৭ই জুলাই, ২০২০ ইং , ২৩শে আষাঢ়, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জিলক্বদ, ১৪৪১ হিজরী

দিরিলিস আর্তুগ্রুল সিরিয়াল ও একটি সুস্থির আলাপ

দিরিলিস আর্তুগ্রুল সিরিয়াল ও একটি সুস্থির আলাপ

ফয়জুল্লাহ আমান ❑ দিরিলিস আর্তুগ্রুল বর্তমান সময়ে সাড়া জাগানো একটি টিভি সিরিয়াল। অটোমান সম্রাজ্যের উত্থান কিভাবে হয়েছিল তার চিত্রায়ন করা হয়েছে এ সিরিয়ালে। আর্তুগ্রুল হচ্ছেন অটোমনদের প্রথম সুলতান অতমানের পিতা। অতমান তুর্কি নাম। অর্তুগ্রুল যেমন আরবি নাম নয় অতোমানও কোনো আরবি শব্দ নয়। পরবর্তীতে নবীজীর বিখ্যাত সাহাবি তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রা.-এর সাথে মিলিয়ে তার নাম উসমান উচ্চারণ করা হয় এবং সাম্রাজ্যের নামকরণ হয় উসমানিয়া সালতানাত।

উসমান বা অটমান জন্ম গ্রহণ করেন ৬৫৬ হিজরী সনে। এ বছরই তাতারিদের হাতে বাগদাদের আব্বাসি খেলাফতের পতন। আর্তুগ্রুল ছিলেন অঘুজ তুর্কিদের কায়ি গোত্রের নেতা। কায়ি গোত্রের স্থায়ি কোনো আবাস ছিল না। যাযাবরের মত জীবন ছিল তাদের। একবার সলজুকদেরকে কোনো এক যুদ্ধে সাহায্য করার সুবাদে আনাতোলিয়ার জায়গির লাভ করেন। এখান থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে সাম্রাজ্য। হিজরী সপ্তম শতকের শেষ থেকে নিয়ে ১৯২৩ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দীর্ঘ ছ শ বছর এ সাম্রাজ্য টিকে ছিল।

ব্যক্তির যেমন যৌবন ও বার্ধক্য আছে জাতির জীবনেও এমন বিভিন্ন পর্যায় থাকে। একবার বার্ধক্য এসে গেলে হারানো যৌবন আর ফিরে আসে না। সেই যৌবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা অর্থহীন। তুর্কি জাতির যে উত্থান একসময় হয়েছিল তা এখন পুরনো হয়ে গেছে। দিরিলিস আরতুগ্রুল সিনেমা দিয়ে যদি তুর্কি সরকার পুরনো দিন ফিরিয়ে আনার স্বপ্ন দেখেন তাহলে বলতে হয় তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। তার চেয়ে বেশি আহমক যারা এসব সিরিয়াল দেখে অন্য জাতির গোলামির আকাঙ্খায় প্রহর গুণে সময় কাটায়।

সিনেমা বা সিরিয়াল দেখে কোনো জাতি পৃথিবী শাসন করেছে বলে ইতিহাসে নজীর নেই।

একসময় আরবরা সারা পৃথিবীতে রাজত্ব করেছে। ৬৫৬ সালে তাদের শাসন শেষ হয়েছে। এরপর তুর্কিরা বিশ্ব শাসন করেছে। তাদেরও দিন শেষ হয়েছে। এরপর এসেছে বৃটিশরা। বৃটিশদের পর আমেরিকা রাশিয়া। তারপর কারা বলা যাচ্ছে না। হয়ত চিন হয়ত অন্য কেউ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে। এই সব দিন আমি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আনি লোকদের মাঝে। [আল ইমরান আয়াত: ১৪০]

আমাদের বাঙালিরা এখনও বিশ্ব শাসনের সুযোগ পায়নি। সে হিসেবে আমরাও পবিত্র কোরআনের ভাষ্যমতে সে সুযোগ লাভ করতে পারি। কিন্তু দিরিলিস আতুগ্রুল দেখে কি সেভাবে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে পারব? সিনেমা বা সিরিয়াল দেখে কোনো জাতি পৃথিবী শাসন করেছে বলে ইতিহাসে নজীর নেই।

দিরিলিস আর্তুগ্রুল দেখা জায়েয আছে কি না এ নিয়ে বেশ বিতর্ক জমে উঠেছে। যাকির নায়েক, পাকিস্তানের মুফতী ইউটিউবার তারেক মাসউদ ও আরও অনেকেই যুক্তি দিয়ে যায়েযের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছেন। তারা বলছেন, ‘যারা সবসময় হলিউড বলিউডের সিনেমা দেখে তারা যদি নষ্ট ফিল্ম না দেখে এই সিরিয়াল দেখে তাহলে ইসলামের দিকে কিছুটা আকর্ষণ বৃদ্ধি পাবে।’ তার মানে যারা সবসময় অপকর্ম করে তারা যেন বেপর্দা নারীদের ধর্ষন না করে বোরখা ওয়ালিদের ইজ্জত হরণ করে। কারণ বোরখার দিকে যখন নজর পড়বে এতে কিছুটা তো ইসলামি সংস্কৃতির সংস্পর্শ পেল। তাতে ইসলামি জাগরণ সৃষ্টি হবে। অথবা যারা সব সময় ড্রেনের আবর্জনা খায় তারা যেন অন্য ড্রেনের পানি না খেয়ে মসজিদ মাদ্রাসার ড্রেনে মুখ লাগিয়ে আবর্জনা খায়। এতে ইসলামের কাছাকাছি থাকা গেল। ইসলামি চেতনা বৃদ্ধি পাবে। এমন উদ্ভট যুক্তি শুনে মাথা এলোমেলো হয়ে যাবে যেকোনো সুস্থ মানুষের।

জিহাদের জযবা সৃষ্টির জন্য এ সিরিয়াল দেখা অবশ্য কর্তব্য বলেও কিছু লোক বয়ান দিচ্ছে। সাতশ বছর আগের পৃথিবীতে নেই আমরা। একথা বোঝা উচিত জিহাদিস্টদের। সেসময়ের পেক্ষাপটে আর্তুগ্রুল ও অটমানরা যে পথ অবলম্বন করেছেন এখন তা বাস্তবায়ন করতে যাওয়া হবে চরম মুর্খতার পরিচায়ক। সাতশ বছর আগের দৃশ্য দেখে কেউ তরবারি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লে তা জিহাদ হবে না, তা হবে জঙ্গি তৎপরতা। কোনো মুসলমান স্বাগত জানাতে আসবে না এসব জিহাদিস্টদের। একজন বিবাহের পর তার স্ত্রীর সাথে যা করে বিবাহের পূর্বে তা করতে গেলে সেটাই হয়ে যায় লুচ্চামি। এক পরিস্থিতির সাথে আরেক পরিস্থিতিকে গুলিয়ে ফেলানোর কোনো মানে হয় না। সুস্থ মাথায় ভাবতে হবে, আমরা এসব কী করছি?

একটা সিরিয়ালের কারণে সালাফিইজম পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না।

দিরিলিস আর্তুগ্রুলের বিপরীতে কিছু বলতে বসিনি। আমি বরং মূলত এই ধারাবাহিক থ্রীলারের ভালো একটি দিক নিয়ে আলোচনা করব। অটোমানরা ছিল পাক্কা সুন্নি হানাফি সুফি ঘরানার। অনেকটা বর্তমান দেওবন্দিদের মত। একারণেই আরবের স্কলাররা এই সিরিয়ালের বিরুদ্ধে ফতোয়া শুরু করেছে। হিন্দি সিনেমাগুলো আরবি ডাবিং হয়ে আরবের ঘরে ঘরে পৌঁছে যাবার সময় তারা সোচ্চার হন না, আর এখন দিরিলিস নিয়ে কেয়ামত করে ফেলছেন। এত হাক-ডাকের কারণ দিরিলিসের অশ্লিলতা বা ইতিহাস বিকৃতি নয়। সমস্যা অন্য কোথাও। আর তা হচ্ছে সালাফি মতবাদের পতনের ঘন্টাধ্বনি দেখতে পাচ্ছেন তারা। অথচ এতটা আশংকার কিছু নেই। কারণ সালাফিরা এ সিরিয়ালের একটা ব্যাখ্যা নিজেদের মত করে নিতে পারবেন। ভালোটুকু নিয়ে মন্দটা প্রত্যাখ্যান করার কথা বলতে পারবেন। একটা সিরিয়ালের কারণে সালাফিইজম পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে না। অমূলক আশংকা তারা না করলেও পারেন।

এই সিরিয়ালে আর্তুগ্রুলের সাথে ইবনে আরাবির সাক্ষাত ঘটানো হয়েছে। তুর্কিদের উপর ইবনে আরাবির প্রভাব ঐতিহাসিকভাবেই প্রমাণিত। এ যাবৎকাল পৃথিবীতে সুফিবাদের যত সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে এর সিংহভাগ রচনার স্রষ্টা হচ্ছেন ইবনে আরাবি। ৬৩৮ হিজরিতে মৃত্যু বরণ করেন তিনি। স্পেনে জন্ম হলেও তিনি আনাতোলিয়া ও সিরিয়ায় ছিলেন দীর্ঘ সময়। সিরিয়াতেই তার মৃত্যু। ফুতুহাতে মাক্কিয়্যা ও ফুসুসুল হিকাম ছাড়াও অসংখ্য বিস্ময়কর গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি। ওয়াহদাতুল উজুদ বিষয়ে তার বক্তব্য বিকৃত করে তাকে বিতর্কিত করার চেষ্টা হয়েছে আধুনিক সময়ে। বিশ্বব্যাপী সালাফি ইজম প্রতিষ্ঠা করতে সুফিইজমকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে একশ বছর ধরে। এই প্রথম দিরিলিস আর্তুগ্রুলে যেন তার শক্ত জবাব দেওয়া হলো। কাজেই যাকির নায়েক ও তার অনুসারি সালাফিদের এতে খুশি হবার কিছু নেই।

পাঠকদের জানিয়ে রাখছি, উপমহাদেশের বিখ্যাত মুসলিম দার্শনিক দিল্লির শাহ ওয়ালিউল্লাহ থেকে নিয়ে দেওবন্দের সমস্ত মনীষী ইবনুল আরাবির ভক্ত ছিলেন। দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা কাসিম নানুতুবী সম্পর্কে তার পৌত্র কারি তৈয়ব লিখেছেন, মাওলানা নানুতুবি তিনটি গ্রন্থ খুব বেশি পড়েছেন, কুরআন, মাসনবি ও ফুতুহাত। রুমির মাসনবি ও ইবন আরাবির ফুতুহাত। আনাতোলিয়ার কাউনিয়া শহরে ছিলেন জালালুদ্দিন রুমি। রুমি রহ. ইবন আরাবির শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছেন বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়। তুর্কিদের উপর এ দুজন মনীষীর গভীর প্রভাব ছিল। রুমির মৃত্যু ৬৭২ হিজরি সনে। ৬৯১ সনে মৃত্যু বরণ করেন আরেক সুফিসাধক কবি শেখ সাদি। শেখ সাদি ইরানের হলেও তুর্কিদের ভেতর তার চর্চা ছিল। দেখা যাচ্ছে, অটোমানদের উত্থানের সময়টা ছিল সুফিদের প্রভাব বলয়।

তুর্কি সংস্কৃতির প্রভাব মুসলিম বিশ্বে পৌঁছানো গেলে এ থেকে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হবে সহজে।

আমরা সুফিবাদকে পসন্দ করি বলে দিরিলিস দেখতে বলব না। কারণ কল্পিত গল্প দিয়ে কোনো ধর্ম বা মতবাদের প্রসার ঘটলে হোমারের লেখা প্রাচীন ওডিসি ও ইলিয়ড এবং তারপর মহাভারত ও রামায়ন বিশিবব্যাপী প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হতো। কুরআনের জাতি কখনও এমন কল্পকাহিনির পেছনে ছুটতে পারে না। বিশ্বের বুকে স্থায়ী প্রভাব ফেলতে হলে ইমান আমল আধ্যাত্মিক ও মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ হতে হবে। চরিত্রবান, সুস্থ চিন্তা ও বোধসম্পন্ন এবং কর্মঠ হতে হবে আমাদেরকে। রহমদিলি, উদারতা, সেবাপরায়নতা, জ্ঞান, ত্যাগ, সাহস ও কষ্টসহিষ্ণুতা অর্জন করতে হবে দীর্ঘ সাধনায়। নেতৃত্বের জন্য যেসব গুণ প্রয়োজন তা ভালো করে রপ্ত করতে হবে আমাদের। তাহলেই হয়ত একসময় বাঙালি সারা বিশ্বে তাদের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করতে পারবে। কোনো তুর্কি বা হিন্দি সিরিয়াল দেখে সময় নষ্ট করে শক্তিমান হওয়া যাবে না।

কুরুলুস ও দিরিলিস দিয়ে তুর্কিদের সাম্রাজ্য ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে কি না? বাহ্যিকভাবে তুর্কি সাম্রাজ্য বিস্তারের চেষ্টা মনে হলেও বিষয়টি এমন নয়। তুর্কিরা এত বোকা নয়। তারা তুর্কি খেলাফত ফিরিয়ে আনতে এত তোড়জোড় করছে না। তাদের এ চেষ্টার পেছনে অর্থনৈতিক অগ্রগতির চিন্তাই প্রধান বলে মনে হয়। কারণ তুর্কি সংস্কৃতির প্রভাব মুসলিম বিশ্বে পৌঁছানো গেলে এ থেকে অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি হবে সহজে। যখন কোনো জাতি সম্পর্কে জানাশোনা থাকে তখন তাদের সাথে সহজ সম্পর্ক করা যায়। আমরা আমেরিকা সম্পর্কে যতটুকু জানি চীন সম্পর্কে ততটুকু জানি না। তাই চীন এত কাছে হওয়া সত্ত্বেও আমাদের থেকে কত দূরে। আর আমেরিকা দূরের হওয়া সত্তেও অনেক কাছের মনে হয়। যার কারণে বাণিজ্যিক যে সম্পর্ক আমেরিকার সাথে করা সহজ অচেনা এক জাতির সাথে ততটা সহজ নয়। ইমপোর্ট এক্সপোর্টের ক্ষেত্রে এর ভুমিকা থাকে। বিশ্বব্যাপী সম্মান অর্জন করতে হলেও জাতির একটি ভাবমূর্তির প্রয়োজন হয়। তাতে সম্মান যেমন বৃদ্ধি পায় বাণিজ্যিক অনেক সুবিধাও লাভ করা সহজ হয়। এ বিষয়গুলো মাথায় থাকলে যারা তুর্কি শাসন ফিরে আসার শঙ্কা করছেন তাদের ভয় কিছুটা কমবে। ফালতু চিন্তা ছেড়ে আমাদের বাংলাদেশের বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠা কিকরে সম্ভব হয় সে ভাবনায় ভাবিত হওয়া উচিত।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক ও সমাজ বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com