২৪শে ফেব্রুয়ারি, ২০২০ ইং , ১২ই ফাল্গুন, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ , ৩০শে জমাদিউস-সানি, ১৪৪১ হিজরী

তাহকীকের শিলান্যাস

জয় মালেকবাদ—জয় মারকাযুদ্দালালাত

মাওলানা শেখ মুহাম্মাদ ● হায় এক জীবন পার হয়ে গেল, আজও তাহকীকের তাহকীক করা হলো না। অনেক কিছুর তাহকীক হয়েছে কিন্তু তাহকীক শব্দটি তাহকীক বিহীন রয়ে গেল। আলকাউসার কূপের তাহকীকের জাতাকলে পড়ে ইতায়াতি ভাইগণ মাসিক আত-তাহকীক পত্রিকাও বের করলেন। আল কাউসার বা আত-তাহকীক কোথাও তাহকীক শব্দটি নিয়ে গবেষণা হতে দেখা যায়নি। ইলমী দুনিয়ায় এ এক বড় শূণ্যতা!

আজ থেকে শত বছর আগে মারকাযুদ দাওয়াহর পূর্বসূরি এক মুহাক্কিক ছিলেন। যার নকশে কদমে মার্কাজ চলে, বলে ও চিন্তা করে। মহামহিমের নাম হযরত আবুল আলা মওদূদি। তো হযরত মাওদূদি এই তাহকীকের ধারণা দিয়েছিলেন সর্বাগ্রে। তিনি লিখেছিলেন- ‘রাসূলে খোদা কি সিওয়া কিসিকো তানক্বিদ ছে বালাতর না সামঝো। কিসি কি জেহনি গোলামি মে মুবতালা না হোঁ’।

যতদূর জানা যায়, এই একটি মূলনীতিকে প্রাণে ধারণ করে মাওলানা আব্দুল মালেক তার যাত্রা শুরু করেন। মারকাযুদ দাওয়াহর গোড়াপত্তন হয় তাহকীকের এ নতুন ফরমেশন সামনে রেখে। আল্লাহর রাসূল ছাড়া কেউ সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। কারো চেতনার দাসত্ব করা যাবে না।

মূলত যাহা তানক্বিদ তাহাই তাহকীক। আল্লাহর রাসূল ছাড়া আর যেই হোন না কেন। তার ভুল ধরে দিতে হবে। একটা মক্তবের শিশুও পারবে ইবনে হাজার বা ইবনে জাবালের ভুল ধরিয়ে দিতে। আর রাসূলের ভুল ধরা যাবে না সত্য; কিন্তু বড় মনীষীরা রাসূল সা.এর বাণীসমূহের যে ব্যাখ্যা দিবে তা গ্রহণ করা আবশ্যক হবে না। বরং ‘হুম রিজাল নাহনু রিজাল’। তারাও মানুষ আমরাও মানুষ। বড়দের কথা মেনে নেওয়া হবে চেতনার দাসত্ব। এক আল্লাহর ইবাদতের দাবী হচ্ছে অন্য কাউকে না মানা। অবাধ্যতা ও আওয়ারেগি হচ্ছে তাওহীদের আলামত। কিসের উস্তাদ কিসের আকাবির কিসের বাপ মা। সবার উপর তাহকীক সত্য তাহার উপর নাই।

তো এই উসুল অনুসারে পড়াশোনা শুরু করার পর মারকাযের একেকটা ছাত্রের তাহকীকের যে মেজায হয় তার একটি নমুনা নিন। জুমলায়ে মুতারিজা হিসেবে বলতে হয়, সত্য স্বীকার করাই উচিত। তাহকীকের চলমান ধারা আমাদের দেশের মানুষের ভেতর একেবারেই নতুন। এ তাহকীকাতের অবদান সম্পূর্ণই মাওলানা আব্দুল মালেকের। এর আগে হাজার হাজার বছর তাহকীক ছাড়া কেটে গেছে মূর্খ বাঙালির। তাহকীক হীন পৃথিবী সে যে কি দুঃসহ তা বলে বোঝানো যাবে না।

মারকাযের ফুজালাদের কী পরিমাণ তাহকীকের মেজায তৈরি হয় তা আপনি পাঠক কল্পনাও করতে পারবেন না। তো বলছিলাম মুহাক্কিকিন পড়াশোনা শেষ করে ঘরে ফেরেন সম্পূর্ণ নতুন মানসিকতা নিয়ে। চিন্তা জগতে বিপ্লব সৃষ্টি হয়। তাদের কর্মকাণ্ড পাগলা গারদের উন্মাদদের মত হলেও অর্থবহ এক দর্শন তাদের রয়েছে। প্রতিটি কর্মে সেই বর্বর ফালসাফা প্রকাশ পেতে থাকে। বাড়ি গিয়ে তারা প্রথমেই তাহকীক করেন বাবা মাকে। তাহকীক ছাড়া কোনো কিছুই গ্রহণ করা উচিত নয়। বাবা মাকেও তাহকীক করতে হবে? হ্যাঁ অবশ্যই। কেন করবেন না? বাবা মার মত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাহকীক ছাড়াই একজীবন মেনে নিব তা কী করে হয়।

অবশ্য যে কোনো তাহকীকের বিশেষ নাহাজ আছে। এসব নাহাজ বিস্তারিতভাবে শিক্ষা দেওয়া হয় মারকাযুদ দাওয়ায়। প্রথমত মায়ের কাছে একান্ত ভাবে জিজ্ঞেস করেন মারকাযের মুহাক্কিকিন। মা, মাথায় হাত রেখে আল্লাহর কসম করে বল, তুমি আমার ওয়ালেদ ছাহেবের সাথে খেয়ানত করোনি তো? এর আগে অবশ্য বাবাকে বিবাহের স্বাক্ষী উপস্থিত করতে বলা হয়। দলীল পত্র থাকলে সেগুলিও হাজির করার বিনীত অনুরোধ জানানো হয়। এত অল্পতে মুহাক্কিকের তৃপ্তি হলে সে আর কী মুহাক্কিক হলো। তাই অবশেষে আধুনিক পদ্ধতি গ্রহণেও পিছপা হয় না। বাবা মা কে নিয়ে যায় ল্যাবরেটরিতে। ডি এন এ টেস্ট করে চূড়ান্ত তাহকীক করতে হয় প্রতিটি মুহাক্কিককে।

চিন্তা চেতনার ক্ষেত্রে দেওবন্দের নাম যারা নেয় তাদের তাহকীকের যাওক নাই। মূলত যাওক শব্দটিও দেওবন্দে নাই। বেযাওক দেওবন্দী যে সব আলেম আছে তাদেরকে তাহকীকের শরবত পান করিয়ে করা হয় উতলা। পুরো উলামা সমাজ ভেসে যায় তাহকীক তানক্বিদের বন্যায়। তাহকীকের কলেরা ছোটে। প্রতিটি তালিবুল ইলম এখন মুহাক্কিক। তাহকীক ছাড়া কোনো কথা গ্রহণ করা হয় না। শয়নে স্বপনে মন মননে সবমনে সবখানে সবক্ষণে তাহকীকের ছড়াছড়ি। বাজারি বক্তারাও তাহকীকসমৃদ্ধ। এই যে একজন আরেকজনের গলা কাটছে বা গলাবাজি করছে সবাই সেই তাহকীকের শারাবান তাহুরা পান করেই মাঠে নেমেছে। যেন পৃথিবীতে কোনো সম্মানিত মানুষ না থাকে। সবাই বড় সবাই ছোট। ছোট বড়র ভেদাভেদে বিশ্বসী নয় মুহাক্কিকিন। সাম্য প্রতিষ্ঠাও তাদের লক্ষ্য। তাদের চেষ্টা থাকে সমঝদার আলেম প্রজাতির চরম বিলোপ ঘটানো। তাহকীকাতের বিশাল প্রাসাদ গড়া হয় এসব মহৎ উদ্দেশ্য সামনে রেখে। একেকটা মারকাযি একেকটা তাহকীকি।

এসব তাহকীকের মূল কথাই হচ্ছে, যদি যোগ্যতা থাকে তাহলে বড় কারো ভুল ধরে দেখাও। কোনো ভুল না থাকলেও ভুল বের করতে হবে। এর জন্য পাণ্ডিত্যের বিশেষ কতগুলো কোর্স রয়েছে। বেয়াদবির ডিপ্লোমা। ‘হামচুনি মান ডাঙ্গরে নিসতের’ উপর ডক্টরেট। থিসিস হয় প্রচুর পরিমাণে। এসব নিয়ে ইফাদা ইস্তিফাদা চলতে থাকে। দেখা যায় আলেম উলামা একে অপরের কাপড় টানাটানি শুরু করে। কে কার আগে নিজেকে মুহাক্কিকিনের কাতারে ফেলবেন সেই প্রতিযোগিতা। ভুল ধরাটাই যোগ্যতা। সমালোচনা সাহিত্যে হাত পাকানোই কামাল। বেয়াদবীই আদব। অহংকারই বিনয়। এবং অজ্ঞ হয়েও আলেমকূল শিরোমনি হতে প্রয়োজন রয়েছে বিশেষ কোর্সের। নীলক্ষেত থেকে একের পর এক কিতাব ফটোকপি চলতে থাকে আর মুহাক্কিক জন্ম নিতে থাকে পথে ঘাটে বনে জঙ্গলে বাংলার ঘরে ঘরে। কে কতগুলো ভুল ধরতে পারল তা কাউন্ট করা হয়। পুরস্কৃত করা হয় অগ্রসরদের।

হেনস্তা করার মহোৎসব আজ শুরু হয়েছে বাংলার জমীনে। কাল কেয়ামতের আগে আর এর গতি থমকে যাবে না। চক্রান্ত করে বন্ধ করা যাবে না তাহকীকের দরজা। মারকাযুদ দাওয়াহে বরং আরও গতিশীল করা হচ্ছে এর ধারা। নিয়মিত ছাত্র পাওয়া যাচ্ছে সেখানে আদীব ছাহেব হুজুরের খামার থেকে। বিকলাঙ্গরা আর কোথাও স্থান না পেলে মারকাযের প্রান্তর তাদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। আরব থেকে গাধার পিঠে করে কিতাব আনা হয়েছে। শোনা গেছে আরবের কুতুবখানাসমূহের যাকাতের কিতাব জমা করা হয়েছে এখানে। এত কিতাব একসঙ্গে পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায়নি। কুতুবখানার ফাজায়েল বললে এক জিলদ হয়ে যাবে। আমরা শুধু বলব এখানে গেলে মুহাক্কিক না হলেও তাহকীকের ঘ্রাণ পাবেন চোখ বন্ধ করে।

আগে হুজুরদের পরস্পর বিদ্বেষের গল্প শুনতাম। এখন এর বাস্তবতা দেখতে পাচ্ছি। এক লোক দুজন হুজুরকে দাওয়াত করল। প্রথম জনকে দাওয়াতের সময় জানালো অমুক হুজুরকেও দাওয়াত করছি। তো হুজুর বললেন, ও তো একটা ছাগল। অপরজনকে দাওয়াত দিতে গেলে সে অপর হুজুরের কথা শুনে বললেন, ও তো একটা গরু। যথা সময়ে দুই গরু দাওয়াত খেতে এসে দেখেন- তাদের জন্য দস্তরখানে এক প্লেটে কিছু ঘাস, আরেক প্লেটে কিছু ভুসি। খাবারের বদলে এসব কী? মেজবান বললো, আপনাদের দুজনকেই আমি শ্রদ্ধা করি। দুজনের কথার প্রতিই আমার সমান আস্থা। উভয়ের তাহকীক অনুসারে আজকে এমন আয়োজন করেছি।

মাওলানা আব্দুল মালেক সাহেব তাহকীকাতের যে আগুন জেলে দিয়েছেন তাতে ইনশাল্লাহ অল্প সময়েই দেশে আপনারা এর সুফল দেখতে পাবেন। ইতোমধ্যেই ওয়ায়েজিনদের গলা কাটাকাটি দেখতেই পাচ্ছেন। সামনে আরও অপেক্ষা করুন। অতীত ও বর্তমানের কেউ যেন নিরাপদ না থাকে সে ব্যবস্থা করা হয়েছে অলরেডি। দিন দিন মুহাক্কিকদের কদর বাড়বে। পথে ঘাটে ভরে যাবে মুহাক্কিকদের হারামখোর বংশধর। তাহকীকের সেই সোনালি দিনের অপেক্ষায় আমরা ফেরকায়ে মালেকিয়ার মহাজনরা। আমরা শুধু গুড় লাগানোর কাজটি করব। তারপর বলব, আমরা সমাজের সংশোধন করতে চাই। ‘ইন্নামা নাহনু মুসলিহুন’। জয় মালেকবাদ—জয় মারকাযুদ্দালালাত।

লেখক : বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্যানুরাগী মুহাক্কিক আলেম

মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com