৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

জ্ঞানচর্চার উদার বিদ্যালয় লাইব্রেরি

মাওলানা মুনীরুল ইসলাম ● বই মানুষের পরম বন্ধু। অবসরের সঙ্গী। বইয়ের সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বলা যায়। পৃথিবীতে যত মানুষ-বন্ধু রয়েছে তাদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় ধরে কথা বললে, আড্ডা দিলে কথা কাটাকাটি ও ঝগড়াঝাটির সম্ভাবনা থাকে। কিন্তু শুধু বই-ই এমন বন্ধু- যার সঙ্গে অনন্তকাল কথা বললেও ঝগড়া-বিবাদের কোনো আশঙ্কা নেই। দার্শনিক ওমর খৈয়াম বলেছেন, ‘রুটি-মদ ফুরিয়ে যাবে, প্রিয়ার কালো চোখ ঘোলাটে হয়ে যাবে। কিন্তু একটি বই অন ন্ত যৌবনা, যদি তেমন বই হয়।’ সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. বলেছেন, ‘মাতৃভাষা ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি উদাসীনতা কিংবা বিমাতাসূলভ আচরণ এদেশের আলেম সমাজের জন্য আত্মহত্যার নামান্তর।’ আমাদের প্রিয় রাসুল হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ফরজ।’

সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের সর্বপ্রথম আয়াত নাযিল করেছেন পাঠসংক্রান্ত। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন…।’ আর সেই পঠনসামগ্রী হচ্ছে বই তথা কোরআন, হাদিস, ইসলামী সাহিত্য ইত্যাদি।

শিক্ষা গ্রহণের সহায়ক প্রতিষ্ঠান কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়। বরং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে অনেকাংশে বেশি ভূমিকা রাখতে পারে একটি লাইব্রেরি। চলতি শতাব্দীর শুরুর দিকে প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন, লাইব্রেরির প্রয়োজনীয়তা স্কুল-কলেজের চেয়ে বেশি। আর মোতাহার হোসেন চৌধুরী লাইব্রেরিকে জাতির সভ্যতা ও অগ্রগতির মাপকাঠি হিসেবে চিহ্নিত করেন। শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা নিজ বাসা-বাড়িতে শিক্ষকম-লীর সহযোগিতায় পাঠ্যপুস্তক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন করা যায়। কিন্তু লাইব্রেরি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে উচ্চতর জ্ঞান ও গবেষণামূলক জ্ঞানার্জনের সুযোগ করে দেয়। লাইব্রেরি মানুষকে পাঠপ্রবণ, স্বশিক্ষিত ও সুশিক্ষিত এবং আপন ইচ্ছা ও রুচি অনুযায়ী বিকশিত হতে সহায়তা করে। শারীরিক পরিচর্যায় যেমন স্বাস্থ্যবান হয়ে ওঠে, তেমনি জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে মানুষ জ্ঞানী হয়ে ওঠে। আর জ্ঞানচর্চার সর্বোৎকৃষ্ট স্থান হলো লাইব্রেরি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মেজবাহ্-উল-ইসলাম বলেন, গণগ্রন্থাগার হলো গণমানুষের বিশ্ববিদ্যালয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এর ব্যবহারকারীরা সকল শ্রেণির মানুষ হতে পারে। এখানে অল্পশিক্ষিত মানুষ থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্র, শিক্ষক কিংবা গবেষকও অবাধে আসতে পারে। তিনি বলেন, গণমত সৃষ্টিতে, জ্ঞান বিতরণে গবেষকদের গবেষণায় সকল তথ্য প্রদানে লাইব্রেরি অপরিসীম ভূমিকা পালন করে।

গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা মতে, সমাজে চার ধরনের লাইব্রেরি হয়ে থাকে। একাডেমিক, জাতীয়, বিশেষ ও গণগ্রন্থাগার। এর মধ্যে একাডেমিক লাইব্রেরিগুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও গবেষকরা ব্যবহার করেন। জাতীয় ও বিশেষ গ্রন্থাগারগুলো থাকে সংরক্ষিত। আর গণগ্রন্থাগার থাকে সবার জন্য উন্মুক্ত। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের এক গবেষণা জরিপের তথ্য মতে, সারাদেশে বেসরকারি গণগ্রন্থাগার আছে সাড়ে ৬ শো। আর সরকারি গণগ্রন্থাগার আছে ৬৪টি। রাজধানী ঢাকা থেকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গণগ্রন্থাগারগুলো পাঠকসেবা দিয়ে আসছে। রাজধানী ঢাকাতেই রয়েছে দেশসেরা বেশকিছু লাইব্রেরি। যেসব লাইব্রেরি রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষসহ সারাদেশের হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন ব্যবহার করে থাকেন। এসব লাইব্রেরির মধ্যে রয়েছে-

ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি : ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি। এর প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এটি রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ সংলগ্ন চার তলা ভবনজুড়ে অবস্থিত। প্রথম তলায় প্রদর্শনী হল। সেখানে দেশি-বিদেশি দুর্লভ ও প্রসিদ্ধ অনেক বই রয়েছে। বিভিন্ন ভাষায় অনূদিত কোরআন শরিফগুলোর প্রদর্শনী হলের শোভামণ্ডিত করেছে। দ্বিতীয় তলায় বাংলা ও ইংরেজি পাঠকক্ষ। তৃতীয় তলায় আরবি ও উর্দু পাঠকক্ষ এবং চতুর্থ তলায় পত্র-পত্রিকা ও জার্নাল পাঠকক্ষ। এ লাইব্রেরিতে বর্তমানে ১ লাখ ২০ হাজারের মতো দেশী-বিদেশী বই রয়েছে। এখানে কোরআন, হাদিস, ইসলামী আইন, আরবি সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস, সীরাত, পীর-আউলিয়া ও মুসলিম মনীষীদের জীবনী তথা ইসলাম সম্পর্কিত বইয়ের বিপুল সমাহার রয়েছে। জেলা শহর ও কিছু কিছু থানা শহরেও এর শাখা লাইব্রেরি রয়েছে।

বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থাগার : রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় গ্রন্থাগার। এটি প্রথমে ঢাকার ১০৬ সেন্ট্রাল রোডে এবং পরে ৩৭২ এলিফ্যান্ট রোডে ভাড়া করা বাড়িতে ছিল। ১৯৮৫ সালে বর্তমান ভবনে এটি স্থানান্তরিত হয়। এই গ্রন্থাগারের সব প্রকার বইয়ের সংগ্রহসংখ্যা আনুমানিক ৫ লাখের বেশি। নিত্যব্যবহারযোগ্য বইয়ের সংখ্যা প্রায় ২ লাখ। জাতীয় গ্রন্থাগারে শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির বই এবং পাঠ্যবই ছাড়াও পুরাতন দু®প্রাপ্য কিছু বই সংগ্রহে রয়েছে।

সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার : সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন শাহবাগ জাতীয় জাদুঘরের পাশে অবস্থিত। এটি পাবলিক লাইব্রেরি নামেই সবার কাছে পরিচিত। এটি ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পাঠকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয় ২২ মার্চ ১৯৫৮ সালে। পাবলিক লাইব্রেরিতে বর্তমানে বইয়ের সংখ্যা দেড় লক্ষাধিক। এতে রয়েছে সাধারণ পাঠকক্ষ, বিজ্ঞান কক্ষ, রেফারেন্স কক্ষ ও শিশু-কিশোর পাঠকক্ষ। সাধারণ পাঠকক্ষে সাহিত্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, মুক্তিযুদ্ধ ও বিভিন্ন বিভাগের পাঠ্যপুস্তক রয়েছে। গবেষণার জন্য এখানে রয়েছে রেফারেন্সমূলক প্রচুর বই। আলাদাভাবে শিশু-কিশোরদের জন্য রয়েছে শিশু-কিশোর পাঠকক্ষ।

বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র : ‘আলোকিত মানুষ চাই’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। এটি রাজধানীর বাংলামটরে অবস্থিত। এই লাইব্রেরিটি মূলত শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির বই পাঠকদের জন্য পরিবেশন করে থাকে। বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্রের লাইব্রেরিতে রয়েছে প্রায় ৫ লাখ বই।

বৃটিশ কাউন্সিল লাইব্রেরি : এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ফুলার রোডে অবস্থিত। এ লাইব্রেরিতে ইংরেজি ভাষায় লেখা বিভিন্ন বিষয়ের উপর মোট ১২ হাজার বই রয়েছে। লাইব্রেরিতে রয়েছে ইংরেজি ভাষা, সাহিত্য, ফ্যাশন ডিজাইন, ব্যবসা, চিকিৎসা, অর্থনীতি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞান শিশুসাহিত্য, বিজ্ঞান, ধর্ম ও মিডিয়া নিয়ে প্রচুর মূল্যবান বইয়ের ভাণ্ডার।

এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ লাইব্রেরি : এই লাইব্রেরিটি ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার বইয়ের বিশাল ভাণ্ডার নিয়ে সমৃদ্ধ এ লাইব্রেরি অনেক ইতিহাসের সাক্ষী। এতে রয়েছে বিভিন্ন বিষয়ের উপর উচ্চতর গবেষণামূলক বিভিন দেশি-বিদেশি বই। মূলতঃ এদেশের হাজার বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য, সভ্যতা, সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, রাজনীতিসহ প্রায় সব বিষয়ের উপর রচিত বিশাল বইয়ের ভা-ার রয়েছে এ লাইব্রেরিতে।

বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) লাইব্রেরি : এটি সংবাদপত্র ও গণমাধ্যমের বইয়ে সমৃদ্ধ একটি বিশেষ ধরনের লাইব্রেরি। এ লাইব্রেরিটির সূচনা হয় ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে। সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের চাহিদা পূরণে, পাঠস্পৃহা বৃদ্ধি, উন্নতি ও মননশীলতাকে বাস্তবমুখী করার লক্ষ্যে লাইব্রেরিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। বর্তমানে এ লাইব্রেরিতে মোট ১৩ হাজারের মতো বই রয়েছে। এছাড়া রাজধানীর বাইরের লাইব্রেরিগুলোও বইয়ে সমৃদ্ধ আর পাঠকদের মধ্যে জেনারেল জ্ঞান বিতরণে ভূমিকা রেখে আসছে।

আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লাইব্রেরি : ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লাইব্রেরি। এটি পল্টন তোপখানা রোডে অবস্থিত। এখানে প্রায় ২৩ হাজার বই রয়েছে। এখানেও ইসলামী বিভিন্ন বিষয়ে বইয়ের সমাবেশ ঘটেছে।

মহানগর পাঠাগার [জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র] : মহানগর পাঠাগার গুলিস্তানের বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে অবস্থিত একটি সমৃদ্ধ পাঠাগার। এখানে প্রায় ১২ হাজার বই রয়েছে।

আমাদের আরও লাইব্রেরি প্রয়োজন : আমার জানামতে ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি ও আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক লাইব্রেরি ছাড়া উপর্যুক্ত লাইব্রেরিগুলো লাখ লাখ কপি বইয়ে সমৃদ্ধ হলেও এর অধিকাংশই দেশী-বিদেশী অমুসলিম পণ্ডিতদের লেখা বই। সেগুলোতে কোরআন, হাদিস, ইসলামী আইন, আরবি সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস, সীরাত, পীর-আউলিয়া ও মুসলিম মনীষীদের জীবনী তথা ইসলাম সম্পর্কিত বই নেই বললেই চলে। মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক এবং দীনদার পাঠকের যা আছে তা পাঠের জন্য যাওয়ার মতোও পরিবেশ নেই। সেগুলোতে দায়িত্বরত ব্যক্তিরাও তাদেরকে ভালোভাবে নেয় না। সেগুলোতে গিয়ে অনেক সময় বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।

এ অবস্থায় আমাদেরও প্রথমত রাজধানীতে আরো সমৃদ্ধ লাইব্রেরি প্রয়োজন। এরপর পর্যায়ক্রমে জেলা শহর এবং থানা শহরগুলোতে লাইব্রেরি স্থাপন করা প্রয়োজন। যেখানে থাকবে কোরআন, হাদিস, ইসলামী আইন, দর্শন, আরবি সাহিত্য, বাংলা সাহিত্য, ইসলামের ইতিহাস, সীরাত তথা বিশ্ব সাহিত্য ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল বইয়ের সমাহার। যেখানে মাদরাসা শিক্ষিত ও সাধারণ দীনদার পাঠকরা অবাধে যেতে পারবে। উপরন্তু জেনারেল শিক্ষিত পাঠকদের জন্যও তা হবে উন্মুক্ত। মহিলাদের জন্য থাকবে পর্দাসমৃদ্ধ পৃথক মহিলা পাঠকক্ষ। বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড, ইসলামী এনজিও সংস্থা এবং ইসলামপ্রিয় সামর্থ্যবান ব্যক্তিবর্গ এ ব্যাপারে এগিয়ে আসতে পারেন।

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com