৩১শে অক্টোবর, ২০২০ ইং , ১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৩ই রবিউল-আউয়াল, ১৪৪২ হিজরী

দীনিয়াতের খুশবু ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়

দীনিয়াতের খুশবু ছড়িয়ে পড়ুক বিশ্বময়

মুহাম্মাদ আইয়ুব ❑ গত মাসের শেষ দিকে বাংলাদেশের বৃহৎ মানবতাবাদী বেসরকারি সেবা সংস্থা ‘ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশ’ এর উদ্যোগে আয়োজিত মাদানী মক্তব শিক্ষক প্রশিক্ষণ কর্মশালায় অংশগ্রহণ করতে ইকরায় গিয়েছিলাম। ইকরা বাংলাদেশের প্রিন্সিপাল মাওলানা সদরুদ্দীন মাকনুন সাহেবের তত্বাবধানে পরিচালিত কর্মশালাটি সবদিক থেকে ছিল সুশৃঙ্খল ও পরিপাটি। শিক্ষকদের মূল্যায়নের কোন দিকই তিনি অসম্পূর্ণ ছাড়েননি মাশাআল্লাহ। প্রশিক্ষণ কর্মশালাটি সম্পাদন করেছে বাংলাদেশের দীনিয়াত কমিটি।

দীনিয়াতের কর্মপদ্ধতি এবং তাদের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমি ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ। মাওলানা মাকনুন সাহেবের উসিলায় ইকরায় যেয়ে আমি এক নতুন দিগন্তের সন্ধান পেলাম। যে দিগন্তের ভাবনা মুসলিম জাতীকে নিয়ে। মুসলিম জাতীর নতুন প্রজন্মকে নিয়ে। মুসলিম জাতীর ৯৮% সন্তানরা স্কুল কলেজমুখী। তাই উম্মতের বৃহৎ এ অংশকে কিভাবে কুরআন শিক্ষা সহ দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো শিখিয়ে দেওয়া যায় এ নিয়েই তাদের সকল গবেষণা, চেষ্টা প্রচেষ্টা ও দৌঁড়ঝাপ। দীনিয়াতের মৌলিক উদ্দেশ্যের মধ্যে প্রধানতম হচ্ছে আদর্শ মক্তব প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা। মুসলিম উম্মাহকে বাতিলের করালগ্রাস থেকে বাঁচাতে মক্তব শিক্ষার কোন বিকল্প নেই। তাই এ বিষয়ে আমাদের আকাবির উলামায়ে কেরাম যথেষ্ট জোর দিয়েছেন।

মক্তব প্রতিষ্ঠায় বড়দের উক্তি

১. হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. বলেন, আমি মাল্টার একাকীত্বের জীবনে চিন্তা করেছি, পুরো দুনিয়াতে মুসলমানগণ দ্বীনি ও দুনিয়াবি দিক থেকে কেন অধঃপতনের শিকার? তখন আমার এর পেছনে দুটি কারণের কথা মনে হয়েছে। এক. কুরআনকে ছেড়ে দেওয়া। দুই. পারস্পরিক মতবিরোধ ও গৃহযুদ্ধ। তাই আমি সেখান থেকেই প্রতিজ্ঞা করে এসেছি যে,কুরআনের সবরকম শিক্ষা ( অর্থাৎ শাব্দিক তেলাওয়াত ও অর্থ এবং মর্ম) ব্যাপক করতে হবে।বাচ্চাদেরকে তেলাওয়াত শেখানোর জন্য পাড়ায় পাড়ায় মক্তব প্রতিষ্ঠা করতে হবে।( ওয়াহদাতে উম্মত)

২. হযরত হাকিমুল উম্মত শাহ আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, সর্বপ্রথম মুসলিম বাচ্চাদের কুরআন পড়ানো উচিত।এমনটা সঙ্গত মনে হয় না যে,চোখ মেলার পরই তাকে ইংরেজি শেখায় লাগিয়ে দেওয়া হবে।( আল ইলমু ওয়াল উলামা, ৪০)

৩. হযরত হাফেজ্জি হুজুর রহ. বলেন, বাংলাদেশের ৬৮ হাজার গ্রামে ৬৮ হাজার কুরআনি মক্তব প্রতিষ্ঠা করুন। মক্তব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে ঈমানের দৌলত পৌঁছে দিন এবং তাদের মধ্যে ইসলামী আদর্শ, চেতনা ও মূল্যবোধের বীজ বপন করুন।

বড়দের দূরদর্শীমূলক বাণীমালাকে সামনে রেখেই মূলত দীনিয়াতের নড়াচড়া, সামনে অগ্রসর হওয়া।

দীনিয়াত প্রতিষ্ঠার ইতিহাস

দীনিয়াত সর্বপ্রথম ১৯২৫ ইং সনে দক্ষিণ আফ্রিকার উলামায়ে কেরামগণ সেখানকার পরিস্থিতি সামনে রেখে স্কুলগামী মুসলিম বাচ্চাদের জন্য একটি মক্তব সিলেবাস তৈরী করেন। তাদের সফলতার উপর ভিত্তি করে বড়দের পরামর্শে ( হারদুঈ হযরত রহ.) মুম্বাইয়ের হাজী রফিক সাহেবের উদ্যোগে ২০০৩ ইং সনে এশিয়ায় আফ্রিকার সিলেবাসসহ আরো অন্যান্য সিলেবাস সামনে রেখে দীনিয়াত নামে একটি আদর্শ মক্তব সিলেবাস প্রনয়ণ করা হয়।

এর ভিত্তি চারটি বিষয়ের উপর রাখা হয়। ১. আদর্শ সিলেবাস। ২. আদর্শ পাঠদান পদ্ধতি। ৩. আদর্শ নীতিমালা। ৪. আদর্শ পরিদর্শন ব্যবস্থা। এ চারটি বিষয়কে সামনে রেখে মুম্বাই থেকে সুশৃঙ্খল মক্তব পুরো ইন্ডিয়াতে পরিচালিত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে প্রায় ৩০ লক্ষ স্কুলগামী ছাত্র-ছাত্রী কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদির দীক্ষা নিচ্ছে।

বাংলাদেশে দীনিয়াত

বাংলাদেশে দীনিয়াতের পথচলা ২০১১ সালে মাওলানা সালমান সাহেবের হাত ধরে। তারপর ভারতে দীনিয়াতের সফলতা বাস্তবে দেখার উদ্দেশ্যে ২০১৭ ইং সনের মার্চ মাসে বাংলাদেশের শীর্ষ উলামাদের একটি দল মুম্বাইয়ে সফর করেন। এবং এই সফর থেকে ফিরে তাঁরা ওদের কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং অন্যদেরকেও দীনিয়াতের মুনাযযাম মক্তব এগিয়ে নেওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেন।

দীনিয়াতের শিক্ষা কার্যক্রমের উদ্দেশ্য

১. শতভাগ উম্মত তথা: শিশু- কিশোর, যুবক- বয়স্ক( পুরুষ -মহিলা) সকলের কাছে মৌলিক দ্বীন পৌঁছানোর চেষ্টা করা।

২. মুসলিম বাচ্চাদের বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত ও দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদি শিক্ষা দেওয়া এবং তাদেরকে ধর্মীয় চেতনা, ইসলামী মূল্যবোধ ও শিষ্টাচারের বলয়ে গড়ে তোলা।

৩. প্রতিটি মুসলিম এলাকা এবং মসজিদে দীনিয়াতের আদর্শ মক্তব প্রতিষ্ঠা করা।

৪. মক্তব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের দ্বীন ও ঈমান হেফাজত করা এবং তাদের মাজে কুরআন- সুন্নাহর মৌলিক শিক্ষা বিস্তার করা।

৫. অল্প সময়ে একাধিক মুসলিম বাচ্চাকে দ্বীনের মৌলিক শিক্ষা দেওয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন ও স্কুলে দীনিয়াত কোর্স চালু করা।

৬. ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে দ্বীন ও ইসলামের মৌলিক শিক্ষার ব্যাপক প্রচার প্রসার করা।

৭. প্রতিটি বস্তি পথশিশু ও বঞ্চিতদের কাছে কুরআনের তা’লিম পৌঁছানোর চেষ্টা করা।

৮. সর্বোপরি মক্তব শিক্ষাকে যুগের চাহিদানুপাতে সংস্কার, আধুনিকায়ন, সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা ও বয়স ভেদে ভিন্ন ভিন্ন সিলেবাসের মাধ্যমে সব শ্রেণীর মুসলমানদের কাছে দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াই দীনিয়াতের উদ্দেশ্য।

দীনিয়াতের কার্যক্রম

দীনিয়াতের কার্যক্রম মূলত বর্তমান বিশ্বের চল্লিশটি দেশে চললেও এর টার্গেট বিশ্বব্যাপী। এদের বই পৃথিবীর বিশটি ভাষায় অনূদিত হয়ে চল্লিশটি রাস্ট্রে সমাদৃত। উলামায়ে কেরামের প্রত্যক্ষ তত্বাবধানে, তাঁদের ঘাম ও রক্তে ভর করে দীনিয়াত এগিয়ে চলুক তার লক্ষ্যপানে দূর্বার গতীতে। অগ্নীর মতো বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ুক দীনিয়াতের এই জান্নাতি খুশবু, চিরন্তন এই কামনা রইল।

লেখক : খতিব, শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com