৪ঠা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং , ১৯শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ , ১৮ই রবিউস-সানি, ১৪৪২ হিজরী

দুর্যোগ মোকাবেলায় স্থায়ী সমাধানের পথে সরকার

দেশ ভাবনা । আসিফ আহমেদ

দুর্যোগ মোকাবেলায় স্থায়ী সমাধানের পথে সরকার

বৈশ্বিক পরিবেশ ও জলবায়ু বিরুপভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে। জলবায়ুর বিরূপ পরিবর্তনে বন্যা, নদী ভাঙ্গন, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস এর মতো ভয়াবহ দুর্যোগে বারংবার আক্রান্ত হচ্ছে বাংলাদেশ। চলতি বছরে শুধুমাত্র “কোভিট ১৯” নয় বরং শক্তিশালী ঘূর্ণঝড় আম্ফানসহ দীর্ঘস্থায়ী বন্যা মোকাবিলা করতে হয়েছে বাংলাদেশকে। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বলা হয়, ২১০০ সালের মধ্যে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (GBM) ডেল্টায় ৮৫-১৪০ সে.মি. পর্যন্ত সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি পেতে পারে।তাই জলবায়ুর ক্রমপরিবর্তনসৃষ্ট আগামী চ্যালেঞ্জকে লক্ষ্য করে বদলে যাচ্ছে সরকারের কাজের পদ্ধতিগত ধরণ। সে লক্ষ্যে শক্তিশালীকরণ হচ্ছে পানি ব্যবস্থাপনা কাঠামো ও পরিকল্পনা। দুর্যোগ মোকাবিলার স্থায়ী সমাধানকল্পে সরকার শতবর্ষী ডেল্টাপ্ল্যান-২১০০ সাথে সমন্বয় করে নিচ্ছে নানা প্রকল্প।

বিশ্বে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা (GBM) ডেল্টা খুব গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্যোগপ্রবণ। এই ডেল্টায় শতকোটিরও বেশি মানুষ বাস করে। এই অববাহিকার ভাটিতে বাংলাদেশের অবস্থান। এই অববাহিকার প্রায় ৯৩ শতাংশ পানির উৎপত্তি বাংলাদেশের বাইরে। উজান থেকে পানি নেমে বাংলাদেশ মধ্য দিয়ে বঙ্গোপসাগরে যাওয়ার পূর্ব পর্যন্ত পুরো পানি ব্যবস্থাপনা খুব জটিল এবং চ্যালেঞ্জিং।

শুষ্ক মৌসুমে পানির স্বল্পতা এবং বর্ষায় প্লাবন আমাদের জন্য রূঢ় বাস্তবতা। সাধারণভাবে আমাদের দেশে ১৪৭ বিলিয়ন কিউসেক মিটার পানির প্রয়োজন থাকে যেখানে শুষ্ক মৌসুমে আমাদের থাকে ৪৪ বিলিয়ন কিউসেক মিটার পানি। তখন প্রায় ১০০ বিলিয়ন কিউসেক মিটারের অধিক পরিমাণ পানি ঘাটতি থাকে। ফলে শুষ্ক মৌসুমে কৃষিসেচসহ নৌ-পথকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলে দেয়। অন্যদিকে উজানে (নেপাল, ভুটান, ভারত,চীন) যখন বৃষ্টি হয়,সেই পানি নেমে আমাদের দেশ হয়ে বঙ্গোপসাগরে যায়। প্রসঙ্গত, বর্ষায় প্রায় ১১২৪ বিলিয়ন কিউসেক মিটার পানি উজান থেকে নেমে আসে। যা আমাদের নদী-নালা,খাল-বিল,হাওর এর সম্মিলিতভাবে পানি ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি। এই বিশাল পরিমাণ পানিরাশি সাথে নিয়ে আসে বছরে প্রায় ১-২ বিলিয়ন টন পলি, উঁচু করে দেয় নদীর তলদেশ। তাই ধারণ করতে না পেরে নদী উপচে পানি তলিয়ে দেয় নদীপাড়ের অঞ্চলগুলো। সংঘটিত হয় বন্যা। তাই উজান থেকে আসা বর্ধিত পানি ধারণক্ষমতা উপযোগী ব্যবস্থাপনা করতে চায় সরকার, যাতে পানি উপচে বন্যা না হয়।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বন্যা মোকাবিলার জন্য নদীর স্থায়ী নাব্যতা নিশ্চিতে কাজ করে যাচ্ছে সরকার । পরিকল্পিত ও নিয়মিত ড্রেজিং করা হবে। উজানের বৃষ্টিপাতের পরিমাণ এবং আমাদের দেশের বৃষ্টিপাতের পরিমাণের সাথে আরও ৫ শতাংশ বেশি ধরে দেশের নদ-নদী ও খালের পানি ধারণ ক্ষমতা বাড়াতে ড্রেজিং করবে সরকার। সেই সাথে কমানো হবে নদীর প্রসস্থতা। বড়ো বড়ো নদীর প্রসস্থতা কমিয়ে ৬-৭ কিমি. আনা হবে।নদী ড্রেজিংকৃত মাটি নদীতীরে ফেলে জমি পুনরুদ্ধার (RECLAIM)করা হবে। পুনরুদ্ধারকৃত জমি প্লাবন ভূমি (Flood Plain) হিসেবে থাকবে। তখন নদীর পানি উপচে শুধু প্লাবন ভূমিকে (Flood Plain) প্লাবিত করবে। প্লাবন ভূমির পাশেই স্থলভাগের দিকে নির্মিত হবে তীররক্ষা বাঁধ। যেহেতু পানি পলি নিয়ে আসে তাই প্লাবন ভূমি থাকবে উর্বর, যা ব্যবহৃত হবে কৃষিকাজে। এতে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার বাড়তি খাদ্য চাহিদা মেটাতে সহায়ক হবে। একই সাথে হ্রাস পাবে কৃষিজমি সংকট, বর্ধিত হবে কর্মসংস্থান। এতে নদীগুলো পাবে চিরস্থায়ী গভীরতা, ফিরে পাবে পূর্বের ন্যায় স্বাভাবিক প্রবাহ। ধারাবাহিকভাবে এর স্রোতধারায় প্রাণ পাবে আরো অনেক শাখা নদী, নিরাপদ হবে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলের মানুষের জীবন।

বন্যার অন্যতম কারণ হলো পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়া। কালের বিবর্তনে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও অসাধুদের দখলে কারণে অতীতের ন্যায় পানির আন্তঃসংযোগ নেই। বড়ো নদীর সাথে সংযোগ (Linkage) হারানো সকল ছোটো নদী, খাল ও জলাশয়কে পুনরুজ্জীবিত করতে খনন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে সরকার। সেলক্ষ্যে শুধুমাত্র গত অর্থবছরেইসারাদেশে প্রায় ১৬ শত কিমি খাল পুনঃখনন করা হয়েছে। প্রথম পর্যায় শেষে দ্বিতীয় পর্যায় প্রায় আরও ৫ শত ছোট নদী, খাল খনন করবে সরকার। দখলমুক্ত করতে চলছে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ। বড়ো নদীর সাথে ছোটো নদী-খালের লিংকেজ পুনরুজ্জীবিত হলে উজানের বাড়তি পানির চাপ সামলে নিবে পুরো ব্যবস্থাপনা, দ্রুততায়ন হবে পানি নিষ্কাশন। সঙ্গতভাবে, রিচার্জড হবে ভূগর্ভস্থ পানিস্তর, সহজতর হবে কৃষিসেচ। একইসাথে পুনরুদ্ধার হবে ছোটো-বড়ো হারানো অনেক নৌপথ।

নদীভাঙন আমাদের দেশের অন্যতম সমস্যা। প্রতিবছর যমুনা,পদ্মা এবং মেঘনা (নিম্নভাগ) যথাক্রমে প্রায় ১৭৭০ হেক্টর, ১৩০০ হেক্টর এবং ২৯০০ হেক্টর করে ভাঙ্গছে। গৃহহারা হচ্ছে বছরে প্রায় ৫০-৬০ হাজার পরিবার। সহায়-সম্বল হারিয়ে দুর্দশা নেমে আসে লাখো মানুষের জীবনে। নদীভাঙ্গন রক্ষায় সারাদেশে ১৬ হাজার ৩৫৩ কিমি বাঁধ রয়েছে। শুধুমাত্র গত

(২০১৯-২০২০) অর্থবছরে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রকল্পাধীনে ৯২ কিমি বাঁধ নির্মাণ হয়েছে। তবুও প্রকৃতির সাথে পেরে উঠা যেন দুষ্কর। বন্যা-ঘূর্ণিঝড় আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাঁধ। পানি ঢুকে ভাসিয়ে নেয় ফসলি জমি, ঘরবাড়ি। দেশে গড়ে প্রতি তিন বছরে একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বিশেষত, গত মে মাসে প্রলয়ংকারী ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে দেশের ৫ শতাধিক স্থানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোটি কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি সাধন করেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের উপকূলাঞ্চল। সরকারের আবহাওয়া পূর্বাভাসের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মাঠ পর্যায়ে রাখা হয়েছিলো পূর্বপ্রস্তুতি। করা হয়েছে পূর্ব প্রচারণা এবং জরুরিভাবে ভাঙ্গন ঠেকাতে তৈরি ছিলো জিও ব্যাগ। ঝড়ের পরদিনই করোনা মহামারী মধ্যেই ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন সরকার। প্রাথমিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ জরুরি সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিলো সেনাবাহিনীকে। ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনে দেওয়া হয়েছে বিশেষ বরাদ্দ। দেশে লকডাউন পরিস্থিতিতেও বর্ষাকে লক্ষ্য করে কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চিহ্নিত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প অব্যাহত রাখারও নির্দেশনা দেয় সরকার।

দুর্যোগের পাশাপাশি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ বসতি। গৃহহীন ভাসমান মানুষেরা কোনোরকম ঘর বানিয়ে বসবাস করেন বাঁধের ওপর। সেখানে খাবার রান্নার ফলে ইঁদুরের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। সেই সাথে উপকূলাঞ্চলে লাভজনক চিংড়ি চাষও বাঁধকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলাসহ জোয়ারের পানি প্রতিরোধে বাঁধ উন্নয়নে পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। জুন, ২০২২ সালে সম্পন্ন করার লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ৩ হাজার ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে সাতক্ষীরা,খুলনা, বাগেরহাট,পিরোজপুর, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার বাঁধ উন্নয়ন কাজ শুরু করেছে সরকার। স্থান ও প্রয়োজনভেদে বাঁধ আরো উঁচু-মজবুত করা হচ্ছে।

আম্ফান পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায় , যেসব জায়গায় বাঁধ টিকে আছে সেখানে গাছ ছিলো। যেখানে বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে অধিকাংশ জায়গায় কোনো গাছ ছিলো না। তাই বাঁধ দৃঢ়করণের পাশাপাশি বাঁধকে টেকসই করতে বৃক্ষরোপন জরুরি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশের বনায়নকে ২৫ শতাংশে উন্নীত করতে মুজিববর্ষ উপলক্ষ্যে ১ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন । এই কর্মসূচির অংশ হিসেবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে সারাদেশে ১০ লক্ষ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি সম্পন্ন করেছে এবং স্থানীয়দের মাঝেও বৃক্ষরোপণে তাগিদ দেয়া হয়েছে। এখন বাঁধসংশ্লিষ্ট সকল প্রকল্পেই গাছ লাগানোর বিষয়টি জোরারোপ করা হচ্ছে।

পানি ব্যবস্থাপনায় সরকারের প্রকল্পগুলো এখন আরো বেশি দূরদৃষ্টিসম্পন্ন। টেকসই করার লক্ষ্যেসকল প্রকল্পের আগে সংশ্লিষ্ট এলাকার সমস্যার ধরণ ও ঋতুভেদে নদীপ্রকৃতির বিশ্লেষণধর্মী স্ট্যাডিকরা হচ্ছে।প্রয়োজন সাপেক্ষে নেয়া হচ্ছে বিদেশি কারিগরি সহায়তা। এছাড়া সম্যক পরিস্থিতি অভিজ্ঞতার জন্য বেড়ে গেছে প্রকল্প এলাকায় পরিদর্শন। গত দেড় বছরে সারাদেশে প্রায় ৩০০ টিপ্রকল্প স্থান পরিদর্শন করেছে মন্ত্রণালয়। প্রকৃত অবস্থা জানতে প্রকল্প স্থান রিয়েল টাইম (তাৎক্ষণিক) মনিটরিং করতে হচ্ছে অনলাইন ক্যামেরাব্যবস্থা। যাতে ঢাকায় বসেও কোথায় কি কাজ হচ্ছে তা তাৎক্ষণিক মনিটর করা যায়।দূর করা হয়েছে কেন্দ্রের সাথে মাঠ পর্যায়ের সকল যোগাযোগ দূরত্ব (Communication Gap)। সারাদেশে চলমান কাজের অগ্রগতি,উদ্ভূত নানা সমস্যা ও তাৎক্ষণিক নির্দেশনার জন্য যোগাযোগ করা হচ্ছে অনলাইনভিত্তিক গ্রুপে। নেই নির্দেশনাগত কোনো দীর্ঘসূত্রিতা। তাছাড়া কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে সিভিল সার্ভিসে পানিসম্পদ ক্যাডার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি রয়েছে প্রক্রিয়াধীন।

নদীমাতৃক দেশে পানি ব্যবস্থাপনার স্থায়ী সমাধান ব্যতিরেকে কোনো উন্নয়নকে টেকসই করা যায় না। তাই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসহ (SDG) দেশের কাঙ্খিত উন্নয়ন অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। জলবায়ুর নেতিবাচক প্রভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগচক্র আগামীতে বৃদ্ধি পেতে পারে। ডেকে আনতে পারে আরো দুর্ভোগ, আরো ক্ষয়ক্ষতি। তাই আগামী জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি, পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায়”ডেল্টাপ্ল্যান বা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০” নামে ১০০ বছরের মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। যার সফল বাস্তবায়নে ভবিষ্যত প্রজন্ম পাবে নিরাপদ ও উন্নত এক ব-দ্বীপ। এই মহাকর্মযজ্ঞেরদৃশ্যমান সুফল পেতে প্রয়োজন ধৈর্য ও সহনশীলতার।
লেখক : কলামিস্ট
০৪.১১.২০২০

নিউজটি শেয়ার করুন

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার সম্পূর্ণ বেআইনি এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ
Design & Developed BY ThemesBazar.Com