ধে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত এ মানুষগুলো আমাদেরই মা-বাবা! ওরা আমাদেরই ভাই-বোন! তাই তাদের পাশে সানন্দে আমাদেরকেই দাঁড়াতে হবে। তাদের ভাঁজপড়া মুখগুলোতে ফুটিয়ে তুলতে হবে আনন্দমাখা এক টুকরো অমলিন হাসি৷

তাহলে হয়ত দারিদ্রের গ্লানী সইতে না পেরে পরাজিত সৈনিকের ন্যায় আত্মহননের পথ বেছে নিবে না মর্জিনা-সখিনা ও ফুলবানুদের ন্যায় কোনো মা৷ দুঃখের দহনে দগ্ধ হবে না স্ত্রী-কন্যাহারা কোনো হৃদয়। মা-হারা কঁচিমুখের করুণ চিৎকারে কেঁপে ওঠবে না খোদার আরশ!!

________________________________________
[১] পরিচয়:
জাকাত আরবি শব্দ। এর অর্থ- পরিচ্ছন্নতা,পবিত্রতা ও বৃদ্ধি। মুসলমানদের নিসাব পরিমাণ ধন-সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ বছর পূর্তিতে আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত খাতসমূহে ব্যয় করাকে জাকাত বলে।

গুরুত্ব:
ঈমানের পর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য ইবাদত হল সালাত ও জাকাত। এ হিসেবে জাকাত ইসলামের তৃতীয় রোকন। এটি দ্বিতীয় হিজরিতে ফরজ হয়। পবিত্র কুরআনের বিরাশিটি স্থানে সালাতের পর পরই জাকাতের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

জাকাতের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন: ‘জাকাত শরীয়তের এমন এক অকাট্য বিধান, যে সম্পর্কে দলীল-প্রমাণের আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। জাকাত সংক্রান্ত কিছু কিছু মাসআলায় ইমামদের মধ্যে মতভিন্নতা থাকলেও মূল বিষয়ে অর্থাৎ জাকাত ফরজ হওয়া সম্পর্কে কোনো মতভেদ নেই। জাকাতের ফরজিয়তকে যে অস্বীকার করে সে ইসলাম থেকে খারিজ হয়ে যায়।’ -ফাতহুল বারী ৩/৩০৯

যাদের ওপর জাকাত ফরজ:
নিসাব পরিমাণ {রূপা ৫৯৫ গ্রাম (৫২.৫০ ভরি) কিংবা স্বর্ণ ৮৫ গ্রাম (৭.৫০ ভরি)} সম্পদের মালিক সকল মুসলিম নর-নারীর ওপর জাকাত প্রদান করা ফরজ। কোনো ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়ার পর চাঁদের হিসাবে পরিপূর্ণ একবছর অতিবাহিত হলে তার ওপর পূর্ববর্তী বছরের জাকাত প্রদান করা ফরজ।

জাকাত ব্যয়ের খাতসমূহ:
আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘জাকাত হল কেবল ফকির, মিসকীন, জাকাত আদায়কারী ও যাদের চিত্ত আকর্ষণ প্রয়োজন তাদের হক এবং তা দাস-মুক্তির জন্যে, ঋণগ্রস্তদের জন্য, আল্লাহর পথে জেহাদকারীদের জন্যে এবং মুসাফিরদের জন্যে। (সূরা তাওবা; আয়াত নং ৬০)

জাকাত না দেওয়ায় শাস্তি:
আল্লাহ তায়ালা বলেন: ‘আর যারা স্বর্ণ ও রূপা জমা করে রাখে এবং তা ব্যয় করে না আল্লাহর পথে, তাদের কঠোর আযাবের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন। সে দিন জাহান্নামের আগুনে তা উত্তপ্ত করা হবে এবং তার দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠদেশকে দগ্ধ করা হবে (সেদিন বলা হবে), এগুলো যা তোমরা নিজেদের জন্যে জমা রেখেছিলে, সুতরাং এক্ষণে আস্বাদ গ্রহণ কর জমা করে রাখার।’ (সূরা তাওবা; আয়াত নং ৩৪-৩৫)

হজরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছ থেকে ধন-সম্পদ পেয়েছে কিন্তু সে তার জাকাত আদায় করেনি, কিয়ামতের দিন ওই ধন-সম্পদ এমন বিষধর সাপে পরিণত হবে যার মাথার ওপর থাকবে দুটি কালো দাগ। এ সাপ সে ব্যক্তির গলায় পেচিয়ে দেওয়া হবে। অতঃপর সাপ উক্ত ব্যক্তির গলায় ঝুলে তার দুগালে কামড়াতে থাকবে এবং বলবে, আমি তোমার মাল, আমি তোমার সঞ্চিত সম্পদ। (বুখারি শরিফ; হাদিস নং ১৪০৩)

হজরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, স্বর্ণ ও রূপার এমন কোনো মালিক নেই, যে এর হক প্রদান করে না, যার জন্য কিয়ামতের দিন আগুনের পাত তৈরি করা হবে না, যা জাহান্নামের আগুনে তাপ দিয়ে অতঃপর তার পার্শ্ব, কপাল ও পৃষ্ঠদেশ সেঁক দেওয়া হবে। যখন যখন তা ঠাণ্ডা হবে গরম করা হবে, সে দিনের পরিমাণ হবে পঞ্চাশ হাজার বছর, যতক্ষণ না বান্দাদের ফয়সালা সমাপ্ত হয়। (মুসলিম শরিফ; হাদিস নং: ৯৮৭)

হজরত আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, প্রতিদিন সকালে দু’জন ফেরেশতা অবতরণ করেন। তাদের একজন বলেন, হে আল্লাহ! দাতাকে তার দানের উত্তম প্রতিদান দিন। আর অপরজন বলেন, হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করে দিন। (বুখারি শরিফ; হাদিস নং ১৪৪২; মুসলিম শরিফ হাদিস নং ১০১০)

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com