সোমবার, ২৬ অগাস্ট ২০১৯, ১১:০১ পূর্বাহ্ন

জামায়াত কি অসহনীয় | ফয়জুল্লাহ আমান

জামায়াত কি অসহনীয় : ফয়জুল্লাহ আমান

‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি’ একটি পুরনো সংগঠন। সায়্যিদ আবুল আলা মওদুদী এর প্রতিষ্ঠাতা। মূলত ভারতে এর গোড়াপত্তন। বাংলাদেশে এর কার্যক্রম প্রায় ষাট বছর যাবৎ চলছে। ১৯৪০ সালে ভারতে এর সূচনা হয়। রাজনীতিতে প্রবেশ অবশ্য পাকিস্তান সৃষ্টির পর। পাঞ্জাবের পাঠানকোটে একটি গ্রামের কিয়দাংশে ইসলামি হুকুমতের নাম দিয়ে এ সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়েছিল। তারপর রাজনীতিতে যথেষ্ট সাফল্য পেয়েছে।

পাকিস্তানে পুরো ষাটের দশক এর চরম উত্থানের সময়। বাংলাদেশ সৃষ্টির পর বঙ্গের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এর প্রভাব। মূলত জিয়াউর রাহমানের আমলে মধ্যপ্রাচ্যের পেট্টলের টাকায় বেড়ে ওঠে সংগঠনটি। ২০০১ সালে নির্বাচনে চারদলীয় জোট জয়লাভের পর দুজন জামাতি নেতা মন্ত্রিত্বও পেয়েছিলেন। ভারতে বা পাকিস্তানে তাদের এতটা উত্থান হতে পারেনি। ভারতে এখনও পর্যন্ত একটি সামাজিক সংগঠন হিসেবেই রয়ে গেছে। আর পাকিস্তানে রাজনীতির ময়দানে থাকলেও তেমন কোনো অবস্থান তাদের নেই। কিং মেকারের ভূমিকায় তো অবশ্যই নয়।

২০০১ সালে আবার বিএনপির সাথে জোট করে সংসদে গিয়েছে। তারপর অনেক জল ঘোলা হয়েছে। অবশেষে তাদের চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধিরা সাজা পেয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদ- পেয়েছেন নিজামি, কাদের মোল্লা, মির কাসেম আলি, কামরুজ্জামান। এছাড়া যাবজ্জীবন কারাদ-ের সাজা পেয়েছেন মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদি। অধ্যাপক গোলাম আযম কারাগারে বিচারাধীন থাকা অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন।

১৯৭১সালে তাদের যে অবস্থান তা জাতির সামনে পরিষ্কার। ধর্মীয় সংগঠনসমূহের মাঝে জামায়াতে ইসলামী দলীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল। পাক হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করেছিল নিরীহ বাঙালিদের উপর অত্যাচার নিপীড়নে। সে হিসেবে লজ্জা থাকলে কেউ স্বাধীনতার পর এই নামে রাজনীতি করতে পারে না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে তারা রাজনীতি করেছে এ নামকে বর্জন না করেই। দেশীয় বা জাতীয় বিষয়গুলো বাদ দিলেও ধর্মীয় বিভিন্ন কারণ রয়েছে তাদের প্রতি ঘৃণা প্রকাশের। আমাদের দেশের আলেম উলামা তাদের প্রতি যে বিদ্বেষ প্রকাশ করে এসেছে তা মূলত ধর্মীয় দৃষ্টিকোণের কারণে।

বিদ্বান বা ধার্মিক ও সভ্য মানুষ তাদের বরদাশত করতে পারে না তাদের ভেতরের বেয়াদবীর কারণে। চরম ধৃষ্ট ও উগ্রতা যেন জামায়াতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। নবীজীর প্রশংসা করতে গেলেও তাদের মুখ থেকে সিক্স প্যাক শব্দ বের হয়। এ থেকেই তাদের মাইন্ড আপনি অনুমান করতে পারবেন। তাদের দোষত্রুটি গণনা করে শেষ করা যাবে না। তবে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে তাদের প্রধান বিকার দুটি। এক হচ্ছে প্রিয় নবীজীর সাহচর্যধন্য সাহাবিদের প্রতি তাদের বিদ্বেষ খুবই প্রকট। আরেক হচ্ছে ইসলামি এস্টেটের নামে চরম উন্মাদনা সৃষ্টির কৌশল তারা ভাল রপ্ত করেছে। উপনিবেশ আমলে সেই যে মুসলিম জনসাধারণ শিক্ষা থেকে বঞ্চিত তার ফলে সাধারণ মুসলিমদের মাঝে জ্ঞান চর্চার ধারা আজও চালু হতে পারেনি। আর মূর্খ মুসলমানরা যে কোনো আইডলোজিতে ইসলাম শব্দ যোগ করে দিলেই সেদিকে ঝুঁকে পড়ে খুব সহজে।

আবেগপ্রবণ সাধারণ মুসলমানদের প্রবঞ্চিত করার উপায়গুলো জামায়াতিরা খুব চর্চা করে নিয়েছে। তো সাহাবী বিদ্বেষ এবং ইসলামি স্টেট (সংক্ষেপে আইএস) হচ্ছে তাদের চেতনার মূল। দুটির প্রথমটি একান্ত তাত্ত্বিক। আর দ্বিতীয়টি বাস্তবভিত্তিক কাজে ব্যবহার উপযোগী। ২০১৩ সালে সিরিয়া ও ইরাকে আইএসআইএস এর উত্থানের পর সারা বিশ্বে ইসলামী এস্টেটের আইডলোজি নিয়ে অনেক ঘাঁটাঘাটি হয়েছে। তার ফলে আইএস-এর পক্ষে সরাসরি জামায়াতিরা সাময়িক নীরব থাকছে। কিন্তু তাদের চেতনার মূল কথাটি কিন্তু এখনও ইসলামী স্টেট কায়েমের স্বপ্ন। এই একই মানসিকতা লালন করে ইরানের খোমেনির অনুসারীরা এবং মিসরের ব্রাদার হুড তথা ইখওয়ানুল মুসলিমীন। এই তিন সংগঠনের আন্তর্জাতিকভাবে এক সংযোগও লক্ষ্য করা যায়।

যত ঘৃণ্য বা জঘন্য মানসিকতারই হোক না কেন জামায়াত শিবির! তাদের সাথে আমাদের সুন্দরভাবে মেশা উচিত কি না তা নিয়ে একটু ভেবে দেখার দরকার। পবিত্র আল কুরআনুল কারীমে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, ইদফা বিল্লাতি হিয়া আহসান। মন্দকে প্রতিহত কর উত্তম ব্যবহারের দ্বারা। তাতে তুমি দেখতে পাবে যার সাথে তোমার চরম শত্রুতা ছিল সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধুতে রূপান্তরিত হয়ে গেছে।

এক সময় যে জামায়াতি চেতনা সীমিত ছিল তা আজ বাংলাদেশে বৈশি^ক কারণেই ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। জামায়াতে ইসলামী অবদমিত থাকলেও তাদের নষ্ট চেতনাগুলো সমাজের সর্বত্র আসন করে নেওয়ার প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন নতুন রূপে তা আত্মপ্রকাশ করছে। আপনি জামায়াতকে গালমন্দ করছেন অথচ আপনার আশপাশের এমনকি আপনার ঘরের লোকদের কেউ দেখুন তাদের চিন্তা চেতনায় আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।

আমাদের দেশের কাওমি মাদরাসার একটা বড় অংশ জামায়াতকে ঘৃণা করত তাদের সাহাবা বিদ্বেষের কারণে, তাদের আইএস-এর মানসিকতার কারণে নয়। এখন এই কাওমী মাদরাসার ছাত্ররা ও ধার্মিক বহু মানুষই আইএসকে সমর্থন করছে। আইএস বলতে সিরিয়ার আইএস অবশ্যই নয় কিন্তু সিরিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের ইসলামি স্টেটের ভুল চিন্তার সঙ্গে এরা সবাই সহমত।

সাহাবা বিদ্বেষ একটা মনোবিকার। কবে দেড় হাজার বছর আগে এক প্রজন্ম অতিবাহিত হয়েছে। যারা নবীজীর সান্নিধ্যে ছিলেন এবং যাদের আচরণে মুগ্ধ হয়ে বিশ^বাসী ইসলামের দাওয়াত কবুল করেছে ইতিহাস চর্চার নামে তাদের ভুলত্রুটি নিয়ে গবেষণা করা স্পষ্ট এক মনোবৈকল্য। বর্তমান যুগেও সাহাবা বিদ্বেষী শিয়া ও খারেজিদের শক্তিশালি অস্তিত্ব রয়েছে। বিশ^পরিস্থিতি বিচার করলে সাহাবা বিদ্বেষ থাকা সত্ত্বেও শিয়া ও খারেজিদের সাথে কূটনৈতিকভাবে সুসম্পর্ক রক্ষায় কল্যাণ থাকতে পারে। আমাদের এখন নতুন করে ভাবা উচিত, কেবল জামায়াতিদের সাহাবা বিদ্বেষই নয়, এখন ইসলামী স্টেট চিন্তার প্রতিফলনও মুসলিম উম্মাহর জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে যা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করার উপক্্রম হয়েছিল। আরব এক মরুভূমি অঞ্চল। সেখানে ম্যাসাকার করলে ক্ষয়ক্ষতি কম হয়।

আমাদের এই পদ্মা মেঘনা বিধৌত পলি মাটি খুবই উর্বর। এখানে যে ঘনবসতি তা মুসলিম বিশে^র আর কোথাও নেই। এখানে একটা বোমা বিষ্ফোরণ হলে কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে তা কল্পনা করুন। বাংলাদেশকে সিরিয়ার মত দেখতে চান? তাহলে জামায়াতিদেরকে তাদের অবস্থার উপর ছেড়ে দিন। মূলত ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের পর থেকে আজ পর্যন্ত তাদের দূরবস্থার একটা সময়। এসময় তাদের প্রতি সহমর্মী হওয়া উচিত ছিল। ভালোবাসার একটা শক্তি আছে। আপনি কাউকে ভালোবাসা দিয়ে সুন্দর করে বোঝালে আজ না হোক কাল সঠিক পথে সে এক দিন না একদিন ফিরে আসবেই। সমস্যা যত ব্যাপক হয় তা নিরসনের উদ্যোগটা সেরকম ব্যাপকই হতে হয়। প্রত্যন্ত অঞ্চলে এ জামায়াতি মানসিকতা ছড়িয়ে পড়েছে। আজ ধার্মিক মানেই আইএস-এর সমর্থক। সত্যিকার দেশপ্রেমিক সুস্থ মানুষদের এ পরিস্থিতি মুুকাবিলায় অবশ্যই এগিয়ে আসতে হবে।

এখন কোথাও আপনি জামায়াতিদের খুঁজে পাবেন না। তার কারণ সব জামায়াতি এখন বড় বড় আওয়ামী লীগার। বঙ্গবন্ধু ও দেশপ্রেমের কথা তারা প্রকৃত আওয়ামিলীগারদের চেয়ে বড় করে বলে। মূল আওয়ামী লীগিরা তাদের অফিসগুলিতে চান্স পাচ্ছে না জামাতিদের ভিড়ের কারণে। কিন্তু তাদের মুখেই কেবল দেশ। অন্তরে এখনও স্বদেশের প্রতি রয়েছে চরম ঘৃণা। এই পরিস্থিতি কেন হলো? এভাবে আরও দশটা বছর গেলে দেশের অবস্থা কী হবে তা একটু ভেবে দেখুন। হাতে এখনও সময় আছে। জামায়াতকে সমাদর করুন। এখনও যারা জামায়াতের পরিচয় গোপন করছে না তাদের ভ্রান্তিসহই তাদেরকে বুকে টেনে নিন।

আমাদের জানা আছে তারা দেশের শত্রু, মানবতার শত্রু তবু তারা আদমের সন্তান। আইএস বিরোধি যে ব্যাপক প্রচারণা হয়েছে। বিশেষত এক লক্ষ আলেমের যে ফতোয়া প্রকাশ পেয়েছে এ সময়টা আমাদের কাজের জন্য মোক্ষম। জামায়তিদেরকে কাছে টানুন। তাদের নিয়েই ইসলামী স্টেটের বিরুদ্ধে কথা বলুন। তাদের মুখ দিয়ে আইএস-এর বিপরীতে কথা বলান। মূল আইডলোজিকে ধ্বংস করতে এর বিকল্প কিছু দেখছি না। ভারতবর্ষের ধর্ম তাত্ত্বিকরা বলে থাকেন, বৌদ্ধ ধর্ম ভারতে তার প্রভাব হারিয়ে ফেলেছিল তার একটা বড় কারণ ছিল ব্রাহ্মণরা গৌতম বুদ্ধকে তাদের একটা অবতার বানিয়ে নিয়েছিল। বুদ্ধদেব নাম ব্রাহ্মণদের দেওয়া। হিন্দু বুদ্ধিজীবিরা বৌদ্ধদের কাছে টেনেই তাদের ধর্মের প্রভাব নষ্ট করতে পেরেছিল। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা যে অপকৌশল গ্রহণ করেছিল সত্যের খাতিরে সেটিকে সুন্দর কৌশল হিসেবে গ্রহণ করতে বাধা নেই। উদ্দেশ্য মহৎ হলে তা প্রশংসিত হবে বৈ কি? অন্যকে আঘাত করে নয় কাছে টেনেও তার বিচারধারাকে বিলুপ্ত করা যায়। সুস্থ চেতনায় তাকে উজ্জীবিত করা যায়। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা গ্রহণ একান্তভাবেই কাম্য।

জামায়াতি নষ্ট চেতনার ধ্বংসাত্মক পরিণতি থেকে বাঁচতে এ কৌশলটি পরীক্ষা করে দেখার আহ্বান রইল সবার প্রতি। যা ঘৃণ্য তার প্রতি বিদ্বেষ অবশ্যই রাখতে হবে তবে পচা মানসিকতাগুলো সমূলে উৎখাতের জন্য বিচিত্র পদ্ধতিও উদ্ভাবন করতে হবে। সবাইকে একভাবে ফেরানো সম্ভব নয়। যাকে যেভাবে পরিবর্তন করা যায় তাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। জামাতি চিন্তার খপ্পর থেকে রক্ষা করতে হবে বাঙলার বাতাস। নষ্ট চিন্তার মানুষগুলিই সমাজের সব জায়গায় প্রতিপত্তি করে নিয়েছে। জামায়াত শিবির এক বড় আপদ হয়ে বঙ্গের আকাশ বাতাশ বিষাক্ত করে তুলছে। অসহ্য হয়ে উঠছে তাদের কর্মতৎপরতা। নিরীহ সাধারণ মানুষদের ধর্মের নামে অধর্মের দিকে নিয়ে যাবার নীল নকশা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।

হে খোদা! তুমি রক্ষা করো আমাদেরকে সব বাতিল থেকে। বাংলাদেশের প্রতিটি ধূলিকণায় যেন তাদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ে। জামায়াতিদের নাম শুনেও যেন মানুষ থুথু ছিটায়। শিশু থেকে বৃদ্ধ প্রতিটি মুসলিম যেন তাদের ভ্রান্তিগুলো স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে তুমি সেই তাওফিক দাও। আমীন। হাসবুনাল্লাহ ওয়া নিমাল ওয়াকিল। নিমাল মাওলা ওয়া নিমান নাসির।

লেখক : বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com