২৭শে নভেম্বর, ২০২০ ইং , ১২ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১১ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

জ্ঞানচক্ষু খুলে যাক ওসব জ্ঞানপাপিদের

সময়চিন্তা। আমিনুল ইসলাম কাসেমী

জ্ঞানচক্ষু খুলে যাক ওসব জ্ঞানপাপিদের

প্রতিদিন সকালে হাটাহাটি করা পুরনো অভ্যাস। ছাত্রজীবন থেকে এই অভ্যাস গড়ে ওঠেছে। এখনো প্রতিদিন সকালে নিয়মিত হাটি। একটানা প্রায় পঞ্চাশ মিনিট। কখনো এক ঘণ্টা। কখনো কমবেশি হয়ে থাকে।

প্রতিদিনের ন্যায় আজ সকালে হাঁটতে বেরুলাম। ছোট রাস্তা থেকে হাইওয়েতে পা রাখলাম। হাইওয়েতে অবশ্য সকালে গাড়ির চাপ কম থাকে। তবে সেখানে বেশী সময় হাটা হয় না। ছোট রাস্তাতেই বেশী চলাচল করা হয়। আজ রাস্তায় চলার সময় একজন অশিতিপর বৃদ্ধা মহিলার সাথে দেখা হল। বয়সের ভারে তিনি খানিকটা কুঁজো হয়ে গেছেন। সোজা হয়ে হাঁটতে পারেন না।

আমি রাস্তার একপাশ ধরে চলছি। তাঁকে দেখে আমি একটু সরে দাঁড়ালাম। যাতে তাঁর যেন চলতে কষ্ট না হয়। মহিলাটি যখন আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন,সঙ্গে সঙ্গে আমাকে স্ব-জোরে সালাম দিলেন “ আচ্ছালামু আলাইকুম” সালামটা অত্যান্ত শুদ্ধ উচ্চারণ। মনে হল, আরবী ভাষা জ্ঞান তাঁর আছে। এবং তাঁর আরবী উচ্চারণে কোন ভুল নেই।

বৃদ্ধা মহিলাটি আমার পাশ দিয়ে অতিক্রম করে যখন চলে গেল। আমি শুধু তাঁর চলার দিকে তাকিয়ে রইলাম। যতদূর তাঁকে দেখা যায়, শুধু দেখতে লাগলাম।

আমি শুধু দেখলাম আর ভাবতে লাগলাম, হায় ! এরাও মানুষ আর আমার ঢাকা ভার্সিটির প্রফেসর সাহেবও একজন মানুষ। এ দুয়ের মাঝে আকাশ-পাতালের ব্যবধান।

একজন গ্রাম্য সাধারণ মহিলা। তিনি কোথায় পড়েছেন আমার জানা নেই। তাঁর পরিচয়ও আমার জানা নেই। তিনি কোথায় কি করেন, সেটাও আমার অজানা। হয়ত তিনি গ্রামের পাঠশালাতে পড়েছেন। সেই আগের দিনের ”প্রথম ভাগ” দ্বিতীয় ভাগ” এর থেকে বেশি কিছু জ্ঞান মনেহয় তাঁর মধ্যে পাওয়া যাবে না। কিন্তু তাঁর মাঝে এমন কিছু জ্ঞান আল্লাহ তায়ালা দান করেছেন, যেটা আমার প্রফেসর সাহেবের নেই।

প্র্রাচ্যের অক্সর্ফোড খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষকের গ্রামের সাধারণ একজন মহিলার জ্ঞান হাসিল করতে পারেন নি, যেটা বড় আফসোসের বিষয়। বহু ডিগ্রি তিনি হাসিল করেছেন, কিন্তু ভদ্রতা ও শিষ্টাচারের প্রাক-প্রাথমিক জ্ঞানও মনেহয় তাদের মাঝে নেই।

বেশ কয়েকবছর আগে আমার মরহুম বাবার একজন হিন্দু বাল্যবন্ধুর সাথে সাক্ষাত হয়ে ছিল, তিনি পেশায় একজন শিক্ষক ছিলেন,এখন অবসরে। আমার বাবার বাল্যকালের বন্ধু, সে হিসেবে তাঁকে যথেষ্ট সন্মান করলাম। অনেক কথা হয়েছিল তাঁর সাথে। বিদায় বেলা তিনি একটা নসীহত করেছিলেন, যা আমার মনে গেঁথে আছে, তিনি বলেছিলেন, বাবা আমিনুল! শোন! শুধু বড় ডিগ্রি অর্জন আর বইয়ের লাইব্রেরি মুখস্থ করলে শিক্ষিত হওয়া যায় না।
লেখাপড়া শিখে হজম করার যোগ্যতা থাকতে হয়। যে যা শিখেছে, সেটা হজম করতে পারা একটা বড় যোগ্যতা। অনেকেই সেটা পারেনা। বড় ডিগ্রি হাসিল করে সে মুর্খ হয়ে যায়।
তিনি আরো বলেছিলেন, অনেক সাধারণ মানুষ, তারা কোন কলেজ- ভার্সিটিতে পড়েনি,কিন্তু বড় শিক্ষিত মানুষ থেকে তাদের জ্ঞান অনেক। বিবেক-বুদ্ধিতে তাঁরা এগিয়ে।

বাবার বাল্যবন্ধুর এই কথার সত্যতা আরো পেলাম সেদিন, আমার একজন বন্ধু তিনি কোন একটা কাজে মুফতী আব্দুল মালেক সাহেবের কাছে গিয়েছিলেন, কথা প্রসঙ্গে তিনি অনুরূপ কথা বললেন। যেটা আমার বাবার বন্ধুর সাথে মিলে গেল।

আমাদের সমাজে শিক্ষিত লোকের অভাব নেই। ডিগ্রিধারী লোকও অনেক। কিন্তু অরজিনাল শিক্ষিত,জ্ঞানী লোকের বড় অভাব। আজ ভার্সিটির শিক্ষক অনেক লেখাপড়া করেছেন, পদ-পদবী বেশুমার। কিন্তু আসল শিক্ষা এখনো হাসিল করতে পারিনি। ইলম আছে কিন্তু হেলেম নেই। সে যা শিখেছে, সেটা হজম করার ক্ষমতা এখনো তৈরী হয়নি।

পুঁথিগত বিদ্যা হাসিল করলেই শিক্ষিত হওয়া যায় না, সেটা বোঝা যায় ঐসব শিক্ষিত লোকের আচরণ দেখে। তাদের চাল-চলন কথা-র্বাতায় বোঝা যায়, এরা জ্ঞানপাপি।

মানুষকে সহী শুদ্ধভাবে সালাম করা এটা ইসলামী আর্দশ। একজন মুসলমানের বৈশিষ্ট। মুসলমান হয়ে অপর মুসলমানের কল্যাণ কামনা করা জরুরি। কোন মুসলমান অপর মুসলমানের অকল্যাণ চাইতে পারেনা। বরং মুসলমান চায় অন্য মানুষের শান্তি-কল্যাণ।
সালামের অর্থটা বড় চমৎকার,”আচ্ছালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ” আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।
মানুষের জন্য দোয়া করা হয়ে থাকে। কল্যাণ কামনা করা হয় মানুষের। কিন্তু এই সাধারণ বিষয়টা আমাদের শিক্ষিত নামধারী লোকেরা বুঝতে সক্ষম হয় নি। একজন গ্রাম্য মহিলা যেটা বুঝতে পেরেছেন, কিন্তু আমাদের ভার্সিটির বড় শিক্ষিত মানুষেরা আজো তারা বুঝতে পারছে না।

আর এভাবেই চলছে। কদিন পর পর দেখা যায় আমাদের সুশীল সমাজের কিছু মানুষজন এরকম অবান্তর কথা বলে থাকেন। দ্বীনি বিষয়-আশায় নিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন তারা উথ্থাপন করেন। দেশব্যাপি হৈচৈ ফেলে দেন।

কিন্তু কেন? কেন এভাবে আমাদের সমাজের উচ্চস্তরের মানুষদের থেকে বেঁফাস মন্তব্য বের হবে? কেন তারা সমালোচিত হয়ে আমাদের দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠগুলোকে কলুষিত করবেন? এটা নিয়ে ভাবার দরকার।

আসলে মুলে গেলে দেখা যাবে, নৈতিক শিক্ষার বড্ড অভাব।আমাদের ডিগ্রীধারীদের নৈতিক শিক্ষা নেই। যে শিক্ষা তারা গ্রহণ করেছে, তাতে পুরোপুরি সবখানে ফিট হওয়ার মত যোগ্যতা পয়দা হয়নি। অনেক ডিগ্রী অর্জন করেছেন, কিন্তু সেই আসল শিক্ষা এখনো বঞ্চিত।

শিক্ষাঙ্গনে যে অবক্ষয়, নৈতিক শিক্ষার অভাবে আজ আমাদের শিক্ষিত মানুষগুলো বিপদগামী। একারণে শিক্ষাব্যবস্থায় প্রয়োজন দ্বীনি শিক্ষাকে অর্ন্তভুক্ত করণ। প্রতিটি কলেজ-ভার্সিটির সিলেবাসে দ্বীনি শিক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা জরুরি। যেটা বাধ্যতামূলক। নামকেওয়াস্তে আর নয়।প্রতিটি শির্ক্ষাথীকে দ্বীনি শিক্ষা দেওয়া আবশ্যকীয়। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে সহজ করুন। আমিন।

লেখক ; কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com