১লা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৫ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

ঢালাওভাবে নাস্তিক বলবেন না

ভাবনীয় মতামত। আমীনুল ইসলাম কাসেমী

ঢালাওভাবে নাস্তিক বলবেন না

বর্তমানে কাউকে “নাস্তিক” বলা যেন পান্তা ভাত হয়ে গেছে! মতের সাথে না মিললেই সে “নাস্তিক”! সে “মুরতাদ”! আবার ইদানীং আরেক জঘন্য শব্দের আবিষ্কার হয়েছে “পতিতা” ! কোনো মহিলা যদি মতের খেলাফ বলে ফেলল, তাহলে সে “পতিতা”?

বড় দুঃখ লাগে, এসব শব্দগুলো আমাদের কতিপয় “আলেম” সমাজের কেউ যখন ব্যবহার করেন! একদম আলখেল্লাধারী ব্যক্তিদের মুখ থেকে বের হচ্ছে! যখন-তখন! কেউ একটু আমাদের মতের বিরুদ্ধে চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে “নাস্তিক” আখ্যা দিয়ে দিলাম!

আরো সমস্যা হল, কোন সংগঠন বা কোন প্রতিষ্ঠান বা কোন গোষ্ঠীর কেউ যদি ভুল করে বসে, কোন অন্যায় করে ফেলে, বেফাঁস মন্তব্য করে বসে— তৎক্ষণাৎ আমরা তাদের পুরো গোষ্ঠীকে নাস্তিক বলে দিচ্ছি!

যেমন কোন মিডিয়ার কেউ যদি ভুল করে, সাথে পুরো মিডিয়ার সবাইকে নাস্তিক বলে “সাইজ করা” হচ্ছে! মিডিয়ার কোন মহিলা যদি ভুল করে, সেখানকার সব মহিলাকে “পতিতা”র মতো অশালীন ও চূড়ান্তভাবে আপত্তিকর গালি দিতেও দ্বিধাবোধ করছি না!! বিবেকে বাধছে না! এটা আলেমের চরিত্র হতে পারে না। অথচ ঐসব গোষ্ঠী বা দলে বা প্রতিষ্ঠানে বা মিডিয়াতে নানান মত ও পথের মানুষ কাজ করে থাকে। দেশের এমন কোনো মিডিয়া হাউস নেই যেখানে নামাজি নেই, দ্বীনদার নেই, রোজাদার নেই। অনেক ভাল মানুষ আছেন সেখানেও। অনেক পরহেজগার ব্যক্তি আছেন।এতদসত্বেও একচেটিয়াভাবে ওই মিডিয়াকে নাস্তিক বলে দেওয়া বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। তাছাড়া মিডিয়া তো নাস্তিক-আস্তিকের বিষয়ও নয়। বড়ই দুঃখজনক।

আচ্ছা বলুন তো? আমরা যে মানুষের ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করছি, মারাত্মক শব্দ “নাস্তিক” বলছি, জঘন্য শব্দ “পতিতা”ও বলছি— আমাদের কওমী অঙ্গনে কি ঐরকম দু’-একজন নোংরা-লোক নেই? কিছু অসভ্য-বর্বর নেই?

এর আগে দেশের বিভিন্ন জায়গাতে অঘটন ঘটায়ে ধরা খেয়েছে আমাদের কওমীর লোক…। তাহলে কি এখন পুরো কওমী অঙ্গন খারাপ হয়ে যাবে? একজনের বলাৎকারের কারণে কি পুরো কওমী গোষ্ঠী ঐ দোষে সাব্যস্ত হবে?

—কখনোই নয়। একজনের ভুলের কারণে পুরো গোষ্ঠী বা সম্প্রদায় বা জাতি খারাপ হতে পারে না। একজনের অন্যায়ের কারণে কোনো গোষ্ঠীকে দোষী সাব্যস্ত করা যায় না।

কিন্তু এরপরও আমাদের এই চরম অজ্ঞতা, এই তীব্র সংকীর্ণতা কেন? কেন আজ এ ধরনের গর্হিত কাজের সাথে আমরা জড়িত?

এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের অবশ্যই ফিরে আসতে হবে। আমরা যেসব লোকদের নাস্তিক বলি বা যেসব মহিলাদের এমন অশালীন ও নোংরা শব্দে গালি দিয়ে যাচ্ছি— এর মূলে গেলে দেখা যাবে, ঐ লোকদের ইসলাম সম্পর্কে ন্যূনতম ধারণা নেই। আমরা যেরকম ইসলাম নিয়ে ভুরি- ভুরি পড়াশুনা করেছি, গবেষণা করেছি, তারা সেটা করার সুযোগ পায়নি। যার দরুণ তাদের ভুল-ভ্রান্তি হওয়া স্বাভাবিক।যেটা আদতে তাদের কথাতেই বোঝা যায়। না জানার কারণে তারা এলোমেলো কথা বলে যাচ্ছেন। এখানে আগেই আমাদের হার্ড লাইনে না গিয়ে, তাদের পিছনে দাওয়াতের মেহনত করা দরকার ছিল। তাদের দ্বীনী দাওয়াত পৌঁছনোর দায়িত্ব আমাদের ছিল। কিন্তু সেটা না করে, সরাসরি “ফতোয়াবাজী” করা হচ্ছে, ওরা সব নাস্তিক!!

আসলে রাজনৈতিক কিছু নেতা ধর্মের অপব্যাখ্যা দিয়ে আমাদের মিসগাইড করে চলেছে। ওরা স্বার্থ হাসিলের জন্য, ক্ষমতার স্বাদ নেওয়ার জন্য মরিয়া। তার জন্য ওরা মানুষকে উস্কে দিচ্ছেন। কোন তাহকীক ছাড়াই, কোন প্রকার বাছ-বিচার ছাড়াই, ডাইরেক্ট আরেকজনকে আক্রমণ করে যাচ্ছে।

এটা কত বড় খতরনাক, আমরা কিন্তু চিন্তা করে দেখি না। যাকে নাস্তিক বলা হচ্ছে, নোংরা ভাষায় গালি দেওয়া হচ্ছে, সে যদি আসলে নাস্তিক না-হয়, যে দোষ দেওয়া হচ্ছে সে দোষে দুষ্ট না-হয়, পতিতা না-হয়— তাহলে মহান আল্লাহতা’য়ালার কাছে আমরা কী জবাব দিব? আমরা কি ভেবে দেখেছি? কত বড় ভয়াবহ অপরাধ করছি। কত বড় অবিচার করা হচ্ছে। এর জন্য মহান আল্লাহতা’য়ালার কাছে আমাদের জবাব দেওয়ার কোন জায়গা থাকবে বলে মনে হয় না।

এ প্রসঙ্গে একটা হাদীস বলতে চাই। সিহাহ সিত্তার প্রসিদ্ধ কিতাব আবু দাউদ শরীফের মধ্যে রয়েছে—
নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুজাহিদদের একটি জামাত হারাকাতের কাফেরদের সাথে যুদ্ধ করার জন্য পাঠালেন। তখন কাফেররা মুজাহিদ বাহিনীর আগমনের সংবাদ পেয়ে পালিয়ে গেল। সে যুদ্ধে মাত্র একজন কাফেরকে গ্রেফতার করা সম্ভব হল। অতঃপর মুজাহিদরা যখন তাকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হল, তখন সে কালিমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়ল, কিন্তু এতদসত্বেও তাঁকে হত্যা করা হল।

রাসূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ঘটনা শুনে নারাজ হয়ে বললেন, কিয়ামতের দিন সে যখন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নিয়ে হাজির হবে তখন তোমাকে কে নাজাৎ দিবে? সাহাবী উত্তর দিলেন, সে তো অস্ত্রের ভয়ে কালিমা পড়েছিল। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হাল্লা শাকাকতা আন কালবিহি” অর্থাৎ, তুমি তার দ্বীল চিরে দেখলে না কেন? তাহলে বুঝতে পারতে সে কীসের জন্য কালিমা পড়েছিল। অতঃপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বার বার বলছিলেন, কিয়ামতের দিন সে যখন “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” নিয়ে উঠবে তখন তোমাকে কে রক্ষা করবে?

সাহাবী বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের এ কথাটা বার বার শুনে মনে চাচ্ছিল যে, হায়! এ ঘটনার পূর্বে যদি আমি ইসলাম গ্রহণ না করতাম, তাহলে ভাল হত। কারণ ইসলাম গ্রহণ করলে পিছনের সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়। তাই এ গোনাহ মাফ হয়ে যেত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কথার উদ্দেশ্য হল, লোকটা অস্ত্রের ভয়েই যে কালিমা পড়েছিল, আসলে সে মুসলমান হয়নি” —এটা বোঝার কোন উপায় নেই। দ্বীল চিরে দেখলেও তা বোঝা যাবে না। সুতরাং শুধু ধারণার উপর ভিত্তি করে এমন কথা বলার অনুমতি নেই। বরং বাহ্যিক কথার উপর ভিত্তি করেই তার ঈমান আছে বিশ্বাস করতে হবে। আর মনের ব্যাপারে আল্লাহর উপরে ছেড়ে দিতে হবে।
(হুদুদে ইখতেলাফ, মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহঃ, সংকলক মুফতী ফারুক রহঃ, অনুবাদ মুফতী মামুনূর রশীদ, আযিযী প্রকাশনী)

এখানে লক্ষণীয় বিষয় হল, কাফেররা ময়দান ছেড়ে পালাল। একজন মাত্র কাফের ধরা পড়েছে, সে কোন আমল করেনি। শুধু কালিমা পড়েছে, তাই তাঁর সাথে এমন ব্যবহার দেখানো হল, যা একজন মুসলমানের সাথে দেখানো হয়।

এ জন্য সাবধান হওয়া দরকার।যাকে-তাকে নাস্তিক বলা, কাফের বলা, বড় চিন্তার বিষয়। যাকে আমরা নাস্তিক আখ্যা দিচ্ছি, সে যদি নাস্তিক না হয়। সে যদি কালিমা পড়ে মুসলমান হয়ে থাকে, তাহলে আমরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে কী জওয়াব দিব?
ঢালাওভাবে একটা প্রতিষ্ঠানের সকলকে নাস্তিক বলে আখ্যা দেওয়া বা নোংরা ভাষায় গালি দেওয়া বড় জঘন্য কাজ। ঐ ধরনের মন-মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে আমাদের। খুব হিসাব করে চলা দরকার। কথা ও কাজ যথার্থ হওয়া চাই।

এই যে গালি দেওয়ার প্রবণতা, এটা তো খুবই নিন্দনীয় বিষয়, খুবই লজ্জার বিষয়। কোন মু’মীন মুসলমান তো আরেক ভাইকে গালি দিতে পারে না। ভাষা খারাপ করে কথা বলতে পারে না। বরং মুসলমানদের আখলাক হবে কোমল, নরম। তাদের মিষ্ট কথায় প্রাণ জুড়ে যাবে। তাদের আখলাক-চরিত্র দেখে বিধর্মীগণ ইসলামে দাখিল হবেন।

কিন্তু আমরা যে খিস্তি-খেউড়ের রাজনীতি করে যাচ্ছি, যে ধরনের অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার করছি, তাতে মানুষের মন বিগড়ে যাবে। ইসলামে দীক্ষিত হওয়া দূরের কথা, বরং (আমাদের অপরাধে ও মূর্খতায়) তাদের ইসলামের প্রতি তাদের ঘৃণা জন্মাচ্ছে ও জন্মাবে।

বুখারী শরীফের হাদীসে রয়েছে, “আল মুসলীমু মান সালিমাল মুসলীমুনা মিল লিছানিহি ওয়াদিহি” প্রকৃত মুসলমান ঐ ব্যক্তি, যার মুখ এবং হাত থেকে অন্য মুসলিম ভাই নিরাপদে থাকে।

এবার চিন্তা করুন তো, আমরা যে আগ্রাসী কায়দায় আরেক মুসলমান ভাইয়ের উপরে ঝাপিয়ে পড়ছি, এটা কতদূর শরীয়াৎ সমর্থন করে? মোটেও নয়। বরং ইসলাম এটা নিন্দা করে।

তাই আসুন, অনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিহার করি। অত্যন্ত হেকমত এবং উত্তম আখলাকের মাধ্যমে মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করি।কুরআনুল কারীমে বর্ণিত হয়েছে, “উদয়ু ইলা সাবিলি রাব্বিকা বিল হিকমাতে ওয়াল মাওয়েজাতিল হাসানা” “আপনার প্রতিপালকের রাস্তায় মানুষকে আহ্বান করুন, হেকমত এবং উত্তম কথার মাধ্যমে”(সুরা নাহল-১৪৫)

কুরআনুল কারীমের অন্যত্র আছে, “ফাকুলু লাহু কওলাল লাইয়্যিনা” “তুমি তাদের নরম-মোলায়েম ভাষায় দ্বীনের রাস্তায় দাওয়াত দাও” (সুরা ত্বহা-৪৪)

যে যেখানে আছি, উত্তম-মিষ্ট কথার মাধ্যমে দ্বীনের দাওয়াত মানুষের কাছে পৌঁছে দেই। গালি-গালাজ, ভাষা খারাপ পরিহার করি। আল্লাহতায়ালা আমাদেরকে উত্তম কাজে শরীক হওয়ার তাওফীক দিন। আমীন।
লেখক : কওমী মাদ্রাসার শিক্ষক ও কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com