২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং , ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ৬ই সফর, ১৪৪২ হিজরী

জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহঃ তথ্য ও তর্কে শর্ত

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহঃ তথ্য ও তর্কে শর্ত

পাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকমঃ জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ইসলামের একটি অমোঘ শাশ্বত বিধান। শরিয়তের অন্যান্য বিধানের জন্য যেমন কিছু শর্ত থাকে জিহাদের জন্যও আছে বেশ কিছু শর্ত। চলমান রচনায় সেই শর্তাবলীর দালিলিক আলোচনা করেছেন সৌদী আরবের প্রখ্যাত আলেম ড. খালেদ আলী আম্বারী। খারেজীদের সুরে সুর মিলিয়ে বেশ কিছুদিন ধরে একটি চক্র এই কথার প্রচার করছে যে, জিহাদের জন্য কোন আমীরের প্রয়োজন নেই। তাদের কথা যে কতটা মিথ্যা তা এই অধ্যায়টি পাঠ করলে সহজেই অনুমান করা যাবে। শর্ত শারায়েতের বিচারে বর্তমান যুগে জিহাদের প্রয়োগ কতটুকু বাস্তববাদী এসম্পর্কেও একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে এই লেখাটিতে। তরুণ লেখক ও অনুবাদক মুফতি আব্দুস সালাম এর প্রকাশিতব্য অনুদিত গ্রন্থ ‘আত্মজ! উগ্রবাদের ফাঁদ এড়িয়ে চলো’ থেকে নির্বাচিত অংশবিশেষপাথেয় টোয়েন্টিফোর ডটকম এর পাঠকদের জন্য প্রকাশিত হলো।

 

জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহঃ তথ্য ও তর্কে শর্ত

আত্মজ!
জিহাদ কর্মটি কোন হট্টগোল, হৈ হুল্লোড় করার নাম নয়। লড়াইটা ‘জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ’ হওয়ার জন্য বেশকিছু পূর্বশর্ত আছে; যেগুলোর পূর্ণ উপস্থিতি ঘটা বাঞ্চনীয়। অন্যথায় তা হবে খামখেয়ালির জিহাদ ও জিহাদ ফী সাবীলিত তাগুত।

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন, কুর’আন হাদীসে প্রচুর পরিমাণে জিহাদ ও জিহাদের ফজিলতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে কোনটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত শরঈ জিহাদ আর কোনটি প্রবৃত্তি পূজারীদের ভুয়া যুদ্ধ, এই পার্থক্যজ্ঞানটুকু থাকা বাঞ্চনীয়৷ কেউ কেউ শয়তানের পথে যুদ্ধ করেও ভাবে যে, তারা বুঝি আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করছে । যেমন খারেজী ও উগ্র ইসলামপন্থীরা। (আইএস, তালেবান, আলকায়েদাসহ বিশ্বের বিভিন্ন জঙ্গিগোষ্ঠীর জিহাদ-অনুবাদক)। (আর রাদ্দূ আলাল ইখনায়ী-২০৫পৃ.)

জিহাদ করতে হলে মুসলামনদের কাছে লড়াইয়ের শক্তি সামর্থ্য থাকা জিহাদের একটি পূর্বশর্ত। সামর্থ্য অর্জন না করে জিহাদ করতে যাওয়া সম্পূর্ণ না জায়েয৷ কেননা এর ফলাফল হয় স্রেফ নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়া। কারণ ‘আল্লাহ কারো উপর সাধ্যাতীত কোন কিছু চাপিয়ে দেন না’। (বাকারা-৩৮৬)

মক্কী জীবনে আল্লাহ তা’আলা তাঁর রাসূল সা. ও সাহাবায়ে কেরামকে জিহাদের নির্দেশ না দেওয়ার কারণটিও এখান থেকে সহজে অনুমান করা যায়। তখন শত্রুদের তুলনায় মুসলমানরা শক্তি ও উপকরণে বেশ দুর্বল ছিলো।

পিতামাতার সম্মতি জিহাদের আরেকটি শর্ত। কারণ, মাতাপিতার সেবা ফরজে আইন, পক্ষান্তরে জিহাদ হলো ফরজে কেফায়া। কেফায়া বনাম আইনের মোকাবেলায় আইনটাই অগ্রাধিকারযোগ্য। এমনকি পিতা-মাতার কোন একজন যদি অনুমতি দেয় আর অপরজন না দেয়, সেক্ষেত্রেও জিহাদে যাওয়া জায়েয হবে না।

এরপরও তুমি যদি তথাকথিত জিহাদে যাও তাহলে পাপের ভাগিদার হওয়া ছাড়া গতি থাকবে না।

এক সাহাবী রাসূল সা. এর কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে রাসূল সা. তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘বাবা মা বেঁচে আছেন’?

‘হ্যাঁ, ইয়া রাসূলাল্লাহ!’ ছেলেটি উত্তর দিলো৷

রাসূল সা. বললেন, তুমি তাদের মাঝে থেকেই জিহাদ (সেবা) করো। এটি আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বুখারীর বর্ণনা। আবু সাইদ রা. থেকে আবু দাউদ বর্ণিত বর্ণনাটি আরো স্পষ্ট। ‘হে যুবক! তুমি ঘরে ফিরে যাও, তারা যদি অনুমতি দেন তবে জিহাদ করো, অন্যথায় তাদের সেবা করো’। (সুনানে আবূ দাঊদ- ২৫৩০)

প্রিয় পুত্র!
তুমি নিশ্চয়ই জানো যে, জামাতে নামাজ পড়ার শর্ত হল একজন ইমাম থাকা। তিন মুসলমান সফরে বের হলেও তাদের একজন আমীর থাকা চাই। ঠিক জিহাদের জন্যও একজন মুসলিম ইমাম থাকা আবশ্যক। তিনি অনুমতি না দিলে জিহাদ করতে যাওয়া জায়েয নেই। জিহাদের যাবতীয় বিষয় সেই আমির বা সেনাপ্রধানের কাছে ন্যাস্ত থাকবে। এটাই আহলুস সুন্নাহর আকিদা। তা না হলে মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক হাঙ্গামা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে।

আল্লাহ তা’আলা বলেছেন ‘মুমিন তো তারাই; যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে এবং রাসূলের সাথে কোন সমষ্টিগত কাজে শরীক হলে তাঁর কাছ থেকে অনুমতি গ্রহণ ব্যতীত চলে যায় না’ (সূরা নূর-৬২)

সমষ্টিগত কাজ বলতে এখানে সংঘবদ্ধ কোন কাজ যেমন যুদ্ধ ও জিহাদকে বুঝানো হয়েছে, অধিকাংশ মুফাসসিরের অভিমত এটাই।

আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘আর যখন তাদের কাছে পৌঁছে কোন সংবাদ শান্তি-সংক্রান্ত কিংবা ভয়ের, তখন তারা সেগুলোকে রটিয়ে দেয়। আর যদি সেগুলো পৌঁছে দিত রাসূল পর্যন্ত কিংবা তাদের শাসকদের পর্যন্ত, তখন অনুসন্ধান করে দেখা যেত সেসব বিষয়, যা তাতে রয়েছে অনুসন্ধান করার মত। বস্তুতঃ আল্লাহর অনুগ্রহ ও করুণা যদি তোমাদের উপর বিদ্যমান না থাকত তবে তোমাদের অল্প কতিপয় লোক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করতে শুরু করত’ (নিসা -৮৩)

এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছে যে, জিহাদের বিষয়টিকে ইমামের প্রতি ন্যাস্ত করতে হয়। কারণ জিহাদ শান্তি এবং ভয় সংক্রান্ত বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত।

আয়েশা রা. এর একটি হাদীসও এদিকে ইঙ্গিত করে। আম্মাজান বলেন আমি রাসূল সা. এর কাছে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তিনি বলেন, হজ্জই তোমাদের জন্য জিহাদ। (বুখারী-২৮৭৫)

ইমাম বা নেতার কাছে জিহাদের অনুমতি চাওয়ার ব্যাপারটি পূর্বের থেকে এখানে আরও স্পষ্টতর।

হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, ইমামকে ঢাল বলা হয়েছে কারণ তিনি তার সৈন্যদেরকে শত্রুর আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেন আর মুসলমানদেরকেও পারস্পরিক লড়াই থেকে নিবৃত্ত করেন। আর ইমাম বলা হয় যিনি মুসলমানদের যাবতীয় বিষয়ের দেখভাল করেন।

রাসূল সা. এর যুগে এমন কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি যা তাঁর অনুমতি ছাড়া ঘটেছে

এর স্বপক্ষে সহীহাইনের হাদীসও পাওয়া যায়৷ যেমন- হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসূল সা. বলেছেন, যে ব্যাক্তি আমার আনুগত্য করবে সে যেন আল্লাহরও আনুগত্য করবে৷ আর যে আমীরের আনুগত্য করবে প্রকারান্তরে সে আমারই আনুগত্য করবে। আর যে দায়িত্বশীলের অমান্য করবে তা আমাকে অমান্য করা হবে। ইমাম হচ্ছে ঢাল স্বরূপ যার অধিনে যুদ্ধ করা হয়, যার মাধ্যমে আত্মরক্ষা করা হয়৷ যদি সে ন্যায়বান হয় ও তাকওয়াপূর্ণ আদেশ দেয় তাহলে এর ভালো প্রতিদান পাবে। আর যদি বিপরীত কিছুর আদেশ দেয় তাহলে তারও প্রতিদান পাবে। (বুখারী-২৯৫৭, মুসলিম-৪৬৬৬)

ইমাম নববী রহ. বলেন, ‘তার অধিনে যুদ্ধ করা হয়’ মানে কাফের, রাষ্ট্রদ্রোহী, খারেজী বিশৃঙ্খলাকারী ও উগ্রবাদীরা মূলত তার সাথেই লড়াই করতে আসে।

ইমাম কুরতুবী রহ. সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থ আল মুফহাম-এ বলেন ‘তার অধীনে যুদ্ধ করে’ এই সংক্ষিপ্ত কথাটি দুটি বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এক ইমামের সিদ্ধান্তকে নির্দ্বিধায় মেনে নেওয়া। দুই তার অধিনস্তে থেকে যুদ্ধ করা।

রাসূল সা. এর যুগে এমন কোন যুদ্ধ সংঘটিত হয়নি যা তাঁর অনুমতি ছাড়া ঘটেছে। যেনতেন লোক যদি খেয়াল খুশি মত দুঃসাহস দেখিয়ে সৈন্যদেরকে ডেকে জিহাদ নেমে পড়তো তাহলে চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হতো।

ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. এর পুত্র আব্দুল্লাহ বলেন, আমি বাবাকে প্রশ্ন করেছিলাম যদি তারা ইমামের অনুমতি না নিয়ে যুদ্ধ করতে চলে যায়? তিনি বলেছিলেন, না, অনুমতি লাগবেই। যদি হঠাৎ শত্রুরা আক্রমণ করে বসে আর ইমামের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়ার সময় না পাওয়া যায় তখন ভিন্ন কথা৷

তাঁর পরবর্তী আলেমগণও এসম্পর্কে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছেন।

ইবনে কুদামা রহ. বলেন, প্রতিপক্ষ যখন হামলা করে বসবে তখন তাদেরকে প্রতিহত করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব। সংখ্যায় তারা কম হোক কিংবা বেশি। তবে ইমামের নির্দেশ ছাড়া কেউ বের হবে না। শত্রু যদি আকষ্মিক আক্রমণ করে বসে এবং প্রচুর হতাহতের সম্ভবানা থাকে তাহলে অনুমতি নেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড় থাকবে। কারো পিছপা হওয়ার কোন অবকাশ থাকবে না তবে নিজের বাস্তুভূমি পরিজন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থেকে যেতে পারবে। আর পারবে খোদ ইমাম যাকে বারণ করবে এবং যে যুদ্ধ করতে অপারগ বা অক্ষম সে। (আল মুগনী ১০/৩৮৩)

আবু মুহাম্মাদ বাহাউদ্দীন আল মাকদিসী রহ. বলেন, আমীরের অনুমতি ছাড়া জিহাদে যাওয়া জায়েয নেই। কারণ যুদ্ধের প্রয়োজনীয় কলাকৌশল, শত্রুর সংখ্যা ও গতিবিধি সম্পর্কে তিনিই বেশি প্রাজ্ঞ৷ তাই তার সিন্ধান্তের প্রতিই অনুগত থাকা উচিৎ৷ তবে যদি শত্রু প্রবল প্রতাপে আকস্মিক হামলা করে বসে এবং ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা হয়, অথবা কোন সুবর্ণ সুযোগ মিলে যায় বিলম্ব করলে যা হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে তখন ভিন্ন কথা। কোন দেশে শত্রু আক্রমণ করলে সদলবলে তাদেরকে প্রতিরোধ করা ওয়াজিব। কারো জন্যই নিবৃত্ত থাকা জায়েয নেই। তবে নিজের বাস্তুভূমি পরিজন ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে থেকে যেতে পারবে। আর পারবে খোদ ইমাম যাকে যেতে বারণ করে সে। দলীল- এই আয়াত ‘তোমরা বের হয়ে পড় স্বল্প বা প্রচুর সরঞ্জামের সাথে’ (তওবা-০৯) এবং এই হাদীস- ‘যখন তোমাদেরকে সদলবলে ডাকা হয় তখন বেড়িয়ে যাও’। (ইবনু মাজাহ, আল উদ্দাহ ফি শারহিল উমদাহ-২২৬ পৃ.)

প্রখ্যাত হাম্বলী আলেম বাহুতী বলেন, সেনাপ্রধানের নির্দেশ ছাড়া যুদ্ধে যাওয়া হারাম। কেননা যুদ্ধের ভার তার কাছে অর্পিত৷ কারণ প্রতিপক্ষের সক্ষমতা ও রণকৌশল সম্পর্কে তিনিই সবচেয়ে বেশি জানেন। তবে যদি শত্রু আকষ্মিক আক্রমণ করে বসে আর ক্ষতির আশঙ্কা থাকে তাহলে বিশেষ উপকারিতার দিকে লক্ষ করে অনুমতি ছাড়াই লড়াই করা জায়েয আছে। (দাকাইকু উলিন্নুহা লিশারহিল মুনতাহা, ১/৬৩২। মাতালিবু উলিন্নুহা লিশারহি গয়াতিল মুনতাহা। ২/৫৪৩)

পুত্র শোনো!
যুদ্ধ করতে হলে ইমামের অধীনেই করতে হবে, যদিও সে ফাসেক হয়। এটাই আহলুস সুন্নাহর আকিদা। যার-তার ডাকে জিহাদ করতে যেও না। হোক না সে সাধু দরবেশ। এসব খারেজিদের ফতোয়া৷ ইমাম যদি বারণ করে তাকে অমান্য করে জিহাদে যেও না। ফুকাহাদের বক্তব্য তুলে ধরে একটু আগেই এ ব্যাপারটা তোমার কাছে খোলাসা করে এসেছি। শেষে আরো একজন ফকীহ, ইবনে হাবীব মালেকির বক্তব্য উল্লেখ করে ইতি টানছি। তিনি বলেছেন, কোন কল্যাণের দিকে লক্ষ্য করে ইমাম যদি যুদ্ধ করতে নিষেধ করে তাহলে অমান্য করা জায়েয নেই। তবে শত্রু যদি অতর্কিত হামলা করে তখন ভিন্ন কথা। (মাওয়াহিবুল জালিল-৩/৩৪৯)

জিহাদের আরেকটি শর্ত হলো ‘লক্ষ্যধারী কেতন’ বিরাজমান থাকা। সঠিক রাস্তা নির্ণয় ও তার উপর অবিচাল থাকতে প্রয়োজন একটি লক্ষ ও উদ্দেশ্য ধারণকারী পতাকার। সুতরাং জিহাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্যের দিশা দিতে পারে না এমন বিকৃত ও ছিন্ন পতাকাতলে জিহাদ হতে পারে না৷ আল্লাহ বলেছেন, ‘তাদের সাথে লড়াই করো যেন আল্লাহর কালিমা-ই হয় চির উন্নত’।(বাকারা-১৯৩)

এছাড়াও অন্যায়ভাবে লক্ষ্যহীন কোন মুসলমানের রক্তপাত করা জায়েয নেই। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সা. বলেন, যে ব্যাক্তি কোন লক্ষ্যহীন পতাকাতলে জিহাদ করে, সাম্প্রদায়িকতার কারণে ক্রুদ্ধ হয় ও সাম্প্রদায়িকতার দিকে মানুষকে ডাকে, অথবা কোন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠিকে সাহায্য করে, তার জাহিলিয়্যাতের মৃত্যু হবে। (মুসলিম শরিফ-৪৬৮০)

জিহাদের আরেকটি শর্ত হচ্ছে, ফলাফলে এর ক্ষতির পাল্লাটি যেন লাভের চেয়ে ভারি না হয়।

জিহাদের আরেকটি শর্ত, যার সাথে লড়াই করবে সে যেন মুসলিম শাসনাধীনে বসবাসকারী অমুসলিম-জিম্মি-মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় নিরাপত্তাপ্রাপ্ত অমুসলিম-মুস্তা’মান-কিংবা যার দেশের সাথে মুসলিমরা শান্তিচুক্তিতে আবদ্ধ – মু‘আহিদ- না হয়৷ আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, ‘অঙ্গীকার পূর্ন কর। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে’।(ইসরা-৩৪)।

এসব কারণেই তোমার দেশের সাথে শান্তি ও মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ কোন রাষ্ট্রের সাথে যুদ্ধ করতে পারবে না। আল্লাহর এই বানী কি শুনোনি? ‘অবশ্য যদি তারা ধর্মীয় ব্যাপারে তোমাদের সহায়তা কামনা করে, তবে তাদের সাহায্য করা তোমাদের কর্তব্য। কিন্তু তোমাদের সাথে যাদের সহযোগী চুক্তি বিদ্যমান রয়েছে, তাদের মোকাবেলায় নয়। বস্তুতঃ তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সেসবই দেখেন’। (আনফাল-৭২)

ইবনু আতিয়্যাহ রহ. বলেন, এখানে ঐ সকল কুফফারদের কথা বলা হয়েছে যাদের সাথে তোমরা যুদ্ধ না করার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছো তাদের বিরুদ্ধে অন্য কাউকে সাহায্য করো না। কেননা তা অক্ষমতার পরিচয়, সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ভঙ্গ করা।

কেবল অঙ্গীকার রক্ষার্থে রাসূল সা. দুজন সাহাবীকে মহান বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে অনুমতি দেননি

ইবনে কাসির রহ. বলেন, এমন সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে কাউকে সাহায্য করতে যেও না, যাদের সাথে তোমাদের নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত শান্তিচুক্তি সংঘটিত হয়েছে। যদি করো তাহলে অঙ্গীকার ভঙ্গকারী হিসেবে গণ্য হবে। এটি মূলত ইবনে আব্বাসের উক্তি।

কেবল অঙ্গীকার রক্ষার্থে রাসূল সা. দুজন সাহাবী হযরত হুজায়ফা রা. ও তার পিতার সাহায্যকে বদরের যুদ্ধের প্রাক্কালে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁরা মক্কার কাফের কুরাইশদের সাথে অঙ্গীকার করেছিলেন যে, নবীর সাথে তাঁরা যুদ্ধে অংশ নিবেন না। রাসূল সা. তাদেরকে কৃত অঙ্গীকারের উপর বহাল রেখেছিলেন।

সহিহ মুসলিমে হযরত হুজাইফাতুবনুল ইয়ামান রা. থেকে এই ঘটনার পূর্ণ বিবরণ আছে৷ তিনি বলেন, বদরের যুদ্ধে অংশ নিতে এটাই শুধু আমার প্রতিবন্ধকতা ছিলো যে, আমি এবং আমার পিতা হোসাইল রওনা করলাম। তিনি বলেন, তারপর কুরাইশরা আমাদের পথ আটকে ধরলো৷ তারা বলল, নিশ্চয়ই তোমরা মুহাম্মাদের কাছে যাচ্ছো? আমরা বললাম, বরং আমরা মদীনায় যাবো৷ তখন তারা আমাদের থেকে এই মর্মে আল্লাহর শপথ নিলো যে আমরা যেন মদিনাতেই যাই, রাসূল সা. এর সাথে যুদ্ধে অংশ না নেই। আমরা এসে রাসূল সা. কে জানালে তিনি বললেন, তাহলে মদীনায়ই চলে যাও৷ আমরা তাদের সাথে অঙ্গীকার রক্ষা করবো, আল্লাহর কাছে তাদের বিরুদ্ধে সাহায্য চাইবো। (মুসলিম-১৭৮৭)

অনুবাদকের পরিশিষ্টঃ নামাজ রোযা হজ্জ যাকাত ইসলামের প্রভৃতি বিধানগুলোর আলোচনায় ইসলামের ধর্মতাত্ত্বিক একত্ববাদীতার দিকগুলোই ফুটে ওঠে। কিন্তু জিহাদের বিষয় সম্পূর্ণ আলাদা। এর পারিপার্শ্বিক চিত্র বাহ্যত কখনো মনে প্রশ্ন তৈরী করলেও এর শর্ত-শারায়েত ও সতর্কতার প্রতি দৃষ্টি দিলে কোন খটকাই থাকবে না।

জিহাদ কী ও কেন? বর্তমান জঙ্গীগোষ্ঠীর গতিবিধি ও কর্মপন্থার বিচারে এর উত্তর খুঁজতে গেলে ফলাফল খুবই জঘন্যরকম হবে। কিন্তু কুরআন-সুন্নাহ আর ফিকহের আলোকে জিহাদকে বুঝতে গেলে কোন সমস্যা আর থাকবে না।

 

লেখক : তরুণ আলেম ও গবেষক, মুহাদ্দিস, জামি’আ ইকরা বাংলাদেশ

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com